অবৈধ অভিবাসীদের বৈধতা দিচ্ছে স্পেন, যারা পাচ্ছে সুযোগ

অবৈধ অভিবাসীদের বৈধ করার ঘোষণা দিয়েছে ইউরোপের দেশ স্পেন। এতে দেশটিতে অনিয়মিত হয়ে যাওয়া অভিবাসীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। এখন পর্যন্ত দেশটিতে বৈধতা পেতে ১২ লাখেরও বেশি আবেদন জমা পড়েছে।  

বার্তা সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) উদ্ধৃত করে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি বলছে, স্পেনের অভিবাসনমন্ত্রী এলমা সাইজ জানিয়েছেন, সরকার মুখ ফিরিয়ে থাকবে না। স্পেনে বাস করা মানুষদের মর্যাদা দেওয়া এবং তাঁদের উপস্থিতি স্বীকার করে নেওয়াই সরকারের মূল লক্ষ্য।

গত জানুয়ারিতে স্পেন সরকার একটি বিশেষ কর্মসূচির ঘোষণা দেয়। এর মাধ্যমে দেশটিতে বসবাসকারী অভিবাসীদের বৈধতা এবং কাজ করার সুযোগ দেওয়া হয়।

আবেদন করতে পারবেন কারা, যোগ্যতা কী?

এ কর্মসূচির আওতায় আবেদনকারীদের প্রমাণ করতে হবে যে তাঁরা ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে স্পেনে এসেছেন এবং এখানে অন্তত পাঁচ মাস সেখানে বসবাস করছেন। একই সঙ্গে তাদের কোনো অপরাধের রেকর্ড থাকা যাবে না। এ পরিকল্পনার অধীনে এক বছর মেয়াদি নবায়নযোগ্য রেসিডেন্স পারমিট দেওয়া হচ্ছে। ফলে আবেদনকারীরা আনুষ্ঠানিকভাবে কাজের সুযোগ এবং আইনি স্বীকৃতি পাবেন।

স্পেন কেন অভিবাসীদের গুরুত্ব দিচ্ছে?

কয়েক বছর ধরে লাখ লাখ নথিপত্রহীন অভিবাসী স্পেনে বসবাস ও কাজ করছেন। তাঁরা পর্যটন, আতিথেয়তা এবং কৃষির মতো খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন, যা দেশটির অর্থনীতির অন্যতম মূল চালিকাশক্তি। বার্সেলোনা সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের (সিআইডিওবি) তথ্য অনুযায়ী, স্পেনের গৃহস্থালি সেবায় ৭২ শতাংশ, হোটেল-রেস্তোরাঁ খাতে ৪৫ শতাংশ, নির্মাণ খাতে ৩২ শতাংশ এবং কৃষি খাতে ৩১ শতাংশ কর্মসংস্থান পূরণ করছেন অভিবাসী শ্রমিকেরা।

সিআইডিওবি জানায়, একবিংশ শতাব্দীতে স্পেনের অভিবাসনের বড় দুটি প্রবাহ দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সময়কালের সঙ্গে সরাসরি মিলে যায়। বিপরীতে, ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার পর নিট অভিবাসন ঋণাত্মক হয়ে পড়ে এবং অভিবাসীদের নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ে।

বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এপ্রিলে স্পেন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে এই উদ্যোগের অনুমোদন দেয়, যার ফলে আবেদন প্রক্রিয়ার পথ সুগম হয়।

স্পেনের প্রধানমন্ত্রী পেদ্রো সানচেজ এই পদক্ষেপকে ‘ন্যায্যতার প্রতীক’ ও একই সঙ্গে অর্থনৈতিক প্রয়োজন হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা এক চিঠিতে সানচেজ বলেন, এ কর্মসূচির মাধ্যমে মূলত সেই বাস্তবতাকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে যে নথিপত্রহীন লাখ লাখ অভিবাসী ইতোমধ্যে স্পেনের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে গেছেন।

তবে এই নীতির সমালোচনাও হয়েছে। বিরোধী দল পপুলার পার্টি (পিপি) যুক্তি দিয়েছে, এ ধরনের পদক্ষেপ অবৈধ বা অনিয়মিত অভিবাসনকে আরও উৎসাহিত করতে পারে। তারা এই সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করার ঘোষণা দিয়েছে।

কর্মকর্তাদের প্রাথমিক অনুমান ছিল, এই কর্মসূচির মাধ্যমে প্রায় ৫ লাখ অনিয়মিত অভিবাসী উপকৃত হতে পারেন। তবে কিছু সংস্থার মতে, স্পেনে আইনি বৈধতাহীন মানুষের সংখ্যা ৮ লাখ পর্যন্ত হতে পারে। যোগ্য অভিবাসীদের ১৬ এপ্রিল থেকে ৩০ জুনের মধ্যে আবেদন করার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল।

তবে বাস্তবে প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি সাড়া পাওয়া গেছে। ৩০ জুন পর্যন্ত প্রায় ১২ লাখ (আবেদন জমা পড়েছে। এটি সরকারের প্রাথমিক অনুমানের চেয়েও দ্বিগুণ।

আবেদন প্রক্রিয়া শেষে প্রকাশিত তথ্যে দেখা যায়, জমা পড়া আবেদনের ৬৭ শতাংশই ল্যাটিন আমেরিকার নাগরিকদের। সবচেয়ে বেশি আবেদন এসেছে কলম্বিয়া থেকে, যা মোট আবেদনের ২৫.৯ শতাংশ। তালিকায় দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে মরক্কো। এখান থেকে আবেদন এসেছে ১৩.৩ শতাংশ। 

পরিসংখ্যানে আরও দেখা গেছে, আবেদনকারীদের বড় অংশই তরুণ। প্রতি ১০ জনের মধ্যে ৮ জনের বয়সই ৪৫ বছরের নিচে। এর মধ্যে পুরুষ ৫৭ শতাংশ এবং নারী ৪৩ শতাংশ।

শুধু আবেদন করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৈধতা পাওয়া যাবে না। আবেদনকারীদের অবশ্যই প্রমাণ করতে হবে যে তাঁদের কোনো অপরাধের রেকর্ড নেই এবং তাঁরা ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারির আগে অন্তত টানা পাঁচ মাস স্পেনে বসবাস করেছেন। আবেদনকারীদের কাজ ও বসবাসের অনুমতি দেওয়া হবে কি না, তা যাচাই-বাছাই করতে স্পেন কর্তৃপক্ষের হাতে সর্বোচ্চ তিন মাস সময় থাকবে।