ফিরে দেখা

বছরজুড়ে ট্রেন্ড ছিল ‘নো মেকআপ’ লুক

বছরজুড়ে রূপ দুনিয়ায় ছিল নানা সংযোজন-বিয়োজন। ২০২৩‑এ যা ছিল নতুন, ২৪-এ তাই সেকেলে। যদিও কয়েক বছর ধরেই খুব সাধারণ সাজই ট্রেন্ড হয়ে আসছিল। তবে সেটা সবার কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে চলতি বছরে। তাই তো এখন সবাই খুব সাধারণ লুকই বেশি পছন্দ করছে। সিম্পল লুক মানে এই না যে, তারা একেবারেই মেকআপ করছে না। তবে এখনকার ট্রেন্ড বেরিয়ে এসেছে আগের হেভি মেকআপের যুগ থেকে।

এ ধরনের ফ্যাশন ট্রেন্ডের মূলে রয়েছে–

  • সাজের থেকে এখন সবাই স্কিন কেয়ারের দিকে প্রাধান্য দিচ্ছে।
  • চোখের মেকআপে পছন্দ করছে হালকা সাজ।
  • ঠোঁটে বোল্ড লিপস্টিক পরছেন জমকালো অনুষ্ঠানে।
  • বিয়েতেও হালকা মেকআপ করাতে আগ্রহ বেড়েছে।
  • বেশি দামি বিউটি পণ্যের কদর ছিল বছরজুড়েই।
  • সাজের ট্রেন্ড ফলো করছে ইনস্টাগ্রাম বা টিকটকে।

শোভন মেকওভারের কসমেটোলজিস্ট শোভন সাহা ইনডিপেনডেন্ট ডিজিটালকে বলেন, ‘ন্যাচারাল ন্যুড মেকআপই এখন সবার বেশি পছন্দের। খুব সাধারণ বললেও, এই মেকআপ করা বেশ কষ্টসাধ্য। সেই সঙ্গে ব্যয়বহুলও বটে। কারণ, এসব মেকআপের জন্য হাই‑এন্ড বিউটি পণ্য ছাড়া একেবারেই সম্ভব নয়। তাই তো এই বছর বিদেশি বিউটি পণ্যেরও কদর বেড়েছে অনেকগুণে। তবে সিম্পল লুক পেতে চাইলে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় সেলফ কেয়ার। কারণ, ন্যুড মেকআপ করতে চাইলে, মুখে দাগ বা পিম্পল বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ট্রেন্ডি মেকআপ করতে অনেকেই এখন সেলফ কেয়ারের দিকে গুরুত্ব দিচ্ছেন।’

সাজের থেকে এখন সবাই স্কিন কেয়ারের দিকে প্রাধান্য দিচ্ছে। ছবি: ফ্রিপিক

একই ধরনের কথা বলেন ফারজানা’স ডিলাক্স বিউটি স্পার কর্ণধার ও বিউটি এক্সপার্ট ফারজানা আলম। তিনি বলেন, ‘এখন মেকআপে বেশ পরিবর্তন এসেছে। কেউ আর ভারী মেকআপ নিতে চায় না। সবাই ন্যুড ধরনের মেকআপ বেশি পছন্দ করে। চোখের সাজ অনেকটাই ন্যাচারাল রাখতে চেষ্টা করে। তবে ঠোঁটের সাজ অনুষ্ঠানের ওপর নির্ভর করে পরিবর্তন হয়। কোনো কোনো সময় লিপস্টিক অনেকটাই বোল্ড হয়। তবে বছরজুড়ে ট্রেন্ডি ছিল নো-মেকআপ লুক। এই ধরনের লুক পেতে হাই‑এন্ড বিউটি পণ্যর জুড়ি মেলা ভার। তাই বছরজুড়েই বিদেশি বিউটি পণ্যের চাহিদা বেশি ছিল। সাজের থেকেও মানুষ এখন স্কিন কেয়ারের ওপর বেশি জোর দিচ্ছে। স্কিন কেয়ার ও বিভিন্ন ট্রিটমেন্ট নিতেই মানুষ এখন পার্লারমুখী হচ্ছে। এক কথায় মেকআপের থেকেও স্কিন কেয়ার মানুষ বেশি পছন্দ করছে।’

জারা’স বিউটি লাউঞ্জ অ্যান্ড ফিটনেস সেন্টারের কর্ণধার ফারহানা রুমি বলেন, ‘নো মেকআপ এবং ন্যুড মেকআপের ট্রেন্ড ছিল বছরজুড়েই। স্কিন টোন ঠিক রাখতে ন্যাচারাল বেইজের ব্যবহার বেশি ছিল। বিয়ের অনুষ্ঠান বা রাতের পার্টিতে হালকা মেকআপের চাহিদা বেশি দেখা গিয়েছে। তবে ডেইলি রূপচর্চার দিকে মানুষের আগ্রাহ বেড়েছে। এখন শুধু অনুষ্ঠান নয়, সাপ্তাহিক রূপচর্চার জন্য পার্লারে আসছে অনেকে। তাই পার্লারগুলোও এখন রূপান্তর হচ্ছে কেয়ার সেন্টারে। খরচ বেশি হলেও পারসোনাল কেয়ারের ব্যাপারেই অনেকে সচেতন হয়েছে এ বছর, যা আগে কখনও দেখা যায়নি।’

বেড়েছে লেজার ট্রিটমেন্ট সেবা

এ বছর বিউটি কেয়ারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লেজার ট্রিটমেন্ট। ছবি: ফ্রিপিক

বছরজুড়েই বিউটি কেয়ারের চাহিদার শীর্ষে ছিল লেজার ট্রিটমেন্ট। এই সময় এই সেবা ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিল। এবার বিউটি কেয়ারের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে লেজার ট্রিটমেন্ট। তাই পার্লারগুলোও নন সার্জিক্যাল লেজার সেবা নিয়ে এসেছে। এ ছাড়া সাধারণের বদলে এখন ট্রিটমেন্ট ফেশিয়াল বেশি চলছে। যেমন মেশিনের ফেশিয়াল, যার মধ্যে থাকছে–হাইড্রা, বায়োহাইড্রা, ফেসভি শেপ, ফ্যাট বার্ন ও হাইফু। ত্বকের নানা সমস্যা খুব সহজে দূর করতে জনপ্রিয়তা পেয়েছে বায়োহাইড্রা।

চোখের সাজে বেড়েছে শিমারের ব্যবহার

২০২৩ সালে চোখের সাজে অনেক বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছিল। মেকআপ হালকা হলেও চোখের সাজ হতে হবে আকর্ষণীয়। সেই ধ্যান‑ধারণা থেকে বের হয়ে এসেছে ফ্যাশনপ্রেমীরা। পোশাকের সঙ্গে মিলিয়ে চোখের সাজ দেওয়ার প্রবণতা কমেছে এ বছর। শাড়ি বা পোশাকের রং যা‑ই হোক না কেন, চোখের সাজে মানুষ পছন্দ করছে ন্যুড মেকআপ। এই বছর পুরোপুরিই যেন বাদ গিয়েছে গ্লিটার। তার বদলে কিছুটা হালকা আইশ্যাডো শিমারের ব্যবহার বেড়েছে। মোট কথা চোখের সাজেরও পছন্দ করছে একেবারে ন্যাচারাল মেকআপ। 

সবাই এখন ন্যুড ধরনের মেকআপ বেশি পছন্দ করে। ছবি: ফ্রিপিক

রাজিয়া’স মেকওভারের স্বত্ত্বাধিকারী রাজিয়া সুলতানা বলেন, ‘এ বছর ন্যুড মেকআপের কদর অনেক বেশি ছিল। বিয়ের অনুষ্ঠানে কনের সাজেও খুব বেশি মেকআপ লক্ষ্য করা যায়নি। সবাই প্রাধান্য দিয়েছে হালকা মেকআপে। অনুষ্ঠান বুঝে ঠোঁট বা চোখের মেকআপে ভিন্নতা এনেছে। কেউ যদি বোল্ড লিপস্টিক নেয়, তবে চোখের সাজ ছিল হালকা। আবার চোখে ভারী সাজ দিলে, বাকি সাজ হালকা রেখেছি। নারীরা এখন সাজের থেকে বিউটি কেয়ারের দিকে বেশি মনযোগী। ডেইলি রূপচর্চার ব্যপারে এখন নারীরা অনেক সচেতন। গত বছরও খুব একটা লক্ষ্য করা যায়নি।’

চুলের সাজেও খুব সাধারণ

চুল বাঁধার ক্ষেত্রেও খুব সাধারণ ধারারই প্রাধান্য ছিল বেশি। স্ট্রেইট হেয়ার বা টেনে খোঁপা করতে দেখা গেছে এ বছর। ফুল দিয়ে সাজার ট্রেন্ড অনেক আগে থেকে থাকলেও, এ বছর এ ক্ষেত্রে দেখা গেছে বিদেশি ফুলের ব্যবহার। সাজের ক্ষেত্রে টিকটক বা ইনস্টাগ্রাম ট্রেন্ড বেশি ফলো করেছে মানুষ। ফলে সাজ বা ফ্যাশনের বিদেশি ট্রেন্ড আমাদের দেশে অনেক বেশি ঢুকছে। আর দেশের ট্রেন্ড সেটাররাও সেদিকেই গা ভাসিয়েছে। তাই তো সাজে এসেছে পশ্চিমা ছোঁয়া।

হেয়ারকাটে টিকটক বা ইনস্টাগ্রাম ট্রেন্ড বেশি অনুসরণ করেছে মানুষ। ছবি: ফ্রিপিক

রিবন্ডিংয়ের বদলে কেরাটিন বা বোটক্স

২০২৩ সালেও চুল রিবন্ডিং করানোর প্রতি সবার অনেক বেশি ঝোঁক ছিল। তবে চলতি বছর সেই বিষয়টি থেকে একেবারেই দূরে সরে এসেছে অনেকে। এখন মানুষ অনেক বেশি সচেতন হয়েছে বিউটি কেয়ারের ব্যপারে। কারণ, রিবন্ডিং করা চুলে আসল সৌন্দর্য হারিয়ে যায়। আগের লুক ফিরে পেতে অনেক বেশি সময় লেগে যায়। তাই এটাকে ২০২৪ সালে এসে একদমই পছন্দ করছে না সৌন্দর্যপ্রেমীরা। এর বদলে ব্যবহার বেড়েছে কেরাটিন বা বোটক্স। এগুলো ড্যামেজ চুলকে রিপেয়ার বা সিল করে দেয়। এই পণ্যগুলো খুব বেশি দিন স্থায়ী নয় এবং দামি, তবুও পছন্দের শীর্ষে রয়েছে কেরাটিন বা বোটক্স।

বিউটিতে এ বছরের নতুন সংযোজন

উন্নত বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলছে আমাদের দেশও। পিছিয়ে নেই ফ্যাশন ও বিউটিতে। রূপচর্চা বা বিউটি কেয়ারে আমাদের দেশেও আসছে উন্নত সব সেবা। তারই ধারাবাহিকতায়, এই বছর বিউটি পার্লারগুলোতে নতুন কিছু সার্ভিস যুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম লেজার ট্রিটমেন্ট। কয়েক বছর ধরে কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান এ সেবা দিলেও চলতি বছর বিউটি সেক্টরে বেশ সাড়া ফেলেছে এই সার্ভিস। এ ছাড়া বেশ কিছু সেবার চাহিদা বেড়েছে, যার মধ্যে থাকছে নেইল এক্সটেনশন, আইল্যাশ এক্সটেনশন, আইব্রো লেমিনেশন, মাইক্রোব্লেডিং, মাইক্রো সেডিং ও লিপ ব্লাশিং।