কলকাতার প্রয়াত অভিনেতা রাহুল অরুণোদয় বন্দ্যোপাধ্যায় বাবা দিবস উপলক্ষে ছেলের প্রতি একটি আবেগঘন চিঠি লিখেছিলেন। যা এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকের চোখ ভিজেছে এটি পড়ে, অনেকেই বলেছেন, এটি শুধুই এক বাবার চিঠি নয়, বরং অগণিত না–বলা অনুভূতির প্রতিচ্ছবি। অভিনেত্রী শ্রীলেখা মিত্রও সেই চিঠি শেয়ার করেছেন।
জানো সহজ, আমি আর তোমার মা তখন থেকে বন্ধু, যখন তোমার মায়ের বয়স ছিল ১৪ আর আমার ২১। সব ধারাবাহিকে আমরা ভাই-বোন। যেহেতু ছোট, তাই অন্যদের ছেড়ে শেষে আমাদের অংশের শুটিং করা হতো।’’
তোমাকে এই গল্প কেন বলছি জানো? যদি কখনও তুমি আমাদের ইন্ডাস্ট্রিতে কাজ করো, তা হলে তুমি জানবে তুমি প্রিভিলেজড, যে প্রিভিলেজ একটি ১৪ বছরের মেয়ে এবং একটি ২১ বছরের ছেলে দিনের পর দিন অপমানিত হতে হতে অর্জন করেছে, ঘটনাচক্রে যারা তোমার বাবা-মা।'
রাহুল ছেলেকে জীবন ও মানুষের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিও শেয়ার করেছেন, ‘এই ইন্ডাস্ট্রিতে সত্যিই যদি কাজ করতে ইচ্ছে হয় তোমার, আমি তোমাকে অনুরোধ করব—প্রত্যেকটা মানুষকে তার প্রাপ্য সম্মান দিও। কারণ যে মানুষটি তোমাকে চা দিচ্ছেন, তিনি হয়তো তোমার বাবা-মাকেও ছোট দেখেছেন। উপার্জন আর ক্ষমতার আতশ কাচ দিয়ে যারা মানুষকে দেখে, তাদের মতো অশিক্ষিত এই পৃথিবীতে কেউ নেই। এ রকম অশিক্ষায় তুমি বড় হবে না, এটুকু আশা তো করতেই পারি, কী বলো?’
তুমি জানো না হয়তো, তোমার মা কখনো বাজার চলতি বেবিফুড খাওয়ায়নি। সব নিজের হাতে বানাত। তাতে যদি সারা দিন লাগে, তো লাগুক। তোমার মায়ের তোমার জন্য অনেক সংগ্রাম, অনেক আত্মত্যাগ। তুমি কতটা মনে রাখবে, তা তোমার সিদ্ধান্ত।’
ছেলের প্রতি মায়ের প্রতি শ্রদ্ধার বার্তাও রেখেছেন রাহুল, ‘‘আজ তোমার মা ইনস্টাগ্রামে যথেষ্ট অ্যাস্থেটিক ছবি দেওয়ার পরেও উড়ো কমেন্ট ভেসে আসে—‘লজ্জা করে না আপনার? আপনি কিনা মা?’
না, এ নিয়ে কোনো দুঃখবোধ আছে ভেবো না, গন্ডারের চামড়া ধার নিয়ে তবে সেলিব্রিটি হওয়া যায়, এ আমরা শিখে গেছি।
শুধু তোমাকে বলছি, তোমার মায়ের লড়াইয়ের একটা আন্দাজ দেওয়ার জন্য। আমরা, সন্তানেরা শুধু মায়ের বুকের ওমটুকু টের পাই, পিঠে কত ছুরি গাঁথা আছে দেখতে পাই না। মায়েরা তা সযত্নে লুকিয়ে রাখেন। তোমার মাও রেখেছে। কিন্তু আমি চাইব, তুমি সেই ক্ষতগুলোর শুশ্রূষা করবে। মায়ের পিঠের ছুরিগুলো যদি সরাতে নাও পারো, তোমার একটু আদরই মায়ের জন্য যথেষ্ট হবে।’’
ভারতীয় পত্রিকা আনন্দবাজার জানাচ্ছে, এই চিঠি ২০২১ সালের বাবা দিবসে রাহুল ছেলের উদ্দেশে লিখেছিলেন। রাহুল ছেলেকে নিজের ভাষা, সংস্কৃতি এবং উত্তরাধিকার হিসেবে যা দিতে চেয়েছেন, তাও স্পষ্ট করেছেন, ‘এখন প্রশ্ন হচ্ছে, আমি কোন হরিদাস পাল যে তোমাকে এত জ্ঞান দিচ্ছে? আমি তোর বাপ (হা হা), দূরসম্পর্কেরই হই, বাপ তো বটে! সেই উপলক্ষে একটু জ্ঞান দেওয়ার অধিকার জন্মে যায়ই।
আমি তোমাকে আমার ভাগের সব ক’টা নদী, পাহাড়, জঙ্গল উত্তরাধিকার সূত্রে দিয়ে যাচ্ছি। বইমেলার ধুলো, কলেজ স্ট্রিটের ফুটপাথগুলোকেও পৈতৃক সম্পত্তি ভাবতে পারো। আর হ্যাঁ, তোমাকে দিয়ে দিলাম আমার একটা প্রচণ্ড অহংকারের জিনিস—আমার ভাষা। বাংলা। হ্যাঁ, বাংলা ভাষা। আর শুধু সেই বাংলা ভাষা নয়, যেটা আমরা দক্ষিণ কলকাতায় বলি। বাংলা তার সমস্ত উপভাষা, ডায়ালেক্ট নিয়ে যে প্রবল ঐশ্বর্যের অধিকারী, সেই সব ঐশ্বর্য তোমাকে দিয়ে দিলাম। সবই দিয়ে দিলাম, যা যা আমার।'