এখনকার শিশুদের কার্টুন অনেকটাই বদলে গেছে। আগের দিনের কার্টুনে গল্প ধীরে ধীরে এগোত। কিন্তু এখন সেই দৃশ্যপট সম্পূর্ণ বদলে গেছে। এখন কার্টুনগুলোতে দেখা যায় উজ্জ্বল রং আর দ্রুত দৃশ্য বদল। সেই সাথে জোরে বাজা গান আর দ্রুত নড়াচড়া তো আছেই। এসব মূলত শিশুদের মনোযোগ ধরে রাখার জন্যই তৈরি করা হয়। কিন্তু প্রশ্ন উঠছে, এ ধরনের দ্রুতগতির ডিজিটাল কনটেন্ট কি ছোটদের মস্তিষ্কের জন্য উত্তেজনা বাড়িয়ে দিচ্ছে না তো?
স্ক্রিন টাইম নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোচনা চলছেই। বিশেষজ্ঞরা এখন আরও একটি বিষয় নিয়ে ভাবছেন। আর সেটি হলো, দ্রুতগতির এই ডিজিটাল কনটেন্ট ছোট শিশুদের উপর ঠিক কী প্রভাব ফেলছে?
কেন আলোচনায় ‘কোকোমেলন’
অনেক অভিভাবকের মতে, কিছু শিশুতোষ অনুষ্ঠান যেন শিশুদের এক ধরনের ঘোরের মধ্যে ফেলে দেয়। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ওয়েবসাইট প্যারেন্টস ডট কমের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জনপ্রিয় শিশুতোষ কার্টুন কোকোমেলন নিয়ে অনেক অভিভাবকই উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের মতে, কার্টুনটির রং, গ্রাফিকস ও দ্রুতগতির দৃশ্য শিশুদের অতিরিক্ত উত্তেজিত করে তুলতে পারে।
ছোটদের কাছে এই অনুষ্ঠানটি খুবই জনপ্রিয়। এতে রয়েছে উজ্জ্বল অ্যানিমেশন, ছড়ার মতো গান এবং দৈনন্দিন জীবনের নানা বিষয়। যেমন গোসল করা, ভাগাভাগি করা বা ভদ্র আচরণ শেখানো। তবে অনেক অভিভাবকের অভিযোগ, এতে থাকা পুনরাবৃত্ত গান, হাসির শব্দ এবং উজ্জ্বল দৃশ্য এতটাই বেশি যে তা শিশুদের মনে দীর্ঘ সময় আটকে থাকে।
এ কারণে অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, এই কার্টুন কি শিশুদের জন্য ক্ষতিকর?
বিশেষজ্ঞদের মতে, বিষয়টি এত সহজে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।
দ্রুত দৃশ্য বদলের ঝুঁকি
অভিভাবক ও গবেষকদের বড় একটি উদ্বেগ হলো এসব অনুষ্ঠানের গতি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেক বিশ্লেষক এই কার্টুনের অ্যানিমেশন স্টাইল নিয়ে আলোচনা করেছেন। একটি বহুল আলোচিত ভিডিও বিশ্লেষণে দেখা গেছে, অনেক সময় এক থেকে তিন সেকেন্ডের মধ্যেই দৃশ্য বদলে যায়।
একই সঙ্গে ক্যামেরা দ্রুত প্যান, জুম ইন বা জুম আউট করে। এই ক্রমাগত নড়াচড়া শিশুদের মনোযোগ ধরে রাখে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, যাদের মস্তিষ্ক এখনও বিকাশের পর্যায়ে, তাদের জন্য এটি অনেক সময় বেশি হয়ে যেতে পারে।
দৃশ্য এত দ্রুত বদলালে শিশুদের পক্ষে স্বাভাবিক গতিতে তথ্য গ্রহণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
গবেষণা কী বলছে
এ বিষয়ে গবেষণার ফল একরকম নয়। কিছু গবেষণায় দেখা গেছে, খুব দ্রুতগতির কনটেন্ট স্বল্প সময়ের জন্য হলেও শিশুদের চিন্তাশক্তির উপর প্রভাব ফেলতে পারে।
২০১১ সালে চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী পিডিয়াট্রিকসে প্রকাশিত একটি গবেষণায় দেখা যায়, মাত্র ৯ মিনিট দ্রুতগতির একটি অনুষ্ঠান দেখার পর ছোট শিশুদের নির্বাহী কার্যক্ষমতা বা এক্সিকিউটিভ ফাংশনে সাময়িক সমস্যা দেখা দেয়।
এক্সিকিউটিভ ফাংশনের মধ্যে রয়েছে আত্মনিয়ন্ত্রণ, পরিকল্পনা করার ক্ষমতা, স্মৃতিশক্তি, কাজ শুরু করার দক্ষতা এবং মানসিক নমনীয়তা। এই দক্ষতাগুলো শেখা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং সমস্যা সমাধানের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
গবেষণাটি সরাসরি কোকোমেলন নিয়ে না হলেও এতে বলা হয়েছে, খুব দ্রুত দৃশ্য পরিবর্তন ও তীব্র ভিজ্যুয়াল উদ্দীপনা শিশুদের মনোযোগ ধরে রাখা কঠিন করে তুলতে পারে।
ধীরগতির গল্প কেন উপকারী
যেসব অভিভাবক দ্রুতগতির কার্টুন নিয়ে চিন্তিত, বিশেষজ্ঞরা তাদের পুরোনো ধাঁচের ধীরগতির গল্প বা অ্যানিমেশন দেখানোর পরামর্শ দেন। আগের দিনের অনেক অ্যানিমেশন চলচ্চিত্র বা শিশুতোষ গল্প ধীর গতিতে এগোয়। এতে শিশুদের দৃশ্য ও গল্প বোঝার জন্য বেশি সময় পাওয়া যায়। যেমন মিনা কাটুন, সিসিমপুর ১-২-৩, বা উইনি দ্য পুহের গল্পভিত্তিক চলচ্চিত্র ওয়াল-ই।
এই ধরনের কার্টুন বা চলচ্চিত্রে সব সময় দ্রুত দৃশ্য বদল হয় না। অনেক সময় শান্ত মুহূর্ত বা কম সংলাপও থাকে। এতে শিশুরা নিজের কল্পনাশক্তি ব্যবহার করে গল্পের ফাঁকগুলো পূরণ করতে শেখে। ফলে তাদের সৃজনশীলতা ও চিন্তাশক্তি বাড়ে।
শিশুদের স্ক্রিন ব্যবহারে কিছু সহজ পরামর্শ
শিশুদের জন্য স্বাস্থ্যকর মিডিয়া অভ্যাস তৈরি করতে অভিভাবকেরা কিছু সহজ নিয়ম অনুসরণ করতে পারেন।
টানা অনেক পর্ব দেখতে দেবেন না
দ্রুতগতির কার্টুন একটানা অনেকগুলো পর্ব দেখলে শিশুদের মস্তিষ্কে অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে। মাঝেমধ্যে বিরতি দিলে মস্তিষ্ক বিশ্রাম পায়।
ধীরে ধীরে কনটেন্ট বদলান
চাইলে দ্রুতগতির কার্টুনের বদলে ধীরগতির শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান বা গল্পভিত্তিক সিনেমা দেখানো শুরু করতে পারেন।
শিশুর সঙ্গে বসে দেখুন
সম্ভব হলে শিশুর সঙ্গে বসে অনুষ্ঠান দেখুন। এতে অভিভাবক বুঝতে পারবেন শিশুরা কী দেখছে এবং গল্পটি বোঝাতেও সাহায্য করতে পারবেন।
স্ক্রিনের পর অফলাইন খেলা
কার্টুন দেখার পর আঁকাআঁকি, পাজল, কল্পনাশক্তির খেলা বা বাইরে খেলাধুলার সুযোগ দিন। এতে শিশুরা স্ক্রিন থেকে সহজে দূরে সরে আসে।
নির্দিষ্ট সময় স্ক্রিনমুক্ত রাখুন
খাবারের সময় বা ঘুমানোর আগে স্ক্রিন বন্ধ রাখার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন। এতে শিশুদের স্বাস্থ্যকর রুটিন তৈরি হয়।
শিশুদের বিনোদনের ধরন দ্রুত বদলে যাচ্ছে। দ্রুতগতির কার্টুন শিশুদের মনোযোগ ধরে রাখতে পারে। তবে অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করেন, শিশুদের জন্য ধীরগতির গল্প, কল্পনাশক্তির ব্যবহার এবং বাস্তব জীবনের খেলাধুলা সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শিশুর সুস্থ মানসিক বিকাশের জন্য স্ক্রিন আর বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্যে ভারসাম্য রাখাটাই সবচেয়ে জরুরি।



