ডলি জহুর: যাঁর চোখের পানি হাসি ফুটিয়েছিল ইন্ডাস্ট্রিতে

অনবদ্য এক অভিনেত্রীর নাম ডলি জহুর। বিনোদান তারকারা যাকে ‘মা’ বলেই সম্বোধন করেন, পর্দার বাইরেও। চার যুগেরও বেশি সময় ধরে মুগ্ধ করে রেখেছেন দর্শকদের। তিনি আপাদমস্তক একজন অভিনেত্রী, সত্যিকারের একজন শিল্পী, একই সঙ্গে চমৎকার বন্ধুসুলভ মানুষও। মঞ্চ, টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র-—সব মাধ্যমেই দাপটের সঙ্গে কাজ করতে দেখা গেছে তাকে। আজ (১৭ জুলাই) এই গুণী অভিনেত্রীর জন্মদিন। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়ার সময়ে ১৯৭৪-৭৫ সালের দিকে ডলি বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিনয় শুরু করেন। এরপর মঞ্চে অভিনয় করেন। পরবর্তী সময়ে টেলিভিশন নাটকে ও চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করেন। তাঁর অন্যতম কাজ ‘বাবা কেন চাকর’ সিনেমা।

যেখানে রাজ্জাক ও ডলি জহুরের অভিনয় দেখে সিনেমা হলে মানুষ অশ্রুসিক্ত হয়েছেন। রাজ্জাক পরিচালিত ও প্রযোজিত ছবিটি ব্যবসায়িক সফলতাও পায়।  সম্প্রতি এই ছবিটি নিয়ে মুখ খুলেছেন ডলি। জানান মজার এক তথ্য। তাঁর মতে, এক আড্ডায় পরিচালক মনতাজুর রহমান আকবরকে রাজ্জাক বলেছিলেন, ডলি জহুরের চোখের পানির দাম তিন কোটি টাকা।

‘বাবা কেন চাকর’ ছবিটি মুক্তির পর দর্শকদের কাঁদিয়েছে, তা নির্মাণের খবর শুনে অনেকে নাকি তখন হাসাহাসি করেছেন। চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট অনেকেও নাকি এই নামে ছবি হোক, তা চাননি। আজ রাজ্জাকের মতো চলচ্চিত্রের প্রভাবশালী একজন এই নামে ছবি বানাতে পারেন, তা ভাবতেও পারেননি।

ডলি জহুরের ভাষ্য, ‘বাবা কেন চাকর ছবিটি হলো, তখন পুরো চলচ্চিত্র অঙ্গনের অবস্থা খুব একটা ভালো ছিল না। আস্তে আস্তে আরও খারাপের দিকে যাচ্ছিল। অনেকে তাই বলাবলি করছিল, এমনিতেই ছবি চলে না। তার ওপর ছবির নাম রাখছে, বাবা কেন চাকর! অনেকে আমার সামনেও হাসাহাসি করছে। হাসতে হাসতে এ–ও বলেছে, রাজ্জাক সাহেব কেন এই নামের ছবি করবেন! কিন্তু যাঁরা এমন কথা বলছিল, তারা কেউই বাবা কেন চাকর ছবির ভেতরের গল্পটা জানে না।’

বাবা কেন চাকর নামে ছবির নাম রাখার কারণ হিসেবে ডলি জহুর জানালেন, ‘‘ওই সময় ‘স্বামী কেন আসামী’ নামে একটা ছবি সুপারহিট হয়েছিল। রাজ্জাকও তাই ভেবেছিলেন, ছবির গল্পটা যেমন, তাতে ‘বাবা কেন চাকর’ নামে ছবি বানালে ছবিটি কিছু একটা হবে। মানুষকে নাড়া দেবে।’’

বাবা কেন চাকর ছবিতে রাজ্জাক ও ডলি। ছবি ইউটিউব ভিডিও থেকে নেওয়াএ চলচ্চিত্র তখন হাসি ফুটিয়েছিল অনেক হল মালিকদের মুখে। ইন্ডাস্ট্রি চাঙ্গা হয়ে ওঠে। কলকাতাতেও তৈরি করা হয় রিমেক। সিনেমার ব্যবসা প্রসঙ্গে ডলি বলেন, ‘‘রাজ্জাক ভাই যা ভেবেছিলেন, তাই হয়েছে। মুক্তির পর লোকজন হুমড়ি খেয়ে পড়ল। দেখা গেছে, আজকে দুইজন, কালকে পাঁচজন, এভাবে যেন বাড়তেই থাকল। লোকমুখে ছবিটির নাম ছড়িয়ে পড়ল। একদিন তো রাজ্জাক ভাই মনতাজুর রহমান আকবর ভাইয়ের শুটিং স্পটে ছবিটি নিয়ে কথাও বললেন। তিনি এভাবে বলছিলেন, ‘জানো আকবর, তোমরা তো অমুকের চোখের পানি কোটি টাকা, তমুকের চোখের পানি কোটি টাকা বলো। কিন্তু তোমরা কি জানো, ডলির চোখের পানির দাম তিন কোটি টাকা। বিষয়টাতে আসলে রাজ্জাক ভাই বলতে চেয়েছিলেন, ওই সময়ে বাবা কেন চাকর ছবিটি তিন কোটি টাকা ব্যবসা করেছে।’’

ডলি জহুরের অসংখ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে আছে—‘শঙ্খনীল কারাগার’, ‘আগুনের পরশমণি’, ‘বিচার হবে’, ‘স্বপ্নের ঠিকানা’, ‘ দীপু নাম্বার টু’, ‘রং নাম্বার’, ‘নিরন্তর’,‘ ঘানি’, ‘দারুচিনি দ্বীপ’ ইত্যাদি। চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য দুইবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করে ডলি জহুর। ১৯৯২ সালে ‘শঙ্খনীল কারাগার’ এবং ২০০৬ সালে ‘ঘানি’ চলচ্চিত্রে অভিনয়ের জন্য এ পুরস্কার পান তিনি। 

২০২১ সালে তাঁকে আজীবন সম্মাননা বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রদান করা হয়।