দিনভর সংঘর্ষ আর ওপার থেকে ভেসে আসা তীব্র গোলা–বারুদের শব্দে আতঙ্ক কাটছে না মিয়ানমার সীমান্তে থাকা জনপদগুলোতে। আরাকান আর্মির সঙ্গে চলমান সংঘাতে টিকতে না পেরে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছে মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশের (বিজিপি) দুই শতাধীক সদস্য।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) বলছে, মায়ানমারের অভ্যন্তরে চলমান সংঘর্ষের জেরে এখন পর্যন্ত বিজিপি, মিয়ানমার সেনাবাহিনী, ইমিগ্রেশন সদস্য, পুলিশ ও অন্যান্য সংস্থার ২৬৪ জন সদস্য বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। তাদেরকে নিরস্ত্রীকরণ করে নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার সকালে আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইন লঙ্ঘন করে কক্সবাজারের বালুখালির জমিদার পাড়ায় ঢুকে তুমল যুদ্ধ করেছে বিজিপি ও আরাকান আর্মির সদস্যরা। গোলাগুলির বিকট শব্দে আতঙ্কে ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে চলে গেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
এদিকে উদ্ভুত পরিস্থিতিতে বালুখালি প্রাথমিক বিদ্যালয় বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। বালুখালি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. ইউনুস বলেন, ‘মিয়ানমারের সেনাদের গোলাগুলির কারণে স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।’
নাইক্ষ্যংছড়ির ওপারে মিয়ানমারের তমব্রু ঘাঁটি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর ঢেঁকিবনিয়া সীমান্তচৌকি দখলে নিতে চারদিন ধরে গোলাগুলি ও মর্টার শেল নিক্ষেপ করছে আরকান আর্মি ও মিয়ানমারের সীমান্তরক্ষীরা। এতে কেঁপে কেঁপে উঠছে জলপাইতলী, জমিদার পড়াসহ সীমান্তের অন্তত ১৩টি গ্রাম। মার্টার শেল আর গুলি এসে পড়েছে বাংলাদেশেও।
উদ্ভুত পরিস্থিতিতে ঢাকায় নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত অং কিউ মোয়েকে ডেকে কড়া প্রতিবাদ জানিয়েছে ঢাকা। পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাছান মাহমুদ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, ‘মিয়ানমারের অভ্যন্তর থেকে গোলাবারুদ পড়া, বাংলাদেশি নিহত হওয়ায় ঘটনা অনাকাঙ্ক্ষিত।’
এদিকে নাফ নদী পার হওয়ার সময় ৬৫ জন রোহিঙ্গাকে পুশব্যাক করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিজিবির নবনিযুক্ত মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান সিদ্দিকী। নতুন করে দেশে কোনো রোহিঙ্গাকে ঢুকতে দেওয়া হবে না বলেও জানান তিনি।
মঙ্গলবার টুঙ্গিপাড়ায় জাতির পিতার সমাধিতে শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘মিয়ানমারের অভ্যন্তরে সংঘর্ষের ঘটনায় বাংলাদেশের সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে। ধৈর্য ধারণ করে মানবিক দিক থেকে এবং আন্তর্জাতিক সুসম্পর্ক বজায় রেখে পরিস্থিতি মোকাবিলার চেষ্টা করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীও ধৈর্য ধারণের নির্দেশনা দিয়েছেন, সেই অনুযায়ী কাজ করছে বিজিবি।’
যা দেখলেন ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের সাংবাদিকরা
মিয়ানমার সীমান্তের যুদ্ধ পরিস্থিতির সংবাদ সংগ্রহ করতে কক্সবাজার এলাকায় রয়েছেন ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রতিবেদক আল আমিন হোসেন ও চট্টগ্রাম ব্যুরোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক অনুপম শীল। তারা জানিয়েছেন, ওপারের যুদ্ধের আঁচ এসে পড়েছে সীমান্ত লাগোয়া জনপদগুলোতেও। এতে আতঙ্ক বিরাজ করছে ওই এলাকাগুলোতে।
কক্সবাজারের বালুখালি সীমান্ত থেকে বিকেলে আল আমিন হোসেন জানান, আরাকান আর্মির সদস্যরা এখনও বাংলাদেশের অভ্যন্তরে দক্ষিণ দামনখালি জিরো পয়েন্ট এলাকায় অবস্থান করছে।
আল আমিন হোসেন বলেন, ‘বাংলাদেশের নাফ নদীর পাশ দিয়ে যে বেরিবাঁধটি নির্মানাধীন এর অন্তত ১৫০ ফিট অভ্যন্তরে তারা (আরাকান আর্মি) এসে অবস্থান করছে। এখানকার গ্রামবাসীদের যে বক্তব্য, তারা বেশ আতঙ্কে রয়েছেন। রাতে ও দিনেও তারা গোলাগুলির তীব্র শব্দ শুনেছেন। স্ত্রী সন্তানদের অনেকেই নিরাপদ আশ্রয়ে পাঠিয়ে দিয়েছেন।’
আল আমিন বলেন, ‘বেরিবাঁধের উপরে একজন লাল মার্কিং করা একজনকে আমরা দেখতে পাচ্ছি। এখানে কিছুক্ষণ আগেও ২০ থেকে ২৫ জনকে সশস্ত্র অবস্থায় দেখা গেছে। তারা আসলে কোন পক্ষের সদস্য এটা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তারা মুলত বেরিবাঁধের অন্যপাশে অবস্থান করছেন। সেখানে গোলাগুলির শব্দ আমরা পেয়েছি। বেরিবাঁধের উপর নির্মানাধীন কয়েকটি স্থাপনার পাশে লাল পতাকা দেখা যাচ্ছে। মূলত এই পর্যন্ত তারা দখলে নিয়েছেন।’
আল আমিন বলেন, ‘গ্রামবাসীরা বলছেন, বেতবুনিয়া সীমান্ত এখান থেকে খুব কাছে। সেখানে যে চেকপোস্ট আছে সেটাতে তারা গতকাল রাতে আগুন জ্বলতে দেখেছেন। সকালে আমরা দেখেছি দুই পক্ষের মধ্যেই গোলাগুলি হয়েছে। তবে গতকাল রাতে আমরা তমব্রু সীমান্তে যেমনটা দেখেছিলাম তেমনটা এখানে দেখতে পাইনি। গতকাল তমব্রু সীমান্তে হেলিকপ্টার দিয়ে মিয়ানমারের সরকারি বাহিনীকে বোমা নিক্ষেপ করতে দেখা গিয়েছিল, সেখানে যারা প্রতিরোধ করতে পারেন নি তারা আসলে সরে গেছেন।’
আল আমিন জানান, যুদ্ধের সময় বেরিবাঁধটিকে আরাকান আর্মির সদস্যরা ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছেন। তিনি বলেন, ‘তারা বাংলাদেশের মধ্যে প্রবেশ করে। আবার কিছুক্ষণ পর এখান থেকে চলে যায়।’
সীমান্ত এলাকায় রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বিজিবি তৎপরতা বৃদ্ধি করেছে বলে জানান ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক অনুপম শীল।
কক্সবাজারের উখিয়া সীমান্তের পরিস্থিতি সম্বন্ধে তিনি বলেন, ‘আজকের পরিস্থিতিও কিছুটা জটিল। সকালে আমরা ঘুমধুম সীমান্তে দেখেছি একটি স্কুলের পাশে এসে মর্টারশেল পড়েছে। রহমতের বিল এলাকায় তুমুল সংঘর্ষ হয়েছে। আরও কয়েকটি এলাকায় দফায় দফায় সীমান্তের ওপার থেকে শব্দ ভেসে আসতে শোনা গেছে।’
অনুপম বলেন, ‘রহমতের বিল এলাকা দিয়ে ১১৪ জন মিয়ানমার সীমান্ত রক্ষী বাহিনীকে আসতে দেখা গিয়েছে। তারা বিজিবির কাছে আশ্রয় চেয়েছে। তাদের আশ্রয় দেওয়া হয়েছে। এই ১১৪ জনের মধ্যে বিজিপি সদস্যের পাশাপাশি কাস্টমস কর্মকর্তারাও আছেন। এখনও বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি। পুরো সীমানা শিল করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে ভয় ও আতঙ্ক রয়েছে।’
সম্প্রতি মিয়ানমারের বিভিন্ন রাজ্যে বিদ্রোহীদের আক্রমণে ক্রমাগত চাপের মুখে রয়েছে দেশটির জান্তা সরকার। বিদ্রোহীদের কাছে উত্তর-পশ্চিমের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে মিন অং হ্লাইংয়ের জান্তা বাহিনী। পশ্চিম সীমান্তে আরাকান আর্মির হামলায় পিছু হটছে তারা। এরই মধ্যে একে একে সেখানকার সব সামরিক ঘাঁটি চলে যাচ্ছে আরাকান আর্মির দখলে।
বেসরকারি সংবাদ পরিষেবা সংস্থা রেডিও ফ্রি এশিয়া বলছে, রোববার বাংলাদেশ সীমান্তের কাছাকাছি মিয়ানমার বর্ডার গার্ড ফোর্সের আরও একটি ঘাঁটিতে আক্রমণ চালায় আরাকান আর্মি। মিয়ানমারের পশ্চিম সীমান্তের এই ঘাঁটিতে পূর্ণ সামরিক শক্তি নিয়ে চালানো হয় এই হামলা।
মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্তের দৈর্ঘ্য প্রায় ২৮৩ কিলোমিটার। এর বড় অংশ পড়েছে বান্দরবান ও কক্সবাজার জেলায়। কয়েক সপ্তাহ ধরে বাংলাদেশ সীমান্ত এলাকায় যুদ্ধ জোরাল করেছে আরাকান আর্মিসহ বিদ্রোহী কয়েকটি গোষ্ঠী। সংঘাত বাড়ার পর সবচেয়ে বেশি গোলাগুলির আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে টেকনাফের হোয়াইক্যংয়ের উলুবনিয়া, তুলাতুলি, কাঞ্জরপাড়া, উখিয়ার পালংখালির আনজুমান পাড়া এবং বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি তুমব্রু ও ঘুমধুম সীমান্তে। এতে রোহিঙ্গা গ্রামগুলোতে আবার দেখা দিয়েছে উত্তেজনা, বেড়েছে অনুপ্রবেশের শঙ্কা।
এ সংঘাতের কারণে সীমান্ত এলাকায় সতর্ক অবস্থায় রয়েছে বিজিবি। এর মধ্যে গত সোমবার মিয়ানমার থেকে ছোঁড়া একটি গোলার আঘাতে ঘুমধুম সীমান্তে একজন বাংলাদেশি ও একজন রোহিঙ্গা নিহত হন।
২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে অং সান সুচির সরকারকে উৎখাত করে মিয়ানমারের সামরিক জান্তা। নির্মমভাবে দমন করা হয় বিক্ষোভকারীদের। জবাবে হাতে অস্ত্র তুলে নেয় গণতন্ত্রকামীরা। বিভিন্ন জাতিগত বিদ্রোহী গোষ্ঠীর কাছে অস্ত্র প্রশিক্ষণ নেয় তারা।
পাশাপাশি আরাকান আর্মি, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক এলায়েন্স আর্মি ও ট্যাঙ্গ ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি নিয়ে গঠিত থ্রি ব্রাদারহুড এলায়েন্স সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। গত তিন বছরের গৃহযুদ্ধে ৩ শর বেশি সেনা চৌকি এবং ২০টি শহর দখল করে নিয়েছে মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠীগুলো।
২০২২ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বরেও মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের প্রভাব পড়েছিল বাংলাদেশ সীমান্তে। তখনও কিছু গোলা এসে পড়ার ঘটনাও ঘটে।