একমাত্র কন্যা প্রেমাকে নিয়ে রাহাত-মায়ার সংসার। তবে তা ‘সুখের সংসার’ কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে! কেননা, স্বামীর অদ্ভুত সব কর্মকাণ্ডে তাদের সংসারে ‘সুখ’ শব্দটি অধরা। ক’দিন পরপরই রাহাত কাউকে কিছু না জানিয়ে উধাও হয়ে যায়। চাকরি-বাকরিতেও সে থিতু হতে পারে না। মিথ্যার এক মনোজগত তার। একপর্যায়ে আবিষ্কৃত হয়, রাহাত একজন মাদকাসক্ত। নেশা ছাড়া থাকতে পারে না।
এমনই একটি গল্প নিয়ে ‘তুফান’খ্যাত নির্মাতা রায়হান রাফী নির্মাণ করেছেন ওয়েব ফিল্ম ‘মায়া’। সোমবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সেটি মুক্তি পেয়েছে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম বিঞ্জে।
রাহাতের কর্মকাণ্ডে ক্রমশ বিষিয়ে ওঠে মায়ার সংসার। কেননা, মাদকাসক্ত কেউ নিজে যেমন ধ্বংস হন, একইসঙ্গে সে তার পরিবারের জীবনকেও বিপর্যস্ত করে তোলে। এমন নানা ঘটনা পরম্পরায় এগিয়েছে ফিল্মটি। বেশ সুনিপুণভাবে এতে রাফী তাঁর গল্পকে ফুটিয়ে তুলেছেন। এর মাধ্যমে যে বার্তাটি দাঁড়িয়েছে, তা অনেকটা এমন—‘নেশার ফাঁদে পড়বে যারা, সব হারিয়ে মরবে তারা।’
এ সিনেমায় নির্মাতাকেও পাওয়া যায় ব্যতিক্রমীভাবে। যিনি একে একে উপহার দিয়েছেন ‘পোড়ামন ২’, ‘পরাণ’, ‘সুড়ঙ্গ’, ‘তুফান’র মতো আলোচিত সিনেমা। অন্যদিকে, ওটিটিতে ‘ফ্রাইডে’, ‘৭ নম্বর ফ্লোর’, ‘টান’ দিয়েও বাজিমাত করেছেন। তবে এগুলোর চেয়ে ভিন্নমাত্রার চলচ্চিত্র ‘মায়া’।
যেখানে নির্মাতা রাফী বেশ গল্পনির্ভর। পর্দায় সবচেয়ে চমকপ্রদ ছিলেন অভিনেতা মামনুন ইমন। ‘রাহাত’ চরিত্রে তাঁর অভিনয় ছিল অভূতপূর্ব। বিশেষ করে একজন মাদকাসক্ত ব্যক্তির আচরণে যে ধরনের পরিবর্তন আসে, ঠিক তেমনই ছিলেন ইমন। তাঁর অপ্রস্তুত আচরণ ও অঙ্গভঙ্গি ছিল দর্শনীয়। একদিকে তিনি হাসিয়েছেন, আবার কখনও বিষাদে ডুবিয়ে দিয়েছেন দর্শকদের। পর্দায় যেমনটা বিপর্যস্ত করেছেন মায়াকে!
এই চরিত্রে রয়েছেন অভিনেত্রী সারিকা সাবরিন। অভিনয়ে তিনিও স্বতঃস্ফূর্ত। এ ছাড়া রাশেদা চৌধুরী, নাদের চৌধুরী, হাসনাত রিপন, মুনতাহা এমেলিয়া—সবাই দারুণভাবে সঙ্গ দিয়েছেন কেন্দ্রীয় ভূমিকায় থাকা সারিকা-ইমনকে।
তবে এ সিনেমায় এক-দুটি জায়গায় সাইনবোর্ডে জুড়ে থাকা জায়গার নাম দর্শকদের কিছুটা দ্বিধান্বিত করতে পারে। অন্যথায়, পুরো গল্প সিনেম্যাটিক উপাদানে ভরপুর।
সিনেম্যাটোগ্রাফিতে মুনশিয়ানা দেখিয়েছেন মুরশেদ বিপুল। আর এখন তো দেশের প্রায় সিনেমা-সিরিজেই শব্দস্রষ্টা হিসেবে কাজ করেন রিপন নাথ। বরাবরের মতো এবারও তিনি তাঁর শব্দগ্রহণে দর্শকের ওপর প্রভাব রাখতে পেরেছেন। এ ছাড়া সালমান জাইমের সংগীতও বেশ আবেশী।
সিনেমাটিতে পারিবারিক টানাপোড়েন ভেতর দিয়ে এই সময়ের নারীদের সংগ্রামকে যেমন ফুটিয়ে তুলেছেন রাফী, তেমনই সিনেমাটি আরও সমসাময়িক করে তুলেছে কিছু ঘটনায়। শেষ মুহূর্ত তো দর্শকদের রীতিমতো হতবাক করে দেয়! আবেগে ভাসেন তাঁরা। শেষ পর্যন্ত মায়ার জীবনে নেমে আসে অকল্পনীয় এক বিপর্যয়। আর এই ঘটনা ‘গণপিটুনির সমকালীন বাস্তবতা’ হয়ে গেঁথে থাকে দর্শকের মনে।
দিনশেষে প্রশ্ন রাখা যায় যে, ‘মায়া’ কি তবে রাফির সেরা সিনেমা? এই উত্তরে দ্বিমত হলেও এটুকু অন্তত নিশ্চিত—এটি রাফীর ক্যারিয়ারে অন্যতম একটি কাজ হয়েই থাকবে।