ফ্লপ মাস্টার থেকে মহানায়ক

তিনি বাংলা চলচ্চিত্রের ‘মহানায়ক’। অভিনয় জীবনের শুরুতে যদিও নানান চড়াই-উতরাই তাঁকে পেয়ে বসেছিল। একে একে মুখ থুবড়ে পড়েছিল ৭টি ছবি। এর আগে অভিনয়ে নাম লেখাতে গিয়েও নানা অলিগলি ঘুরতে হয়েছে। আর্থিক অনটনের দিনগুলোতে কলকাতার পোর্টে নিয়েছিলেন কেরানির চাকরি। অবশেষে তিনি অপরাজিত। তিনি উত্তম কুমার। আজ এই মহানায়কের জন্মবার্ষিকী।

সালটা ১৯৫৩, মুক্তি পেল নির্মল দের ছবি ‘সাড়ে ৭৪’। মুক্তির পর ছবিটি নিয়ে দর্শকের কী উল্লাস! তারকাবহুল এই ছবিতে কে নেই! চারদিকে কথা হচ্ছিল, ছবিটির মাধ্যমে নতুন জুটি এসেছে পর্দায়। বয়স্করা মজেছিলেন তুলসী চক্রবর্তী ও মলিনা দেবীতে। তাদের দাবি, হিরো-হিরোইন তো তুলসী-মলিনা। নতুন জুটি তো পার্শ্ব চরিত্রে! বক্স অফিস কাঁপিয়ে দিয়েছিল সেই ছবি। টানা আট সপ্তাহ চলেছিল সিনেমা হলে। শুরুটা সেভাবেই।

টানা ব্যর্থতাতেও দমে যাননি উত্তম কুমার। ছবি: সংগৃহীত

১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কলকাতায় জন্মগ্রহণ করেন উত্তম কুমার। পরিবারের দেওয়া নাম ছিল অরুণ কুমার। বাবা সাতকড়ি চট্টোপাধ্যায় কলকতার মেট্রো সিনেমা হলের এক সাধারণ কর্মচারী, মা চপলা দেবী গৃহিণী। অভাব-অনটনের সংসার, কোনোমতে দিন কেটে যায়। উপায় না দেখে উপার্জনে নেমে পড়লেন বাড়ির বড় ছেলে অরুণ। পড়াশোনার পাশাপাশি গানের শিক্ষকতা শুরু করলেন। সবচেয়ে লোভনীয় প্রস্তাব পেলেন অল্প দিনেই। গান শেখাতে হবে গাঙ্গুলী বাড়ির মেয়ে গৌরী দেবীকে। বেতনও বেশ ভালো, মাসে ৭৫ টাকা। সেখান থেকেই প্রেমে মজলেন উত্তম-গৌরী। ১৯৫০ সালের ১ জুন বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তাঁরা।

ছোটবেলা থেকেই থিয়েটার অনুরাগী অরুণ, ছিলেন যাত্রার ভক্ত। রুপালি পর্দায় অভিনয়ের ঝোঁকটা ক্রমেই বেড়ে চলল। ১৯৪৭ সালে হিন্দি চলচ্চিত্র ‘মায়াডোর’-এ অভিনয়ের সুযোগ মিলল। তবে এক্সট্রা আর্টিস্ট হিসেবে। মাত্র পাঁচ সিকিতে দৈনিক ভিত্তিতে ওই ছবিতে অভিনয় করলেন তিনি। কিন্তু ‘মায়াডোর’ মুক্তি পেল না। 

১৯৪৮ সালে পেলেন আরেকটি সুযোগ, ‘দৃষ্টিদান’ ছবিতে নায়ক অসিতবরণের অল্প বয়সের চরিত্রে। কিন্তু দর্শকমনে তেমন দাগ কাটতে পারলেন না অরুণ। পরের ছবি ‘কামনা’। ১৯৪৯ সালে মুক্তি পেল ছবিটি, কিন্তু সেটিও সুপার ফ্লপ। পরের দুই ছবি ‘মর্যাদা’ ও ‘ওরে যাত্রী’ও চলল না।

টানা ফ্লপ, তারপরও দমে যাননি অরুণ। হাতে ছিল তখনও ‘সহযাত্রী’ ও ‘নষ্টনীড়’ নামের দুটি ছবি। মন-প্রাণ দিয়ে অভিনয় করলেন। ফল আগের তিনটির মতোই! বিষয়টি ভালোভাবে নিলেন না অনেকেই। আড়ালে-আবডালে তাঁকে ডাকা শুরু হলো ‘ফ্লপ মাস্টার জেনারেল’ বা ‘এফএমজি’ বলে। নামটা রটে গেল টলিউডে। গণমাধ্যমে এফএমজি ঘিরে খবরও প্রকাশিত হলো।

চলচ্চিত্রের পর্দায় উত্তম-সুচিত্রা। ছবি: সংগৃহীত

ব্যর্থতার এই ধারাবাহিকতা চলছিল। এর মধ্যে সরোজ মুখোপাধ্যায়ের ‘মর্যাদা’ ছবিতে নায়ক হলেন অরুণ। তবে পরিচালকের সঙ্গে প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী নাম পাল্টে হলেন অরূপ কুমার। তাতেও কাজ হলো না। ‘সহযাত্রী’ ছবিতে তিনি অভিনয় করছিলেন বিখ্যাত অভিনেতা পাহাড়ি সান্যালের সঙ্গে। শুটিংয়ের এক ফাঁকে আড্ডায় পাহাড়ি সান্যাল হঠাৎ বলে বসলেন—‘তুমি অরুণ নও হে, তুমি যে উত্তম, উত্তম কুমার।’ তাঁর পরামর্শে নাম পাল্টে হয়ে গেলেন উত্তম কুমার। নাম বদলের প্রথম ছবি সহযাত্রীতেও সাফল্য ধরা দিল না। ১৯৫১ সালে ‘সঞ্জীবনী’ও ফ্লপ হলো। এর পরের গল্পটা ঘুরে দাঁড়ানোর। পার্শ্ব চরিত্রে সুযোগ পেলেন ‘বসু পরিবার’ ছবিতে। বেশ ভালো চলল, অভিনয়ের জন্য প্রথমবারের মতো প্রশংসিত হলেন উত্তম।

১৯৫৪ সালে মুক্তি পেল উত্তম অভিনীত ১৪টি ছবি। ‘দৃষ্টিদান’ দিয়ে শুরু করে ১৯৮০ সাল পর্যন্ত ৩৩ বছরে ক্যারিয়ারে বাংলা-হিন্দি মিলিয়ে আড়াইশ’র মতো ছবিতে অভিনয় করেছেন উত্তম।

এই মহানায়কের ক্যারিয়ারে মহানায়িকা সুচিত্রা সেন রয়েছেন বড় এক অধ্যায়জুড়ে। ‘ওরা থাকে ওধারে’ ছবির মাধ্যমে উত্তম-সুচিত্রা জুটি পাকাপাকিভাবে দর্শক হৃদয়ে জায়গা করে নেয়। ২২ বছরে মুক্তি পেয়েছিল উত্তম-সুচিত্রার ৩১টি ছবি। 

তবে রুপালি পর্দার বাইরে কেমন ছিল এই জুটির সম্পর্ক? পেশাগত নাকি বন্ধুত্বের? নাকি আরও কিছু? এসব প্রশ্নের শুরু আছে, শেষ হয়নি কখনো! সুচিত্রার শেষ ছবি হতে পারত উত্তমের সঙ্গে, এমনকি উত্তমেরও। কিন্তু কী যে ঘটেছিল, ১৯৬২ সালের পর তাঁরা একসঙ্গে ছবি করা কমিয়ে দেন। অন্যদিকে, সুচিত্রা কেনই-বা সিনেদুনিয়া ছেড়ে চলে গেলেন লোকচক্ষুর আড়ালে, তাও এক চিরকালীন রহস্য। গৌরী দেবীকে ছেড়ে ১৯৬৩ সাল থেকে ১৯৮০ সালে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত সুপ্রিয়া দেবীর বাড়িই হয়েছিল উত্তমের ঠিকানা।