মানুষের এক অদ্ভুত জীবন, কখন কী ঘটবে, তা কেউ বলতে পারে না। যেকোনো দিন হুট করেই ঘটে যেতে পারে অপ্রত্যাশিত কোনো ঘটনা। আর সেই ঘটনার রেশ বয়ে বেড়াতে হয় সারা জীবন।
কিন্তু সব সময় কী সতর্ক থাকা সম্ভব? খুব একটা দূরের কথা না, চলতি বছরের জুলাই-আগস্ট মাসের কথা। অনেকের মনেই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কিছু ঘটনা এখনো দাগ কেটে আছে। আবার এমন অনেকেই আছেন, যারা এই আন্দোলনের ভয়াবহতা বয়ে বেড়াচ্ছেন।
একটু পেছনের দিকে ফিরে তাকাই। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনেরে উত্তাল সময়। সেদিন অন্যান্য জায়গার মতো উত্তাল ছিল রামপুরা-বনশ্রী এলাকা। কাজ শেষে বাসায় ফিরছিলেন দোকান কর্মচারী আমির হোসেন। পুলিশের ধাওয়া খেয়ে নির্মাণাধীন ভবনের চার তলায় উঠে পড়েন। কিন্তু সেখানেও তিনি নিরাপদ ছিলেন না। পুলিশ তাঁকে কেন্দ্র করে দুই দফায় ৬টি গুলি করে। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পড়ে ছিলেন তিন ঘণ্টা। পরে পাশের একটি বেসরকারি হাসপাতালের চিকিৎসকেরা তাঁকে উদ্ধার করেন।
সেই চারতলা ভবনের বাইরে ঝুলে থাকা আমির হোসেনের কথা আমাদের নিশ্চয়ই মনে আছে। পুলিশ তাঁকে আন্দোলনকারী ভেবে এক‑দুটি নয়, ছয়টি গুলি করে। তারপরও তিনি বেঁচে আছেন। কিন্তু এভাবে বেঁচে থাকাকে কি বেঁচে থাকা বলে? প্রতি মুহূর্তে অজানা এক মানসিক পীড়নে দিন কাটছে আমির হোসেনের। পা কেটে ফেলার শঙ্কা এখনো তাড়া করে ফেরে। তবে, মনে‑প্রাণে আপ্রাণ চেষ্টা করছেন স্বাভাবিক জীবনে ফিরবার।
চিকিৎসকের ভাষ্যমতে, ঘটনাস্থলে যদি আর ১০ থেকে ১৫ মিনিট আমির হোসেন পড়ে থাকতেন, তাহলে রক্তশূন্যতায় তাঁর মৃত্যু হতে পারত। ছয়টি গুলিই আমিরের পায়ের এক পাশে লেগে অন্য পাশ দিয়ে বের হয়ে গেছে। ছিঁড়ে গেছে রক্তনালী। প্রথমে পা কেটে ফেলার সিদ্ধান্ত হলেও পরে রক্ষা করা গেছে।
ক্ষেত্রবিশেষে এ ধরনের ঘটনা শুধু এক বা দুটিই ঘটছে, তা কিন্তু নয়। সপ্তাহ, মাস, বছরজুড়ে ঘটছে অনেক ঘটনা। যেসব ঘটনার পরিপূর্ণ চিত্র হয়তো গণমাধ্যমে উঠে আসছে না।
আজ বিশ্ব ট্রমা দিবস। প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী এই দিবস পালিত হয়। ২০১১ সালে ভারতের নয়াদিল্লিতে এই দিবসের সূচনা হয়। এই দিবসের পেছনে রয়েছে সড়ক দুর্ঘটনার ইতিহাস। প্রতি বছর দুর্ঘটনায় পৃথিবীতে বহু মানুষের মৃত্যু ঘটে। দুর্ঘটনায় আহত মানুষের চিকিৎসা ও সচেতনতার জন্য এই দিবসটি পালন করা হয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে, প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী ৪৪ লাখ মানুষ সহিংসতা ও দুর্ঘটনায় মারা যায়। ৫ থেকে ২৯ বছর বয়সের মানুষের মৃত্যুর পাঁচটি কারণের মধ্যে তিনটি হলো–সড়ক দুর্ঘটনা, হত্যা ও আত্মহত্যা।
ট্রমা (মানসিক আঘাত) মানে শরীরে বা মনের এমন এক আঘাত, যা পরে মানুষের অনুভূতি, আচরণ ও চিন্তায় প্রভাব ফেলে। যে ঘটনার রেশ সারা জীবন মানুষকে বয়ে বেড়াতে হয়। যার সময়কাল হতে পারে একদিন, বা এক সপ্তাহ, এক মাস কিংবা বছরের পর বছর।
ভিন্ন ভিন্ন পরিস্থিতিতে ট্রমা কাটিয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এডুকেশনাল অ্যান্ড কাউন্সেলিং সাইকোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. আজহারুল ইসলাম বলেন, ‘যেহেতু ব্যক্তিভেদে ট্রমার অভিজ্ঞতায় তারতম্য রয়েছে, ট্রমা ব্যবস্থাপনাতেও সেটার প্রতিফলন থাকতে হবে। অর্থাৎ, ক্ষতির পরিমাণের ওপর নির্ভর করে ব্যক্তি কীভাবে সেটা কাটিয়ে উঠবেন। যারা মারাত্মক শারীরিকভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হন, সুচিকিৎসা এবং প্রয়োজনীয় পুনর্বাসন ছাড়া তাদের ট্রমা মোকাবিলা করা অসম্ভব। এমনকি সুচিকিৎসা এবং পুনর্বাসন হলেও মানসিক ক্ষত কাটিয়ে উঠতে অনেক সময় লেগে যেতে পারে। তবে, শারীরিকভাবে আঘাতপ্রাপ্তদের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা এবং পুনর্বাসন না হলে, মনের ক্ষত আরও গভীর হবে।’
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে মৃত্যুর সংখ্যা যেমন বেশি ছিল, তেমনি নিহতের সংখ্যাও নেহাত কম ছিল না। এই আন্দোলনে একদিনে মৃতের সংখ্যা ছিল দেশের ইতিহাসে প্রথম। এই আন্দোলনে ১ হাজার ৫৮১ জন নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের স্বাস্থ্যবিষয়ক উপকমিটি এবং জাতীয় নাগরিক কমিটি। বিভিন্ন উৎস থেকে পাওয়া তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ এবং নিহত ব্যক্তিদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে বেসরকারি এই তালিকায় এসব নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। গত ২৮ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে শিক্ষার্থীরাই বেশি যুক্ত ছিলেন। শিক্ষার্থীরা খুব কাছ থেকে দেখেছেন গুলি, বোমাসহ বিভিন্ন ধরনের অস্ত্র। তারা অল্প কয়েক দিনেই যে ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন, তাতে তাঁদের অভিজ্ঞতার ঝুলিতে জমা হয়েছে অনেক অপ্রত্যাশিত ঘটনা। আন্দোলনে অনেকেই নিজের চোখের সামনে দেখেছেন বন্ধু অথবা সহপাঠীর মৃত্যু। আবার বাবা কিংবা মা দেখেছেন জানালার গ্রিল, ছাদে থাকা প্রিয় সন্তানের তাৎক্ষণিক মৃত্যু।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ঘটনাপ্রবাহে ঘটেছে বহু ঘটনা, যা দেশের ইতিহাসের জন্য সুখকর পরিস্থিতির জন্ম দেয়নি। এই আন্দোলনে যারা পরিস্থিতির শিকার, তাদের মধ্যে অনেকেই এখনো সুস্থ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে পারেননি। তাদের অনেকেই অঙ্গ হারিয়েছেন, মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন, কারও কারও বেঁকে গেছে চেহারা, আবার অনেকে এখনো হাসপাতালে শুয়ে দিন কাটাচ্ছেন। দিনে দিনে তাঁদের মনে ক্ষতের পরিমাণ বাড়ছে। ফলে তাঁরা এক ধরনের ট্রমার আচ্ছন্ন হয়ে পড়ছেন। আবার শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষকদের কথা ভুলে গেলে চলবে না। আন্দোলনের সহিংসতার ঘটনায় শিক্ষকেরাও মানসিক ট্রমার পড়েছেন।
ড. আজহারুল ইসলাম এই মানসিক পীড়া থেকে বের হতে ব্যক্তিবিশেষে কিছু পদক্ষেপের কথা বলেন। যেমন–
১. সবসময় অভ্যুত্থান এবং এর ফলে কী হলো আর কী হলো না–এসব চুলচেরা বিশ্লেষণ না করে, দিনের নির্দিষ্ট একটা সময়ে সেটা করতে পারেন। কারণ আপনি যদি সারাক্ষণ এসব ভাবেন, সোশ্যাল মিডিয়ায় এসব ঘটনা অনুসরণ করেন বা টিভিতে এসবই দেখেন, তাহলে আপনার চিন্তায় এসব ঘটনাই ঘুরপাক খাবেই। এক্ষেত্রে মনে রাখা দরকার ব্যক্তিগত বা জাতীয় চরিত্র পরিবর্তন একটি ধীর প্রক্রিয়া।
৩. নিজেকে শান্ত এবং মনে প্রশান্তি আনার জন্য আপনার প্রিয় বই পড়া শুরু করুন, বা সিনেমা দেখুন কিংবা গান শুনুন। আপনার দৈনিক কায়িক পরিশ্রম অথবা ব্যায়াম ভুলে গেলে আবার শুরু করুন। দ্রুতই দেখবেন শরীর ও মন স্থির হচ্ছে। মনটা বর্তমানে ফিরে আসছে।
৪. রাজনৈতিক সংঘর্ষ এবং ক্ষমতার পটপরিবর্তনের ফলে আপনি একাকিত্বে ভুগতে পারেন অথবা নিজের কাঁধে অনেক দায়িত্ব মনে করতে পারেন। এই দুই অবস্থাই মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি। এই একাকিত্ব বা অতিরিক্ত দায়িত্বের বোঝা আরও বেড়ে যায়। এ সময় আবেগীয় বুদ্ধিমত্তার সঠিক ব্যবহার করতে হবে। একপেশে বা অসত্য তথ্য অথবা মনগড়া বয়ানে আপনি যদি নিজেকে হারিয়ে ফেলেন, তাহলে ট্রমা কাটিয়ে উঠতে আপনার কষ্ট হবে। ঘটনা নিয়ে আপনার নিজস্ব বয়ান তৈরি করুন। এতে অযাচিত সামাজিক চাপ থেকে মুক্তি পাবেন। এতে আপনার জন্য যা সঠিক তাতে মনোনিবেশ করা সহজ হবে।
পরিশেষে বলতে হয়, ট্রমার শিকার মানুষের জীবন থেকে সুখ নামক পাখিটা অচিন বনে হারিয়ে যায়। তাই তাদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আলাপ করা খুব জরুরি। তা না হলে এই মানসিক ক্ষত যুগ যুগ ধরে বাড়তে থাকবে।