চুল পড়ার কারণ কি শুধুই শ্যাম্পু-কন্ডিশনার, নাকি অন্যকিছু?

চুল পড়া। এই দুটি শব্দ অনেককেই দুশ্চিন্তায় ফেলে দেয়। আয়নায় হঠাৎ নিজেকে দেখে বুঝতে পারেন, চুলের ঘনত্ব আগের মতো নেই। এ অনুভূতি মানসিক চাপও বাড়িয়ে দেয়। বেশিরভাগ মানুষই প্রথমেই দোষ চাপান বাহ্যিক কারণগুলোর ওপর। পানি বদলে গেছে, তাই চুল পড়ছে। ভুল শ্যাম্পু-কন্ডিশনার ব্যবহার করছেন, তাই চুল উঠে যাচ্ছে। কেউ ভাবেন, সামান্য খুশকি বা চুলে ট্রিটমেন্ট করানোর জন্যই টাক পড়ার মতো অবস্থা হয়েছে।

কিন্তু ত্বক ও চুলের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চুল পড়ার আসল কারণ এগুলো কোনোটি নয়। শরীরের ভেতরের পুষ্টিহীনতা, হরমোনের অসামঞ্জস্য ও মানসিক চাপই মূলত বড় ভূমিকা রাখে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শরীরের ভেতরের কোনও অস্বাভাবিক অবস্থা যেমন থাইরয়েডের সমস্যা, দীর্ঘদিনের স্ট্রেস, গর্ভাবস্থা-পরবর্তী পরিবর্তন কিংবা কোনও গাইনোকোলজিক্যাল অসুবিধা, চুল পড়ার একটি বড় কারণ। তবে পুষ্টির ঘাটতি যে কতটা প্রভাব ফেলে, তা অনেকেই জানেন না।

ঘন, স্বাস্থ্যোজ্জ্বল চুল পেতে হলে নিয়মিত যত্নের পাশাপাশি প্রয়োজন সঠিক খাদ্যাভ্যাস। শরীর পর্যাপ্ত ভিটামিন এ, বি কমপ্লেক্স, সি, ডি, ই এবং আয়রন, সেলেনিয়াম, জিঙ্ক না পেলে চুলের ফলিকল দুর্বল হয়ে পড়ে। এর মধ্যে তিনটি ভিটামিন ও মিনারেলের ঘাটতি হলে চুল পড়া বেড়ে যায় হুহু করে।

জেনে নিন সেই গুরুত্বপূর্ণ তিনটি পুষ্টি উপাদান সম্পর্কে।

ভিটামিন ডি

হাড়ের স্বাস্থ্য ভালো রাখা কিংবা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা জোরদার করার ক্ষেত্রে ভিটামিন ডি গুরুত্বপূর্ণ। এ কথা আমরা সবাই জানি। কিন্তু এই ভিটামিন যে চুলের বৃদ্ধিতেও সমান ভূমিকা রাখে, তা অনেকেরই অজানা। ভিটামিন ডি চুলের ফলিকলে নতুন কোষ তৈরি করতে সাহায্য করে। এর ঘাটতি হলে চুল দুর্বল হয়ে যায় এবং স্বাভাবিক হারে বাড়তে পারে না। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সূর্যালোক গ্রহণ, ভিটামিন ডি-সমৃদ্ধ খাবার যুক্ত করা কিংবা সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার মাধ্যমে এ ঘাটতি পূরণ করা যায়।

আয়রন

বিশেষ করে মহিলাদের মধ্যে চুল পড়ার অন্যতম প্রধান কারণ হলো আয়রনের ঘাটতি। অনেক নারী রক্তাল্পতার সমস্যায় ভোগেন, যার অন্যতম লক্ষণ চুল পড়া। শরীরে পর্যাপ্ত আয়রন না থাকলে রক্তের মাধ্যমে অক্সিজেন ঠিকমতো চুলের ফলিকলে পৌঁছায় না। ফলে চুলের বৃদ্ধি থেমে যায় এবং ধীরে ধীরে চুল ঝরে পড়ে। আয়রনসমৃদ্ধ খাবার যেমন পালং শাক, কলিজা, ডাল, বিট, কুমড়ার বীজ। প্রতিদিনের খাদ্যতালিকায় রাখলে উপকার পাওয়া যায়। প্রয়োজন হলে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী আয়রন সাপ্লিমেন্টও গ্রহণ করা যেতে পারে।

ভিটামিন সি

ত্বকের উজ্জ্বলতা থেকে রোগ প্রতিরোধ-ভিটামিন সি’র কাজ বহু। কিন্তু এই ভিটামিন যে আয়রন শোষণে সরাসরি ভূমিকা রাখে, তা অনেকেই জানেন না। অর্থাৎ শরীরে আয়রন কম না থাকলেও, ভিটামিন সি কম হলে শরীর আয়রন ঠিকভাবে গ্রহণ করতে পারে না। ফলে চুল পড়ার সমস্যা থেকে যায়। লেবুজাতীয় ফল, পেয়ারা, কমলা, কিউই, টমেটো, যেকোনো একটি প্রতিদিনের খাবারে রাখলেই ভিটামিন সি’র ঘাটতি অনেকটাই পূরণ হয়। প্রয়োজনে সাপ্লিমেন্টও নেওয়া যায় চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী।

চুল পড়া থামাতে শুধু বাহ্যিক যত্ন যথেষ্ট নয়। শ্যাম্পু, তেল বা কন্ডিশনার বদলালেই যে সমস্যার সমাধান হবে, এ ধারণা ভুল। শরীরের ভেতরে প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও মিনারেলের অভাব থাকলে চুল পড়া থামানো সম্ভব নয়। তাই চুলের সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনতে হলে প্রথমেই নজর দিতে হবে খাদ্যাভ্যাসে, প্রয়োজন হলে নিতে হবে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ। চুলের মতোই নিজের যত্নও হবে তখন ভরসার জায়গা।