একসময় ধারণা করা হত, মোবাইল ফোনই হয়তো হাতঘড়ির অস্তিত্ব মুছে দেবে। ২০০৫ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, তরুণদের কাছে ঘড়ি নাকি হয়ে যাচ্ছে সূর্যঘড়ির মতোই অপ্রাসঙ্গিক। কারণ সময় তো ফোনেই দেখা যায়। কিন্তু সময় বদলেছে। আজকের জেনজি প্রজন্ম আবার ফিরে যাচ্ছে সেই পুরোনো ঘড়ির কাছেই। তবে সময় দেখার জন্য নয়, স্টাইল আর স্মৃতির টানে।
২০০৩ সালে জন্ম নেওয়া ইভান ফ্রাই বড় হয়েছেন এমন এক সময়ে, যখন সময় জানার জন্য আলাদা ঘড়ির প্রয়োজন ছিল না। স্মার্টফোন, ল্যাপটপ, টিভি, এমনকি রান্নাঘরের যন্ত্রেও সময় দেখা যায়। তবু মাত্র ২২ বছর বয়সেই তার সংগ্রহে রয়েছে ৩৫টির বেশি ঘড়ি। যেগুলোর প্রতিটির দাম প্রায় এক থেকে দুই হাজার ডলার।
তার সংগ্রহের সবচেয়ে প্রিয় ঘড়ি হলো ট্যাগ হোয়ারের কারেরা মডেল, যার দাম প্রায় ৩ হাজার ৫০০ ডলার। ভবিষ্যতে তিনি এইচ মোজার অ্যান্ড সিয়ের একটি ঘড়ি কেনার স্বপ্ন দেখেন। যার কিছু কিছু মডেলের দাম প্রায় ৫০ হাজার ডলার।
তরুণদের নতুন আগ্রহ
ফ্রাই একা নন। তার মতো আরও অনেক তরুণ এখন রেট্রো বা ভিনটেজ ঘড়ির প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠছেন। একটি গবেষণা অনুযায়ী, ৩০ বছরের নিচের ক্রেতারা এখন বিলাসবহুল ঘড়ির বাজারের বড় একটি অংশ। অনেক ক্ষেত্রেই তারা একটি ঘড়ির জন্য গড়ে সবচেয়ে বেশি খরচও করছেন।
সুইস ঘড়ি নির্মাতা লঁজিনের কর্মকর্তারাও বলছেন, তরুণদের মধ্যে পুরোনো ঘড়ি সার্ভিসিং বা পুনরুদ্ধারের আগ্রহ বেড়েছে। অনেকেই পারিবারিক উত্তরাধিকার হিসেবে পাওয়া ঘড়ি ঠিক করে ব্যবহার করছেন। যা তাদের কাছে শুধু একটি বস্তু নয়, স্মৃতির অংশ।
নস্টালজিয়া ও ইতিহাসের টান
ফ্রাইয়ের মতে, পুরোনো ঘড়ির প্রতি তার আগ্রহের পেছনে আছে ইতিহাস জানার কৌতূহল। একসময় একটি ঘড়ি ছিল মানুষের প্রতিদিনের সঙ্গী। তাই পুরোনো একটি ঘড়ি হাতে নেওয়া মানে যেন অতীতের একটি অংশকে ছুঁয়ে দেখা।
এই নস্টালজিয়ার প্রভাব পড়ছে ডিজাইন পছন্দেও। তথ্য বলছে, জেনজি প্রজন্ম অন্যদের তুলনায় বেশি কিনছে ক্লাসিক ড্রেস ওয়াচ। যেমন কার্তিয়ের ট্যাংক লুই কার্তিয়ে, ভাশেরঁ কনস্ট্যানটিনের প্যাট্রিমনি কিংবা পুরোনো সেইকো মডেল। ২০১৮ সালের পর থেকে এই ধরনের ঘড়ি কেনার হার ৪৪ শতাংশ বেড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ঘড়ি এমন এক সময়ের প্রতিনিধিত্ব করে। যখন জিনিসপত্র দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার জন্য তৈরি করা হতো। আর সংগ্রহের মূল্য ছিল আলাদা।
ডিজিটাল যুগে স্পর্শযোগ্যতার আকর্ষণ
অনলাইন ভিনটেজ ঘড়ির দোকান পরিচালনাকারী ডাহিন লি বলেন, ‘ডিজিটাল পরিবেশে বড় হওয়া এই প্রজন্মের মধ্যে বাস্তব, স্পর্শযোগ্য জিনিসের প্রতি একধরনের আকর্ষণ তৈরি হয়েছে।’
তার ক্রেতাদের বড় একটি অংশই জেনজি। যারা অনেক সময় ঘড়ি কেনে শুধুই তার সৌন্দর্যের জন্য। এমনকি অনেকেই এমন ঘড়িও কিনতে আগ্রহী, যা কাজ করে না। কারণ তাদের কাছে এটি একটি ফ্যাশন অ্যাকসেসরির মতো।
ঘড়ির নতুন ট্রেন্ড
ঘড়ির ক্ষেত্রে লিঙ্গভেদও এখন আর তেমন গুরুত্বপূর্ণ নয়। ছেলেরা নারীদের জন্য তৈরি ছোট ঘড়ি কিনছেন। আবার মেয়েরাও বড় ডায়ালের পুরুষদের ঘড়ি বেছে নিচ্ছেন।
এই প্রবণতায় বড় ভূমিকা রাখছেন তারকারা। যেমন অভিনেতা টিমোথে শালামে একটি ছোট ডায়ালের কার্তিয়ে পাঁতের ঘড়ি পরে আলোচনায় আসার পর অনেক তরুণ এমন ঘড়ি পরতে আগ্রহী হয়েছেন।
এছাড়া অস্কারের লালগালিচায় মাইকেল বি. জর্ডান, পেড্রো পাসকালসহ অনেক তারকার নতুন স্টাইল তরুণদের প্রভাবিত করছে।
ব্র্যান্ড নয়, ‘লুক’ই গুরুত্বপূর্ণ
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জেন জি প্রজন্মের কাছে ঘড়ির ব্র্যান্ডের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ এর ডিজাইন বা ‘লুক’। তারা শুধু জনপ্রিয় ব্র্যান্ডের পেছনে না ছুটে নিজের পছন্দ অনুযায়ী ঘড়ি বেছে নিচ্ছে। এমনকি অনেক তরুণ স্বীকার করেন, তারা ঠিকভাবে সময় পড়তেও জানেন না।তবু ঘড়ি কেনেন শুধুই স্টাইলের জন্য।
সময় জানানোর যন্ত্র থেকে ঘড়ি এখন জেন জি প্রজন্মের কাছে হয়ে উঠেছে পরিচয়ের অংশ। যেখানে স্টাইল, ইতিহাস আর অনুভূতিই সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে।