একদিক থেকে দেখলে একে যুদ্ধ বলা যায় কি না, তা-ই প্রশ্নসাপেক্ষ। আক্রমণ যেখানে বলতে গেলে একপাক্ষিক, সে তো যুদ্ধের চেয়ে বরং নিপীড়িতের ওপর নিপীড়কের আগ্রাসনের সংজ্ঞায় পড়ে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের হামলার জেরে ইসরায়েল ফিলিস্তিনিদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছে ঠিকই, তবে এরপর থেকে ইসরায়েলের হামলার বিপরীতে হামাসের জবাবের যা ধরন, তাকে ঘুষির বিপরীতে বড়জোর চিমটি বলা যেতে পারে। এমন এক অসমযুদ্ধেরই শিকার ৬২ হাজার ফিলিস্তিনি প্রাণ!
যুদ্ধটা সমানে-সমানে হয়নি বলেই কি না, ফিলিস্তিনের পাশের অন্য অনেক মুসলিম দেশ কী করছে, কেন চুপ করে আছে – সে প্রশ্ন সামনে এসেছে বারেবারে। বিশেষত বাংলাদেশের মতো মুসলিমপ্রধান দেশগুলোর মানুষের মনে। প্রশ্ন ছাপিয়ে সমালোচনায় রূপ নেওয়া তিরের ফলাটা মূলত খুঁজেছে সৌদি আরবকে। বছরের পর বছর ধরে তারা নিজেদের আরব বিশ্বের নেতা হিসেবে উপস্থাপন করে এসেছে কিনা!
সৌদি আরবের ভূমিকা – বা দৃশ্যমান কোনো ভূমিকা রাখতে না পারার ব্যর্থতা - তখন সমালোচনা কুড়িয়েছে। কিন্তু এখন আবার উল্টো কারণে মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক কূটনীতির বিশ্লেষণে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে সৌদি আরব। আগামী মাসে হতে যাওয়া জাতিসংঘ অধিবেশনে যখন ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার নানা ঢংয়ের ঘোষণা দিয়েছে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, কানাডা ও অস্ট্রেলিয়া, এর নেপথ্যে দেখা যাচ্ছে, পর্দার পেছনে থেকে বড় ভূমিকা রেখেছে সৌদি আরব।
কী করেছে সৌদি আরব? গত জুলাইয়ে নিউইয়র্কে ১২০ দেশের সভায় ফ্রান্সের সঙ্গে মিলে সভাপতিত্ব করেছে তারা, যে সভার আগে-পরে দিন দশেকের মধ্যেই মূলত ফ্রান্স-যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলোর ঘোষণাগুলো এসেছে।
গত বছরও জাতিসংঘ অধিবেশনের আগে ইউরোপের তিন দেশ থেকে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা এসেছে। তবে স্পেন, আয়ারল্যান্ড ও নরওয়ের সে ঘোষণা প্রশংসা পেলেও তেমন আওয়াজ তুলতে পারেনি। এবার একই রকম ঘোষণা যখন আসছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মিত্র, জি৭-এর তিন সদস্যের দিক থেকে – যার মধ্যে দুটি ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্য আবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা কাউন্সিলের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের দুটি… একে আর খাটো করে দেখার উপায় নেই। আর এসবের পেছনে যখন সৌদি আরবের ভূমিকার কথা শোনা যায়, মুসলিম বিশ্বের তাতে আগ্রহ না বেড়ে পারে না। প্রশ্নও জাগে, সৌদি আরব আসলে করতে চাইছে-টা কী?
আরবের নেতা হিসেবে ফিলিস্তিনের পাশে সৌদি আরবের তো দাঁড়ানোরই কথা, তাতে প্রশ্ন ওঠার কিছু নেই। প্রশ্নটা ওঠে তাদের নড়াচড়ার ধরন দেখে। এতদিন শুধু কণ্ঠে আওয়াজ তোলা সৌদি আরব যে এখন ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধানে কূটনীতির টেবিলে বসছে পশ্চিমের সঙ্গে। শুধু বসেইনি, টেবিলে নেতৃত্বও দিয়েছে! নড়াচড়াটা হঠাৎ বলেই তার ‘মোটিভ’ নিয়ে প্রশ্ন জাগে। শুধুই ফিলিস্তিনের জন্য, নাকি ফিলিস্তিনের সমস্যা সমাধানের রাস্তায় নেমে তৈরি করছে আরব বিশ্বে নিজেদের দাপট আরও সুসংহত করার পথ?
ঠিক কোন জায়গায় সৌদি আরবের নড়াচড়ার ধরনটা অন্য সময়ের চেয়ে এখন আলাদা মনে হতে পারে, সেটা সম্ভবত একটু ব্যাখ্যা দাবি করে। ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীর ও গাজাসহ সিরিয়ার গোলান মালভূমি ও লেবাননে দখল করা অঞ্চল ছাড়তে ইসরায়েলকে বাধ্য করার পরিকল্পনা থেকে ‘আরব পিস ইনিশিয়েটিভে’র নেতৃত্ব তো সেই ২০০২ সালেই দিয়েছিল সৌদি আরব! লক্ষ্য ছিল ইসরায়েলের সঙ্গে আরবের দ্বন্দ্বের শেষ টানা। আরব বিশ্বে সৌদি আরবের ভূমিকা নিয়ে বিতর্কের শুরুও সম্ভবত তখন থেকেই! ১৯৩০-এর দশকে তেলের খনি আবিষ্কারের পর যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা সৌদি আরব মূলত 'আরব-পিস ইনিশিয়েটিভে'র ওই সময় থেকেই ইসরায়েলের দিকে ঝুঁকতে শুরু করে। কিন্তু ফিলিস্তিন ইস্যুকে পাশ কাটিয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা এত সহজ তো নয়!
পেট্রোডলারের ঝনঝনানি শোনানো অর্থনীতি আর মক্কা-মদিনার উপস্থিতির কারণে মুসলিম বিশ্বে সব সময়ই প্রভাবশালী সৌদি আরবকে ফিলিস্তিন ইস্যুতে কথা বলতেই হতো। কথা বলেছেও তারা। তবে এত বছর তারা সেটা করে এসেছে মূলত আরব বিশ্বের প্রতিনিধি হিসেবে। আরব দেশগুলোর সঙ্গে বৈঠক, আরব দেশগুলোকে নিয়ে বিবৃতি…এসবই ছিল তাদের আওয়াজ তোলার মাধ্যম। কিন্তু ২০১৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রথম দফায় প্রেসিডেন্ট হওয়া আর এদিকে তার পরের বছর মোহাম্মদ বিন সালমান সৌদি আরবের ক্রাউন প্রিন্স হওয়ার পর থেকে চিত্রটা বদলাতে শুরু করে। একদিকে ইসরায়েলের দিকে আরও ঝুঁকতে শুরু করে সৌদি আরব, অন্যদিকে ফিলিস্তিন প্রশ্নেও তাদের কার্যক্রমে যুক্ত হতে থাকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের মিত্ররা।
জিউয়িশ ভার্চুয়াল লাইব্রেরি জানাচ্ছে, ২০২০ সালে নিওমে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল-সৌদি আরবের গোপন বৈঠক হয়েছে, যেখানে তিন পক্ষের মৈত্রী, ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদির সম্পর্ক আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাভাবিক করা, ইরানকে ঠেকানো – এসবই মূলত আলোচ্য হলেও ফিলিস্তিন ইস্যুর সমাধান নিয়েও কথা হয়েছে। এরপর ২০২১-এ যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, জাতিসংঘ, ইইউ, প্যালেস্টাইন অথরিটি (পিএ), জর্ডান, মিশরকে নিয়ে আট পক্ষের বৈঠকে সৌদি আরব আলোচনা করেছে দ্বিরাষ্ট্র সমাধান নিয়ে। ২০২৩-এর ফেব্রুয়ারিতে রিয়াদে জর্ডান, মিশর, বাহরাইন, আমিরাত আর পিএ-কে নিয়ে আলোচনা করেছে দ্বিরাষ্ট্র সমাধান এবং গাজাকে নতুন করে গড়ে তোলা নিয়ে। এরপর যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইউরোপের দিকে হাত বাড়িয়েছে সৌদি আরব। গত বছর স্পেন, আয়ারল্যান্ড, নরওয়ে যখন ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়, সৌদি আরবের ভূমিকা আরও জোরদার হলো। গত বছরের অক্টোবরেই রিয়াদে ইইউ এবং আরব ও ইউরোপিয়ান কয়েকটি দেশকে নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকের আয়োজন করেছে সৌদি, আরেক দফা আলোচনা হয়েছে দ্বিরাষ্ট্র সমাধান নিয়ে। এর পরের মাসে মোহাম্মদ বিন সালমান বসেছেন ওআইসি ও আরব লিগের নেতাদের সঙ্গে। এরই প্রেক্ষিতে গত জুলাইয়ে নিউইয়র্কে ফ্রান্সের সঙ্গে মিলে সৌদি আরবের ওই বৈঠক, যার হাত ধরে এসেছে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য-কানাডার স্বীকৃতির ঘোষণা।
বৈঠকগুলোর ধরন, বৈঠকে সঙ্গী, আর বৈঠকের উদ্দেশ্য ও ফলাফল মিলিয়ে নিলে হয়তো বুঝে নেওয়া যাবে, সৌদি আরব কী চায়, কীভাবে চায়, কেন চায়। শুধু তো এসব বৈঠকই নয়, সৌদি আরব এর বাইরেও কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে - জি৭ বৈঠকে তাদের প্রতিনিধি যাচ্ছেন, জাতিসংঘের অধিবেশনের সময়েও সাইডলাইন বৈঠকে বসছে। যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্সে বড় বিনিয়োগও আছে সৌদি আরবের।
সৌদি আরব কী চায়? মোটা দাগে বললে, তারা ফিলিস্তিনের হাতে হাত রেখে প্রেমপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকায় ইসরায়েলের দিকে। প্রকাশ্যে ফিলিস্তিনের অস্তিত্বের নিশ্চয়তা চায়, পাশাপাশি গোপনে - অন্তত এখন পর্যন্ত গোপনে - চায় ইসরায়েল আর আমেরিকার সমর্থন।
নিওমে ২০২০ সালের নভেম্বরে সৌদি-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্রের গোপন বৈঠক যখন হয়, তার মাস দুয়েক আগেই যুক্তরাষ্ট্রের - আরও নির্দিষ্ট করে বললে সে সময়ে প্রথম দফায় প্রেসিডেন্টের আসনে বসা ডোনাল্ড ট্রাম্পের - তত্ত্বাবধানে 'আব্রাহাম অ্যাকর্ডে' সই করে ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ককে আনুষ্ঠানিকতা দিয়েছিল বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। যা ছিল ১৯৯৪ সালে জর্ডানের পর কোনো আরব দেশের আব্রাহাম অ্যাকর্ডে সই করার প্রথম ঘটনা। ওই দুই দেশের পর সই করেছে মরক্কোও। তালিকায় এরপর থাকার কথা ছিল সৌদি আরবের। আগ্রহজাগানিয়া ব্যাপারটা কী, ২০২৩ সালের অক্টোবরে যখন ইসরায়েলে হামাসের হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু হচ্ছে, সে সময়েই সৌদি আরবের আব্রাহাম অ্যাকর্ডে সই করতে যাচ্ছে বলে গুঞ্জন একেবারে চূড়ায়!
ফিলিস্তিনের জন্য কোনো একটা সমাধান বের হওয়ার আগে ইসরায়েলের সঙ্গে চুক্তিতে যাওয়া অবশ্য সৌদি আরবের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে যেত। তারা আরব বিশ্বের নেতা না! তাদের নিজ দেশের মানুষ ফিলিস্তিনের পক্ষে, ফিলিস্তিনের স্বার্থ না দেখে ইসরায়েলের সঙ্গে চুক্তিতে যাওয়া সৌদি জনগন মেনে না নেওয়ার ঝুঁকি ছিল। ওদিকে তখন পর্যন্ত আরবের 'কোল্ড ওয়ারে' তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী ইরান তো ওঁত পেতেই ছিল, সব সময়ই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্ককে নেতিবাচক ঢংয়ে দেখানো ইরান কোনোভাবেই ইসরায়েল-সৌদি সম্পর্ককে নিয়ে রাজনীতির সুযোগ ছাড়ার প্রশ্ন আসে না! ফিলিস্তিনকে অভুক্ত রেখে ইসরায়েলের সঙ্গে ডিনারের টেবিলে বসার ঝুঁকি তাই নিতে পারত না সৌদি। ইসরায়েলের সঙ্গে 'নরমালাইজেশনে'র সে চুক্তির জন্য সে কারণে সৌদি আরব শর্ত বেঁধে দিল, ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গড়ার দিকে না এগোলে ইসরায়েলের সঙ্গে চুক্তি নয়। এরপর তো যুদ্ধই শুরু হয়ে গেল, চুক্তি গেল পিছিয়ে।
এখন সৌদি আরবের ফিলিস্তিন প্রশ্নে দৌড়ঝাঁপের পেছনে কি ওই চুক্তির কোনো সম্পর্ক আছে? উত্তর খুঁজতে ম্যাপটা ফিলিস্তিন থেকে 'জুম-আউট' করে পুরো আরবে দেখতে হবে। ঘুরে আসতে হবে ইউরোপ থেকেও।
সৌদি আরব তাদের তেলের ওপর ভাসতে থাকা অর্থনীতিতে বৈচিত্র্য আনতে চায়। প্রযুক্তি ও পর্যটনে নজর তাদের। শিক্ষায়, গবেষণায়, কর্মক্ষেত্রে নারী অংশগ্রহণে সৌদি আরবকে আধুনিকায়ন করতে চায়। মুসলিম বিশ্বের তো তারা নেতাই, হজ্জ্ব-ওমরাহর জন্যও সৌদি আরব ছাড়া আর গতি নেই...সৌদি আরব এর পাশাপাশি চায় দেশটাকে 'গ্লোবাল হাব' বানাতে। ২০৩০ সালে চোখ রেখে তৈরি এই 'ভিশন ২০৩০' ঘোষিত হয়েছে ২০১৬ সালেই, তবে পরিকল্পনাটা আরও গতি পেয়েছে মোহাম্মদ বিন সালমান ক্রাউন প্রিন্স হওয়ার পর। এই ভিশনের জন্য তাদের কী চাই? বিশ্বকে বোঝানো যে সৌদি আরব বিনিয়োগের জন্য, পর্যটনের জন্য, ব্যবসায়ের জন্য কত্ত ভালো জায়গা!
ওদিকে ইউরোপসহ পশ্চিমা বিশ্বের দেশগুলোও বসেই আছে সৌদি আরবের সঙ্গে চুক্তিতে যাওয়ার জন্য। একে তো সৌদি আরব বিনিয়োগের জন্য লাভজনক, তারওপর রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের পর সৌদি আরবের তেল আরও বেশি লোভনীয় হয়ে উঠেছে পশ্চিমা দেশগুলোর কাছে। ইরান তো আগে থেকেই পশ্চিমের নিষেধাজ্ঞায় পড়ে আছে, তাদের তেলের ৯০ শতাংশ কিনছে চীন। আর ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়াও তাদের তেলের সিংহভাগ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে চীন আর ভারতের কাছে। এতে ইউরোপ পড়েছে বিপাকে। তেলের জন্য সৌদি আরবের দ্বারস্থ হতে হচ্ছে, ওদিকে সৌদি আরবের ভিশন ২০৩০-তে বিদেশি বিনিয়োগ লাগবে, তেলের পাশাপাশি অন্য ব্যবসায়িক চুক্তিও লাগবে। হয়ে গেল দুইয়ে দুইয়ে চার। ফেল কড়ি, মাখো তেল!
কিন্তু শুধু সৌদি আরব বা মার্কিন ব্লকে থাকা দেশগুলো নিয়েই তো আর আরব অঞ্চল নয়! সৌদি আরবের পরিকল্পনা আর পশ্চিমাদের সৌদির সঙ্গে ব্যবসার কন্টকাকীর্ণ পথটাকে কুসুমাস্তীর্ণ করতে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি দরকার। হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা দরকার। সিরিয়ায় 'পশ্চিম ও সৌদিবিরোধী' বাশার আল-আসাদের সরকার পতন হয়ে গেল, গাজা যুদ্ধের মধ্যেই ১২ দিনের জন্য বন্দুকের নল ঘুরিয়ে ইরানকেও আপাতত দুর্বল করে দিয়েছে ইসরায়েল। ইরান দুর্বল হওয়ায় ইয়েমেনের হুথি, ইরাকের আল-কায়েমের মতো যে গ্রুপগুলোকে ইরান অর্থায়ন করে বলে দাবি পশ্চিমের, তারা দুর্বল হলো। পরিস্থিতি এমনই থাকলে সৌদি থেকে পশ্চিমে পণ্য আনা-নেওয়ার পথে বাধা তাতে কমে বলে আশা করতেই পারে সৌদি ও পশ্চিমের কোয়ালিশন!
বাকি থাকে ফিলিস্তিন। সেখানে শান্তি নিশ্চিত করা, সন্ত্রাসের উত্থান ঠেকানো সৌদি আর ইউরোপের ব্যবসার জন্য তো বটেই, তার চেয়ে বেশি দরকার ইউরোপে শরণার্থী সংকট বাড়তে না দেওয়ার প্রয়োজনে। মিনা অঞ্চলে আগের যুদ্ধ কিংবা রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ...সবগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র ইউরোপের পেছনে মদদদাতা হিসেবে ছিল, কিন্তু এসব যুদ্ধে শরণার্থীর ধকলটা সইতে হয়েছে ইউরোপকে। আটলান্টিকের উপস্থিতি বাঁচিয়ে দিয়েছে আমেরিকাকে। কিন্তু করোনার পর ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে অর্থনীতি যেখানে নাজুক, এমন অবস্থায় গাজার শরণার্থীর ধকলও আর নিতে চায় না ইউরোপ। তারা গাজায়, ফিলিস্তিনে শান্তি চায়।
এরপর আর কী বাকি থাকে?বাকি থাকে ইসরায়েলের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্কের নরমালাইজেশন। ফিলিস্তিন প্রশ্নে নিষ্পত্তি ছাড়া ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক ঠিক করার সুযোগ নেই সৌদি আরবের। আবার পশ্চিম, ইসরায়েল ও সৌদির 'শত্রু' ইরানকে পেছনে ফেলতে ইসরায়েল-সৌদি সম্পর্কটা ত্রিপক্ষীয় জোটেরই দরকার। ভিশন ২০৩০ বাস্তবায়নে জোর কদমে হাঁটা নামা সৌদি আরব দেখাতে চায়, আরবের নেতৃত্বে তারা অপ্রতিদ্বন্দ্বী। তাদের সঙ্গে ব্যবসায়িক-সামরিক-কূটনৈতিক জোটে মিলেমিশে লাভ করতে চাওয়া পশ্চিমা মিত্ররাও সেটা না চাওয়ার কোনো কারণ নেই। ইসরায়েলের আক্রমণে ইরান যখন সামরিকভাবে ধাক্কা খেয়েছে, বাইরে পশ্চিমের নিষেধাজ্ঞার কারণে তাদের ব্যবসার সুযোগ যখন সীমিত, মূল্যস্ফীতি-বেকারত্ব-অপশাসনের কারণে ইরান ভেতর থেকেও যখন টালমাটাল...সৌদি আরবের জন্য সেটা আরও বড় সুযোগ আরব বিশ্বে এটা জানানোর যে, ইরান নয়, তাদের পাশে থাকাই লাভজনক।
সে একচ্ছত্র আধিপত্যের পথে সৌদি আরবের জন্য বাধা হয়ে এখন থেকে যাচ্ছে ফিলিস্তিন প্রশ্ন। ইউরোপের সঙ্গে মিলে তারা যদি ইসরায়েলকে চাপ দিয়ে আলোচনার টেবিলে বসতে রাজি করাতে পারে, যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়ার বিপরীতে গিয়েও ফিলিস্তিন প্রশ্নে সমাধান আনতে পারে, শুধু তেলেধন্য অর্থনীতির জোর আর মক্কা-মদিনার দেখভালের বাইরেও কূটনৈতিকভাবে সৌদি আরবের ইমেজ আরও উজ্জ্বল হবে। নাকি বলা ভালো, ইমেজটা 'এডিটেড' হবে? জামাল খাসোগি হত্যা, আফগানিস্তানে-সিরিয়াসহ নানা দেশে সন্ত্রাসবাদে অর্থায়নের অভিযোগের কারণে সৌদি আরবের ইমেজটা যে তাদের ব্যবসা ও দাপটের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায় বারেবারে। মানবাধিকার নিয়ে সচেতনরা বারেবারে ওই প্রশ্নগুলো সামনে টেনে এনে বিব্রত করেন সৌদিকে। এর বিপরীতে ফিলিস্তিন ইস্যুতে শেষ পর্যন্ত 'শান্তির দূত' হতে পারলে সৌদির জন্য সেটা হবে লুডুর বোর্ডে দুই ছক্কা পাঁচ।
কিন্তু এসবই তো সৌদি আরবের আর ইউরোপের মিলিত স্বার্থের হিসাব। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থও কিছুটা নিশ্চিত হয় বটে। কিন্তু যে প্রশ্নে ইসরায়েল-আমেরিকা আর সৌদি-ইউরোপ জোট দুই ভিন্ন অবস্থানে, সেটার সমাধানের আদৌ কিছু হবে?
সৌদি-ইউরোপ জোট দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের কথা বলে। ফিলিস্তিন তা মেনে নেওয়ার ইঙ্গিত দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি না করেনি, তবে তাদের চোখে সমাধান ইসরায়েল-ফিলিস্তিন দুই পক্ষের আলোচনায় ঠিক হতে হবে। যে আলোচনার টেবিলে তারা অবশ্য ইসরায়েলের পাশেই যে থাকবে তা কারও অজানা নয়। আর ইসরায়েল তো এ সমাধান মানতে রাজিই নয়! এতদিন যুদ্ধ করে কোনো দৃশ্যমান বিজয় (গাজার অন্তত কিছু অংশের বা পুরোটার দখল) না দেখাতে পারলে যে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর পদে থাকাই মুশকিল হয়ে যাবে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর! তাহলে সৌদি আর ইউরোপের চাপে ইসরায়েলকে - এবং আমেরিকাকেও - আলোচনার টেবিলে বসিয়েও কোনো লাভ আছে?
লাভ আছে কি নেই, কতটা আছে, সেটা নির্ভর করছে দ্বিরাষ্ট্র সমাধানে কোন সীমানা নির্ধারিত হয় তার ওপর। সৌদি-ইউরোপ জোট ১৯৬৭ সালের জুনে আরব-ইসরায়েলের ছয় দিনের যুদ্ধের আগের সীমানাকে (১৯৪৯ গ্রিন লাইন) ভিত্তি ধরে এগোনোর কথা বলে। যদিও এত বছরে ইসরায়েলের আগ্রাসনের কারণে কিছু জায়গা এদিক-সেদিক ছাড় দেওয়ার কথাও বলে তারা। কিন্তু সেটা কতটা? গাজার কতটা দখল কার থাকবে?
ফিলিস্তিন তো এক ইঞ্চিও ছাড় দিতে চাওয়ার কথা নয়। এরই মধ্যে গাজার উত্তরাঞ্চল তো বটেই, মধ্যাঞ্চলেরও কিছু অংশ খালি করার নোটিশ জারি করে ফেলা ইসরায়েলও তাদের দখল ছাড়ার কোনো কারণ নেই। দুটি কারণে - এক, বেন গুরিয়ন খালের প্রস্তাবিত পথের জন্য গাজার দখল চাই তাদের; দুই, অন্তত গাজার কিছু অংশ দখল করেছেন দেখাতে না পারলে যুদ্ধে নেতানিয়াহু নিজেকে সফল দাবি করার কোনো রাস্তাই থাকবে না। কিন্তু ১৯৪৯ গ্রিন লাইনে তো গাজার পুরোটাই ফিলিস্তিনের।
অবশ্য শতাব্দী আগে তো বর্তমান ইসরায়েলও ফিলিস্তিনেরই ছিল!
লেখক: সাংবাদিক
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]



