তীব্র গরমে বাইরে বের হওয়াই যখন কঠিন হয়ে ওঠে, তখন পোশাক নির্বাচনও হয়ে পড়ে বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক সময় হালকা কাপড়ও অস্বস্তিকর মনে হয়। এমন পরিস্থিতিতে ফ্যাশনের চেয়ে বেশি গুরুত্ব পায় আরাম ও স্বস্তিদায়ক পোশাক।
দেশীয় ফ্যাশন হাউস রঙ বাংলাদেশের প্রধান নির্বাহী সৌমিক দাস বলেন, ‘এই গরমে পোশাক বাছাইয়ের ক্ষেত্রে কিছু বিষয় মাথায় রাখতেই হবে। তা না হলে, পোশাক হয়ে উঠতে পারে অস্বস্তিকর। সঠিক কাপড়, রঙ ও ঢিলেঢালা ডিজাইন। এই তিনটি বিষয়ই সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’
ফ্যাশন হাউস বিবিয়ানার স্বত্বাধিকারী লিপি খন্দকারের মতে, ‘গরমে হালকা পোশাক সবচেয়ে বেশি আরামদায়ক।’
গরম আমাদের দেশের ঋতুচক্রেরই অংশ। কিন্তু কিছু কিছু দিন আসে, যখন রোদ যেন আর সহনীয় থাকে না। বাইরে বের হওয়ার আগে বারান্দায় দাঁড়িয়েই মনে হয়, আজ কী পরলে একটু কম গরম লাগবে?
আলমারিতে থাকা প্রিয় পোশাকগুলো হঠাৎ করেই অপ্রয়োজনীয় মনে হতে শুরু করে। হালকা কাপড়ও ভারী লাগে। আর সাজগোজ যেন হয়ে ওঠে আবহাওয়ার সঙ্গে প্রতিদিনের এক নিঃশব্দ দরকষাকষি।
এমন সময় ফ্যাশনের সংজ্ঞাটাও বদলে যায়। কী ট্রেন্ডে চলছে, তা নয়। বরং কী পরলে ভালো থাকবে, সেটাই হয়ে ওঠে মূল ভাবনা। তবু মানুষ তো নিজের মতো করে সুন্দর থাকতে চায়। তাই রইল এমন কিছু সহজ কৌশল। যা মেনে চললে তীব্র গরমেও আরাম আর স্টাইল, দুটোই একসঙ্গে রাখা সম্ভব।
কাপড়েই লুকিয়ে স্বস্তি
গরমে সবচেয়ে বড় বিষয় হলো কাপড়ের ধরন। অনেক সময় আমরা ডিজাইন বা রঙ দেখে পোশাক কিনি। কিন্তু কাপড়টা শরীরের সঙ্গে মানাচ্ছে কি না, সেটি খেয়াল করি না। অথচ তাপপ্রবাহে এই বিষয়টিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
সুতি কাপড় বরাবরই গরমের জন্য আদর্শ। এটি ঘাম শোষে নেয় এবং শরীরে বাতাস চলাচল করতে দেয়। লিনেনও এখন বেশ জনপ্রিয়। আগে লিনেন মানেই ছিল শক্ত আর সহজে কুঁচকে যাওয়া কাপড়। এখন প্রযুক্তির উন্নয়নে লিনেন অনেক নরম ও আরামদায়ক হয়েছে। ফলে এটি যেমন দেখতে স্মার্ট লাগে, তেমনি পরতেও স্বস্তিদায়ক।
অন্যদিকে, সিনথেটিক কাপড় যেমন পলিয়েস্টার, যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলাই ভালো। দেখতে হালকা হলেও এগুলো শরীরের তাপ আটকে রাখে। ফলে ঘাম বাড়ে, অস্বস্তিও বেড়ে যায়।
রঙে আনুন ঠান্ডা অনুভূতি
গরমের দিনে রঙের প্রভাবও কম নয়। কালো বা গাঢ় রঙের পোশাক সূর্যের তাপ বেশি শোষণ করে। তাই এই সময় হালকা রঙের পোশাকই বেশি আরাম দেয়।
সাদা, অফ-হোয়াইট, বেইজ, হালকা নীল, প্যাস্টেল গোলাপি কিংবা মৃদু সবুজ।এই রঙগুলো চোখে যেমন শান্তি দেয়, শরীরেও তেমন স্বস্তি আনে। তবে যারা গাঢ় রঙ পছন্দ করেন, তারা পুরোপুরি তা বাদ না দিয়ে হালকা রঙের সঙ্গে মিলিয়ে পরতে পারেন। যেমন, কালো টপের সঙ্গে সাদা বা বেইজ প্যান্ট।
কম ঝামেলায় স্বস্তি
গরমের দিনে সবচেয়ে সহজ সমাধান হতে পারে একটি আরামদায়ক পোশাক। যেদিন পোশাক নিয়ে বেশি ভাবার সময় বা ইচ্ছা থাকে না, সেদিন একটি ভালো ড্রেসই যথেষ্ট।
তবে এখানে গুরুত্বপূর্ণ হলো কাট বা ডিজাইন। খুব আঁটসাঁট বা শরীরে লেগে থাকে এমন ড্রেস এড়িয়ে চলা ভালো। মিডি বা ম্যাক্সি লম্বার ঢিলেঢালা ড্রেস, স্লিভলেস বা পাতলা স্ট্র্যাপ। এসব ডিজাইন গরমে বেশ আরামদায়ক।
একটি পোশাকেই পুরো সাজ সম্পন্ন হয়ে যায়। এটাই এর সবচেয়ে বড় সুবিধা।
ঢিলেঢালা পোশাকেই স্বস্তি
তাপপ্রবাহে আঁটসাঁট পোশাক যেন একপ্রকার শাস্তির মতো। শরীরে বাতাস চলাচল না করলে গরম আরও বেশি অনুভূত হয়। তাই এই সময়ে ঢিলেঢালা পোশাকই সবচেয়ে ভালো।
ওভারসাইজ শার্ট, ওয়াইড-লেগ প্যান্ট, আরামদায়ক কো-অর্ড সেট কিংবা ঢিলেঢালা টপ। এসব পোশাক এখন শুধু আরামদায়কই নয়, ফ্যাশনেও এগিয়ে।
একটি সাদা ওভারসাইজ শার্ট, ভেতরে একটি হালকা ট্যাংক টপ। এই সহজ সাজটিও দেখতে বেশ পরিপাটি লাগে। আবার চাইলে হালকা কাপড়ের ঢিলেঢালা কুর্তিও হতে পারে ভালো পছন্দ।
গরমেও লেয়ারিং সম্ভব
শুনতে অবাক লাগলেও, গরমে লেয়ারিং করা একেবারেই অসম্ভব নয়। বরং সঠিকভাবে করলে এটি উপকারই করতে পারে।
ধরুন, বাইরে প্রচণ্ড রোদ। এ সময় সরাসরি রোদে ত্বক পুড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। সেখানে একটি হালকা শার্ট বা শ্রাগ পরলে তা রোদ থেকে কিছুটা সুরক্ষা দেয়।
তবে লেয়ারিংয়ের ক্ষেত্রে কিছু বিষয় মাথায় রাখা জরুরি। কাপড় যেন খুব হালকা হয়, সহজে খোলা যায় এবং শরীরে বাতাস চলাচল বন্ধ না করে। পাতলা সুতি শার্ট, শিয়ার কাপড় বা হালকা নিট, এসবই হতে পারে ভালো বিকল্প।
নিজের আরামটাই আগে
ফ্যাশনের দুনিয়ায় ট্রেন্ড বদলায় খুব দ্রুত। কিন্তু তাপপ্রবাহের সময় নিজের শরীরের আরামটাই হওয়া উচিত প্রথম অগ্রাধিকার। অন্য কেউ কী পরছে বা কী ট্রেন্ড চলছে। তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, আপনি কী পরলে ভালো থাকছেন।
অনেক সময় আমরা স্টাইল ধরে রাখার জন্য এমন পোশাক পরি, যা আসলে আমাদের জন্য অস্বস্তিকর। কিন্তু এই গরমে সেই আপস করার কোনো প্রয়োজন নেই। বরং এমন পোশাকই বেছে নেওয়া উচিত, যা আপনাকে স্বস্তি দেবে এবং আত্মবিশ্বাসী রাখবে।
ছোট ছোট অভ্যাসে বড় স্বস্তি
পোশাকের পাশাপাশি কিছু ছোট অভ্যাসও আপনাকে গরমে স্বস্তি দিতে পারে। যেমন, হালকা ও ঢিলেঢালা পোশাক পরা। ঘাম শোষে এমন কাপড় বেছে নেওয়া। প্রয়োজনে অতিরিক্ত একটি শার্ট সঙ্গে রাখা। এ ছাড়া বাইরে বের হলে রোদ থেকে বাঁচতে ছাতা বা হালকা স্কার্ফ ব্যবহার করাও উপকারী হতে পারে।
তাপপ্রবাহকে আমরা থামাতে পারি না। কিন্তু এর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার উপায় আমাদের হাতেই আছে। তাই বেছে নিন সঠিক কাপড়, হালকা রঙ আর আরামদায়ক ডিজাইন। এই তিনটি বিষয় মাথায় রাখলেই গরমের দিনগুলো কিছুটা হলেও সহজ হয়ে উঠতে পারে।