মানুষ বা সমগ্র অর্থে পুরো মানবজাতির বানানো বড় অস্ত্র আসলে কী? কেউ হয়তো বলবেন, আগুন জ্বালানো। আবার কারও কাছে হয়তো পরমাণু অস্ত্রই সবচেয়ে বড়। কিন্তু আসলেই কি তাই? নাকি মানুষের মিথ্যা কথা বলার বা প্রতারণা করার ক্ষমতাই সবচেয়ে মারাত্মক অস্ত্র?
একবার ভেবে দেখুন তো। মানবসভ্যতার ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ানক কিংবা বিপর্যয়কর ঘটনাগুলোতে কি সংশ্লিষ্ট মানুষগুলোর প্রতারণা বা তঞ্চকতার ভূমিকা নেই? একটু খুঁজলেই পেয়ে যাবেন। দেখবেন, মানুষের তৈরি মিথ্যা অন্য মানুষকে যতটা বিপদে ফেলেছে, ততটা আর অন্য কোনো কারণে হয়নি।
তাই একটি কণ্ঠ যখন বলে ওঠে, ‘মিথ্যা কথা বলার ক্ষমতাই মানুষের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। মানুষ টিকে থাকার জন্যই মিথ্যার ওপর নির্ভর করে। আমরা শত্রুকে মিথ্যা বলি। বন্ধুকে মিথ্যা বলি। নিজেদেরও মিথ্যা বলি। মানব মস্তিষ্ক যে ধরনের কাজ করতে পারে, তার মধ্যে সবচেয়ে জটিল হলো মিথ্যা বলা…’, তখন আসলে দ্বিমত করার সুযোগ খুব একটা থাকে না।
কথাগুলো বলা ব্যক্তিটি পরিচিত কোনো বিখ্যাত ব্যক্তি নন। বরং একটি চরিত্র, নাম টুলা হারকোন্যান। ‘ডিউন: প্রফেসি’ নামের সাম্প্রতিক একটি টিভি সিরিজের চরিত্র টুলা। কিছুদিন আগে এই সিরিজটি মুক্তি পেয়েছে। দেখা যাচ্ছে প্রাইম ভিডিও ও ম্যাক্স—দুটো স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মেই।
গত বছরই মুক্তি পেয়েছিল ‘ডিউন: পার্ট টু’ নামের চলচ্চিত্রটি। ডিউনের প্রথম পর্ব বক্স অফিসে ঝড় তোলার পর থেকেই এর দ্বিতীয় কিস্তি নিয়ে দর্শকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ছিল। তা বেশ ভালোভাবেই পূরণ করে ‘পার্ট টু’। ব্যবসাও করেছিল দারুণ। দানি ভিলনাভ পরিচালিত ‘ডিউন: পার্ট ওয়ান’ ও ‘ডিউন: পার্ট টু’-এর গল্প মূলত নেওয়া হয়েছে ফ্রাংক হারবার্টের লেখা ১৯৬৫ সালের উপন্যাস ‘ডিউন’ থেকে। এবার সেই উপন্যাস ও সিনেমার দর্শক ও পাঠকপ্রিয়তাকে কাজে লাগাতেই যেন ছোট পর্দায় চলে এল ‘ডিউন: প্রফেসি’। এই সিরিজের ক্রিয়েটর হলেন ডায়ান আদিমু-জন ও অ্যালিসন স্ক্যাপকার। সিরিজে মোট পর্ব ৬টি। পরিচালনা করেছেন আনা ফরেস্টার, রিচার্ড জে. লুইস ও জন ক্যামেরন।
চলচ্চিত্র হিসেবে ডিউন-এর গল্প মূলত ভবিষ্যতের পৃথিবী ও মহাবিশ্বের। কল্পিত সেই বাস্তবতাতে দেখা যায়, পুরো মহাবিশ্বেই বিভিন্ন গোত্রে বা বংশে বিভক্ত মানবসমাজ ছড়িয়ে আছে। বিভিন্ন বাসযোগ্য গ্রহের মালিকানা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হতে থাকে। আর এই পরিবর্তন হয় একজন মহাশক্তিধর সম্রাটের অঙ্গুলিহেলনে। সিনেমার দুটি পর্বে আসলে পল অ্যাট্রেইডিসের নেতা হয়ে ওঠার গল্পই দেখানো হয়েছে। আর সিরিজ হিসেবে ‘ডিউন: প্রফেসি’ বলছে এসব ঘটনারও ১০ হাজার বছর আগের কাহিনী। মানুষ তখন সবে থিংকিং মেশিনকে পরাজিত করেছে যুদ্ধে। মহাশক্তিধর সম্রাট তখন থাকলেও অন্যদের ওপর তার নিয়ন্ত্রণ ঠুনকো। আর তখনই গড়ে ওঠে সিস্টারহুড বা বেনি জ্যাসেরেট। সম্রাটকে নিয়ন্ত্রণ করে নিজেদের টিকিয়ে রেখে প্রভাবশালী হয়ে ওঠাই ছিল তাদের লক্ষ্য। আর এই সিস্টারহুডের তৈরি হওয়া বা গড়ে ওঠা নিয়েই জমে ওঠে ‘ডিউন: প্রফেসি’।
সিস্টারহুডের নেতৃত্বে ছিল ভালিয়া ও টুলা হারকোন্যান। এই দুই চরিত্রের ব্যক্তিগত অভিযাত্রা যেমন এই সিরিজে দেখানো হয়েছে, তেমনি সিস্টারহুডের চরম শত্রুকে মোকাবিলা করার বিষয়টিও উঠে এসেছে। এর সঙ্গে আছে মানুষের তৈরি সাম্রাজ্যের নানা কুটিল ও জটিল রাজনীতি। সব মিলিয়ে ভবিষ্যতের পৃথিবীর এমন এক চিত্র ফুটে উঠেছে, যা যেকোনো সায়েন্স ফিকশনপ্রেমী দর্শকের কাছেই অত্যন্ত উপভোগ্য।
ডিউন ইউনিভার্সের প্রায় শুরুর দিকের গল্প বলেছে ‘ডিউন: প্রফেসি’। সেটি এতটাই সুচারুভাবে বলা হয়েছে যে, সিনেমা থেকে সিরিজকে খুব একটা আলাদা ভাবার জো নেই। সেট ডিজাইন, সিনেম্যাটোগ্রাফি, সাউন্ড ডিজাইন—সবই ছিল দুর্দান্ত। আর সিরিজের গল্প বলার ঢংটাও আগ্রহ জাগানিয়া। তাই এক পর্ব দেখার পর আরেক পর্ব শুরু করার আকাঙ্ক্ষাও থাকে বেশ। কারণ মিস্ট্রি ও থ্রিলকে এমনভাবে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, সিজন শেষ না হওয়া পর্যন্ত থামতে ইচ্ছে করে না।
এই সিরিজে খুবই বুদ্ধিদীপ্ত কিছু সংলাপ ব্যবহার করা হয়েছে। কিছু উদাহরণ তো লেখার শুরুতেই দেওয়া হয়েছে। এমন আরও বেশ কিছু সংলাপের কারণে ‘ডিউন: প্রফেসি’ আরও উপভোগ্য হয়েছে। ধরে রাখা গেছে টানটান উত্তেজনাও। ফলে একেকটি পর্বের দৈর্ঘ্য ঘণ্টার কাছাকাছি বা তার বেশি হলেও বিরক্ত বোধ হয় না কখনও।
মূলত ডিউন ইউনিভার্সের ইতিহাসকে তুলে ধরা হয়েছে এই সিরিজে। তাই ডিউনের রহস্যে মোড়া দুনিয়ার প্রতি যাদের আগ্রহ আছে, তারা দেখতেই পারেন। হতাশ হতে হবে না একেবারেই। বরং ডিউনের দুনিয়ার একনিষ্ঠ ভক্ত বনে যেতে হতে পারে!
এমন এক দৃশ্যে ‘ডিউন: প্রফেসি’র সিজন ওয়ানের যতি টানা হয়েছে যে, এর সিজন টু যে আসছেই—সেই ঘোষণা স্পষ্ট। সিজন টু নিয়ে জল্পনা-কল্পনা করার জন্য তাই দ্রুতই দেখে ফেলতে পারেন সিজন ওয়ান। অবসর সময় নষ্ট হবে না—এটি নিশ্চিত!