ভুলে যাওয়ার দুশ্চিন্তায় ভয় পাচ্ছেন? জেনে নিন কারণ...

'আমার প্রচন্ড প্যানিক অ্যাটাক হয়। মনে হয় শরীরের রক্ত জমে হিম হয়ে যাচ্ছে। পেটের মধ্যে প্রজাপতি উড়তে থাকে। দমটা মনে হয় গলার কাছে আটকে গেছে। মনে হয় আমি সবাইকে ভুলে যাব। আবার কিছুক্ষণ পর মনে হয় একদিন সবাই আমাকে ভুলে যাবে।' এসব কথা এক ভদ্রমহিলা হুড়মুড় করে বলেন।

খেয়াল করলাম ভদ্রমহিলা ডান পায়ের বুড়ো আঙুল দিয়ে বাম পায়ের বুড়ো আঙুল ঘষছেন। হঠাৎ দেখলাম তিনি হোঁচট খাচ্ছেন, থেমে থেমে কথা বলছেন।

আমি তাঁর কাছে জানতে চাইলাম, 'পানি খাবেন?' তিনি বলেন, 'গরম পানি হলে খুব ভালো হয়। আমি এবার জিজ্ঞেস করলাম, আপনি বলছিলেন ভয়ের কথা?' আমার এ কথা শুনে ভদ্রমহিলা বলেন, 'হ্যাঁ, ভয়, ......  আমি খুব ভয় পাই। গত সাত-আট মাস ধরে এত খারাপ সময় গেছে। প্রায়ই সময় মনে হয়েছে আমার হাত পা সব যেন পেটের মধ্যে কুঁকড়ে যাচ্ছে। ঘুমাতে পারছি না। কখনো কখনো নার্ভ ব্রেক ডাউন হচ্ছে। আমার স্বামী মোটেও এসব গুরুত্ব দিচ্ছে না।'

'আপনি কি মানসিক চাপের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন?' মৃদু কণ্ঠে প্রশ্ন করলাম।

'আমার মায়ের ডিমেনশিয়া ছিল। মা প্রায় ১৫ বছর আমার কাছে ছিলেন। আমার প্রথম সন্তান ডাউন সিনড্রোম ছিল। ২৫ বছর বয়সে ও মারা যায়। এরপরে আমার দুই মেয়ে। ওরা যমজ। দুজনেই থাকে দেশের বাইরে। ইদানীং মনে হয়, আমার স্বামী যদি আমার আগে মারা যায়, তাহলে আমি মরে গেলে আমার মরদেহ গলে পচে যাবে। কেউ খোঁজ করেও পাবে না।' স্পষ্ট দেখলাম ভদ্রমহিলার আঙ্গুলগুলো কাঁপছে। বুঝতে পারছি তীব্র ভয়ের স্রোত তাঁর মেরুদন্ড বেয়ে চলে যাচ্ছে।

ভদ্রমহিলা দীর্ঘদিন দেশের বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। ভদ্রমহিলার স্বামী বলেন, 'আমার স্ত্রী তীব্র দুশ্চিন্তায় ভোগে, তাঁর ধারণা আমরা সবাই তাঁকে ভুলে যাব। আরও ধারণা করে, একদিন নিজেই ভয়ের চোটে পাগল হয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়বে।'

আলোচ্য ভদ্রমহিলা সম্ভবত অ্যাথাজাগরফোবিয়াতে (Athazagoraphobia) ভুগছেন। এর অর্থ কাউকে বা কোনো কিছু ভুলে যাওয়ার দুশ্চিন্তায় অথবা ওনাকে অন্যরা ভুলে যাবে সেই আশঙ্কায় তিনি শঙ্কিত। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আপনি নিজে অথবা আপনার পরিচিত কেউ অ্যালঝাইমারস বা ডিমেনশিয়া অথবা স্মৃতিভ্রষ্টতায় ভুগবেন বলে শঙ্কিত। অথবা তিনি যার যত্ন নিচ্ছেন সেই প্রিয় মানুষটি এতে আক্রান্ত হবেন বলে ভয় পাচ্ছেন। কারণ একবার স্মৃতিভ্রষ্ট হয়ে গেলে আপনার ভয় হচ্ছে, তিনি আপনাকে আর মনে রাখবেন না। কেউ কেউ এই ভুলে যাওয়ার ভয় এতো তীব্রভাবে ভোগেন যে তা ফোবিয়ার পর্যায়ে চলে যায়।

এক কথায় অ্যাথাজাগরফোবিয়া একটি অপ্রচলিত অযৌক্তিক ভয়। যেখানে আক্রান্ত ব্যক্তি মনে করেন, তাকে অন্যরা ভুলে যাবে বা উপেক্ষা করবে অথবা তিনি উপেক্ষিত হবেন। অথবা ক্ষেত্র–বিশেষে তিনি অন্য কাউকে ভুলে যাবেন অথবা কোন জিনিসকে ভুলে যাবেন।

কেন এমনটা হচ্ছে, সুনির্দিষ্ট করে বলা কিছুটা কঠিন হলেও বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন জিনগত এবং পরিবেশগত কারণ নির্দিষ্ট ফোবিয়া তৈরিতে ভূমিকা পালন করে। শৈশবের আঘাত, হয়তো তাকে পরিত্যাগ করা হয়েছিল অথবা পরিবারের কেউ যদি ডিমেনশিয়া আক্রান্ত থাকেন তবে স্মৃতিজনিত ফোবিয়া তৈরি হতে পারে।

অধিকাংশ ফোবিয়াকে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাগ করা যায়। যদিও বর্তমানে আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক অ্যাসোসিয়েশন (এপিএ) ডায়াগনস্টিক এন্ড স্ট্যাটিস্টিকাল ম্যানুয়াল অব মেন্টাল ডিসঅর্ডার (ডিএসএম-৫) এ অ্যাথাজাগরফোবিয়াকে চিহ্নিত করে নাই।

বহুদিন আগে পুলক বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা একটি গান শুনেছিলাম, ‘ওগো আবার নতুন করে ভুলে যাওয়া নাম ধরে ডেকো না, হারানো স্বপন চোখে একো না।’ এই ভুলে যাওয়া নাম শব্দটি এখন পাশ্চাত্যের নতুন রূপে আবির্ভূত হচ্ছে। পাশ্চাত্যের মানুষ দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হচ্ছেন অনাগত স্মৃতিভ্রষ্টতার মহামারীর আশঙ্কায়।

লেখক: চিকিৎসক, কাউন্সিলর, সাইকোথেরাপি প্র্যাকটিশনার। ফিনিক্স ওয়েলনেস সেন্টার, বাংলাদেশ।