পূজা কোথায় কাটালেন, কেমন কেটেছে?
নিদ্রা নেহা: পূজায় এবার একটু অন্যরকম কাটছে। বাসাতেই আছি। বাবা অসুস্থ। তাঁকে সময় দিচ্ছি। পূজায় প্রতিবছর পরিবারের সঙ্গেই কাটে, যেহেতু আমি একজন পরিবারকেন্দ্রিক মানুষ। পরিবারের সঙ্গে থাকতেই পছন্দ করি। মা–বাবা ঢাকায় এসেছেন। এবার আমি যাইনি বাড়িতে, তাঁরাই আমার বাসায় এসেছেন। সবাই মিলে পূজা কাটাচ্ছি।
মণ্ডপে ঘুরতে বের হয়েছিলেন?
নিদ্রা নেহা: ঘোরা হয়নি একদমই! বেরই হয়নি। শুধু ষষ্ঠীর দিন রাতের বেলায় পুরান ঢাকায় ঘুরে এসেছি। প্রতিবছর সাধারণত আমি রমনা কালী মন্দিরে যাই, এবার সেখানেও যাওয়া হয়নি। বাবাকে নিয়ে হাসপাতাল আর বাসা—এভাবেই কাটছে। মন–মানসিকতাও ভালো নেই। মা–বাবাকে এনেছি, কেননা বাবার সঙ্গে আর পূজা কাটাতে পারব কি-না জানি না। একটু ভালোভাবে কাটানোর জন্যই তাঁদের নিয়ে এসেছি।
নিদ্রা নেহা: বাবা পাকস্থলীর ক্যানসারে আক্রান্ত। এখন লাস্ট স্টেজে (শেষ ধাপে) আছেন। শরীর একদমই ভালো না। আমরা চেষ্টা করছি, বাকিটা ভগবানের ওপর। গত বছর লক্ষ্মীপূজার সময় বাবার ক্যানসার ধরা পড়েছিল। প্রায় এক বছর হয়ে গেছে। দুর্গাপূজাতেও এবার আমাদের পরিবারে ‘পুজো পুজো’ ব্যাপারটা নেই। আমার পুরো জীবনে এতটা নিরিবিলি পূজা কখনোই কাটাইনি।
পুরান ঢাকায় গিয়েছিলেন, কেমন দেখলেন? কোথায় কোথায় ঘুরলেন?
নিদ্রা নেহা: সাধারণত ঢাকেশ্বরী মন্দির, রমনা কালী মন্দির, জগন্নাথ হল—এই তিনটি মণ্ডপে সবসময়ই যাওয়া হয়। ভার্সিটি (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) তো আমার নিজেরই ভার্সিটি, তাই এই মণ্ডপগুলোর সঙ্গে সম্পর্কটা অনেক বেশি। এ ছাড়া রমনা কালী মন্দির আমার জন্য অনেক বেশি স্পেশাল, কারণ বলতে গেলে আমি আমার জীবনের অনেক কিছু সেখানে পেয়েছি, কালী মন্দিরের মাধ্যমে। এই জন্য রমনা কালী মন্দির আমার জন্য স্পেশাল। আর ঢাকেশ্বরী তো আমাদের জাতীয় মন্দির। এবার ঢাকেশ্বরী–রমনা–জগন্নাথ হল—একটাতেও যাওয়া হয়নি। কিন্তু পুরান ঢাকার পূজা আমার কাছে মনে হয় অনেক বেশি আনন্দের, ‘পুজো পুজো ভাইব’ যাকে বলে! হাঁটছি—ডানে প্রতিমা, বামে প্রতিমা। কিন্তু এবার আমার কাছে মনে হয়েছে যে আগের চেয়ে হয়তো–বা প্রতিমার সংখ্যা একটু কম ছিল। যদিও আয়োজন ভালো ছিল, পরিবেশ ভালো ছিল, সবকিছুই সুন্দর ছিল। ভেবেছিলাম বৃষ্টি অনেক বেশি হবে, কিন্তু সেভাবে বৃষ্টি হয়নি; রোদ ছিল।
নিদ্রা নেহা: হ্যাঁ, হয়তো–বা বেড়েছে। আবার এটাও হতে পারে যে ষষ্ঠীর দিন সব মণ্ডপ আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়েছিল কি-না। পুরান ঢাকায় দেখা যায়, একটা গলির মধ্যে অনেকগুলো প্রতিমা বানানো হয়। এমন নয় যে কলাবাগান এলাকাজুড়ে যেমন একটা মণ্ডপে পূজা হচ্ছে, সেখানে একটা গলিতে অনেকগুলো প্রতিমা হয়। আমার কাছে মনে হয়েছে, এর আগে পুরান ঢাকায় আরও বেশি প্রতিমা দেখেছি। এবার হয়তো কম চোখে পড়েছে।
আরেকটি বিষয়, মাঝে বাবার চিকিৎসার জন্য আপনি দেশের বাইরে যেতে চেয়েছিলেন। তখন বিমানবন্দরে একটা জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিলেন। এখন কী অবস্থা?
নিদ্রা নেহা: এখনও আসলে সেই জটিলতার মধ্যেই আছি। এখন দেখেন, দেশের সিস্টেম (রাষ্ট্রব্যবস্থা) নিয়ে বলার মতো আমি কেউ না, আমি খুবই নগণ্য একজন মানুষ! কিন্তু আমি বুঝি না, একজন মানুষের জীবনের চেয়ে দেশের সিস্টেম কীভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়! হ্যাঁ, অবশ্যই সিস্টেমের গুরুত্ব রয়েছে। আমার বাবা একজন সরকারি চাকুরে। তিনি বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংকে আছেন। তাঁর এনওসি’র (অনাপত্তি পত্র) বিষয়টির সমাধান হয়নি। আমাদের ভিসা আছে, কিন্তু চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যেতে পারছি না। কারণ, বাবা এখনও এনওসি পাচ্ছেন না, আর এই এনওসি ছাড়া তিনি ফ্লাই (উড়াল) করতে পারবেন না। প্রায় তিন–চার মাস ধরে আমরা এনওসির জন্য ঘুরছি, কিন্তু কেন যে হচ্ছে না সেটাও জানি না। ঢাকায় কৃষি ব্যাংকের হেড অফিসে এসে জমে আছে এনওসি। আমার কথা হচ্ছে—কোনো ইস্যুর জন্য আপনারা যদি এনওসি না–ও দেন, আমাদেরকে সেটা বলে দেন, জানান! কারণ বাবার চিকিৎসা বাংলাদেশে করতে হলেও তো একটা প্রস্তুতির ব্যাপার আছে। সবকিছু মিলিয়ে একটা আয়োজন আছে। আসলে তাঁরা (বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক) বলছেও না যে কী হচ্ছে! একটা সইয়ের জন্য দুই মাস ধরে একটা কাগজ জমা পড়ে আছে, আমি একজন মেয়ে হয়ে চোখের সামনে দেখছি আমার বাবা তিলে–তিলে নাই হয়ে যাচ্ছেন। কাগজপত্র ঠিক আছে, সব ঠিক আছে; কিন্তু কেন যে তাঁরা দিচ্ছেন না? আসলে এগুলো নিয়ে বলার কিছু নেই! বলেও কিছু হবে না! এখন অপেক্ষায় আছি, যদি তাঁরা সইটা করেন! এটাকে রাজনৈতিক নাকি সামাজিক সমস্যা বলব—আমি জানি না। কিন্তু ভুক্তভোগী তো আমি হচ্ছি, আমার পরিবার হচ্ছে।
কাগজপত্রে কি কোনো জটিলতা আছে?
নিদ্রা নেহা: কাগজপত্র সব ঠিক আছে। আমাদের ইতিমধ্যে শুধু কেমোথেরাপি আর ট্রিটমেন্টের (চিকিৎসা) পেছনে ৩৫ লাখের বেশি টাকা খরচ হয়ে গেছে। আর আসা–যাওয়া, অন্যান্য বিষয় তো বাদই! সেখানে আমাদের মুম্বাইয়ে যে তারিখটা রাখা ছিল, ওই হাসপাতালে এক লাখ রুপি খরচ করে একটা তারিখ নেওয়া হয়েছিল—সেগুলো সব মিস করেছি। আর্থিকভাবে আমাদের ক্ষতি হচ্ছে, আমি একটা মানুষ আমার বাবাকে হারাতে যাচ্ছি—কিন্তু এই সিস্টেমের বেড়াজালে আটকে পড়েছি।
আশা করছি দ্রুত এ জটিলতা শেষ হবে। ব্যক্তিগত কিছু তথ্য জানতে চাই। দুর্গাপূজা উপলক্ষে স্বামীর (অভিনেতা প্রান্তর দস্তিদার) কাছ থেকে কী উপহার পেলেন, আপনিই–বা তাঁকে কী দিয়েছেন?
নিদ্রা নেহা: প্রান্তর সবসময়ই আমাকে জীবনের সবচেয়ে স্পেশাল উপহারগুলো দিয়েছে। আমি মনে করি না যে গিফট বা উপহার সবসময় একটা বস্তু-জাতীয় কিছু হবে! শিক্ষাও অনেক সময় মানুষের জীবনে অনেক বড় উপহার হয়। এবারের পূজায় আমরা দুজন দুজনকে একটু ভিন্নভাবে উপহার দিয়েছি। প্রান্তর এবার একটা বিশেষ উপহার দিয়েছে, যা আমার জন্য অনেক বড় একটা শেখা যে, কীভাবে নিজেকে ভালোবাসতে হয়, নিজেকে নিয়ে থাকতে হয়? আসলে আমাদের জীবনে সবাই যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক না কেন, নিজেকে ভালোবাসা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু অন্য কারও ক্ষতি না করে। ও আসলে সেটাই শিখিয়েছে যে কীভাবে নিজেকে ভালোবাসতে হবে। আর আমি প্রান্তরকে একটা গিফট দিয়েছি, সেটা খুবই স্পেশাল। আসলে একটু তো নিজেদের মধ্যে ব্যক্তিগত কিছু থাকে, সব বলা যায় না! আমার কথা যদি বলি, আমি ওকে শেষ তিন বছরের পূজার চেয়ে এবার ভিন্নধর্মী একটা পূজা উপহার দিয়েছি।
পূজায় কি ফটোশুট বা এ রকম কিছুতে অংশ নিয়েছেন?
নিদ্রা নেহা: হ্যাঁ, ফ্যাশন ব্র্যান্ড কিউরিয়াস’র সঙ্গে একটা ফটোশুট করেছি। ওরা বেশ ভালো ব্র্যান্ড, আর আমার নিজেরও অনেকদিন পর ফ্যাশনে কাজ করে ভালো লেগেছে।
নিদ্রা নেহা: আসলে কমানোর প্রশ্ন তো তখনই আসবে, যখন আমি কাজ করব বেশি। নাটক, সিনেমা, ওটিটি—প্রথম থেকেই আমি সবখানে কাজ করেছি, অভিনয়টাই করতে চাই ঠিকঠাকভাবে। সেটা হোক নাটক, বিজ্ঞাপন, বড় পর্দা, ছোট পর্দা—সবই তো অভিনয়, সবই তো পর্দা। হোক সেটা রূপালি কিংবা তামার! হ্যাঁ, কাজের বেলায় আমি একটু সিলেক্টেড (বেছে বেছে কাজ)। মধ্যে কাজ করতে পারিনি, কারণ আমার একটা অ্যাকসিডেন্ট হয়, পায়ে ব্যথা পাই। প্রায় দুই মাস এতে বিশ্রামে থাকতে হয়েছিল। চাইলেও তখন কাজ করতে পারিনি। তারপর এখন বাবার শরীর ভালো নেই। আসলে আমি চাই না যে, কাউকে ডেট (তারিখ) দিলাম, পরে আর সেটা করতে পারিনি। যেহেতু এখন মেডিকেল ইমার্জেন্সি! মাঝে এই পূজার একটা কাজের ডেট দিয়েও করতে পারিনি। বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন, আমাকে হাসপাতালে যেতে হয়। কথা দিয়ে তার ব্যতিক্রম হবে—আমার ক্যারিয়ারে এমনটা আমি করতে চাই না।
সামনে ভক্তরা কী সুখবর পাবেন?
নিদ্রা নেহা: ভালো খবর হচ্ছে—আমার তিনটা সিনেমা পাইপলাইনে আছে। একটু অন্যরকম কাজ করতে চেয়েছিলাম, যদিও মনমতো পাচ্ছিলাম না। থাকে না যে এমন একটি শক্তিশালী চরিত্র, যাকে ঘিরে গল্পটি আবর্তিত হবে; অনেকটা শো–রানার! এটা এমন নয় যে আমাকে বেশি দেখাতে হবে, বরং আমি যেন অনেক ধরনের চরিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পাই, আমার দর্শকদের ব্যতিক্রম কিছু দেখানোর সুযোগ পাই—এই ধরনের কাজ করতে চাই। সামনে অনেক বড় একটা প্রজেক্ট আসবে, কিন্তু এখনই এসব বিষয়ে বলতে পারছি না। কারণ এখনও অফিসিয়ালি হয়নি। সবাই এখন একটু মিস করুক, বলা হয় না যে, ভালোবাসা বাড়ে দূরে থাকলে! আমার দর্শকরা এখন একটু মিস করুক আমাকে, ভালো কিছু নিয়েই আসব।
সবশেষ আপনাকে ওয়েব সিরিজ ‘ফ্যাঁকড়া’তে দেখা গেছে। দর্শকরাও কাজটি বেশ প্রশংসা করেছেন। এই ধারাবাহিকতায় ওটিটিতে আগামীতে কী আসছে?
নিদ্রা নেহা: গত বছর আমার দুটি ওটিটির কাজ এসেছে—‘আধুনিক বাংলা হোটেল’ ও ‘ফ্যাঁকড়া’। দুটি কাজই দর্শক–সমালোচকদের কাছ থেকে অনেক অনেক ভালোবাসা পেয়েছে। পুরস্কার জিতেছে। হয়তো আমার চরিত্রটি কোনো পুরস্কার পায়নি, কিন্তু টিমের কেউ একজন স্বীকৃতি পেলেও সেটা পুরো টিমের জন্যই ভালোলাগা। কারণ একটা কাজে আমরা প্রত্যেকে একে–অপরের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এখন আমার হাতে ওটিটির কাজ নেই, সিনেমাই আছে তিনটি; সেগুলোতেই সময় দিচ্ছি।