গাজায় চলমান গণহত্যার মধ্যেও ইউরোভিশনের মঞ্চে ইসরায়েলকে তুলে ধরায় প্রতিবাদ ও নিন্দা জানিয়েছেন ফিলিস্তিনি সংগীতশিল্পীরা। অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় চলমান এই সংগীত প্রতিযোগিতা বয়কটের আহ্বান জানিয়েছেন তাঁরা। অধিকৃত পশ্চিমতীর ও গাজার বাসিন্দাদের ভাষ্য, যে দেশ গণহত্যার জন্য দায়ী, সেই দেশকে দেখতে যখন লাখ লাখ মানুষ টিউন করছেন, তখন একই সময়ে তাঁদের সংস্কৃতি ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে।
প্রতিবাদ হিসেবে সামাজিকমাধ্যমে ‘#VoteJustice4Palestine’ শীর্ষক একটি ক্যাম্পেইন করছেন ফিলিস্তিনিরা। এতে ইউরোভিশন যাঁরা বয়কট করছেন, তাঁদেরকে সেই পোস্টে ‘দ্য ড্রোন সং’ শিরোনামের একটি গান শেয়ার করার আহ্বান জানান তাঁরা। গানটি গত বছর গাজা শহরে রেকর্ড করেছিলেন আহমেদ আবু আমশা। সামাজিকমাধ্যমে সেই সময় এটি বেশ ভাইরাল হয়েছিল।
একটি পুরোনো ফিলিস্তিনি লোকগানের ওপর ভিত্তি করে লেখা দ্য ড্রোন সং। গাজার আকাশে ইসরায়েলি ড্রোনের গুঞ্জন থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে লেখা হয় গানটি।
দীর্ঘ তিন দশকের বেশি সময় ধরে রামাল্লা, জেরুজালেম, বেথলেহেম, নাবলুস ও গাজা শহরের শিশুদের জন্য সংগীত প্রশিক্ষণের কাজ করছে দ্য এডওয়ার্ড সাঈদ ন্যাশনাল কনজারভেটরি অব মিউজিক। প্রতিষ্ঠানটির জনসংযোগ কর্মকর্তা এলেনি মুস্তাকলেম সম্প্রতি এক ওয়েবিনারে জানান, ফিলিস্তিনিরা কয়েক দশক ধরে একটি ‘সাংস্কৃতিক গণহত্যা’র মুখোমুখি রয়েছেন।
ইউরোভিশন বয়কট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আজ আমাদের এখানে অংশ নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ, কারণ গত ৭০ বছরের মধ্যে অন্যতম একটি বড় বয়কটে অংশ নিচ্ছি আমরা।’
এলেনি মুস্তাকলেম আরও বলেন, ‘আজ ফিলিস্তিনে একজন শিল্পী হওয়ার অর্থ কী, তা তুলে ধরাই আমাদের দায়িত্ব। চকচকে প্রতিযোগিতা উৎসবের ঊর্ধ্বে উঠে যাঁরা বিষয়টিকে দেখার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন, আমরা তাঁদের প্রত্যেককে ধন্যবাদ জানাই।’
এডওয়ার্ড সাঈদ ন্যাশনাল কনজারভেটরির একজন সমন্বয়কারী আবু আমশা। ইসরায়েলি আগ্রসনে ১৫ বার তিনি বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, থেরাপির একটি অন্যতম উপায় হিসেবে গাজার শিশুদের সঙ্গে তিনিও সংগীতচর্চা করছেন।
আমশা বলেন, ‘আমরা বাচ্চাদের জন্য গানবাজনার একটি সেশন করছিলাম, ওরা গাইছিল। হঠাৎ একটি ড্রোনের শব্দ শোনা গেল। বিরক্তিকর, খুব জোরালো শব্দ; আমরা একে অপরের কথা শুনতে পাচ্ছিলাম না।’
তিনি জানান, ড্রোনের শব্দ এতই তীব্র ছিল যে বাচ্চারা অনুশীলন বন্ধ করে দিতে বলেছিল। যোগ করে বলেন, ‘আমি ওদের বললাম, কেউ আমাদের থামাতে পারবে না। আমরা এর সঙ্গেই গান গাইব।’
এদিকে, রামাল্লার পপুলার আর্ট সেন্টারের পরিচালক ইমান হাম্মুরি জানান, ১৯৪৮ সাল থেকে, অর্থাৎ প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ফিলিস্তিনি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে মুছে ফেলার এক সুদূরপ্রসারী মিশনে রয়েছে ইসরায়েল। তিনি বলেন, ‘১৯৪৮ সালে নাকবার পর থেকেই ইসরায়েলি ঔপনিবেশিকতা প্রতিনিয়ত ফিলিস্তিনিদের এমন এক জনগোষ্ঠী হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে আসছে, যেন তাদের কোনো নিজস্ব বয়ান বা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য নেই।’
যোগ করে বলেন, ‘ফিলিস্তিনি ঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয় মুছে ফেলার জন্য তারা আজ পর্যন্ত কাজ করে চলেছে।’
প্রসঙ্গত, চলতি বছরে ইউরোভিশন ইতিহাসের অন্যতম এক বিতর্কিত সংগীত প্রতিযোগিতা হয়ে উঠেছে। এতে ইসরায়েল অংশ নেওয়ার প্রতিবাদে এরইমধ্যে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিয়েছে স্পেন, আয়ারল্যান্ড, আইসল্যান্ড, নেদারল্যান্ডস ও স্লোভেনিয়া। একইসঙ্গে আরও বহু শিল্পী ও অধিকারকর্মী এই আয়োজন বর্জনের আহ্বান জানিয়েছেন।
সূত্র: মিডল ইস্ট আই