কত কী ঘটে যাচ্ছে? সংহার ও সমাবেশ, মৃত্যু ও মিছিল, উৎপাটন ও উন্নয়ন—সব একসাথেই হতে পারছে। এবং এই সবকিছুর খবরের মাঝখানে বসে প্রত্যেকে নিজ ‘মুদ্রাদোষে’ আলাদা হওয়ার বদলে অবিকল অনুলিপি হয়ে উঠছে। কোনো ভাবান্তর ছাড়াই ভূত ও ভবিষ্যতের মিলনবিন্দু এই বর্তমানে দাঁড়িয়ে প্রত্যাদেশের মতো করে নিচ্ছে নির্লিপ্তীর পাঠ। এক ভীষণ নিস্পৃহতার আবরণ গায়ে জড়িয়ে নিজ নিজ ম্যারাথনে ছুটছে সবাই। আর রচিত হচ্ছে এক নায়করহিত পরম্পরা।
প্রশ্ন উঠতে পারে যে, ইতিহাসে এমন কোনো সময় কি থাকে, যা আদতে নায়কহীন? উত্তর দেওয়াটা সহজ নয়। অন্তত বর্তমানের ঘেরাটোপে দাঁড়িয়ে কোনো নায়কের আবির্ভাব মানচিত্র রচিত হচ্ছে কি–না, তা হলফ করে বলা মুশকিল। তবে এটুকু বলা যেতেই পারে যে, এই বর্তমান সে অর্থে কোনো নায়কের জন্ম দিলেও তা দৃষ্টিগ্রাহ্য হচ্ছে না।
‘নায়ক’ শব্দ দিয়ে আবার ভুল বুঝবেন না যেন। ‘নায়ক’ বলতে এখানে সেই মুখ্য চরিত্রের কথা বলা হচ্ছে, যে ন্যায়ের জন্য প্রাণপাত করে এবং নিজের জয়ের সাথে সাথে সামষ্টিক জয়ও নিশ্চিত করে। এই সময়ে তেমন চরিত্র কই? যেন এক প্রলম্বিত জম্বি সিনেমায় ঢুকে পড়েছে গোটা বিশ্ব।
হ্যাঁ, জম্বি সিনেমার কথা বুঝেশুনেই উল্লেখ করা হয়েছে। দুই দশকের বেশি সময় ধরে গোটা বিশ্বেই ‘জম্বি’ জঁরার সিনেমা বেশ জনপ্রিয়। মানুষ বেশ আগ্রহ নিয়ে হলিউডি এসব সিনেমায় বুঁদ হয়ে থাকে। এমন লোকও আছে—যাদের কাছে প্রথম পছন্দের চলচ্চিত্রধারাটি জম্বি। এটা এতটাই যে, ইন্টারনেট মুভি ডেটাবেজের তথ্যমতে, শুধু ইউরোপেই জম্বি ঘরাণার সিনেমার বাজার ১০০ কোটি মার্কিন ডলারের বেশি। এ ধারার সিনেমা সহজে মুখ থুবড়ে পড়ে না। হিট–সুপারহিট যদি নাও হয়, একেবারে ব্যর্থ হয় না সহজে। কিন্তু কেন? এর সাথে কি বিদ্যমান আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতার কোনো সম্পর্ক আছে?
প্রথম প্রশ্নটির উত্তর খোঁজার আগে, দ্বিতীয় প্রশ্নটির উত্তর তালাশ করা যাক। এ জন্য অবশ্য এ ধারার সিনেমার জন্ম–ইতিহাস থেকে ঘুরে আসতে হবে।
জম্বি ধারার সিনেমার জন্ম সম্পর্কে মার্ক ব্লেচার রিভিউ অব অপথামোলজিতে লিখেছেন, এমনিতে সবাই জানেন যে, জম্বি হচ্ছে সেই ব্যক্তি, যে মৃত্যু থেকে উত্থিত এবং যে জীবিতদের মস্তিষ্ক খেতে চায়। এবার একটু ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যাবে—জম্বি শব্দটি আফ্রো–ক্যারিবিয়ান সংস্কৃতি; বিশেষত হাইতি থেকে এসেছে। হাইতিসহ মধ্য–আমেরিকান দেশগুলোতে বিশ্বাস করা হতো যে, জাদুকরি বিদ্যার মাধ্যমে মৃতদের ফিরিয়ে আনা সম্ভব, যারা জীবিতদের হয়ে প্রশ্নহীনভাবে কাজ করে যাবে। মূলত দাসশ্রমের জন্য বাধ্য করতেই এই জাদুকরেরা জ্যান্ত মানুষকে জম্বিতে পরিণত করতে পারত। কী দিয়ে? পাফারফিশে পাওয়া টেট্রোডোটক্সিন নামের এক ধরনের বিষের মাধ্যমে জাদুকরেরা জ্যান্তু মানুষকে মৃত্যুর দরজায় পৌঁছে দিত, শুধু পরে তাদের পুনরুত্থিত করে দাসশ্রমে কাজে লাগানোর জন্য। মার্ক ব্লেচার বলছেন—এটুকু বিশ্বাস। বাস্তবতা হচ্ছে নানান ধর্মীয় অনুষ্ঠানের মাধ্যমে আদতে জীবিত মানুষকেই মাদকের মাধ্যমে এমন এক দশায় নিয়ে যাওয়া হতো, যাতে সে নিজেকে মৃত বলে বিশ্বাস করতে শুরু করত এবং জাদুকর বা পুরোহিতের আজ্ঞাবাহী হিসেবে নিজেকে মেনে নিত। জম্বি শব্দের উৎসের সাথে জড়িয়ে থাকা এই ইতিহাসটুকু স্মরণে রাখব আমরা, যা পরের আলোচনার জন্য জরুরি হয়ে উঠবে।
ইতিহাসের কচকচানি থেকে বেরিয়ে আসা যাক। জম্বি সিনেমায় আমরা কী দেখি? দেখি—একদল লোক টেনেহিঁচড়ে নিজেকে বয়ে বেড়াচ্ছে। কিছুটা ভয় ধরাতেই তার শরীরে নানা বিকৃতি দেখানো হয়। সে দেখতে জীবিতদের মতোই। ড্রাকুলা বা ভ্যাম্পায়ারদের মতো তার কোনো বাড়তি দীর্ঘ দাঁত থাকে না। সে ক্রমাগত এগিয়ে চলে দলবদ্ধভাবে। এক অনিঃশেষ যাত্রার দিকে তার চোখ, যদিও তা সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের জ্যোতিহীন। অন্যের মগজ খাওয়া ছাড়া তারা এমনকি সম্ভাবনারহিত। তাৎক্ষণিক ভোগকেই শুধু তাদের একমাত্র লক্ষ্য হিসেবে চিহ্নিত করা যায়।
জম্বি কোনো জাদুকর নয়
দানবের গল্প তো আজ লেখা হচ্ছে না। সেই কবে থেকে গল্পের গলি–ঘুপচিতে বিস্ময়কর ক্ষমতা নিয়ে লুকিয়ে আছে দৈত্য–দানো। সিনেমার পর্দাতেও দানবেরা হাজির হয়েছে বিচিত্র সব ক্ষমতা নিয়ে। এসবের বিপরীতে জম্বি একেবারেই আলাদা। তার বিশেষ কোনো ক্ষমতা নেই। শুধু সংক্রমণ করতে পারে সে—শক্তি নয়; রোগ। তার কোনো অতিকায় বা অন্য কোনো আকার নেই, যা দিয়ে সাধারণ মানুষ থেকে তাকে আলাদা করা যায়। যেকোনো জম্বি সিনেমায় একান্ত আপনজনও বদলে যেতে পারে জম্বিতে, হয়ে উঠতে পারে ভীষণ সংক্রামক কেউ। এই সংক্রমণ ও ভয়ংকর হয়ে ওঠার পথে তার কোনো অতিপ্রাকৃত ঘটনা বা কোনো জাদুকরি বিদ্যার প্রয়োজন হয় না। সে শুধু বিয়োগান্ত এক পরিণতির শিকার হয়।
সবখানে, সকল স্তরে জম্বিদের পদচারণা রয়েছে। শপিং মল, সেনা কমপ্লেক্স, বিদ্যালয়, গবেষণাগার, বিশ্ববিদ্যালয়, বস্তি বা অট্টালিকা—সবখানে সমভাবে নিজেকে ছড়িয়ে দেয় তারা। মার্কিন গবেষক কোলসন হোয়াইটহেডের মতে আজকের দুনিয়ার জ্যান্ত জম্বিরা এমনকি স্মৃতিরহিত।
টিকে থাকে কতিপয়
জম্বি সিনেমা বেশ অদ্ভুত। কারণ—এতে টিকে থাকাই একমাত্র লক্ষ্য। এ লক্ষ্য আবার উভয় পক্ষের জন্যই বরাদ্দ। যে জম্বি, সেও চায় অন্যকে সংক্রমিত করার মধ্য দিয়ে টিকে থাকতে। আর যে স্বাভাবিক (পর্দায় সংক্রমণ থেকে বেঁচে যাওয়া মানুষ), সেও চায় শেষতক টিকে থাকতে।
সিনেমায় অবশ্য শেষতক মানুষের জয় দেখানো হয়। বোঝানো হয়—মানুষই বাঁচল শেষ পর্যন্ত। কিন্তু সে বড় নিঃসঙ্গ বেঁচে থাকা। আগেই বলা হয়েছে—এ সিনেমায় কোনো নায়ক নেই; আছে সারভাইভার। কিন্তু সেই সারভাইভারের চোখও বেশ বেদনাজাগানিয়া। কারণ, সে তার অতি আপনজনকে দেখেছে জম্বি হয়ে যেতে, নিজ প্রিয় প্রাঙ্গণকে দেখেছে ধ্বংস হয়ে যেতে, দেখেছে গোটা ব্যবস্থা কী করে তাসের ঘরের মতো গুঁড়িয়ে যায়। সে দেখেছে—অনিঃশেষ পুনরুৎপাদন ও পুনরাবৃত্তি কী করে সবকিছুকে ধ্বংস করে দিতে পারে।
জম্বি আসলে কী গল্প বলে
জম্বিরা আসলে আমাদের কাছে আমাদের গল্পই তুলে ধরে। তারা বলে— কী করে আমরা নিজেদের দিনলিপিকে একঘেঁয়ে করে তুলছি। কী করে শুধু ভোগের মধ্যেই নিজেকে আমরা সঁপে দিয়েছি। না আক্ষরিক অর্থেই হয়তো আমরা কারও মগজ খাচ্ছি না, আক্ষরিক অর্থেই হয়তো আমরা কারও মাংস খাচ্ছি না, পান করছি না রক্ত। কিন্তু খাচ্ছি কি না?
জম্বি সিনেমায় থাকা জম্বিরা সবাই এক রকম। তাদের মতো করে এই বাস্তব জগতের নাগরিক মানুষেরাও কি এক রকম নয়? তারাও কি একই রুটিনের পুনরাবৃত্তি করে যাচ্ছে না। এমনকি নিয়ম করে যে সচেতন লোকটি খবর দেখে বা শোনে প্রতিদিন, সেও আদতে খবরের ভোক্তা কেবল। এ কারণে ফিলিস্তিনের গাজায় ইসরায়েলের বোমা হামলা, ঢাকার বিভিন্ন সড়কে বাসে আগুন, দ্রব্যমূল্যের বল্গাহীন ঘোড়া, করহারের গলি–ঘুপচি, গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধির আন্দোলন এবং ডলারের দাম বিবেচনায় মজুরি হ্রাসের মতো ফলাফল, গাজীপুর বা আশুলিয়ায় গুলিতে শ্রমিকের মৃত্যু কিংবা লিপস্টিক–ইকোনমির অন্দরমহল—এসবের কোনো কিছুই আর কাউকে ভাবিত করে না, চালিত করে না।
যেকোনো সংবাদ, যেকোনো খবর বা দৃশ্য শেষ পর্যন্ত পরিণত হয় হাস্যরসের উৎসে। কেন? এর উত্তর হতে পারে—টিকে থাকার প্রবৃত্তি। বাস্তবিক অর্থেই ভোগের ঘেরাটোপে বন্দী মানুষরূপী জোম্বিরা আর কোনো কিছু নিয়েই চিন্তিত নয়। তারা শুধু টিকে থাকতে চায়। নায়ক হওয়ার স্বপ্ন দেখাটা এখন চরম দুঃসাহস হিসেবে পরিগণিত। ফলে সে নিজেকে যেকোনো তথ্যে বা কর্মে সুখী হিসেবে দেখতে চায়, দেখাতে চায়। এটা তো আত্মপ্রবঞ্চনার কাল। সেই আত্মপ্রবঞ্চনা দিয়ে সে শুধু জাগিয়ে রাখে নিজের ভেতরে থাকা অতল ক্ষুধাকে।
পুঁজি প্রযোজিত এই ক্ষুধা এবং এর বিপরীতে মানুষের মধ্যে এখনো টিকে থাকা স্বপ্ন, যা তাকে মাঝেমধ্যেই খুঁচিয়ে জাগিয়ে তুলতে চায়—এই দুইই আসলে মানুষকে টানে। তার ভেতরের ক্ষয়িষ্ণু স্বপ্নবান সত্তাটি বলে—এই সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থাটি ভেঙে পড়ুক। ফলে জম্বি সিনেমায় সে সেই সুপ্ত বাসনাটিরই মঞ্চায়ন দেখে, যদিও এই ভেঙে ফেলায় সে বাস্তবে নিজে অংশ নিতে চায় না। এই মঞ্চায়ন তাকে নিজের ভেতরে থাকা আকাঙ্ক্ষাটিকে পরিতৃপ্ত করে। আবার বাস্তবতার সাথেও সে নিজেকে মিলিয়ে নিতে পারে। কারণ, জম্বি চরিত্রে হোক বা সেখানকার সারভাইভার চরিত্রেই হোক, সে নিজেকে আবিষ্কার করে ক্ষণে ক্ষণে।
এই যে বাস্তবতা এ থেকে এই বিশ্বের কোন মানুষটি এখন নিজেকে আলাদা করতে পারবে? এক চক্রাকার রুটিনে আবদ্ধ মানুষেরা প্রতিদিন প্রতিটি সকালে নিজেকে পুনরুৎপাদন করে। অন্যের ক্ষোভ–বিক্ষোভের হাত ও হাতিয়ার এমনকি মগজটিকেও সে খেতে থাকে তার নির্লিপ্ততা এ নিস্পৃহতা দিয়ে। অধিকার আদায়ের দাবিতে সদা চিৎকার করতে থাকা গুটিকয়ের রক্ত ও মগজ এবং সেই সূত্রে শক্তিকে নাশ করতে থাকে শুধু তাচ্ছিল্য ও উপেক্ষা দিয়ে। ক্রমে এই অধিকার সচেতনেরা, মন ও মগজের ব্যবহারকারীরা নিঃসঙ্গ থেকে নিঃসঙ্গতর হয়ে ওঠে। তারাই এ সময়ের এই বাস্তবিক ও প্রলম্বিত জম্বি সিনেমার সারভাইভার, যার হাত থেকে সকল হাতিয়ার কেড়ে নিয়েছে সমাজ, রাষ্ট্র ও অর্থনীতি। যাকে বিনাশের জন্য অগণিত জম্বি তাদের উপেক্ষা ও বিদ্রুপের অস্ত্র এবং অতল ক্ষুধা নিয়ে অপেক্ষমাণ, যারা মৃত নয়; কিন্তু মৃতের মতোই। তাদের রক্তে অলক্ষ্যে মিশিয়ে দিয়েছে কেউ শুরুতে উল্লিখিত সেই টেট্রোডোটক্সিন, যা তাকে দাসে পরিণত করেছে, যা তাকে স্মৃতিহীন, বৃহত্তর লক্ষ্যহীন এক জম্বিতে পরিণত করেছে, যার জন্য ভোগ–পুনরাবৃত্তি ও পুনরুৎপাদনই একমাত্র সত্য।
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন