সঙ্গীদের সাথে বিপথে পা বাড়িয়েছিলেন এক পুলিশ অফিসার। অর্থের লোভে অবশ্যই। কিন্তু তা করতে গিয়েই ঘটে এমন এক ঘটনা, যাতে বাকি জীবনের দুঃস্বপ্নের কোটা পূরণ হয়ে যায়। সেই দুঃস্বপ্নের তাড়া খেয়ে ঘুরপাক খাওয়ার মধ্যেই শহরে ঘটে মারাত্মক খুন। আর এর মধ্য দিয়েই ওই পুলিশ অফিসার পড়ে এমন এক গাড্ডায়, যা থেকে বের হওয়ার পথ মেলে না আর!
বলা হচ্ছে ‘হ্যাভক’–এর গল্প। গত এপ্রিলের শেষ সপ্তাহে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম নেটফ্লিক্সে মুক্তি পায় এই অ্যাকশনধর্মী ক্রাইম মুভি। পরিচালনা করেছেন গ্যারেথ ইভানস। গল্পও লিখেছেন পরিচালকই।
অ্যাকশন দৃশ্যে দুর্দান্ত টম হার্ডি। ছবি: নেটফ্লিক্সএর আগে ‘দ্য রেইড’ ফ্র্যাঞ্চাইজির সিনেমা দিয়ে বেশ আলোচিত হয়েছিলেন গ্যারেথ। অ্যাকশন সিনেমা তৈরিতে তাঁর কুশলতাও আছে। ফলে টম হার্ডিকে মূল চরিত্রে রেখে তৈরি ‘হ্যাভক’ বেশ আগ্রহ তৈরি করেছে হলিউডে। সেই আগ্রহের প্রমাণ মেলে মুক্তির পর পরই নেটফ্লিক্সের সবচেয়ে বেশি দেখা কনটেন্টের তালিকার শীর্ষে ‘হ্যাভক’–এর চলে আসার মাধ্যমে।
কনটেন্ট তুমুল অ্যাকশন ঘরানার বলেই হয়তো, শুরুর দৃশ্যেই চলে আসে অপরাধীদের তাড়া করার বিষয়টি। এর পরেই চলে খুনোখুনি। শহরের এক মাদক ব্যবসায়ী মাফিয়াকে হত্যা করে একদল মুখোশধারী। তাতেই তৈরি হয় রহস্য। সেই ক্রাইম সিনে তদন্ত চালাতে গিয়েই পুলিশের গোয়েন্দা প্যাট্রিক ওয়াকার জানতে পারে যে, মূল সন্দেহভাজন হলো শহরের আসন্ন মেয়র পদপ্রার্থী ও বিশিষ্ট ব্যবসায়ী লরেন্সের ছেলে। এ নিয়েই শুরু হয় ইঁদুরদৌড়। পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন ওয়াকারের অতীত জীবনের গোপন পাপের দোহাই দিয়ে লরেন্স চাপ দেয় তার ছেলেকে উদ্ধারের ব্যাপারে। ওয়াকারও শুরু করে দেয় কাজ। অনেকটা নিজের অতীতের পাপ থেকে তৈরি হওয়া অপরাধবোধই যেন ওয়াকারকে তাড়িয়ে বেড়ায়। আর এভাবে কাহিনী এগিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে বাড়তে থাকে অ্যাকশনের প্রাবল্য।
অ্যাকশনের কথা যেহেতু এলোই, আরেকটু গভীরে যাওয়া যাক। ‘হ্যাভক’ পুরোদস্তুর একটি মারদাঙ্গা সিনেমা। গোলাগুলি, মারামারি আছে পূর্ণ মাত্রায়। বরং খানিকটা উপচেও পড়েছে। সেই তুলনায় গল্পের গভীরতা কমই। দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশ অফিসারকে কেন্দ্রীয় চরিত্রে রেখে হলিউডে এর আগেও এমন সিনেমা হয়েছে ঢের। সেসবের কাহিনীবিন্যাসের সাথে তুলনায় গেলে বলতেই হয় যে, ‘হ্যাভক’ নতুন কোনো গল্প দেখায় না। মনে করাই যায় যে, গল্পের সেই অগভীর অবস্থাকে কিছুটা ঢেকে দিতেই যেন পুরো সিনেমায় গুলি চালানো হয়েছে বৃষ্টির মতো!
অ্যাকশন দৃশ্য, হ্যাভক। ছবি: নেটফ্লিক্সহ্যাঁ, এই সিনেমায় অ্যাকশনপ্রেমীরা বেশ বিনোদিত হবেন। এমন কিছু অ্যাকশন দৃশ্য রয়েছে, যেগুলো উপভোগ করার মতোই। বিশেষ করে নাইটক্লাবে হুট করে যে সংঘাতের সূচনা হয়, তার ধরণ সত্যিই অভিনব। তবে মারামারিই তো সব কিছু নয়, গল্পেও মারপ্যাঁচ থাকা লাগে। এই জায়গাতেই ছিল ঘাটতি। আর সেই কমতি ঢাকতে গিয়ে তৈরি অ্যাকশন দৃশ্যগুলোকে তাই কিছুটা দীর্ঘ বোধ হয়। কোন কোন ক্ষেত্রে তো মনে হয় টম হার্ডি একজন রক্ত–মাংসের গোয়েন্দা নন, বরং কমিক সুপারহিরো ‘ভেনম’ হয়ে যাচ্ছেন! অর্থাৎ, কিছুটা বাড়াবাড়ি দৃশ্যমান সিনেমায়। এতে করে গল্পকে বাস্তবসম্মত উপায়ে পর্দায় ফুটিয়ে তোলার চেষ্টাও ব্যর্থ হয় বটে।
টম হার্ডি। অনবদ্য অভিনয় করেছেন। ছবি: নেটফ্লিক্সএ সিনেমার সবচেয়ে বড় সম্পদই হলেন টম হার্ডি। এটুকু দ্বিধাহীনভাবে বলে দেওয়া যায় যে, হলিউডের এই গুণী অভিনেতা চেষ্টায় ত্রুটি রাখেননি। এমনকি অনেক কিন্তুর পরও সিনেমাটি শেষ পর্যন্ত দেখার যতোটা আগ্রহ জমা থাকে, সেটি মূলত টম হার্ডির কারণেই। এই অভিনেতা ছাড়াও অন্যান্য চরিত্রে জেসি মেই লি, টিমোথি ওলিফ্যান্ট, ফরেস্ট হুইটেকার প্রমুখও ভালো অভিনয় করেছেন।
ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ও ক্যামেরার কাজও চমকপ্রদ ছিল। বিশেষ করে অ্যাকশন দৃশ্যগুলোতে যেভাবে ক্যামেরার লেন্স এক ধরনের জারকি মুভমেন্ট উপহার দিয়েছে, তা বেশ উপভোগ্য।
হ্যাভকের দৃশ্য। ছবি: নেটফ্লিক্সএক কথায়, নিখাদ অ্যাকশন মুভি দেখতে হলে ‘হ্যাভক’ ভালো বিকল্প। তবে শর্ত থাকে যে, গল্প নিয়ে খুঁতখুঁতে হওয়া যাবে না! এটুকু মেনে নিতে পারলে দেখাই যায় ‘হ্যাভক’। তুমুল অ্যাকশনের পর সিনেমার শেষ দৃশ্যে টম হার্ডির শূন্য দৃষ্টিতে একটু থমকে যে যাবেনই, সেটি নিশ্চিত।
রেটিং: ৪.২০/৫.০০
পরিচালক: গ্যারেথ ইভানস
গল্প: গ্যারেথ ইভানস
অভিনয়শিল্পী: টম হার্ডি, জেসি মেই লি, টিমোথি ওলিফ্যান্ট, ফরেস্ট হুইটেকার
ভাষা: ইংরেজি
ধরন: অ্যাকশন, থ্রিলার
দৈর্ঘ্য: ১ ঘণ্টা ৪৭ মিনিট
প্রযোজনা সংস্থা: সেভার্ন স্ক্রিন, ওয়ান মোর ওয়ান, এক্সওয়াইজেড ফিল্মস
মুক্তি: ২৫ এপ্রিল ২০২৫/নেটফ্লিক্স