পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো এই শহর কি যুদ্ধের শিকার হতে যাচ্ছে?

লেবাননের দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত টায়ার বা স্থানীয় ভাষায় সুর। পৃথিবীর সবচেয়ে পুরনো বসবাসরত শহরগুলোর মধ্যে একটি। ৪,৭০০ বছরের ইতিহাসে ভরা এই শহর এখন অস্ত্রবাজি ও সংঘাতের কারণে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে। রোমান হিপোড্রোম, প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ, মসাইক এবং নেক্রোপলিস সবই এখন ক্ষতির শিকার হওয়ার সম্ভাবনা আছে।

ইসরায়েল-হিজবুল্লাহ সংঘাত তীব্র হয়ে উঠায় টায়ারের মানুষদের তাদের ঘরবাড়ি ত্যাগ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মার্চে একটি ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত টায়ারের উপর পড়েছিল। যার ফলে আল-বাস প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানের প্রবেশদ্বারে ক্ষতি হয়েছে। টায়ার পূর্বেও ১৯৮২, ১৯৯৬ এবং ২০০৬ সালে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ইউনেস্কো জানিয়েছে, তারা সব পক্ষকে এই শহরের ভৌগোলিক অবস্থান জানিয়ে দিয়েছে এবং ক্ষতি রোধের জন্য সব রকম সতর্কতা নিতে বলছে।

মধ্যপ্রাচ্যের সাংস্কৃতিক স্থাপনা বিপন্ন

মধ্যপ্রাচ্যের বহু ঐতিহাসিক স্থান যুদ্ধ ও সংঘাতের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক আইন থাকা সত্ত্বেও এসব ক্ষতি থামানো যায়নি। ১৯৫৪ সালের হেগ কনভেনশন মতে, ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা, শিল্পকর্ম ও স্থাপত্যকে রক্ষা করতে হবে। ক্ষতি হলে সেটিকে ‘সমস্ত মানবজাতির সাংস্কৃতিক হেরিটেজের ক্ষতি’ হিসেবে গণ্য করা হয়। এছাড়া জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ সিদ্ধান্ত ২৩৪৭ জানায়, সন্ত্রাসী গ্রুপদের দ্বারা ঐতিহ্যবাহী সম্পদের ধ্বংস, লুটপাট ও চুরি নিন্দনীয়।

টায়ারের ঐতিহ্য

টায়ারের ইতিহাস চমকপ্রদ। খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ সালের দিকে, টায়ারের মানুষরা গ্রীস, কার্থেজ ও কাডিজে উপনিবেশ গড়ে তুলেছিল। শহরটি বিশেষভাবে পরিচিত ছিল বিরল ও মূল্যবান টায়ারিয়ান পার্পল রঙের জন্য। যা শুধু রাজাদের জন্য সংরক্ষিত ছিল।

শহরে এখন রোমান স্নানাগার, বিশাল হিপোড্রোম এবং ক্রুসেডার দুর্গাবশেষ দেখা যায়। ইতিহাসবিদ, পর্যটক ও প্রত্নতাত্ত্বিকদের জন্য এটি এক অমূল্য ধন। শহরটি মূলত দুটি ঐতিহ্য অঞ্চল আল-মিনা এবং আল-বাসে ভাগ। আল-মিনা অঞ্চলে রোমান ধ্বংসাবশেষ এবং ক্রুসেডারদের প্রতিরক্ষা প্রাচীর আছে। আল-বাস ছিল নেক্রোপলিস। যেখানে পাথরের সমাধি ও বিশাল স্মৃতিস্তম্ভ শহরের প্রাচীন মানুষের কাহিনী বলে।

দর্শনীয় স্থাপনা

টায়ারে রয়েছে ক্রুসেডার চার্চ, দ্বিতীয় শতাব্দীর মসাইক পেভমেন্ট, এবং সাদা, সবুজ রঙের মার্বেলের ডাবল কলোনেড। রোমান স্নানাগার এখনও আংশিকভাবে দাঁড়িয়ে আছে। যা প্রাচীন দিনের দৈনন্দিন জীবনকে বোঝায়। হিপোড্রোমে এক সময় ২০ হাজার দর্শক চ্যারিয়ট রেস দেখতে পারত। এটি রোমান যুগের সবচেয়ে বড় হিপোড্রোম।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য

মধ্যপ্রাচ্যের এই লুকানো রত্নে রয়েছে ইতিহাস ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অনন্য মেলবন্ধন। সমুদ্রসৈকত এবং প্রাচীন ধ্বংসাবশেষ একসাথে চোখ জুড়িয়ে দেয়। এটিকে ‘সমুদ্রের রাণী’ও বলা হয়।

টায়ার কেবল প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান নয়। এটি ৪ হাজার বছরের বেশি সময় ধরে মানুষের ইতিহাসের এক গল্পের বই। তাই এটি সর্বদা রক্ষা করা উচিত।