চিতাবাঘের সন্ধানে শ্রীলঙ্কার ইয়ালা ন্যাশনাল পার্কে একদিন

ভারত মহাসাগরের দেশ শ্রীলঙ্কা ভ্রমণের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ইয়ালা ন্যাশনাল পার্কে সাফারি করা। এই পার্কটি পৃথিবীর অন্যতম লেপার্ড বা চিতাবাঘ সমৃদ্ধ একটি বন। একই সঙ্গে এটি শ্রীলঙ্কার দ্বিতীয় বৃহৎ বন। ভারত মহাসাগর লাগায়ো এই বনের পরিধি প্রায় ৯৭৯ বর্গ কিলোমিটার।

শ্রীলঙ্কা সফরের তৃতীয় দিনে ইয়ালা ন্যাশনাল পার্কে সাফারি সিদ্ধান্ত নিই। এর আগের দিনে নুয়ারা এলিয়া ট্রেনে চেপে রওনা হই শ্রীলঙ্কা অন্যতম সুন্দর শহর এলার উদ্দেশ্যে। এখানে বেড়াতে আসা পর্যটকদের ট্যুর আর্টিনারিতে ৪ ঘণ্টার এই জার্নি প্রায় আবশ্যক বলা যায়। রাতের এলা শহর বেশ পরিপাটি। অনেকটা ইউরোপীয় শহরের মতোই। এলা স্টেশন ঘেঁষেই শহর। সেখানে পর্যটকদের পদচারণায় মুখর। প্রতিটি রেস্তোরা পর্যটকে ঠাসা। রাতে এলা যেন উৎসবের নগরীতে পরিণত হয়েছে। পর্যটন মৌসুমে এমন চিত্র প্রায় প্রতিদিনই চোখে পরে।

সাফারির শুরুতেই চোখে পড়ল স্বাদু পানি কুমির। ছবি: সমির মল্লিক

এলাতে অবস্থানকালীন সময়ে ইয়ালাতে সাফারির সব পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়। শ্রীলঙ্কায় বসবাসরত বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত বৌদ্ধ ভিক্ষু ধর্মকৃতি থেরো আমাদের শ্রীলঙ্কা সফরে পুরো পরিকল্পনা সাজিয়ে দিয়েছেন। পরিকল্পনা মোতাবেক দুপুর ১২ টায় পাহাড়ি শহর এলা ছেড়ে রওনা হলাম ইয়ালার উদ্দেশ্যে। পাহাড়ি পথ। পুরো সড়কটি আঁকা বাঁকা। বন্ধুর পথ পেরিয়ে ২ ঘণ্টার ব্যবধানে আমরা টিস্সা শহরে এসে পৌছাই। ঘড়ির কাটায় তখন বেলা ২টা। দ্রুত সাফারি শুরু করতে হবে। হোটেলে চেক ইন করেই ক্যামেরা নিয়ে রওনা হলাম ইয়ালা ন্যাশনাল পার্কের উদ্দেশ্যে।

আগেই থেকে হোটেলের সামনে অপেক্ষমাণ সাফারি গাড়িতে চেপে বসলাম। ছোট শহর টিস্সা পেরিয়ে যাচ্ছি। কোথাও কোথাও ছোট গ্রাম, ধানক্ষেত, লেক এসবের দেখা মিলছে। প্রায় ৪০ মিনিটের দূরত্বে সাফারির গাড়ি এসে থামল টিকেট কাউন্টারে। সার্কভুক্ত নাগরিক হওয়ায় জনপ্রতি ২০ ডলার খরচ গুনতে হলো। শ্রীলঙ্কান রুপিতে ৬ হাজার ৩শ। ৪ জনের খরচ পড়ল ২৫ হাজার ২শ রুপি। সাফারির শুরুতেই গাইড কাম চালক রতনা একাডকে বলা হলো সাফারির প্রধান লক্ষ্য লেপার্ড বা চিতাবাঘের ছবি তোলা।

বন্য মহিষের পাল পানিতে ডুবে বিশ্রাম নিচ্ছে। ছবি: সমির মল্লিক

বিকেল ৩টার দিকে শুরু হলো আমাদের অভিযাত্রিক সাফারি। ২০১৮ সাল থেকে বন্যপ্রাণীর ছবি তুলেছি। তবেই এটিই দেশের বাইরে প্রথম সাফারি। এই এক অন্য রকম অনুভূতি। অধরা স্বপ্ন অবশেষে বাস্তবায়িত হচ্ছে। সাফারির শুরুতেই চোখে পড়ল স্বাদু পানি কুমির। বেশ বড়। ২০০০ সালে আমাদের দেশে এই প্রজাতির কুমিরকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে পরিবেশ সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক সংস্থা আইই্উসিএন (ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনসারভেশন অব নেচার)। বিশ্বব্যাপী সংকটাপন্ন এই প্রাণীর দর্শন ইয়ালা সর্ম্পকে সাফারি শুরুতেই ভালো একটা ধারণা দিল। অল্প দূরত্বে বেশ কয়েকটা কুমিরের দেখা পেয়ে গেলাম। ক্যামেরায় পর্যাপ্ত ছবি তুলে এগুতে থাকলাম।

এবার চোখে পড়ল বন্য জলমহিষ। এটি আইই্উসিএনের লাল তালিকায় বিপন্ন। একাধিক বন্য মহিষের পাল পানিতে ডুবে বিশ্রাম নিচ্ছে। সময়ের সাথে এগিয়ে চলেছে আমাদের সাফারি জীপ। ধূসর প্রান্তর। অদূরে ভারত মহাসাগরের ঢেউ আছড়ে পরছে। লোনা জলে ডুব দিয়ে আছে সংকটাপন্ন বন্য জলমহিষ। বনে তৃণভূমি জুড়ে হরিণ ও বন্য শুকরের বিচরণ। ইয়ালা বন ভেদ করে চলেছে লাল মাটির রাস্তা। রাস্তা ধরে এগুলো চোখে পরে ময়ূর। এছাড়া এশিয়ান হাতি, পেলিকন, মানিকজোড়, ঈগলসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখি।

বনে তৃণভূমি জুড়ে হরিণ বিচরণ। ছবি: সমির মল্লিক

পুরো বনে এক চক্কর শেষ সাময়িক বিরতি দিয়ে আবার সাফারি শুরু হল। বলা যায় বৈকালিক সাফারির শেষটা শুরু হয়েছে। সারাদিনে কেউ তখনও ইয়ালার মূল আকর্ষণ লেপার্ড বা চিতাবাঘের দেখা মেলেনি। আমার ভ্রমণ বন্ধুদের মধ্যে অজিত বড়ুয়া চিতার দর্শন পেতে বেশ মরিয়া হয়ে উঠেছিল। কিন্ত দর্শন না পাওয়ায় সবার চোখে মুখে হতাশা। শ্রীলঙ্কায় আমার ভ্রমণের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল লেপার্ড বা চিতাবাঘের ছবি তোলা।

পৃথিবীর অন্যতম সমৃদ্ধ বন-ইয়ালা ন্যাশনাল পার্কে শ্রীলঙ্কান লেপার্ডের মাঝে মাঝে দেখা পাওয়া যায়। ভারত মহাসাগর ঘেঁষা এই বিশাল বনে লেপার্ডের অস্তিত্ব রয়েছে। আইইউসিএনের জরিপে লেপার্ড বা চিতা বাঘকে বিপন্ন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। স্বল্প দিনের ট্যুর আর্টিনারি অনুযায়ী ইয়ালা’র বনে হাফ ডে’র বেশি সাফারি করা অসম্ভব ছিল। প্রায় দুই ঘণ্টার সাফারিতে জীবনে প্রথমবারের মতো অনেক বন্যপ্রাণী ও পাখি দেখেছি। বিকেল গড়িয়ে প্রায় সন্ধ্যা হতে চলল। লেপার্ডের কোন সাড়া শব্দ নেই। বিভিন্ন প্রাণীর ছবি তুলে ভালো লাগছিল। কিন্তু লেপার্ড দর্শন না পাওয়ায় অপেক্ষাও ছিল।

এখানেই দেখা মিলবে বন মোরগের। ছবি: সমির মল্লিক

সাফারির প্রায় শেষ দিকে শ্রীলঙ্কার জাতীয় পাখি-বন মোরগের ছবি তুলেছিলাম। তখন আমাদের চালক কিছু একটা ইশারা করে উল্টো পথে দ্রুত এগুতে থাকল। অনুমান করছিল সামনে হয়তো লেপার্ডের দেখা মিলবে। শেষ মূহুর্তে একটা নাটকীয়তা! সাফারি সড়ক ধরে লাগায়ো বনে লেপার্ডের অবস্থান আন্দাজ করছিল। কিন্তু দর্শন পাচ্ছিলাম না। কিছুক্ষণ রাস্তার উপর বসে ছিল তখন ছবি তোলার সুযোগ নেই। রাস্তা ত্যাগ করে একটা লেপাড বনের ঘন ঝোপের আড়ালে চলে গেল। তার বের হওয়ার রাস্তা বরাবর লেন্স রেখেছিলাম। ঝোপ থেকে বেরিয়ে এলো বহুল প্রত্যাশিত শ্রীলঙ্কান লেপার্ড। একসাথে এক জোড়া! চোখ দিয়ে দেখব নাকি ছবি তুলব, এমন বিভ্রান্তি কাটাতে কয়েক সেকেন্ড লেগে গেল। অবশেষে দুটোকেই ফ্রেমবন্দি করতে পেরেছি। অধরা স্বপ্ন ধরা দিল।

নিজের ক্যামেরায় চিতাবাঘকে ফ্রেমবন্দি করতে পেরেছি। অন্তত ৬ থেকে ১০ সেকেন্ডের মধ্যে লেপার্ডগুলো বনের জঙ্গলে ঢুকে গেল। ইয়ালার বনে অভিযাত্রিক সাফারি যেন পূর্ণতা পেল। চিতার ছবি তোলার পর বন থেকে বের হওয়ার পালা। পশ্চিমের আকাশে সন্ধ্যা নামছে। রিসোর্টে ফিরতে ফিরতে ভেসে উঠছে ইয়ালার চিত্রপট। যেন এক আদিমতা রেখে ফিরে যাচ্ছি নাগরিক সভ্যতার দিকে। মনের দৃশ্যপটে আটকে আছে মায়া হরিণের চোখ।

অবশেষে ঝোপ থেকে বেরিয়ে এলো বহুল প্রত্যাশিত শ্রীলঙ্কান লেপার্ড। ছবি: সমির মল্লিক

প্রয়োজনীয় তথ্য: শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বো থেকে ইয়ালা ন্যাশনাল পার্কের দূরত্ব ৩০০ কিলোমিটার। রিজার্ভ গাড়িতে যেতে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা সময় লাগবে। অনলাইনে যোগাযোগ করে আগে থেকেই সাফারির গাড়ি ঠিক করে নেয়া যাবে। ইয়ালার বনে সার্কভুক্ত দেশের নাগরিকদের প্রবেশ ফি ২০ ডলার। তবে অফ সিজনে তা ১৫ ডলার। আধাবেলা সাফারি করতে গাড়ি ভাড়া পরে ১৫ থেকে ২০ হাজার শ্রীলঙ্কান রুপি। সাফারি পানিসহ হালকা খাবার সাথে নিতে হবে। ইয়ালা ন্যাশনাল পার্কের পাশে বেশ কয়েকটি রিসোর্ট আছে।