প্রয়োজনের অতিরিক্ত ক্যালরি গ্রহণ না করা এবং খাবার থেকে প্রাপ্ত এনার্জিকে সঠিক উপায়ে কাজে লাগানোই হলো স্বাস্থ্যকর ডায়েটের চাবিকাঠি। আপনি যদি প্রয়োজনের চেয়েও বেশি খাবার খান, তবে আপনার ওজন বৃদ্ধি পাবেই। কারণ, আপনার শরীরে জমে থাকা খাবার ধীরে ধীরে চর্বিতে রূপান্তরিত হবে।
একজন পুরুষের দিনে ২৫০০ ক্যালরি খাবার গ্রহণ করা উচিত। অন্যদিকে, নারীর ক্ষেত্রে এই পরিমাপ ২০০০ ক্যালরি। কিন্তু আমরা নিজেদের অজান্তে প্রতিদিন এর চেয়েও অধিক ক্যালরি গ্রহণ করে থাকি।
জেনে নিন ক্যালরি নিয়ন্ত্রণ করে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের কিছু উপায়-
হাই ফাইবারে ঠাসা কার্বোহাইড্রেট
স্টার্চযুক্ত খাবার আমাদের কার্বোহাইড্রেটের প্রধান উৎস। প্রতিদিনের খাবারের তিনভাগের একভাগ থাকা উচিত স্টার্চযুক্ত কার্বোহাইড্রেটে। এসব খাবারের মধ্যে রয়েছে আমাদের সুপরিচিত আলু, রুটি, ভাত, পাস্তা ইত্যাদি।
এর বদলে বেছে নিন, হাই ফাইবার যুক্ত হোল গ্রেইন ফুড। যেমন– হোল হুইট পাস্তা, লাল চাল, খোসাসহ আলু। যেহেতু এসব খাবারে সাদা বা প্রক্রিয়াজাত স্টার্চি কার্বোহাইড্রেটের চেয়ে অধিক পরিমাণে ফাইবার থাকে, তাই খেলে পেট অনেকটা সময় ভরা থাকে।
তবে স্টার্চযুক্ত খাবার একেবারেই বাদ দেবেন না। খাবার রান্না বা পরিবেশনের সময় অতিরিক্ত যে ফ্যাট যোগ করা হচ্ছে, সে বিষয়ে সতর্ক হোন। যেমন- চিপসের ওপর তেল, রুটির ওপর মাখন এবং পাস্তার ওপর ক্রিমি সস যখন দেওয়া হয়, তখনই আসলে ক্যালরির পরিমাণ বাড়ে।
ফল আর সবজির প্রাচুর্য
প্রতিদিন অন্তত পাঁচবার ফল খাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়। সেটি হতে পারে তাজা, ফ্রোজেন, ক্যানে ভরা, শুকনো বা ফলের জুস। সকালের নাশতায় ওটস বা ওটসের ওপর কলা, আপেল, খেজুর কুচি ছড়িয়ে দিতে পারেন। আবার নাশতা আর দুপুরের খাবারের মাঝে সময়টায় খিদে পেলে অস্বাস্থ্যকর স্ন্যাকস না খেয়ে একটা গোটা ফল খেয়ে নিতে পারেন। তবে কখনো এক গ্লাসের বেশি ফলের রস খাবেন না। কারণ, এতে চিনির পরিমাণ বেশি, যা দাঁতের জন্য ক্ষতিকর।
বেশি করে মাছ খান
সপ্তাহে অন্তত দু’বার মাছ খাওয়ার চেষ্টা করুন, তেলযুক্ত মাছ হলে আরও ভালো। মাছের তেলে উচ্চমাত্রায় ওমেগা-৩ ফ্যাটি এসিড থাকে, যা হৃদ্রোগ প্রতিরোধে ভূমিকা রাখে।
স্যামন, সার্ডিং, হেরিং প্রভৃতি বিদেশি মাছের তেল পুষ্টিগুণে ভরপুর। সুপার মার্কেটগুলোতে আজকাল ক্যানযুক্ত এসব বিদেশি মাছ পাওয়া যায়। কিন্তু ক্যানে সংরক্ষিত মাছে সোডিয়ামের পরিমাণ বেশি থাকে। তাই চেষ্টা করুন নিজের দেশের তাজা মাছ খেতে।
স্যাচুরেটেড ফ্যাটের পরিমাণ কমানো
ফ্যাট বা চর্বি শব্দটি নেতিবাচক অনুভূতি দিলেও আমাদের শরীর সুস্থ রাখতে ফ্যাট বা চর্বির প্রয়োজনীয়তা অনস্বীকার্য। প্রধানত, ২ ধরনের ফ্যাট রয়েছে- স্যাচুরেটেড এবং আনস্যাচুরেটেড। অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ফ্যাট রক্তে কোলেস্টেরলের পরিমাণ বাড়িয়ে তোলে, যা থেকে হৃদরোগের ঝুঁকি তৈরি হয়।
দিনে একজন পুরুষের গড়ে ৩০ গ্রামের বেশি এবং একজন নারীর ২০ গ্রামের বেশি স্যাচুরেটেড ফ্যাট গ্রহণ করা উচিত না। চর্বিযুক্ত মাংস, সসেজ, মাখন, চিজ, ক্রিম, কেক, বিস্কুট ইত্যাদি খাবারে স্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকে। অন্যদিকে আনস্যাচুরেটেড ফ্যাট সমৃদ্ধ খাবারের উদাহরণ হলো ভেজিটেবল অয়েল, তেলযুক্ত মাছ আর অ্যাভোকাডো।
চিনিজাতীয় খাবার কম খাওয়া
নিয়মিত চিনিজাতীয় খাবার গ্রহণের ফলে স্থূলতা এবং দাঁত ক্ষয়ের ঝুঁকি তৈরি হয়। কোমল পানীয়, কেক, বিস্কুট, পেস্ট্রি, পুডিং, চকলেটে যেমন প্রক্রিয়াজাত চিনি থাকে; তেমনি প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত মধু, সিরাপ, ফলের রস, স্মুদি ইত্যাদিতেও ‘ফ্রি সুগার’ নামক এক রকম চিনি থাকে। উভয় চিনিই হবে বর্জনীয়। তবে ফলের রস এবং দুধে যে প্রাকৃতিক চিনি থাকে, তা উপকারী।
দিনে ৬ গ্রামের বেশি লবণ নয়
অতিরিক্ত লবণ খাওয়া রক্তচাপ বাড়িয়ে তুলতে পারে। উচ্চ রক্তচাপের ব্যক্তিদের হৃদ্রোগ বা স্ট্রোকে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। প্রতিদিন যেসব প্রক্রিয়াজাত খাবার কিনে থাকেন, তাতেই আপনার তিন-চতুর্থাংশ লবণের চাহিদা পূরণ হয়ে যায়। যেমন- সিরিয়াল, স্যুপ, ব্রেড আর সস। প্রাপ্তবয়স্ক এবং ১১ বছরের ঊর্ধ্বে শিশুদের দিনে ৬ গ্রামের (প্রায় এক চা চামচ) বেশি লবণ খাওয়া উচিত নয়। ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে এই হার আরও কম।
নিজেকে সক্রিয় রাখা
স্বাস্থ্যকর খাবারের পাশাপাশি নিয়মিত শরীরচর্চা অনেক গুরুতর রোগের হাত থেকে আমাদের দূরে রাখে। স্থূল শরীরে টাইপ-২ ডায়াবেটিস, ক্যানসার, হৃদ্রোগ, স্ট্রোকের ঝুঁকি বেড়ে যায়। আবার যাদের ওজন প্রয়োজনের চেয়ে অনেক কম, তাদেরও থাকে নানান স্বাস্থ্য সমস্যা। ওজন কমানো যদি আপনার লক্ষ্য হয়ে থাকে, তাহলে খাবারের পরিমাণ কমিয়ে শরীরচর্চা বাড়াতে হবে।
পানির পরিমাণ ঠিক রাখা
শরীতে পানিপ্রবাহ ঠিক রাখতে দৈনিক ৬ থেকে ৮ গ্লাস পানি পান করতে হবে। সব সময় পানি খেতে না চাইলে বেছে নিতে পারেন লো ফ্যাট দুধ, ডাবের পানি, গ্রিন টি ইত্যাদি। তবে তেষ্টাতে কখনোই চিনিযুক্ত কোমল পানীয়র দিকে হাত বাড়াবেন না। এসব পানীয় দেহকে আরও পানিশূন্য করে তোলে। এমনকি চিনিছাড়া ফলের রস এবং স্মুদিতেও প্রচুর ফ্রি সুগার থাকে। গরমের মৌসুমে এবং ব্যায়ামের সময় পানি গ্রহণের পরিমাণ বাড়িয়ে দিন।
নাশতা বাদ দেওয়া নয়
ওজন কমানোর আশায় অনেকেই সকালের নাশতা বাদ দিয়ে থাকেন। অথচ উচ্চ ফাইবারে পূর্ণ এবং কম ফ্যাট, চিনি আর লবণ সহযোগে একটি স্বাস্থ্যকর নাশতা আপনাকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি জুগিয়ে সক্রিয় রাখবে পুরো দিন। এমন একটি খাবারের উদাহরণ হলো- হোল হুইট ওটসের সঙ্গে লো-ফ্যাটযুক্ত দুধ আর ওপরে ফলার টুকরো।
তথ্যসূত্র: ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস, ইউকে
আরও পড়ুন: