সালতামামি ২০২৫

একের পর এক কনসার্ট বাতিল, আছে প্রতারণার অভিযোগ

জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা একেবারেই ভেঙে পড়েছিল। এরইমধ্যে অবশ্য সেই পরিস্থিতির অনেকটা উন্নতি হয়েছে। তবে গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে নিরাপত্তাজনিত কারণে বাতিল বা স্থগিত হয়েছে একের পর এক কনসার্ট। চলতি বছরও সংগীতাঙ্গনের এই চিত্র বদলায়নি। এমনকি আয়োজকদের বিরুদ্ধেও উঠেছে প্রতারণার অভিযোগ। সংগীত তারকাদের মতে, এ বছর সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত কনসার্টগুলো নির্বিঘ্নে হয়েছে। এর বাইরে প্রাইভেট শো হলেও, বাতিল বা স্থগিত হয়েছে আন্তর্জাতিক কনসার্ট। যেখানে ভারত-পাকিস্তানের একাধিক তারকা শিল্পীর পারফর্ম করার কথা ছিল। এ ছাড়া উন্মুক্ত কনসার্টে বাধার মুখে পড়েছেন দেশীয় শিল্পীরাও। 

চলতি বছর জানুয়ারিতে ‘ঢাকা ড্রিমস’ শীর্ষক একটি কনসার্টে পারফর্ম করেছিল পাকিস্তানি ব্যান্ড ‘কাভিশ’। এরপর ডিসেম্বরে আবারও ঢাকায় এসেছিলেন ব্যান্ডটির সদস্য জাফর জাইদি ও মাজ মওদুদ। কিন্তু এবার আর তাঁদের গাওয়া হয়নি। কারণ, প্রশাসনের অনুমতি না পাওয়ায় স্থগিত হয়েছে ‘ওয়েভফেস্ট: ফিল দিস উইন্টার’ শীর্ষক একটি কনসার্ট।

একইভাবে পাকিস্তানি সংগীতশিল্পী আলী আজমত, আতিফ আসলাম, ‘জাল দ্য ব্যান্ড’ থেকে শুরু করে ভারতীয় সংগীতশিল্পী অনুব জৈন—এমন জনপ্রিয় শিল্পীদের পারফর্ম করার কথা থাকলেও, দিনশেষে সেইসব আন্তর্জাতিক কনসার্ট হয়নি।

ফরিদপুরে পণ্ড হয় নগরবাউল জেমসের কনসার্ট। ছবি: সংগৃহীত

নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ
বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখে আন্তর্জাতিক কনসার্টের অনুমতি দিচ্ছে না সরকার। এর অন্যতম কারণ হিসেবে সামনে এসেছে নিরাপত্তাজনিত সমস্যা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্রের মতে, আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে চাইছে প্রশাসন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটালকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিরাপত্তা অনুবিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে আপাতত কোনো কনসার্টের অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না।’ তিনি আরও বলেন, ‘বিশেষ করে আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে নিরাপত্তার বিষয়টি আমাদের ভাবতে হয়। প্রায় দেড় মাস হলো কনসার্টের অনুমোদন দেওয়া বন্ধ রয়েছে।’

প্রসঙ্গত, বিদেশি শিল্পীদের নিয়ে কোনো কনসার্ট আয়োজন করতে গেলে, সে বিষয়ে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে আবেদন করতে হয়। তারপর গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করে আবেদনটি বিবেচনা করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

শেখ মনিরুল আলম টিপু। ছবি: ফেসবুক থেকে নেওয়া

আর্থিক ক্ষতির মুখে শিল্পী-আয়োজকরা
একের পর এক কমার্শিয়াল কনসার্ট বাতিল বা স্থগিত হওয়ার ফলে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন শিল্পী ও আয়োজকরা। কনসার্ট বাতিল বা স্থগিতের বিষয়ে জানতে চাইলে—ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটালকে জনপ্রিয় ব্যান্ড ওয়ারফেজ’র দলনেতা ও ড্রামার শেখ মনিরুল আলম টিপু বলেন, ‘প্রথমত, একেবারেই যে শো হয়নি বা হচ্ছে না—সেটা না; প্রাইভেট শোগুলো হচ্ছে। যেমন কলেজ-ইউনিভার্সিটির র্যাগ ডে বা এ ধরনের প্রোগ্রামগুলো হচ্ছে। কিন্তু কমার্শিয়াল শো (যেখানে টিকিট ক্রয় বাধ্যতামূলক) হচ্ছে না। সেগুলো প্রধানত নিরাপত্তার কারণে অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। এতে অবশ্যই শিল্পীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। ফ্যানরা বা শ্রোতারা তাঁদের প্রিয় শিল্পীর গান শোনা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং সংগঠকরা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন।’

যোগ করে তিনি আরও বলেন, ‘শুধু সংগীতশিল্পীরা নন, অন্য শিল্পীদেরও দেখছি একটা সংকটাপন্ন অবস্থা; কী বলব? মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণের পরই বিনোদনের বিষয়টি আসে। মানুষের মনে যখন আনন্দ থাকে, তখন গান-বাজনা হবে। এখন নানা কারণে কনসার্ট স্থগিত বা বাতিল হচ্ছে, এতে দর্শক-শিল্পী-সংগঠক সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’

প্রতারণার অভিযোগ
চলতি বছর ঘটা করে প্রচার-প্রচারণার পর শেষ মুহূর্তে এসে ভেন্যু বা নিরাপত্তা জটিলতায় বাতিল কিংবা স্থগিত হয়েছে বেশকিছু আন্তর্জাতিক কনসার্ট। যদিও সেসব কনসার্টের টিকিট সোল্ড আউট! অর্থাৎ দর্শকের কাছে টিকিট বিক্রি হয়ে গিয়েছিল। অভিযোগ উঠেছে, নিরাপত্তাজনিত কারণে সেসব কনসার্ট যে বাতিল বা স্থগিত হতে পারে, বিষয়টি জেনেও দর্শকের কাছে টিকিট বিক্রি অব্যাহত রেখেছিলেন আয়োজকরা।

ঢাকার মঞ্চে আতিফ। ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে নেওয়া

সবশেষ গত ১৩ ডিসেম্বর রাজধানী ঢাকায় ‘আতিফ আসলাম অ্যাট মেইন স্টেজ শো’ নামের একটি কনসার্ট বাতিল হয়, যেখানে গান গাওয়ার কথা ছিল জনপ্রিয় পাকিস্তানি সংগীতশিল্পী আতিফ আসলামের। এরপরই সেই আয়োজক প্রতিষ্ঠান নিয়ে প্রশ্ন উঠতে থাকে।

আতিফের এই কনসার্ট বাতিল হওয়ার সংবাদ ছড়িয়ে পড়লে সামাজিকমাধ্যমে এ বিষয়ে মুখ খুলেন দীর্ঘদিন আন্তর্জাতিক কনসার্ট আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত থাকা সংগীতশিল্পী আবীর সাদাফ। তিনি বলেন, ‘‘বারবার একই গল্প! পরিকল্পনা, সময় বিনিয়োগ, প্রত্যাশা—সবই নষ্ট। যদি অনুমতির সমস্যার কারণে একজন আন্তর্জাতিক শিল্পীর কনসার্ট বাতিল হতে থাকে, তাহলে আগে থেকে টিকিট বিক্রি কেন? কেন টাকা দিয়ে পিআর প্রতিষ্ঠানকে চাপের মুখে দর্শকদের ‘চিন্তা করো না, শো হবে’ বোঝাতে হয়, যখন আপনি নিজেই জানেন যে কনসার্টটা হবে না?’’

যোগ করে তিনি আরও লেখেন, ‘দর্শকদের অনুভূতি নিয়ে খেলা বন্ধ করেন। আপনারা কিছুই জানেন না! আগে শিখেন, তারপর বাস্তবায়ন করেন। কনসার্ট এমন কিছু নয়, যেখানে কেউ এসে টাকা কামিয়ে নেয়। আর বাংলাদেশের কথা বলতে গেলে সবাই এজেন্সি, সবাই বড় কনসার্ট আয়োজক! হাস্যকর! আমি দুই মাস আগে থেকে জানি যে কনসার্টটা হচ্ছে না এবং আজ এটা প্রমাণিত।’

আবীর সাদাফ বলেন, ‘প্রতিটি বাতিল কনসার্ট কেবল ভক্তদের ক্ষতি করে না, এটি বাংলাদেশী শিল্পীদেরও ক্ষতি করে। আয়োজকরা যদি এই কেলেঙ্কারি চালিয়ে যেতে থাকে, তবে আমরা কীভাবে টিকে থাকব?’

ঢাকার মঞ্চে কাভিশ। ছবি: সংগৃহীত

এমনকি আতিফের কনসার্ট বাতিলের পরও দর্শকদের টিকিটের টাকা ফেরত না দেওয়ার অভিযোগে আয়োজক প্রতিষ্ঠান ‘মেইন স্টেজ ইনক’সহ ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়।

সংগীতশিল্পীদের ভাষ্য, এভাবে বড় পরিসরে আয়োজিত আন্তর্জাতিক কনসার্ট বারবার বাতিল হওয়ার কারণে বহির্বিশ্বে দেশের সুনাম ক্ষুণ্ন হয়। 

দেশের ভেতর কনসার্ট নিয়ে প্রতারণা বা স্ক্যামের বিষয়ে অবগত নন বলে জানান ব্যান্ড ওয়ারফেজ’র দলনেতা ও ড্রামার শেখ মনিরুল আলম টিপু। তবে তাঁর মতে, এমন হতে থাকলে বাংলাদেশের সুনাম নষ্ট হওয়া স্বাভাবিক। এই ব্যান্ড তারকা বলেন, ‘আন্তর্জাতিক কনসার্টের ক্ষেত্রে শিল্পীদের সিডিউল কয়েক মাস আগে থেকে হয়ে থাকে। আমরা যখন দেশের বাইরে যাই, তখন আমাদের ক্ষেত্রেও এমনটাই হয়ে থাকে। অন্তত ৪-৫ মাস আগে সবকিছু চূড়ান্ত হয়ে যায়। কিন্তু শেষদিকে এসে যদি কনসার্ট বাতিল হয়, তখন সেটা শিল্পীর জন্য ক্ষতি, কারণ ওই তারিখের জন্য তিনি অন্যান্য শো নেননি। যখন বারংবার এভাবে কনসার্ট বাতিল হতে থাকবে, তখন সেটা যে দেশেই হোক, এটার একটা বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হবে। শিল্পীরা তা ভালোভাবে নেবেন না, আয়োজকরা ভালোভাবে নেবেন না—কেউই ভালোভাবে নেবেন না।’