কৈশোরে যেভাবে সন্তানের পাশে থাকবেন

শিশু থেকে কিশোরে রূপান্তর একটি জটিল পর্যায়—যা শারীরিক ও মানসিক উভয় দিক থেকেই ঘটে। এই সময় সন্তানেরা স্বাধীনতা খুঁজে, চায় নিজের মতো করে চিন্তা করতে। আবার একই সঙ্গে তারা দিশেহারা বোধ করে। এই সংবেদনশীল সময়ে বাবা-মায়ের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত অনেকেই এই সময়ে সন্তানের সঙ্গে ‘যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা’-র মুখোমুখি হয়।

এ বয়সে শারীরিক ও মানসিক নানা পরিবর্তনের ভেতর দিয়ে যায় একজন কিশোর। এই সময়ে সন্তানদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখা অভিভাবকদের জন্য যেমন চ্যালেঞ্জিং, তেমনি গুরুত্বপূর্ণও। আসুন, দেখে নিন কীভাবে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখে যাবতীয় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করবেন।

সক্রিয় শ্রোতা হওয়া

বেশিরভাগ অভিভাবকের মধ্যে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, তা হলো সক্রিয়ভাবে শোনা বা অ্যাক্টিভ লিসনিং। অনেক সময়ই আমরা সন্তানদের কথা ‘শুনে থাকি’। কিন্তু সে কথার প্রকৃত অর্থ মনোযোগ দিয়ে বোঝা হয় না। আমরা তাদের সমস্যার কথা শুনে সঙ্গে সঙ্গে উপদেশ দিতে শুরু করি, অথবা নিজেদের অভিজ্ঞতা চাপিয়ে দিই। এতে সন্তানেরা মনে করে, তাদের কথা আসলে কেউ শুনছে না বরং তাদেরকে শুধু বিচার করা হচ্ছে।

সহানুভূতির অভাব

অনেক সময় আমরা ভুলে যাই যে, কিশোর বয়সে ছোট ছোট বিষয়ও অনেক বড় মনে হয়। আমরা তাদের অনুভূতিকে হালকাভাবে নিই, ফলস্বরূপ তারা নিজেদের আবেগ গোপন করতে শুরু করে।

নিরাপদ পরিসর তৈরি না করা

সন্তান যদি মনে করে কথা বললেই তাকে বকা খেতে হবে বা বিচার করা হবে, তাহলে সে কখনোই খোলামেলা কথা বলবে না।

সন্তানের সঙ্গে হাঁটতে যাওয়া, সময় কাটানো, খেলা দেখা, রান্না করা বা সিনেমা দেখা—এই সময়গুলোতে মন খুলে কথা বলার সুযোগ করে দেয়। ছবি: ফ্রিপিকধৈর্যের অভাব

কিশোরেরা অনেক সময় যুক্তিহীন বা আবেগপ্রবণ আচরণ করে, যেটা স্বাভাবিক। কিন্তু অভিভাবকরা অনেক সময় খুব দ্রুত রেগে যান বা প্রতিক্রিয়া দেখান, যা যোগাযোগের পথ বন্ধ করে দেন।

স্বচ্ছতা বা আত্মমূল্যায়নের অভাব

অনেক সময় নিজের ভুল স্বীকার না করে, শুধু সন্তানের ভুল ধরিয়ে দেওয়া হয়। এতে তার সঙ্গে আপনার আবার আপনার সঙ্গে সন্তানের বিশ্বাস তৈরি হয় না।

কার্যকর যোগাযোগের কৌশল

উপরে উল্লেখ করা বিষয়গুলো দূর করার নানা ধরনের কৌশল আছে। এখানে আমরা কয়েকটি কৌশল নিয়ে আলোচনা করেছি। এগুলো পালন করা হলে আপনার সন্তানের সাথে কৈশোরকালীন যোগাযোগের অভাব যেমন দূর হবে তেমনি তাদের সঙ্গে বিশ্বাসের মাত্রাও বাড়বে।

শুধু বললেই হবে না, শুনতেও হবে

অনেক বাবা-মা সন্তানের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে শুধু উপদেশ দেন বা দোষ ধরেন। অথচ কিশোর বয়সে তারা চায় কেউ তাদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনুক। আপনার সন্তান কী বলছে, কেন বলছে, সেটি মনোযোগ দিয়ে শুনলে তারা বুঝবে, ‘আমার কথা গুরুত্ব পাচ্ছে।’ তখন তারা আরও বেশি খোলামেলা হবে। এবং মনের কথা খুলে বলবে।

প্রতিক্রিয়া নয়, প্রতিচিন্তা দিন

সন্তান কোনো সমস্যা বা প্রশ্ন নিয়ে এলে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে একটু সময় নিয়ে চিন্তাশীল উত্তর দিন। ধমক না দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করুন—‘তুমি এটা কেন করলে?’ না বলে বলা যেতে পারে, ‘তুমি এটা করেছ, তুমি কী ভাবছিলে তখন?’

বিচারক না হয়ে বন্ধু হোন

বাবা-মা যদি সব সময় বিচারকের ভূমিকায় থাকেন, তাহলে সন্তান তাদের কাছে নিজের সমস্যা বলতে চাইবে না। বরং তারা বন্ধু মনে করলে ছোট-বড় সব কিছুই শেয়ার করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করবে।

গুরুত্বপূর্ণ সময় একসঙ্গে কাটান

শুধু পড়াশোনা বা নিয়ম মানা নিয়ে আলোচনা করলে যোগাযোগ একমুখী হয়। বরং একসঙ্গে হাঁটতে যাওয়া, খেলা দেখা, রান্না করা বা সিনেমা দেখা—এই সময়গুলোতে মন খুলে কথা বলার সুযোগ তৈরি হয়।

কিশোর বয়সের সন্তানদের সঙ্গে যোগাযোগে সফল হতে চাইলে প্রথমে দরকার ধৈর্য, মনোযোগ আর ভালোবাসা। সন্তানেরা এই বয়সে অভিভাবকদের কাছ থেকে গাইডেন্স চায়, কিন্তু সেটি কীভাবে দেওয়া হচ্ছে, সেটাই সবচেয়ে বড় বিষয়। আপনার কথা তারা শুনবে, যদি তারা দেখে আপনি আগে তাদের কথা শুনছেন।

লেখক: শিশু বিকাশ বিষয়ক গবেষক, শিশুবিকাশ ডট কম