হার্ট অ্যাটাক কী, কেন হয়, আর প্রতিকারের উপায় কী?

হার্ট অ্যাটাক একটি বিশেষ রোগ। একটা বয়সের পর প্রায় সবাই এতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কায় থাকেন। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, কিছু বুঝে ওঠার আগেই প্রিয় মানুষটির জীবনাবসনা ঘটে গেল। এর কারণ হলো—হার্ট অ্যাটাকে যারা মারা যান, তাঁদের বেশির ভাগই কিন্তু প্রথম ঘণ্টার মধ্যে মারা যান। ফলে হার্ট অ্যাটাক বিষয়ে সচেতনতা থাকাটা ভীষণ জরুরি। জানা প্রয়োজন—হার্ট অ্যাটাক কী, কেন হয়, এর লক্ষণ কী এবং এর প্রতিরোধের উপায়ই–বা কী?

তাই হার্ট অ্যাটাক সম্বন্ধে আমাদের একটি ব্যক্তিগত ধারণা থাকা দরকার। এর কারণ হলো—হার্ট অ্যাটাক যেই রোগীর হয় তাঁকে হাসপাতালে পৌঁছানোর আগে রোগীর পাশে যাঁরা থাকেন, তাঁদের কিছু বিষয় জেনে রাখা দরকার। তাঁদের কিছু দায়িত্ব থাকে।

হার্ট অ্যাটাক কী
হার্ট বা হৃদ্‌যন্ত্র আমাদের সারা শরীরে রক্ত সঞ্চালন করে। এটি রক্ত পাম্প করে সারা শরীরে সরবরাহ করার দায়িত্ব পালন করে। হার্ট নিজে একটি পাম্প এবং তাকে কাজ করতে হয়, তাই তার নিজস্ব একটি রক্ত চলাচলের পদ্ধতি রয়েছে। হার্টের ভেতরেই আছে রক্তনালি। এই রক্তনালিগুলো মধ্যে কোনো এক বা একাধিক নালি যদি হঠাৎ বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে হার্টের বেশ কিছু অংশে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। এতে হার্টের কর্মক্ষমতাও বন্ধ হয়ে যায়। এটিই হলো হার্ট অ্যাটাক। মূলত, রক্তনালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ফলে হার্টের কার্যক্ষমতা যে বন্ধ হয়ে গেল, সেটিই হলো হার্ট অ্যাটাক।

সামগ্রিকভাবে বলতে গেলে, হার্টের রক্তচলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়া বা কমে যাওয়া—এই রোগটিকে সাধারণত ইসকেমিক হার্ট ডিজিজ বলে। ভয়াবহ এই রোগের প্রাদুর্ভাব অনেক বেশি বলে সাধারণভাবে একে হৃদরোগ বলে বোঝানো হয়। যদিও হৃদ্‌রোগের অন্য কারণও রয়েছে।

সাধারণত, বয়স্ক মানুষ ও পুরুষদের মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের প্রবণতা বেশি। ছবি: পেক্সেলস

কাদের হার্ট অ্যাটাক হয়?
যেকোনো বয়সে এবং যে কেউ হার্ট অ্যাটাকের শিকার হতে পারেন। সাধারণত, বয়স্ক মানুষ ও পুরুষদের মধ্যে এ প্রবণতা বেশি। তবে নারীরাও বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে হার্ট অ্যাটাকের বাড়তি ঝুঁকিতে থাকেন। যাঁরা ধূমপান করেন, ডায়াবেটিস ও উচ্চ রক্তচাপ, রক্তে উচ্চমাত্রায় কোলেস্টেরলজনিত সমস্যায় ভুগছেন, তাঁদের ঝুঁকিও বেশি। পরিবারে কারও হার্টের রক্তনালির সমস্যা বা ইসকেমিক হার্ট ডিজিজ থাকলে পরিবারের অন্যদেরও ঝুঁকি বাড়ে।

হৃদযন্ত্রে কোনো রকম জটিলতা দেখা দিলে সাধারণত এক মাস আগেই শরীরে তার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ছবি: ইনডিপেনডেন্ট

হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ
সাধারণত দুভাবে বিষয়টি হতে পারে। কোনো কোনো লোকের হয়তো আগে থেকে কিছু কিছু লক্ষণ থাকে। উদাহরণস্বরূপ অনেকের পরিশ্রমসাধ্য কাজের সময় বুকে ব্যথা হয়। বিশ্রাম নিলে ভালো থাকেন। এভাবে কয়েক মাস বা কয়েক বছরও চলে যেতে পারে। আবার কোনো কোনো লোকের ক্ষেত্রে হঠাৎ করেই হার্টের রক্তনালি বন্ধ হয়ে যায়।

আসলে আগে থেকে রোগ থাকুক বা না থাকুক যদি কোনো কারণে হঠাৎ করে হার্টের রক্ত সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়, তখন একে সাধারণত হার্ট অ্যাটাক বলা হয়। হৃদযন্ত্রে কোনো রকম জটিলতা দেখা দিলে সাধারণত এক মাস আগেই শরীরে তার ইঙ্গিত পাওয়া যায়। সেজন্যই হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণগুলো জেনে রাখা উচিত। ব্রিটিশ হার্ট ফাউন্ডেশনের ওয়েবসাইটে বেশ কিছু লক্ষণের কথা বলা হয়েছে—

  • শ্বাস-প্রশ্বাসে যদি কষ্ট হয় তাহলে হার্ট অ্যাটাকের আশঙ্কা থাকে। শ্বাস নিতে কষ্ট হলে, দম আটকে এলে অবিলম্বে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করুন। হৃদযন্ত্রের কোনো রকম সমস্যা হলে ফুসফুসও অক্সিজেন কম পায়। তাই এই লক্ষণ দেখা দিতে পারে।
  • কোনো কারণ ছাড়াই ঘাম হলে বা একটুতেই হাঁপিয়ে উঠলেও দুশ্চিন্তার কারণ রয়েছে। শরীরে ঠিকভাবে রক্ত চলাচল না হলে বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ঠিকভাবে অক্সিজেন পায় না। তাই হাঁপ ধরতে পারে।
  • মাঝরাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে দরদর করে ঘামতে থাকলে তা উপেক্ষা করা যাবে না।
  • সাধারণত বুকে ব্যথা হওয়াটা সবচেয়ে প্রচলিত লক্ষণ। হঠাৎ করে বুকটা ভীষণ চেপে ধরে। মনে হয় বুকটি ভেঙ্গে পড়ল। অনেক ওজন চেপে গেছে। এটা হয় শুরুতে এবং এর সাথে সাথে অনেকের শরীরে ঘাম হতে থাকে। তাই বুকে ব্যথা বা চাপ লাগার মতো অনুভূতি হলে অবশ্যই চিকিৎসককে জানাতে হবে।
  • শ্বাসকষ্ট এবং হঠাৎ মাথা ফাঁকা লাগতে পারে।
  • মেয়েদের ক্ষেত্রে কিছু লক্ষণ আলাদা। বুকে ব্যথা, ঘাম হওয়া বা হাঁপ ধরা ছাড়াও পেটে অস্বস্তি, পিঠে ব্যথার মতো কিছু অন্যান্য লক্ষণও দেখা দিতে পারে।
  • উচ্চ রক্তচাপ থাকলে নিয়মিত চিকিৎসকের সাথে পরামর্শ করা জরুরি।
  • অনেকের ক্ষেত্রে হঠাৎ করে ভীষণ উদ্বেগ কাজ করে, যাকে অনেকে প্যানিক অ্যাটাকের সাথে গুলিয়ে ফেলে। তবে এ লক্ষণ সবার ক্ষেত্রে দেখা যায় না।
  • কিছুটা অপ্রচলিত হলেও অনেকের ক্ষেত্রে ভীষণ কফসহ কাশি হয়।

তবে মনে রাখা জরুরি যে, কোনো লক্ষণ শনাক্তের আগেই হার্ট অ্যাটাক হয়ে যেতে পারে। কারণ, ব্যথার অনুভব একেকজন একেকভাবে করে। বিশেষত যারা ডায়াবেটিসে ভুগছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে ব্যথা অনুভূতি অতটা প্রকট মনে নাও হতে পারে। আবার বুকে বা পেটের উপরদিকে ব্যথাও নানা করণে হতে পারে। এ কারণে সতর্ক থাকা এবং এমন যেকোনো অস্বস্তিকে গুরুত্ব দিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে ভালো।

হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণগুলো প্রকাশ পেলে আতঙ্কিত না হয়ে নিকটস্থ হাসপাতালে যোগাযোগ করুন। ছবি: সংগৃহীত

হার্ট অ্যাটাকে কী করণীয়? 
লক্ষণগুলো প্রকাশ পেলে আতঙ্কিত হওয়ার বদলে শান্ত হয়ে বসুন এবং আপনজনদের জানান। বুকে ব্যথা অনুভূত হলে রোগীকে যত দ্রুত সম্ভব নিকটস্থ হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। দ্রুত ইসিজি ও রক্ত পরীক্ষা করে হার্ট অ্যাটাকের বিষয়টি নিশ্চিত হতে হবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো দ্রুততম সময়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে এবং তাঁর পরামর্শ মোতাবেক চলতে হবে।

হার্ট অ্যাটাকের চিকিৎসা
হার্টের রক্তনালির রক্ত চলাচল পুনঃপ্রতিস্থাপন করাই এর প্রধান চিকিৎসা। যত দ্রুত চিকিৎসা প্রদান করা যায়, রোগীর সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা তত বেশি ও দ্রুত হয়। এ ছাড়া আধুনিক চিকিৎসা হলো এনজিওগ্রামের মাধ্যমে হার্টের ব্লক শনাক্ত করে দ্রুত তা অপসারণ করা এবং রক্ত চলাচল পুনঃপ্রতিস্থাপন করা। বিকল্প চিকিৎসা হিসেবে চিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেক ওষুধের মাধ্যমে রক্তজমাট ভেঙে দেওয়া হয় এবং রক্ত চলাচল স্বাভাবিক করা হয়।

হার্ট অ্যাটাক–পরবর্তী জটিলতা
হার্ট অ্যাটাক-পরবর্তী দুই ধরনের জটিলতা দেখা দিতে পারে—স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি। হঠাৎ মৃত্যু বা সাডেন কার্ডিয়াক ডেথ, বিভিন্ন ধরনের অ্যারিদমিয়া বা হার্টবিটের সমস্যা, হার্ট ব্লক, হার্টবিট কমে যাওয়া, অ্যাকিউট হার্ট ফেইলিওর, পালমোনারি ইডেমা, কার্ডিওজনিক শক ইত্যাদি স্বল্পমেয়াদি জটিলতা। অন্যদিকে, হার্ট ফেইলিওর, অ্যারিদমিয়া, ভাল্‌ভের সমস্যা, কিডনি সমস্যা ইত্যাদি দীর্ঘমেয়াদি জটিলতা। প্রতিটি ক্ষেত্রেই হৃদ্‌রোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন করলে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব। ছবি: সংগৃহীত

প্রতিরোধে করণীয়
যেকোনো রোগের ক্ষেত্রেই আপ্তবাক্য হলো—প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধই উত্তম। হার্ট অ্যাটাকের ক্ষেত্রেও তাই। অস্বাস্থ্যকর জীবনযাপন হার্ট অ্যাটাকের অন্যতম একটি কারণ। স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন করলে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি অনেকাংশে প্রতিরোধ করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে কিছু বিষয় অনুসরণের পরামর্শ দেয় ব্রিটিশ হার্ট ফাউন্ডেশন—

  • ধূমপানসহ যেকোনো ধরনের তামাক গ্রহণ ত্যাগ করা।
  • ডায়াবেটিস, কোলেস্টেরল ও উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখা।
  • চর্বিজাতীয় খাবার পরিহার।
  • নিয়মিত শরীরচর্চা করা জরুরি। যেকোনো বিবেচনাতেই শরীরকে সুস্থ রাখতে শরীরচর্চার বিকল্প নেই। তাই সব সময় সচল থাকুন।
  • এটি শুধু হার্ট অ্যাটাক নয়, অন্য অনেক রোগ থেকেও আপনাকে সুরক্ষা দেবে।
  • নিয়ম করে প্রতিদিন হাঁটার অভ্যাস করা।
  • ফাস্ট ফুড ও জাঙ্ক ফুড পরিহার।
  • যথাসম্ভব দুশ্চিন্তা ও মানসিক চাপমুক্ত থাকা।
  • নিয়মিত মেডিকেল চেকআপ করানো ও চিকিৎসকের পরামর্শ মোতাবেক চলা।
  • মদ্যপান ত্যাগ করা।
  • ওজন নিয়ন্ত্রণ করা। এ ক্ষেত্রে পুষ্টিবিদের সহায়তায় স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস তৈরি করা সুফল দেয়।