বিশ্বজুড়ে বাড়ছে জ্বালানি তেলের সংকট। আমাদের দেশেও পড়তে শুরু করেছে সেই প্রভাব। তবে তেলের দাম না বাড়লেও পাম্পে গিয়েও ফুয়েল পাচ্ছেন না অনেকে। এমন সংকটে আশা দেখাচ্ছে ই-বাইক। বর্তমান সময়ে বাংলাদেশে ইভি বা ইলেকট্রিক বাইকের জনপ্রিয়তা দ্রুত বেড়ে চলেছে। শহরের ব্যস্ত রাস্তায় শব্দ ও ধোঁয়া ছাড়াই নিঃশব্দে চলতে পারে এই ই-বাইক।
যে কারণে কিনতে পারেন ই-বাইক
খরচ সাশ্রয়
পেট্রল বা ডিজেল চালিত বাইকের তুলনায় ইভি বাইকের দৈনন্দিন খরচ অনেক কম। একটি ইভি বাইক একবার চার্জ দিলে ৬০ থেকে ১০০ কিলোমিটার পর্যন্ত চলতে পারে। আর চার্জ খরচ খুব সামান্য। প্রতিদিন কয়েকটি কিমি যাতায়াতের জন্য মাসিক খরচ পেট্রল বাইকের চেয়ে কয়েকগুণ কম হয়।
দীর্ঘমেয়াদে দেখলে সার্ভিসিং খরচও কম। ইঞ্জিন কম, জ্বালানি ব্যবস্থার অংশ কম। তাই মেকানিকাল সমস্যা কম হয়। ব্যাটারি পরিবর্তন ছাড়া অনেক বছর বাইক ব্যবহার করা সম্ভব।
পরিবেশ বান্ধব
শহরের দূষণ এখন সবচেয়ে বড় সমস্যা। ইভি বাইক নিঃশব্দে চলে, কোন ধোঁয়া ছাড়ে না। যারা পরিবেশ সচেতন, তারা সহজেই ইভি বাইককে স্বাচ্ছন্দ্য ও দায়িত্বশীল বিকল্প হিসেবে দেখতে পারে।
শুধু শহর নয়, দেশের পরিবেশবান্ধব আন্দোলন ও নীতি অনুযায়ী, ইভি ব্যবহারের বিকল্প আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। এটা শহরের হাওয়াকে আরও পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে।
সহজ ব্যবহার
ইভি বাইক চালানো অনেক সহজ। কোনো ক্লাচ বা গিয়ার নেই, সোজা স্টার্ট, সোজা চলা। নতুন চালকদের জন্য এটি একটি বড় সুবিধা। ট্রাফিক জ্যামের মধ্যে, শহরের ভিড়ে, ইভি বাইক ব্যবহার অনেক শান্ত ও নিরাপদ।
শহরের ছোট দূরত্বে যাতায়াতের জন্য ইভি বাইক নিখুঁত। অফিস, স্কুল বা বাজার সব জায়গায় সহজে পৌঁছানো সম্ভব।
আধুনিক ডিজাইন
বাংলাদেশে দেশীয় ও বিদেশি ব্র্যান্ডের ইভি বাইক এখন বাজারে এসেছে। দেশীয় ওয়ালটন, রানার, আকিজ থেকে শুরু করে বিদেশি হিরো, ভেসপা, রিভো সবাই আধুনিক ডিজাইন এবং ফিচার নিয়ে এসেছে। স্টাইল, রঙ ও ফিচারের সঙ্গে মিলিয়ে এখন ইভি বাইক শুধু একটি যান নয়, এক ধরনের লাইফস্টাইল।
ভবিষ্যতের প্রস্তুতি
জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি, শহরের দূষণ ও বৈশ্বিক পরিবর্তনের দিকে তাকালে বোঝা যায়, ইভি গাড়ি ও বাইক ভবিষ্যতের পরিবহন। এখন কেনা মানে আপনি ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। বাংলাদেশে চার্জিং অবকাঠামো বাড়ছে, প্রযুক্তি উন্নত হচ্ছে, তাই ইভি ব্যবহারের সুবিধা আরও বৃদ্ধি পাবে।
কারা কিনবেন ই-বাইক?
- ব্যস্ত শহরে যারা প্রতিদিন অফিস বা স্কুল যাতায়াত করেন, তাদের জন্য ইভি বাইক খুব সুবিধাজনক। ছোট দূরত্বে ইভি বাইক সহজে চলতে পারে, আর চার্জ খরচও কম।
- যারা প্রতিদিনের যাতায়াতের খরচ কমাতে চান, তাদের জন্য ইভি বাইক উপযুক্ত। পেট্রল বাইকের তুলনায় ইভি চার্জ দিতে খরচ অনেক কম। দীর্ঘমেয়াদে ব্যাটারি পরিবর্তন ছাড়া সার্ভিসিং খরচও কম।
- ধোঁয়া ও শব্দহীন পরিবেশের জন্য যারা পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন করতে চান। তাদের কাছে ইভি বাইক এক গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প। শহরের দূষণ কমাতে ইভি বাইক বড় অবদান রাখতে পারে।
- প্রতিদিন ৫০–৭০ কিমি এর বেশি দূরত্ব না যাওয়ায় যাঁরা শুধু শহরে চলাচল করেন, তাদের জন্য ইভি বাইক সবচেয়ে ভালো। বর্তমান ব্যাটারি রেঞ্জে দীর্ঘ দূরত্বে যাত্রা সীমিত।
কারা ই-বাইক ব্যবহার করবেন না
- যারা দৈনিক ১০০ কিমির বেশি পথ চলেন, তাদের জন্য ইভি বাইক উপযুক্ত নয়। সীমিত ব্যাটারি রেঞ্জ এবং চার্জিং স্টেশনের অভাব তাদের যাত্রা ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে।
- যাদের বাসা বা অফিসে চার্জিং করার সুবিধা নেই, তাদের ইভি বাইক ব্যবহার কঠিন। চার্জ স্টেশন কম থাকায় মাঝপথে ব্যাটারি শেষ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
- যারা স্পোর্টি, দ্রুতগামী বাইক পছন্দ করেন, তাদের জন্য ইভি বাইকের গতি অনেক সময় কম হতে পারে। অধিকাংশ শহরের ইভি বাইক ২৫-৫০ কিমি/ঘণ্টা পর্যন্ত চলতে পারে, যা স্পোর্টি বাইকের মতো অভিজ্ঞতা দেয় না।
- যারা দীর্ঘমেয়াদে ব্যাটারি চার্জ নিয়ে উদ্বিগ্ন, তাদের জন্য বর্তমান ইভি বাইক সীমিত। ব্যাটারি ক্ষয় বা পরিবর্তনের খরচ অনেকের জন্য সমস্যা হতে পারে।
কোথায় পাবেন, কেমন দাম?
দেশের বাজারে বর্তমানে ওয়ালটন, আকিজ, রিভো, রাইডু, ইয়াদিয়া, টেলজি ও ইভেকোর মতো ব্র্যান্ডের বিভিন্ন মডেল পাওয়া যাচ্ছে ই-বাইক পাওয়া যায়। দেখে নিন কি সুবিধা আর কেমন দাম।
রাইডু লিফ ব্ল্যাক
সাশ্রয়ী বাজেটের ই-বাইকগুলো মধ্যে এটা অন্যতম। ৫০০ ওয়াটের মোটর ও ৪৮ ভোল্টের গ্রাফিন ব্যাটারির এই ই-বাইক ১৪ ইঞ্চি চাকা। আর এটি ১৫০ কেজি পর্যন্ত ওজন বহন করতে সক্ষম। একবার চার্জে এই ই-বাইকটি প্রায় ৫০ কিমি পথ পাড়ি দিতে পারে। রিমোট কন্ট্রোল ও কি-স্টার্ট সুবিধাও রয়েছে এই বাইকটিতে। দাম ৫০ হাজার টাকার। এছাড়াও বিভিন্ন ক্যাটাগরির ই-বাইক পাবেন ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত।
রিভো এ১১
আরেকটি ছোট দূরত্বের জন্য উপযুক্ত মডেল হলো রিভো এ১১। শহরের ব্যস্ত রাস্তায় দ্রুত চলার জন্য অত্যন্ত কার্যকর। ১ হাজার ওয়াটের মোটর ও ৬০ ভোল্ট, ২৬ অ্যাম্পিয়ার গ্রাফিন ব্যাটারি একবার চার্জে সর্বোচ্চ ৮৫ কিমি পথ পাড়ি দিতে সক্ষম। ১০ ইঞ্চি টিউবলেস টায়ার ও হাইড্রোলিক শক অ্যাবজর্ভার যাত্রাকে মসৃণ ও নিরাপদ করে তোলে। দাম ৮৯ হাজার ৯৯০ টাকা। তাদের ই-বাইকের মডেল ভেদে দাম ৪৯ হাজার ৯৯০ টাকা থেকে ২ লাখ ২৫ হাজার ৯০০ টাকা হয়ে থাকে।
তাকিওন লিও
ওয়ালটনের তাকিওন লিও মডেলটি বাংলাদেশের রাস্তার জন্য একেবারেই উপযোগী। ৮০০ ওয়াট হাব মোটর ও ৪৮ ভোল্ট সিলড লেড অ্যাসিড ব্যাটারিতে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা চার্জে ৮০ কিমি পথ চলতে পারে। ১৮৫ মিলিমিটার গ্রাউন্ড ক্লিয়ারেন্স এবং সর্বোচ্চ ৩৫ কিমি/ঘণ্টা গতিতে চলার ক্ষমতার কারণে এটি শহরের রাস্তায়ও স্বাচ্ছন্দ্য দেয়। দাম ৭৮ হাজার ৭৫০ টাকা। মডেল ভেদে তাদের বাইক রয়েছে ১ লাখ ৭২ হাজার ৯৯০ টাকা পর্যন্ত।
আকিজ পঙ্খিরাজ
দীর্ঘ রেঞ্জের জন্য আকিজ পঙ্খিরাজ মডেলটি হতে পারে উপযুক্ত। ১০০০ ওয়াটের মোটর এবং ব্যাটারির ধরন অনুযায়ী ১৫০ কিমি পর্যন্ত রেঞ্জ সহ এই ই-বাইকটি ডিস্ক ও ড্রাম ব্রেকের সমন্বয়ে তৈরি। দাম ৮৭ হাজার ৫০০ টাকা।
ইভেকো এএস ১
আধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি এই স্কুটার। ১ হাজার ওয়াট ব্রাশলেস মোটর, ৭২ ভোল্ট ২৯ অ্যাম্পিয়ার গ্রাফিন ব্যাটারি এবং ১৮০ কেজি পর্যন্ত ওজন বহন ক্ষমতার মাধ্যমে এটি শহরের যাত্রাকে আরামদায়ক ও নিরাপদ করে। সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ৫২ কিমি, রেঞ্জ ৮৫ কিমি এবং অ্যান্টিথেফট অ্যালার্ম, এলইডি হেডলাইট সুবিধা এটিকে আরও আকর্ষণীয় করেছে। দাম ৯৮ হাজার টাকা।
স্মার্ট স্কুটার হিসেবে সিনট্যাক্স লিমা, ইভেকো এএস–১২, আকিজ দুরন্ত, ইয়াদিয়া রুইবিন, সিনট্যাক্স রায়ো এবং ইয়াদিয়া এম৬ গ্রাহকদের নতুন প্রযুক্তি ও নিরাপত্তার দেয়। এগুলোতে ১ কিলোওয়াট থেকে ৩ হাজার ওয়াটের মোটর, গ্রাফিন বা লেড অ্যাসিড ব্যাটারি, এলইডি মিটার, অ্যান্টিথেফট সিস্টেম এবং টেলিস্কোপিক সাসপেনশনসহ বিভিন্ন আধুনিক ফিচার রয়েছে। রেঞ্জ ৬০ কিমি থেকে ১৮০ কিলোমিটার। আর দাম ৯৯ হাজার ৯৯৯ টাকা থেকে ২ লাখ ২৫ হাজার ৯০০ টাকা পর্যন্ত।
ওয়ালটন, আকিজ, রিভো, রাইডু, ইয়াদিয়া ও ইভেকোর শোরুম ঢাকাসহ সারাদেশে রয়েছে। ঢাকার তেজগাঁও, মিরপুর, রামপুরা ও বংশাল এলাকা শহরের প্রধান হাব। অনলাইন শপ ও ডিলার নেটওয়ার্কের মাধ্যমে গ্রাহকরা সহজে পছন্দের মডেল বেছে নিতে পারেন।