কয়েক বছর আগের করোনা মহামারির কথা নিশ্চয়ই আমাদের মনে আছে। তারপরও তা মনে কতটা গেঁথে আছে, সে বিষয়ে সন্দেহের অবকাশ থেকে যায়। কারণ মানুষের মন বেশির ভাগ সময়ই বর্তমানে বসবাস করে। অতীতচারী সে হয় বটে, কিন্তু তাতে আটকে থাকে খুব কমই। ফলে অতীতের গল্প দেখিয়ে সেই আগের আবেগ নতুন করে সৃষ্টি করা, তাতে মথিত করে রাখা একটু কঠিনই।
১১০ মিনিটের ছবিটির ধরন হিসেবে বলা হয়েছে সাইকোলজিক্যাল নিও-নয়ার। পরিচালনার পাশাপাশি এর চিত্রনাট্যও লিখেছেন নূর ইমরান মিঠু। ফলে সুবিধা হয়েছে যে, চিত্রনাট্যের সঙ্গে পরিচালনায় কোনো সংঘাত বড় হয়ে দেখা দেয়নি।
পাতালঘর মূলত কিছু ঘটে যাওয়া জানা ঘটনাকে মূল গল্পের প্রেক্ষাপটে তুলে ধরেছে। যেমন ধরুন, করোনাকালের আতঙ্ক, মানুষের বেকার হওয়া, শহরের তুলনায় গ্রামে করোনার ভীতি কম থাকা এবং সর্বোপরি একজনের প্রতি আরেক আপনজনের হুট করেই চরম অমানবিক হয়ে ওঠা। এই সব বিষয়ই আমাদের জানা। পরিচালক এগুলো পর্দায় ফুটিয়েও তুলেছেন সুচারুরূপে। কিন্তু কেন জানি এটি ঠিক বাস্তবের সঙ্গে সুরে মেলে না। তবে হ্যাঁ, পর্দায় নতুন করে দেখে কিছুটা নস্টালজিয়া ভর করে বটে।
অতীতের ঘটনা নিয়ে সিনেমা অবশ্য হরহামেশাই হচ্ছে। এক দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঘটনাই তো নিয়মিত বিরতিতে আমাদের সামনে বারবার আসছে। সেসব চলচ্চিত্র আলোচিত হচ্ছে, প্রশংসিতও হচ্ছে। এর কারণ হলো অতীতের মধ্যে অজানা গল্প থাকা। দর্শক শেষমেষ একটা জমাট গল্পই খোঁজে, তা অতীতে হোক বা বর্তমানে। তবে কি সেই জায়গাতেই পিছিয়ে পড়েছে পাতালঘর?
ওটিটি প্ল্যাটফর্মে গল্পের সূত্র হিসেবে বলা হয়েছে, ‘দীর্ঘদিন পর বাড়ি ফেরা রুপালি পর্দার নায়িকা বাবলিকে মুখোমুখি হতে হয় তার ফেলে আসা শৈশবের। অতীতের সম্পর্কগুলো ফিরে এলে বাবলি নিজেকে জড়িয়ে পর্দার চাকচিক্য পেছনে ফেলে অনাড়ম্বর জীবনের এক নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি হয়।’
বাবলি ও বাবলির মাকে নিয়েই মূলত ছবিটির গল্প আবর্তিত হয়েছে। ছবির শুরুটাই হয় বাবলির মায়ের কিছু অবৈধ কর্মকাণ্ড দিয়ে। এর পর পর্দায় বাবলির প্রবেশ। ধীরে ধীরে আর্থিকভাবে ফ্লপ সিনেমার নায়িকা বাবলির আলোচিত হয়ে ওঠার বিষয়টিও প্রকাশ্যে আসে।
তবে অজানা জানার এই সমান্তরাল রেখা খুব বেশিই সোজাসাপটা হয়ে গেছে। স্রোতহীন এক নদী যেন, যাতে ঢিল ছুড়লেও তরঙ্গের সৃষ্টি হয় না। হয়তো সেই উপযুক্ত স্রোতের অভাবেই একসময় কিছুটা হলেও একঘেয়ে বোধ হলে দর্শকদেরও দোষ দেওয়া যাবে না। কারণ একটি জানা আবহসংগীতে যদি নতুন সুর উপযুক্ত তরঙ্গে শ্রোতার কানে পৌঁছানো না যায়, তবে তাতে নতুনত্ব পাওয়া যায় না। ফলে তা শোনা হয় ঠিকই, কিন্তু কানে লেগে থাকে না। এই একই সমস্যায় পড়েছে পাতালঘর।
অবশ্য ছবিটির অভিনয়শিল্পীরা ছিলেন লা জওয়াব। বড় চরিত্র হোক বা ছোট, সবখানেই অভিনেতা-অভিনেত্রী নির্বাচন ছিল প্রায় নিখুঁত। বাবলি চরিত্রে নুসরাত ফারিয়া বিশ্বাসযোগ্য ছিলেন। বাবলির মায়ের চরিত্রে আফসানা মিমি ছিলেন অনবদ্য।
মানানসই ছিলেন রওনক হাসান, এরফান মৃধা শিবলু, নাসির উদ্দিন খান, দীপান্বিতা মার্টিন ও নাজিয়া হক অর্শা। ত্রুটি খুব একটা চোখে পড়েনি। ছবিতে মামুনুর রশিদের শেষ দৃশ্যটি চোখে লেগে থাকার মতো।
এক কথায়, পাতালঘর ছবিটিতে অনেক অভিনয় প্রতিভার সমাবেশ ঘটেছে। এই সমাবেশ থেকে যে আলোর বিচ্ছুরণ হওয়ার কথা ছিল, সেটিই ঢেকে গেছে আপাত উত্থান-পতনহীন গল্পের অমানিশায়। এ কারণে কোনো কোনো দর্শকের কিছুটা একঘেয়ে লাগলে আসলে বলার কিছু নেই। কারও কারও হয়তো পুরো ছবি দেখার পর সময়টা নষ্ট হয়েছে বলেও মনে হতে পারে।