নারীদের দখলে স্নিকার দুনিয়া

বলুন তো, আপনার প্রিয় স্নিকার কে ডিজাইন করেছেন?

আজকাল শুধু দামি বা ঝকঝকে হলেই স্নিকার আকর্ষণীয় হয় না। এখনকার স্নিকারের মধ্যে থাকতে হয় গল্প, শিকড় আর নিজস্বতা। একঝাঁক নারী ডিজাইনার সেই কাজটাই করছেন। নিজের সংস্কৃতি, অভিজ্ঞতা আর কল্পনাশক্তিকে একত্র করে তারা নতুন করে লিখছেন ফ্যাশনের ব্যাকরণ।

কাহলানা বারফিল্ড ব্রাউনের নাইকি স্নিকার

আজকাল শুধু দেখতে ভালো হলে স্নিকার চলে না। জুতার সঙ্গে থাকতে হয় গল্প। এইরকমই এক সুন্দর গল্পের জুতা বানিয়েছেন কাহলানা বারফিল্ড ব্রাউন। তিনি নাইকির সঙ্গে মিলে বানিয়েছেন ‘ইয়ার্ডরানার’ এয়ার ফোর্স ওয়ান। এই জুতা বানানোর ভাবনা এসেছে তাঁর পড়াশোনা আর পারিবারিক স্মৃতি থেকে।

তিনি পড়েছেন হাওয়ার্ড ইউনিভার্সিটিতে। তার দাদী ছিলেন কৃষ্ণাঙ্গ কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় সমর্থক। এই সব অভিজ্ঞতা দিয়ে তিনি জুতার ডিজাইন করেন। জুতার প্রতিটি অংশে লুকানো আছে সেই ইতিহাসের ছোঁয়া। চামড়া খুব ভালো মানের। ভিতরের অংশ ইটের ডিজাইনের মতো। লাল রঙ এসেছে তাঁর সোররিটি থেকে।

নাইকির ইয়ার্ডরানার এই স্নিকারের বেশ চাহিদা রয়েছে। ছবি: নাইকি

আর হাওয়ার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘দ্য ইয়ার্ড’ অংশের স্থানের স্থানাঙ্ক (কোঅর্ডিনেট) লেখা আছে সামনের অংশে। এই জুতা এত জনপ্রিয় হয়েছে যে, নাইকির ওয়েবসাইটে একদম শেষ। কাহলানা বলেন, ‘আমি এমন একটা জুতা বানাতে চেয়েছি যা কেউ শুধু দেখে না, বরং পড়ে নিজেকে খুঁজে পায়।’

এই ডিজাইনে তাকে সাহায্য করেছে অনেক নতুন প্রতিভাবান মানুষ—মেকআপ আর্টিস্ট, স্টাইলিস্ট, ফটোগ্রাফার, যাঁরা সবাই নতুন মুখ।তিনি বলেন, ‘যখন সুযোগ থাকে, আমাদের উচিত নিজের মতো মানুষদের সুযোগ করে দেওয়া।’ এই জুতা শুধু ফ্যাশনের জন্য না, এটা নিজের পরিচয় ও গর্বের প্রতীক।

সেসিলি বানসেনের আসিকস

সিসিলি বানসেন ডেনমার্কের একজন ডিজাইনার। তিনি মেয়েদের জন্য সুন্দর, আরামদায়ক পোশাক তৈরি করেন। অ্যাসিকস নামে জাপানের একটি জুতার কোম্পানি তাঁকে বলল, ‘তুমি কি মেয়েদের জন্য নতুন জুতা বানাবে?’ সিসিলি বললেন,‘হ্যাঁ! মেয়েরা তো সারা দিন ব্যস্ত থাকে। তাদের দরকার এমন জুতা, যা আরামদায়ক আর দেখতে ভালো।’

শুধু দৌড়ানোর জন্য নয়, কর্মজীবি নারীরাও পরতে পারেন এই স্নিকার। ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে

তারপর তিনি বানালেন নরম আর হালকা জুতা। কিছু জুতা ছিল পাতলা নেট দিয়ে তৈরি। আর কিছু জুতায় ফুলের ডিজাইন ছিল। এসব জুতা ছিল বৃষ্টির জন্য, পানি ঢুকবে না।

এই জুতা তিনি নিজের ছেলেকে নিয়ে বাইরে যাওয়ার সময়ও পরেন। তিনি বলেন, ‘আমি এমন জুতা বানিয়েছি, যা রোজ পরা যায়।’ এই কাজ তাকে অনেক আনন্দ দিয়েছে। তিনি চান মেয়েদের জন্য আরও ভালো জুতা বানাতে।

এই জুতা শুধু স্টাইল নয়। এটা আরাম, প্রয়োজন আর মেয়েদের জীবনের গল্প।

ড্যানিয়েল গুইজিওয়ের পুমা স্পিডক্যাট

মাত্র চারশো ডলার ছিল হাতে। এ দিয়েই নিজের নামে ফ্যাশনের ব্যবসা শুরু করেছিলেন ড্যানিয়েল গুইজিও। আজ তার ডিজাইন করা জামা-জুতা পরে হাঁটেন বিশ্বখ্যাত তারকারা।

২০১৪ সালে শুরু হয় গুইজিওর পথচলা। প্রথমে তৈরি করতেন সাধারণ পোশাক, পরে ধীরে ধীরে নিজের কাজের পরিধি বাড়ান। এখন তার ডিজাইন করা জুতা, ব্যাগ, ফোনের কাভার থেকে শুরু করে নানা কিছুই তরুণদের পছন্দের তালিকায়।

তার তৈরি পোশাক এমনভাবে বানানো, যা একদিকে নিত্যদিনের চলাফেরার জন্য আরামদায়ক। আবার অন্যদিকে দেখতে দারুণ। বন্ধুরা প্রশ্ন করবেই, ‘এটা কোথা থেকে কিনেছ?’

গুইজিওর প্রথম বড় কাজ ছিল একটি পুরোনো ধাঁচের জুতাকে নতুনভাবে সাজানো। পরে নানা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মিলিয়ে বানিয়েছেন আধুনিক ধাঁচের জুতা ও আনুষঙ্গিক পণ্য। ২০২৪ সালে একটি বড় জুতার প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তৈরি করেছেন নতুন এক জুতা। যা পুরোনো স্মৃতিকে নতুনরূপে ফিরিয়ে এনেছে।

ড্যানিয়েল গুইজিওয়র ডিজাইনে তৈরি হয়েছে পুমা স্পিডক্যাট। ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে

জুতার বাক্স থেকে শুরু করে দোকানের সাজসজ্জা, সবকিছুতেই গুইজিও নিজের জীবনের গল্প জুড়ে দেন। একবার তো জুতার প্যাকেটের ডিজাইন করেছেন তাঁর ছোটবেলার ঘরের অনুপ্রেরণায়।

গুইজিও বলেন, ‘জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত, প্রতিটি মানুষ, ভালোবাসা, ব্যর্থতা। সবকিছুই একে অন্যের সঙ্গে জুড়ে দিয়ে আমাদের নিয়ে যায় সামনে।’

তার কাজ প্রমাণ করে, যদি নিজের স্বপ্নে বিশ্বাস থাকে, সাহস থাকে এগিয়ে চলার। তবে ছোট শুরু থেকেও বড় কিছু তৈরি করা সম্ভব।

ওয়েলস বনারের সাম্বা, মেয়েদের পছন্দের স্নিকার

মেয়েদের ফ্যাশনের জগতে এখন যেই জুতাটি সবচেয়ে আলোচনায়, সেটি হলো ওয়েলস বনারের অ্যাডিডাস সাম্বা।

গ্রেস ওয়েলস বনার একজন নামকরা ডিজাইনার। তিনি অনেক পুরস্কার পেয়েছেন। কিন্তু সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছেন অ্যাডিডাসের এই পুরনো জুতা নতুন করে সাজিয়ে। তার ডিজাইনে থাকে পশুর ছাপ, নরম স্যুয়েড আর রঙের দারুণ ব্যবহার। যা একের পর এক সিজনে নতুন ট্রেন্ড তৈরি করছে।

২০২০ সালে যখন প্রথম ওয়েলস বনার আর অ্যাডিডাস একসঙ্গে কাজ শুরু করল। তখনই বোঝা গিয়েছিল, এটা কিছু বিশেষ হতে চলেছে। ওয়েলস বনার শুধু পোশাক নয়, সংস্কৃতিও তুলে ধরেন তার ডিজাইনের মাধ্যমে। তিনি ইউরোপ আর আফ্রিকার ধারা একসঙ্গে মিশিয়ে নতুন এক ধরনের ফ্যাশন দেখান।

সাম্বাগুলো যেন ফ্যাশনের মাঠে একক আধিপত্য। ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে

ওয়েলস বনার অতীত থেকে অনুপ্রেরণা নেন। যেমন, তার ডিজাইন করা কুমিরের ছাপ লাগানো সাম্বা জুতা নিউ ইয়র্কের হিপ-হপ সংস্কৃতি থেকে অনুপ্রাণিত।

তার প্রতিটি নতুন জুতা আগের চেয়েও আকর্ষণীয়। তিনি পুরুষদের জন্য জুতা ডিজাইন করলেও মেয়েদের মনও জয় করে নিয়েছেন। আজকাল অনেক ডিজাইনার পুরনো স্টাইল নতুন করে দেখান। কিন্তু ওয়েলস বনার সেটা করেন নিজের মতো করে। রঙ, আকৃতি আর কাপড়ে আনেন নতুনত্ব।

পাঁচ বছর পার হয়ে গেছে তাঁর প্রথম সাম্বা আসার। এখন এমন অবস্থা সবাই নিজের পছন্দমতো একটা না একটা ওয়েলস বনার সাম্বা খুঁজে পাচ্ছেন। কেউ পছন্দ করেন সাদামাটা ‘ক্রিম’ রঙের, কেউ আবার ঝকঝকে রূপালী রঙের।

স্যান্ডি লিয়াং ও সালোমন

স্যান্ডি লিয়াং বড় হয়েছেন নিউ ইয়র্কের লোয়ার ইস্ট সাইডে। তার পরিবার ছিল চায়নাটাউনে রেস্টুরেন্ট ব্যবসায়ী। ছোটবেলার সেই স্মৃতি আর অভিজ্ঞতা তিনি কাজে লাগান ডিজাইনে।

তার ডিজাইনে থাকে মেয়েদের সাজ, ঠান্ডা রঙ এবং সহজ ব্যবহার সুবিধা। এসব কারণেই এখন অনেক তরুণদের কাছে পছন্দ তিনি।
সালোমন এক ফরাসি জুতা কোম্পানি। তারা স্যান্ডির কাজ দেখে খুব মুগ্ধ হয়। তারা বলে, ‘স্যান্ডি যেভাবে নিজের সংস্কৃতিকে সম্মান করেন, আমরাও তেমনই করি।’ ২০২৩ সালে স্যান্ডি ও সালোমন একসঙ্গে কাজ শুরু করেন। এরপরেই আসে ভাইরাল ডিজাইন ‘স্পিডক্রস ৩ রিবন’।

এই জুতা একাধিকবার স্টকে এসেও মুহূর্তে বিক্রি হয়ে গেছে। ছবি: ইনস্টাগ্রাম থেকে

এই জুতাটির রং কালো, আর ফিতাটি গোলাপি সাটিন কাপড়ের। এটা একদিকে ব্যালে জুতার মতো, আবার অন্যদিকে অনেক মজার ও নতুন। স্যান্ডির বানানো এই জুতা বাজারে এলে মিনিটেই বিক্রি হয়ে যায়। টিকটকে অনেকেই এই জুতার আনবক্সিং ভিডিও দেন। সবাই খুব পছন্দ করে এই ডিজাইন।

সালোমন জানায়, ‘স্নিকার মানেই এখন শুধু খেলাধুলা নয়। এতে নানা রঙ, ফুলের ছাপ, গল্পের মতো সাজও জায়গা পাচ্ছে। আমরা সেগুলোর দিকেও খেয়াল রাখছি।’

নারী ডিজাইনাররা এখন স্নিকার জগতে বড় ভূমিকা রাখছেন। স্যান্ডির ডিজাইন দেখিয়ে দিচ্ছে, খেলাধুলা আর স্টাইল একসাথে চলতে পারে।

তথ্যসূত্র: ইনস্টাইল