ভুল থেকে যদি ভালো কিছু হয়, তবে ভুলই ভালো!

১৮৮৮ সালের একটি সত্য ঘটনা দিয়ে শুরু করা যাক। লি কুম শিউং নামের এক তরুণ রাঁধুনী থাকতেন চীনের দক্ষিণাঞ্চলে। উপকূলীয় অঞ্চলে ছিল তাঁর বাস। একদিন চুলায় অয়েস্টার স্যুপ বসিয়ে বেমালুম ভুলে গিয়েছিলেন লি। এতটাই যে অয়েস্টার স্যুপ জ্বাল হতে হতে এক সময়ে উথলে পড়তে থাকে। একেবারে ঘন হয়ে যায় সেই স্যুপ। লি’র তো তখন মাথায় হাত দেওয়ার মতো অবস্থা। কিন্তু কৌতূহলের বশে একটু চেখে দেখতে গিয়েই লি দেখলেন, এই ঘন বস্তুটির স্বাদ তো দারুণ! আর তখনই জারে ভরে এই অয়েস্টার সস বিক্রি করার ভাবনা তাঁর মাথায় চেপে বসে। 

একটি ভুল থেকে তৈরি হওয়া অয়েস্টার সস বিক্রি করে এরপর রাতারাতি ধনী বনে যান লি কুম শিউং ও তাঁর পরিবার। ফোর্বসের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, লি ও তাঁর পরিবারের এখনও ১৭ বিলিয়ন ডলারের বেশি মূল্যমানের সম্পদ আছে। বর্তমানে হংকং–এর চতুর্থ সর্বোচ্চ ধনী এই পরিবার।

বুঝে দেখুন তবে, ভুলের কত গুণ! ভুল আসলে মানুষের জীবনেরই অংশ। ব্যক্তিগত জীবন থেকে করপোরেট জীবন বা ব্যবসা—সবখানেই আমরা ভুল করি হরহামেশা। ভুল মানেই ব্যর্থতা। কিন্তু ভুল হলে বা কোনো কাজে ব্যর্থ হলে একটি বিষয় বেমালুম ভুলে যাই সবাই। সেটি হলো—সবচেয়ে অপমানজনক ভুল বা ব্যর্থতাও যেকোনো সময় উপকারী প্রমাণিত হতে পারে!

আমরা ভুলে যাই সবচেয়ে অপমানজনক ভুল বা ব্যর্থতাও যেকোনো সময় উপকারী প্রমাণিত হতে পারে! ছবি: ফ্রিপিক

অনেক সময় প্রয়োজনীয় অভিজ্ঞতার অভাবের কারণেও কিছু ভুল হয়, কিছু ব্যর্থতা আসে। এক্ষেত্রে আরেকজন বিখ্যাত ব্যক্তির উদাহরণ আসে। বিখ্যাত সংবাদমাধ্যম দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের কিংবদন্তি প্রকাশক ছিলেন ক্যাথেরিন গ্রাহাম। শহরকেন্দ্রিক একটি ছোট্ট পত্রিকাকে পুরো বিশ্বে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন তিনি। মূলত স্বামীর আত্মহত্যার পর হুট করেই দ্য ওয়াশিংটন পোস্টের প্রকাশকের দায়িত্ব নিতে হয় ক্যাথেরিনকে। পরবর্তীতে নিজের আত্মজীবনী গ্রন্থে তিনি লিখেছিলেন যে, আচমকা প্রকাশক হয়ে যাওয়ার পর কর্মক্ষেত্রে অসংখ্য ভুল করেছিলেন। সেগুলোর মধ্যে কিছু ভুল ছিল মারাত্মক। এগুলোর জন্য প্রচণ্ড আত্মদহনেও ভুগেছিলেন ক্যাথেরিন। কিন্তু এক পর্যায়ে এসব ভুল ও সেসবের কারণে সৃষ্ট আত্মদহন থেকে বাঁচার জন্য এক ধরনের মানসিক সুরক্ষা তৈরির চেষ্টা শুরু করেন তিনি। কারণ তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, ভুল নিয়ে পড়ে থাকলে কোনো লাভ নেই।

এক্ষেত্রে করপোরেট দুনিয়ায় ভুরি ভুরি উদাহারণ মেলে। চলুন, আমাজনের লেজে–গোবরে হওয়ার ঘটনা জানা যাক। ২০১৪ সালে আমাজন বাজারে নিয়ে এসেছিল ফায়ার স্মার্টফোন। এই পণ্য দিয়ে স্মার্টফোনের বাজার দখল করার স্বপ্ন ছিল আমাজনের। কিন্তু দখল তো দূরের কথা, উল্টো এই ফোন এমনভাবেই ফ্লপ হয় যে, ৮৩ মিলিয়ন ডলারের পণ্য অবিক্রিত রয়ে গিয়েছিল! মূলত দেরি করে বাজারে ঢোকা এবং উচ্চমূল্যের স্মার্টফোনটিতে ফিচার কম থাকার কারণেই গ্রাহকেরা মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল ফায়ার স্মার্টফোন থেকে। বেশ লোকসানে পড়েছিল তখন আমাজন। তার চেয়েও বড় কথা, উদ্ভাবনী প্রযুক্তি পণ্যের বাজারে একেবারে ধসে যায় আমাজনের সুনাম। তারপরও দমে যাননি আমাজনের মালিক জেফ বেজোস। পরে এ বিষয়ে তিনি বলেছিলেন যে, ওই ধরনের ব্যর্থতা না থাকলে প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবনের প্রতি মনযোগই নষ্ট হয়ে যেত। জেফ বেজোস আরও বলেছিলেন, ‘যদি আপনি সেটিকে বড় ধরনের ব্যর্থতা মনে করেন, তবে বলতেই হয় যে, ভবিষ্যতের আরও অনেক বড় বড় ব্যর্থতা নিয়ে আমরা বর্তমানে কাজ করছি।’

ব্যর্থতাকে বিচার করার দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। ছবি: ফ্রিপিক

সুতরাং, ভুল হবেই। কিন্তু ভুল হওয়াটাই জীবনের শেষ কথা নয়। বরং ব্যর্থতা ভুলে ফিরে আসাটাই মূল কথা। এ বিষয়ে হার্ভার্ড বিজনেস স্কুলের অধ্যাপক অ্যামি এডমন্ডসন একটি বই লিখেছেন, নাম ‘রাইট কাইন্ড অব রং’। তাতে অ্যামি বলেছেন, এই দুনিয়ার কর্মক্ষেত্র ও জীবনের যাপন জটিল। সফল হতে হলে ঝুঁকি নিতেই হয়। আর তার কারণে ভুল–ভ্রান্তি বা ব্যর্থতা অতি স্বাভাবিক বিষয়। গুরুত্বপূর্ণ হলো ভুল বা ব্যর্থতা স্বীকার করে নিয়ে সেটিকে ঠিক মতো বিশ্লেষণ করে তা থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং পরবর্তী সময়ে সাবধানতা অবলম্বন করা। তাহলেই ভবিষ্যতের ব্যর্থতা এড়ানো যাবে।

ভুল বা ব্যর্থতাকে যেভাবে সামলাবেন

এতক্ষণ মানুষের ব্যক্তি ও কর্মজীবনে ভুল বা ব্যর্থতার প্রকৃতি ও প্রভাব নিয়ে আলোচনা হলো। আসুন এবার ভুল বা ব্যর্থতাকে সামলানোর উপায়গুলো একটু জেনে নেওয়া যাক:

১. ব্যর্থতা আসলে ক্রিয়ার প্রতিক্রিয়া মাত্র। এটিই চূড়ান্ত কিছু নয়। আপনি যখনই সফল হচ্ছেন না, তার অর্থ হচ্ছে আপনি শিখছেন, শেখার সুযোগ পাচ্ছেন। তাই ব্যর্থতাকে বিচার করার দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে। একে যদি শেখার সুযোগ হিসেবে দেখেন, তাহলেই আপনার ভুলকে সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করতে পারবেন। আর তখনই ভবিষ্যতের ব্যর্থতাকে এড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।

২. নিজের মনযোগকে কাজের ফলাফল থেকে সরিয়ে কর্মপ্রক্রিয়াতে নিবদ্ধ করতে হবে। সফলতা কিন্তু কেবলই সর্বশেষ ইতিবাচক ফল নয়। বরং এই পুরো কর্মভ্রমণটিই হয়ে ওঠে সফলতার প্রতিবিম্ব। অপ্রত্যাশিত নেতিবাচক ফল পেলেও তাই ভেঙে পড়লে চলবে না। শিক্ষাগুলো গ্রহণ করতে হবে। দৃষ্টিভঙ্গির এই পরিবর্তন ব্যর্থ হওয়ার শঙ্কা কমিয়ে আনবে এবং প্রয়োজনে ঝুঁকি নিতে আরও উৎসাহিত করবে।

ব্যর্থতাকে মোকাবিলা করার পদ্ধতি বের করে নিতে হবে। ছবি: ফ্রিপিক

৩. কাজে ভুল হলে বা ব্যর্থ হলেই আমরা সাধারণত নিজেদের মনের কাঠগড়ায় দাঁড় করাই। নিজেদের দোষী সাব্যস্ত করতে ব্যস্ত হয়ে যাই। ব্যর্থতাকে সামলাতে প্রথমেই তাই নিজের প্রতি দয়ালু হতে হবে। আপনি দিনশেষে একজন মানুষই। সুতরাং ভুল আপনার হতেই পারে, ব্যর্থতাও আসবে। কিন্তু পরিকল্পনামাফিক সফল হতে না পারলেই নিজের ওপর নিষ্ঠুর হয়ে ওঠা যাবে না। বরং নিজের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে হবে। পাশাপাশি অন্যের প্রতিও সহমর্মী হতে হবে। অন্য কেউ ভুল করলেও তাকে দোষী বানাতে ঝাঁপিয়ে পড়া যাবে না।

৪. ব্যর্থতা মানে আসলে কি? হ্যাঁ, আপনি যেভাবে কাজটি করতে চেয়েছিলেন, সেভাবে হয়নি। আবার একইসঙ্গে আপনার যেভাবে কাজটি করা উচিত ছিল, আপনি সেভাবে করেননি। এই বিষয়টিও সত্যি। অর্থাৎ, একটি ভুল আপনাকে দেখিয়ে দেয় যে, আপনার কী করা উচিত ছিল। সুতরাং এটি অবশ্যই একটি সুযোগও বটে।

বন্ধুবান্ধব বা পরিজনদের সঙ্গে অভিজ্ঞতা ভাগাভাগির মাধ্যমে নিজেকে হালকা করতে পারেন। ছবি: ফ্রিপিক

৫. ব্যর্থতা বা ভুলকে লজ্জার বিষয় হিসেবে বিচার করার অভ্যাস ত্যাগ করতে হবে। এটি একটি গঠনমূলক আলোচনার বিষয়বস্তুও হতে পারে। ব্যর্থতার গল্পগুলো নিয়ে বিশ্লেষণ করে, আলোচনা করে শিক্ষামূলক বিষয়গুলো আত্মস্থ করে নিতে পারি। এতে করে ব্যর্থতা বা ভুলগুলো আমাদের কোণঠাসা ও বিপর্যস্ত করতে পারবে না। এভাবে ব্যর্থতার গল্পের স্বাভাবিকীকরণের মাধ্যমে আমরা এসবকে জীবনে এগিয়ে যাওয়ার উপকরণে রূপান্তরিত করতে পারি।

৬. ব্যর্থতাকে মোকাবিলা করার পদ্ধতি বের করে নিতে হবে। ব্যক্তিবিশেষে এসব পদ্ধতি ভিন্ন ভিন্ন হতেই পারে। আসল কথা হলো ব্যর্থতার সঙ্গে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেওয়া। গুটিয়ে না গিয়ে বরং লড়াই করা। কারও হয়তো ডায়েরিতে অভিজ্ঞতা লিখে ব্যর্থতার বৃত্ত থেকে বের হয়ে আসার অভ্যাস থাকতে পারে। আবার কেউ হয়তো বন্ধুবান্ধব বা পরিজনদের সঙ্গে অভিজ্ঞতা ভাগাভাগির মাধ্যমে নিজেকে হালকা করতে পারেন। একেকজনের মোকাবিলা করার উপায় একেক হয়। তবে মূল লক্ষ্য হতে হবে একটাই। সেটি হলো, ব্যর্থতা বা ভুল যেন আপনার মানসিক সুস্থতাকে নষ্ট করতে না পারে। এর বদলে ব্যর্থতাকে মেনে নিয়ে একে ঠেকানোর উপায় বের করতে হবে।

ভুল হয়, হবেই। ব্যর্থতাও আসবে। এই দুনিয়ায় ব্যর্থতার স্বাদ না পাওয়া মানুষের উদাহরণ মিলবে না। দিনশেষে সুনির্দিষ্ট কোনো নিয়মকানুন আপনাকে বাঁচাতে পারবে না। মানবপ্রকৃতিই এমন যে, ভুল তার হবেই। বরং ভুল স্বীকার করে নিয়ে ব্যর্থতাকেই সফলতার চাবিকাঠি হিসেবে ব্যবহার করার অভ্যাস গড়ে তোলা যায়। এর জন্য আগে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টাতে হবে। ব্যর্থতাকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করার মানসিকতা তৈরি করতে হবে। এতে যে ভুল আর হবে না বা আপনি আর কখনো ব্যর্থ হবেন না—তা কিন্তু নয়। তবে এর মাধ্যমে ব্যর্থতার কারণে নিজের থমকে যাওয়াকে থামাতে পারবেন আপনি। আর চেষ্টা ও অধ্যবসায়ে কী না হয়! 

তথ্যসূত্র: দ্য ইকোনমিস্ট, অন্ট্রাপ্রেনার ডট কম, হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ, ভেরি ওয়েল মাইন্ড ডট কম, দ্য গার্ডিয়ান ও ফোর্বস