আকাশজুড়ে মেঘের ঘন আস্তরণ। সূর্য দেখা যাচ্ছে না। অনেকেই তখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন। ভাবেন, আজ আর সানস্ক্রিনের দরকার নেই। ত্বক বুঝি নিরাপদেই আছে। কিন্তু ত্বকবিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধারণা পুরোপুরি ভুল। মেঘলা আকাশও সূর্যের ক্ষতিকর রশ্মি থেকে আমাদের পুরোপুরি সুরক্ষা দেয় না। বরং অনেক সময় আমরা না জেনেই ত্বকের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির ঝুঁকি বাড়িয়ে ফেলি।
ত্বকবিশেষজ্ঞরা বলছেন, সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মি (ইউভি রে) মেঘ ভেদ করেও পৃথিবীতে পৌঁছায়। বিশেষ করে ইউভিএ রশ্মি। যা ত্বকের গভীরে প্রবেশ করে। মেঘলা দিনেও প্রায় ৮০ শতাংশ পর্যন্ত সক্রিয় থাকতে পারে। ফলে বাইরে রোদ না থাকলেও ত্বক ধীরে ধীরে ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে।
ঢাকার একটি বেসরকারি হাসপাতালের চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ফারজানা আব্দুল্লাহ প্রিয়াঙ্কা বলেন, ‘অনেকেই মনে করেন রোদ না থাকলে সানস্ক্রিন দরকার নেই। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মেঘলা দিনে ত্বক পুড়ে যাওয়ার ঝুঁকি কমলেও ইউভি রশ্মির ক্ষতি থেমে থাকে না। দীর্ঘমেয়াদে এটি ত্বকের বয়স বাড়ানো, দাগ, বলিরেখা এমনকি ত্বকের ক্যানসারের ঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।’
মেঘের আড়ালে লুকানো রশ্মি
আমরা যখন আকাশে মেঘ দেখি, তখন মনে হয় সূর্যের আলো পুরোপুরি আটকে গেছে। কিন্তু বিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা। মেঘ কেবল দৃশ্যমান আলো কিছুটা কমিয়ে দেয়। কিন্তু অতিবেগুনি রশ্মি পুরোপুরি আটকে রাখতে পারে না। বিশেষ করে হালকা বা পাতলা মেঘ থাকলে ইউভি রশ্মির বড় অংশই মাটিতে পৌঁছে যায়।
এ কারণেই পাহাড়ি এলাকা বা সমুদ্রের ধারে মেঘলা আবহাওয়াতেও মানুষ সহজেই রোদে পুড়ে যায়। কারণ সেখানে ইউভি বিকিরণ তুলনামূলকভাবে বেশি শক্তিশালী হয়।
সানস্ক্রিন শুধু রোদের জন্য নয়
সানস্ক্রিনকে অনেকেই শুধুমাত্র সমুদ্র সৈকত, গরমের তীব্র রোদ বা বাইরে ঘোরার সময়ের জিনিস হিসেবে ভাবেন। কিন্তু ত্বকবিশেষজ্ঞরা বলছেন, সানস্ক্রিন আসলে প্রতিদিনের স্কিনকেয়ার রুটিনের অংশ হওয়া উচিত।
চর্মরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘরের ভেতরেও কিছু পরিমাণ ইউভি রশ্মি প্রবেশ করতে পারে জানালার কাচ ভেদ করে। তাই যারা দীর্ঘসময় জানালার পাশে কাজ করেন, তাদের জন্যও সানস্ক্রিন জরুরি।
কী ধরনের ক্ষতি হয়?
মেঘলা দিনেও সানস্ক্রিন না ব্যবহার করলে ধীরে ধীরে ত্বকে কিছু পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। যেমন, ত্বক দ্রুত বুড়িয়ে যাওয়া, কালচে দাগ বা পিগমেন্টেশন, ত্বকের উজ্জ্বলতা কমে যাওয়া ও সূক্ষ্ম বলিরেখা তৈরি হওয়া। এছাড়াও দীর্ঘমেয়াদে ত্বকের ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষজ্ঞরা বলেন, এই ক্ষতিগুলো একদিনে হয় না। বরং বছরের পর বছর ধরে অল্প অল্প করে জমে ওঠে।
সানস্ক্রিন কীভাবে কাজ করে
সানস্ক্রিন মূলত ত্বকের ওপর একটি সুরক্ষামূলক স্তর তৈরি করে। এটি ইউভি রশ্মিকে প্রতিফলিত বা শোষণ করে ত্বকে ঢুকতে বাধা দেয়। বাজারে সাধারণত দুই ধরনের সানস্ক্রিন পাওয়া যায়। একটি ফিজিক্যাল, অন্যটি কেমিক্যাল।
ফিজিক্যাল সানস্ক্রিন ত্বকের ওপর একটি পাতলা স্তর তৈরি করে আলো প্রতিফলিত করে। অন্যদিকে কেমিক্যাল সানস্ক্রিন রশ্মিকে শোষণ করে ক্ষতিকর প্রভাব কমায়।
কতটা এসপিএফ দরকার?
অনেকেই প্রশ্ন করেন, মেঘলা দিনে কি বেশি এসপিএফ লাগবে? বিশেষজ্ঞরা সাধারণত দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য এসপিএফ ৩০ বা তার বেশি সানস্ক্রিন ব্যবহারের পরামর্শ দেন। বাইরে বেশি সময় থাকলে প্রতি ২-৩ ঘণ্টা পর পুনরায় লাগানো ভালো।
শুধু সানস্ক্রিনই যথেষ্ট নয়
ত্বক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সানস্ক্রিন গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি একমাত্র সুরক্ষা নয়। এর সঙ্গে কিছু অভ্যাস মেনে চললে ত্বক আরও ভালো থাকে। যেমন বাইরে গেলে ছাতা বা টুপি ব্যবহার করা। সরাসরি রোদে দীর্ঘসময় না থাকা। পর্যাপ্ত পানি পান করা। নিয়মিত ত্বক পরিষ্কার রাখা। ভালো মানের ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা।
শহুরে জীবনে ভুল ধারণা
শহরের মানুষদের মধ্যে একটি ভুল ধারণা আছে, ‘রোদ না থাকলে ক্ষতি নেই।’ কিন্তু বাস্তবে শহরের দূষণ, ধুলাবালি এবং ইউভি রশ্মি মিলিয়ে ত্বকের ওপর চাপ অনেক বেড়ে যায়। ফলে মেঘলা দিনেও ত্বকের যত্ন অবহেলা করা ঠিক নয়।
আকাশে মেঘ থাকলেও সূর্যের রশ্মি পুরোপুরি থেমে যায় না। তাই ত্বকের সুরক্ষায় অবহেলা করাও ঠিক নয়। সানস্ক্রিনকে শুধু গরমের দিনের প্রসাধনী হিসেবে না দেখে, প্রতিদিনের অভ্যাসে পরিণত করাই সবচেয়ে নিরাপদ উপায়।
কারণ ত্বকের ক্ষতি একদিনে দেখা যায় না। এটি ধীরে ধীরে জমা হয়, আর একসময় প্রকাশ পায়। মেঘলা দিন হোক বা রৌদ্রোজ্জ্বল সকাল, ত্বকের সুরক্ষা দরকার প্রতিদিনই।



