ভয় আসলে মানুষের মনেই থাকে। মনের ভয় একসময় মাথায় ওঠে। আর তখনই মানুষ ভয়ের রাজ্যে ঢুকে যায়। ভয় গিলে খায় মানুষের স্বাভাবিক চিন্তার ক্ষমতাকে। একপর্যায়ে ভয়ের বশবর্তী হয়ে সেই ভয় দ্বারাই চালিত হয় মানুষ।
মানুষের মনের ভয়কেই এবার তুলে আনা হয়েছে ‘২ষ’-তে, এনেছে ওটিটি প্ল্যাটফর্ম চরকি। এর পরিচালনায় আছেন নুহাশ হুমায়ূন। মূলত নুহাশ পরিচালিত আলোচিত সিরিজ ‘পেট কাটা ষ’‑এর দ্বিতীয় সিজন হলো ‘২ষ’। বলতেই হয় যে, নামকরণটি বেশ আকর্ষণীয়। গল্প লিখেছেন নুহাশ হুমায়ুন ও গুলতেকিন খান। দ্বিতীয় সিজনে চার সপ্তাহে মুক্তি পাবে চারটি নতুন গল্প। এগুলো হলো–‘ওয়াক্ত’, ‘ভাগ্য ভালো’, ‘অন্তরা’ ও ‘বেসুরা’। এরই মধ্যে প্রথম দুটি পর্ব মুক্তিও পেয়েছে।
চরকি বলছে, ‘২ষ’ একটি সাইকোলজিক্যাল হরর জনরার সিরিজ। মানুষের মনের ভয়কেই পর্দায় তুলে আনা হয়েছে। এ বিষয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্যে পরিচালক নুহাশ হুমায়ূন জানিয়েছেন যে, ‘পেট কাটা ষ’ ছিল ছোটবেলায় শোনা ভূতের গল্প বা ছড়িয়ে থাকা ভূতের গল্প নিয়ে। কিন্তু ‘২ষ’‑তে সমাজের কোন জিনিসটাকে মানুষ বেশি ভয় পায়, সেটা নিয়ে কাজ করার চেষ্টা হয়েছে। ‘২ষ’‑এর কাহিনি নিয়ে চরকিও বলেছে–‘কোনটা বেশি ভয়ের? জিন, ভূত, শয়তান, ডাইনি? নাকি মানুষ? লোককাহিনি ও কুসংস্কারের বাইরে গিয়ে ‘২ষ’ বাংলাদেশ ও আধুনিক সময়ের ভয়াবহতা নিয়ে কিছু প্রশ্ন তোলে।’
স্বীকার করে নিতেই হবে, বেশ সুন্দর ভাবনা। এমন ধরনের ভাবনা নিয়ে এ দেশের কনটেন্ট মেকিং ইন্ডাস্ট্রিতে গত কিছুদিন ধরেই বিক্ষিপ্তভাবে হলেও কিছু চর্চা হচ্ছে। প্রচলিত চিন্তা থেকে বের হয়ে আসার এই চেষ্টা সত্যিই প্রশংসনীয়।
এবার আলোচনা করা যাক, ‘২ষ’‑এর প্রথম দুটি পর্ব নিয়ে। প্রথমটির নাম ‘ওয়াক্ত’। পাঁচজনের পাপের পাঁচ রকম অলৌকিক পরিণতি নিয়ে প্রথম পর্বটি। পর্বের শুরুতে পাপের সংঘটন দেখানো হয় এবং পরে ধীরে ধীরে উপলব্ধি ও পরিণতি। পাঁচ বন্ধুর গল্পে একেকজনের উপলব্ধি একেক রকম। তবে পরিণতি একই, শুধু তরিকা ভিন্ন। প্রায় ৩৭ মিনিট দৈর্ঘ্যের প্রথম পর্বের প্রথম ১৫ মিনিটের পর আসলে বাকি পুরোটাই অনুমানযোগ্য। সেখানে কোনো চমক আসলে নেই। পরিণত দর্শকেরা বুঝেই ফেলবেন যে, সামনে কী কী হতে যাচ্ছে। কেবল বাস্তবায়ন কীভাবে হবে, সেটি নিয়েই কিছুটা কৌতূহল জারি থাকে। এবং সত্যি কথা বলতে, সেখানেও চমক খুব একটা নেই। ফলে পর্ব শেষের অপেক্ষা কিছুটা দীর্ঘই বোধ হয়।
এখানে একটি কথা বলতেই হয় যে, পাপ, পাপের উপলব্ধি ও এর নানামাত্রিক পরিণতি নিয়ে বিভিন্ন কাহিনি আমাদের বাংলা সাহিত্যেই আছে। বিশ্ব সাহিত্যে তো আছেই। বিভিন্ন লেখক এ নিয়ে আগেও কাজ করেছেন। বৈশ্বিক এন্টারটেইনমেন্ট ইন্ডাস্ট্রিতেও খুঁজলে এমন চিত্রায়নের উদাহরণ মিলবে। এই স্টাইলটা আসলে পরিচিতই। তাই একে অনেকের মধ্যে আলাদা বোঝাতে হলে উপস্থাপনে কিছুটা নতুনত্ব আনা খুবই প্রয়োজন ছিল। আর সেটির অভাবই পাওয়া গেছে ‘ওয়াক্ত’‑এ। হ্যাঁ, আমাদের সমাজের ভয়ের উপকরণকে টেনে আনা হয়েছে। তবে তার উপস্থাপন আরও সূক্ষ্ম হলে ভালো হতো।
অভিনয়ের কথা উঠলে আলাদা করে বলতেই হবে অ্যালেন শুভ্র ও আবদুল্লাহ আল সেন্টুর কথা। দুজনের অভিনয়ই দুর্দান্ত হয়েছে। অ্যালেন শুভ্র তো পর্বটিকে শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে গেছেন। তাঁর অভিব্যক্তি ও শরীরী ভাষা ছিল বিশ্বাস জাগানিয়া।
‘২ষ’‑এর দ্বিতীয় পর্বটি একেবারেই সাম্প্রতিক সময়ে মুক্তি পেয়েছে। নাম ‘ভাগ্য ভালো’। ভাগ্য নিয়ে জুয়া খেলা এক জ্যোতিষীর গল্প বলা হয়েছে এই পর্বে। গল্প নিয়ে চরকি বলছে–‘‘জ্যোতিষীদের নিয়ে অধিকাংশ মানুষ একটি প্রশ্ন করে থাকে। প্রশ্নটি হলো–জ্যোতিষী নিজের ভাগ্য নিজে দেখে না কেন? আর জ্যোতিষী চরিত্রটি বলে, ‘নিজের ভাগ্য নিজে দেখা যায় না। মানা আছে।’’’
তো সেই জ্যোতিষীকে নিয়েই গল্প এগোয়। এবং তুলনার বিচারে এই দ্বিতীয় পর্বটি প্রথমটির তুলনায় ঢের নিখুঁত। অন্তত শেষের প্রান্তে যাওয়ার আগ পর্যন্ত দর্শকদের আগ্রহ ধরে রাখার উপাদান আছে ভালোমতোই। তার চেয়েও বড় কথা মূল মানে জ্যোতিষী চরিত্রে আছেন মোশাররফ করিম। দর্শকদের বাড়তি আগ্রহ উৎপাদনে এই নামটি যথেষ্ট। অভিনয়ে আরও ছিলেন টুনটুনি হামিদ ও আফজাল হোসেন। টুনটুনি হামিদ সত্যিই ছিলেন নজরকাড়া, খুব সাবলীল। ছোট্ট একটি চরিত্রে ছিলেন গুণী অভিনেতা আফজাল হোসেন। স্ক্রিন প্রেজেন্স কম থাকলেও ওইটুকু সময়ের মধ্যেই মন ভরিয়ে দিয়েছেন তিনি। আর মোশাররফ করিম স্বাভাবিকভাবেই খুঁত ধরার তেমন কোনো সুযোগই দেননি।
তবে ‘ভাগ্য ভালো’র দৈর্ঘ্য আরেকটু বড় হলে ক্ষতি হতো না। বরং তখন আফজাল হোসেন ও মোশাররফ করিমের অভিনয়ের দ্বৈরথ আরও জমজমাট হতো। এই দুই অভিনেতা একফ্রেমে–ভাবতেই দর্শকমনে শিহরণ জাগা স্বাভাবিক। কিন্তু কেন জানি আশা পূরণ হলো না। এই দৃশ্যটি নিয়ে আরও কাজ করা যেত বলেই বোধ হয়।
স্বীকার করে নিতে হবে যে, দুটি পর্বেই বেশ কিছু আগ্রহ জাগানিয়া সংলাপ শোনা গেছে। এই সংলাপগুলো পুরোনো চিন্তাকেই নতুন করে উসকে দেয় এবং ভাবতে শেখায় বটে। তবে সমাজে বিদ্যমান ভয়ের উপকরণগুলোর ব্যবহারে কিছুটা তাড়াহুড়ো পরিলক্ষিত হয়েছে, ফলে উপস্থাপনার ধরন অতটা সূক্ষ্ম ছিল না। এক্ষেত্রে আরেকটু যত্ন নিলে বোধহয় খারাপ হতো না!
অবশ্য ‘২ষ’‑এর আরও দুই পর্ব আসছে। ওই পর্বগুলোয় নিশ্চয়ই আরও আকর্ষণীয় ও চমকপ্রদ উপকরণ আছে! পরিচালক নুহাশ হুমায়ূনের কাছে এমনটা আশা করা তো যেতেই পারে।
রেটিং:
১ম পর্ব: ‘ওয়াক্ত’ (৩.২৫/৫.০০)
২য় পর্ব: ‘ভাগ্য ভালো’ (৪.০০/৫.০০)