ফিলিস্তিন ইস্যুতে ইউরোপ কি তবে আমেরিকার বিরুদ্ধে, কেন?

আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১০:৪৩ পিএম

জুলাইয়ের শেষ আর আগস্টের শুরুতে সপ্তাহখানেকের ব্যবধানে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য আর কানাডার দিক থেকে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা দেখে অনেকের মনেই প্রশ্ন জেগেছে। আগের পর্বেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে যে, আমেরিকা কেন স্বাধীন ফিলিস্তিন চায় না বা নিদেনপক্ষে গাজা যুদ্ধের মীমাংসায় তারা কেন আন্তরিক নয়। তারপরও পরীক্ষিত শক্তিশালী তিন মিত্র কেন এমন অবস্থান নিল সে প্রশ্নটা মনে জাগেনি, এমন মানুষ সম্ভবত খুব বেশি পাওয়া যাবে না।

২০২৩-এর ৭ অক্টোবর সশস্ত্রগোষ্ঠী হামাসের হামলার জবাবে ইসরায়েল যে যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছে, লাশের পাহাড় তৈরি করে ফেলা এক বছর দশ মাস পর সেটাকে আর গণহত্যা না বলার উপায় নেই। ৬২ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি প্রাণ ঝরেছে, যার মধ্যে প্রায় ২০ হাজারই নিষ্পাপ শিশু। জাতিসংঘের অনুমান অনুযায়ী উদ্বাস্তুর সংখ্যা ২০ লাখের মতো। এতকিছুর পর, এত সময় পেরিয়ে অবশেষে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, কানাডার মনে হলো কিছু একটা না করে থাকা যাচ্ছে না!

আসলে তারা বিশ্বের কাছে একটা বার্তা পৌঁছাতে চায়। আগামী মাসে হতে যাওয়া জাতিসংঘের ৮০তম অধিবেশনে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার ইচ্ছা জানানো বিবৃতি সেই বার্তার মাধ্যম। যদিও ফ্রান্সের বাইরে বাকি দুই দেশের স্বীকৃতির পরিকল্পনায় ‘অ্যাস্টেরিক’ আছে, কিছু শর্ত পূরণ হলেই কেবল ফিলিস্তিন তাদের কাছ থেকে স্বীকৃতি পাবে।

আগেই বলা হয়েছে, জাতিসংঘের অধিবেশনের আগে এমন তৎপরতা গত বছরও দেখা গেছে। ইউরোপের তিন দেশ স্পেন, নরওয়ে ও আয়ারল্যান্ড তখন ফিলিস্তিনকে স্বীকার করে নিয়েছিল। এবার ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য আর কানাডার পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়াও একই ঘোষণা দিয়েছে। বিবৃতিগুলো এসেছেও একেবারে পিঠাপিঠি–২৫ জুলাই ফ্রান্স, জুলাইয়ের শেষ দুদিনে যুক্তরাজ্য ও কানাডা, আর ৮ আগস্ট এল অস্ট্রেলিয়ার ঘোষণা।

বিশেষ করে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স আর কানাডার ঘোষণা আলোচনার জন্ম দিয়েছে। তারা বিশ্বের শিল্পোন্নত সাত দেশের জোট ‘জি-৭’-এর সদস্য কিনা! জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্য দেশের মধ্যে ১৪৭টির স্বীকৃতি পেলেও ফলিস্তিনকে এর আগে কোনো জি-৭ জোটভুক্ত দেশ স্বীকৃতি দেয়নি। এখন একসঙ্গে তিনটি দেশই স্বীকৃতি দিতে চাইছে!

এমন তো নয় যে এই তিন দেশ চাইলেও ফিলিস্তিন কোনোভাবে জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্য হতে পারবে! যুক্তরাষ্ট্র জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য পাঁচ দেশের একটি। তারা ভেটো দিলে তো কখনোই সেটা সম্ভব নয়। ২০২৪ সালের এপ্রিলে যেমন সম্ভব হয়নি। ২০১২ সালে সর্বশেষ পদোন্নতি পেয়ে ‘সদস্যপদহীন পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র’ হয়ে যাওয়া ফিলিস্তিনকে ১৬ মাস আগে পূর্ণ সদস্য পদে উন্নিত করার প্রস্তাব ভেস্তে গেছে নিরাপত্তা পরিষদে শুধু আমেরিকার ভেটো দেওয়ায়! সেবার নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্য দেশের মধ্যেও শুধু আমেরিকাই প্রস্তাবের বিপক্ষে ছিল। ১২টি দেশ ফিলিস্তিনের পক্ষে ছিল। আর যুক্তরাজ্য ও সুইজারল্যান্ড ভোট দেয়নি। অথচ এবার যুক্তরাজ্যই নাকি ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেবে!

ফলে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডার এই স্বীকৃতির ঘোষণাকে অনেকে তাই ‘প্রতীকী’ হিসেবেই দেখেন। স্বল্পমেয়াদে বিবেচনা করলে এর বেশি কিছু মনে হওয়ার কথাও নয়। জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য পাঁচ দেশের মধ্যে রাশিয়া আর চীন তো ফিলিস্তিনকে আগে থেকেই স্বীকৃতি দিয়ে রেখেছে। ফ্রান্স আর যুক্তরাজ্য গত বছরের এপ্রিলে ভোটাভুটিতে ভেটো দেয়নি। এরপর আলাদা করে স্বীকৃতির মানে কী? এমন স্বীকৃতি মিললেই‑বা সুবিধা কী?

সুবিধা বলা যায় এতটুকুই যে, স্বীকৃতি দেওয়া মানে ওই দেশগুলো এখন ফিলিস্তিনে তাদের দূতাবাস স্থাপন করতে পারবে, ফিলিস্তিনও ওই দেশগুলোতে দূতাবাস দিতে পারবে। জাতীয় পর্যায়ে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করা যাবে। তবে ফিলিস্তিনকে আগেই স্বীকৃতি দেওয়া ১৪৭ দেশের সঙ্গে ‘যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র’ এই তিন দেশের স্বীকৃতির বড় পার্থক্যটা সম্ভবত এটা যে–ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রকে কূটনীতির টেবিলে কিছুটা একপাশে ঠেলে দেওয়া।

আগে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়া ১৪৭ দেশের মধ্যে রাশিয়া ও চীনের বাইরে বিশ্ব রাজনীতিতে প্রভাব রাখার মতো দেশ তেমন নেই। মূলত এশিয়ান ও আফ্রিকান দেশগুলো থেকেই স্বীকৃতি এসেছে। ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র সহজে সেসবকে তাদের বিরুদ্ধে ‘গ্লোবাল সাউথ’ আর ‘গ্লোবাল ইস্টে’র মিলিত লড়াই বলে উড়িয়ে দিতে পেরেছে। কিন্তু যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স ও কানাডা তো যুক্তরাষ্ট্রেরই বলয় ‘ওয়েস্টে’র অংশ! আগের স্বীকৃতিগুলো যদি বলে থাকে ‘আমরা ফিলিস্তিনের পাশে দাঁড়াচ্ছি’, এই তিন দেশের স্বীকৃতি মূলত বলছে ‘আমরা ইসরায়েলকে হুঁশিয়ার করছি’! এই তিন দেশের সমর্থন জি৭-এ যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে অন্য তিন দেশকেও ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ায় প্রেরণা জোগাতে পারে বলে ধরা করা হচ্ছে।

এতে কি ইসরায়েলের সঙ্গে–তার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে–এই তিন দেশের দূরত্ব তৈরি হবে না? এর উত্তরে অবশ্য ফিলিস্তিন আর প্রাসঙ্গিক থাকে না, ভরকেন্দ্রে চলে আসে জিওপলিটিক্স; বাংলায় যাকে বলে ভূরাজনীতি। আলোচনায় চলে আসে এই তিন দেশের ‘কস্ট-বেনেফিট অ্যানালাসিস’।

কেন এই দেশগুলো এখন এভাবে একসঙ্গে স্বীকৃতির ঘোষণাটা দিচ্ছে–সেটার বিশ্লেষণই অনেক কিছু বলে দিতে পারে। হ্যাঁ, দেশগুলোর অভ্যন্তরীণ রাজনীতির হিসাব এখানে জড়িয়ে আছে। তিন দেশেই ফিলিস্তিনের পক্ষে সমর্থন বেড়েছে। যুক্তরাজ্যে ‘মোর ইন কমন’ নামে জরিপ পরিচালন সংস্থার জুলাই মাসের জরিপ বলছে, যুক্তরাজ্যে ২৯ শতাংশ মানুষ ফিলিস্তিনের পক্ষে–সংখ্যাটা ২০২৩ সালের নভেম্বরে ছিল ১১ শতাংশ; আর ইসরায়েলের বিরুদ্ধে ক্ষুব্ধ ১৫ শতাংশ। ফ্রান্সে ইউগভ ইউরোট্র্যাকের মে মাসের জরিপে ২৪ শতাংশ মানুষ ফিলিস্তিনের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন, ইসরায়েলের পক্ষে ১৮ শতাংশ। মাত্র ১৬ শতাংশের মনে হয়েছে, ইসরায়েলের হামলা যথোপযুক্ত। কানাডায় আগস্টে লেজার৩৬০-র পোলে ৪১ শতাংশ মানুষ ফিলিস্তিনের স্বীকৃতির পক্ষে ছিলেন, ২৮ শতাংশ বিপক্ষে।

এর বাইরে সরকারি দলের ভোটের হিসাব তো ছিলই। কানাডায় অভিবাসী ভোট ফিলিস্তিনের পক্ষে, ফ্রান্সে বামপন্থীরা ফিলিস্তিনের সমর্থনে রাস্তায় নেমেছেন, লন্ডনে তো বামপন্থী কিয়ার স্টারমারের ক্ষমতায় যাওয়ার পেছনে প্রচারণার একটা বড় অংশেই ছিল ফিলিস্তিনের প্রতি সমর্থন।

কিন্তু এই ঘরোয়া রাজনীতিই তো আর যুক্তরাষ্ট্রের বিপরীতে তাদের দাঁড় করিয়ে দেয়নি! কস্ট-বেনেফিটের হিসাবটা এখানে আরেকটু জটিল। যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি বিরোধিতা তারা করছে কি না, সে হিসাবও এখানে প্রাসঙ্গিক। প্রশ্নটা মনে আসতে পারে তিন দেশের ঘোষণার পার্থক্য এবং সেটার নেপথ্যের কারণ বিশ্লেষণে গেলে।

ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রশ্নে কোনো শর্ত রাখেনি শুধু ফ্রান্স। কোন ফ্রান্স? যারা ইউরোপের নেতৃত্ব দিতে চায়, যাদের পারমাণবিক অস্ত্র আছে, যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু হলেও যারা বাণিজ্যিক ও সামরিক প্রশ্নে ঠিক যুক্তরাষ্ট্রের ওপর নির্ভরশীল নয়। 

যুক্তরাজ্যের শর্তগুলো মূলত ইসরায়েলকেন্দ্রিক। হামাসের অস্ত্র জমা দেওয়া এবং ফিলিস্তিনের রাজনীতিতে তাদের অংশ না নেওয়ার শর্ত রাখলেও তাদের মূল শর্ত–ইসরায়েলকে গাজায় যুদ্ধবিরতিতে যেতে হবে, পশ্চিম তীরে অবৈধ দখলদারি বন্ধ করতে হবে, জাতিসংঘের ত্রাণ যাওয়ার পথে বাধা দেওয়া যাবে না, আর ১৯৩৭ সালেই পিল কমিশনের প্রস্তাবিত ‘দ্বিরাষ্ট্র সমাধান’ বাস্তবায়নে এগোবে বলে কথা দিতে হবে। এই শর্তগুলোর একটিও ইসরায়েলের পূরণ করার সম্ভাবনা এই মুহূর্তে ততটাই, যতটা সম্ভাবনা সূর্য পশ্চিমে ওঠার। ইসরায়েল শর্তগুলো না মানলেও শেষ পর্যন্ত যদি যুক্তরাজ্য ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়, তাতে যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরায়েলের ক্ষতি তো হয় না। লাভ বলতে, ‘কিছু একটা করার চেষ্টা তো করেছে’ প্রচারণায় কিছুটা মুখ উজ্জ্বল হয় যুক্তরাজ্যের–পারমাণবিক শক্তি থাকলেও যারা ব্রেক্সিটের পর অর্থনৈতিক শক্তিতে পিছিয়ে গেছে। তা ছাড়া ১৯১৭-তে বেলফোর ঘোষণার মধ্য দিয়ে সব ঝামেলার শুরু যাদের হাত ধরে, ১৯৪৭-এ সব ছেড়ে যাওয়ার আগ পর্যন্ত ফিলিস্তিনকে নিজেদের ‘ম্যান্ডেটে’ রাখা সেই সাবেক জমিদার যুক্তরাজ্যের অধিকারবোধও তো একেবারে ফেলনা নয়!

আর কানাডা? অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দুই চুক্তিতে বাঁধা দেশটা লাঠি না ভেঙে সাপকেও ‘হুশহুশ’ করে তাড়িয়ে দেওয়ার রাস্তায় হেঁটেছে! তাদের সব শর্তই ফিলিস্তিনের জন্য! কী সেগুলো? পশ্চিম তীর নিয়ন্ত্রণ করা ‘ফিলিস্তিনি অথোরিটি’‑কে (পিএ) ২০০৬ সালের পর না হওয়া নির্বাচন আয়োজন করতে হবে, হামাস সে নির্বাচনে থাকতে পারবে না, হামাসকে অস্ত্র জমা দিতে হবে এবং ফিলিস্তিনকে দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের পথে হাঁটতে হবে! পিএ ও হামাস শর্তগুলো মেনে নেওয়ার আভাস দিয়েছে বটে; তবে ফাতাহ-হামাস-আল কাসেম ব্রিগেডসহ নানান মতবাদে বিভক্ত, পশ্চিমা যেকোনো সমাধানকে সংশয়ের চোখে দেখা ফিলিস্তিনিদের শেষ পর্যন্ত কোনো সমাধানে এক হওয়ার সম্ভাবনা কমই! তা হোক বা না হোক, কানাডা এই নিরাপদ পথে হাঁটার কারণ কি? তাতে ইসরায়েলের গায়ে টোকাও পড়বে না, যুক্তরাষ্ট্রেরও কিছু আসা-যাওয়ার কথা নয়। যদিও ট্রাম্প তো ট্রাম্পই। ফিলিস্তিনের পক্ষে দাঁড়ানোর ‘শাস্তি’তে কানাডার ট্যারিফ বাড়িয়ে দিয়েছেন তিনি। শেষ পর্যন্ত কানাডা জাতিসংঘ অধিবেশনে ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেবে কি না, সেই সংশয়ও তাই পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।

এ তো গেল তিন দেশের ঘোষণার ধরনের বিশ্লেষণ। মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যেই তিন দেশের হুটহাট ঘোষণার পেছনেও একটা যোগসূত্র আছে। ঘোষণাগুলো এসেছে গত ২৯-৩০ জুলাই নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদরদপ্তরে ‘ফিলিস্তিনের শান্তিপূর্ণ সমাধান ও দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের বাস্তবায়ন’ বিষয়ে ১২০ দেশের উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের ঠিক আগে-পরে। ওই বৈঠকে সভাপতিত্ব করেছে দুটি দেশ–সৌদি আরব ও ফ্রান্স। অর্থনৈতিক জোর ও মক্কা-মদিনার দেখভাল করার সুবাদে মুসলিম বিশ্বের প্রতিনিধি হয়ে যাওয়া সৌদি আরব চেয়ারটাতে বসেছে মধ্যপ্রাচ্যে আরব দেশগুলোর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে কাছের হওয়ার সুবাদে। বৈঠকের আগে আরব দেশগুলোকে ‘দ্বিরাষ্ট্র সমাধানই মুক্তির পথ’ বলে বোঝানো হয়েছে। আর ফ্রান্স সেখানে বসেছে ইউরোপের মনোনীত সেনাপতি হিসেবে। ফ্রান্স ওই বৈঠকের চার দিন আগেই ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে, বৈঠকে যা তাদের আওয়াজের জোর বাড়িয়েছে। যুক্তরাজ্য ও কানাডা বৈঠকের আগে ফিলিস্তিন প্রশ্নে ঘোষণা দেব-দেব করছিল, বৈঠকের পর পরপর দুদিনে ঘোষণা দুটি এসেছে আটলান্টিকের এপার-ওপার থেকে।

এই বৈঠক এবং এর আগে-পরে দেশগুলোর অবস্থানের প্রকাশ বুঝিয়ে দেয় তাদের কূটনৈতিক কৌশল। সবগুলো দেশই দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের কথা বারবার বলছে, কিন্তু কেন?

৮৮ বছর আগে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনকে দুটি আলাদা দেশ হিসেবে পাশাপাশি অবস্থানের রূপরেখা ঠিক করে দেওয়া পিল কমিশনের সেই প্রস্তাব এত বছরেও যে কার্যকর হয়নি, তার কারণ ঘুরেফিরে একই–সীমানা কী হবে, জেরুসালেম কার হবে, শরণার্থীদের কী হবে–প্রশ্নগুলোর সমাধান না হওয়া। ফিলিস্তিনিদের এখন এই সমাধানের ব্যাপারে জোর বিশ্বাস নেই। ইসরায়েল তো এই সমাধান মানতেই রাজি নয়। নেতানিয়াহু গত জুলাইয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে বৈঠকের পর দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের প্রশ্নে কিছু শর্ত জুড়ে দিলেও গত সপ্তাহে ইসরায়েলের আই২৪ নিউজে জানিয়েছেন, তাঁর ‘বৃহত্তর ইসরায়েল’ প্রতিষ্ঠার স্বপ্নের কথা–যা ফিলিস্তিনের অস্তিত্ব তো স্বীকার করেই না, উল্টো জর্ডান-মিশরের কিছু অংশকেও ইসরায়েলের বলে দাবি করে! যুক্তরাষ্ট্রও দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের প্রশ্নে বারবার বলেছে, এই সমাধান আসতে হবে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের নিজেদের আলোচনার মধ্য দিয়ে, কার্যত যা অসম্ভব।

তা সত্ত্বেও ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, কানাডা, সৌদি আরবের মতো দেশের দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের প্রতি এত ঝোঁক কেন?

এক, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ বন্ধে ইউরোপ মরিয়া। কারণ, শরণার্থীদের ঢলটা যে মূলত তাদেরই সামলাতে হয়। এর আগে এমইএনএ বা মিনা (মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা) অঞ্চলে যুদ্ধের সময়ে তা-ই হয়েছে। গাজায় ইসরায়েলের যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার পেছনে যুক্তরাষ্ট্রই বড় কারণ; কিন্তু শরণার্থীর ঢল তো তাদের সইতে হবে না।

দুই, মধ্যপ্রাচ্যে ইউরোপের প্রভাব বাড়ানো। রাশিয়া এই মুহূর্তে ইউক্রেন যুদ্ধেই ব্যস্ত। তাদের আর্থিক শক্তিও এখন আর চীন-যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টেক্কা দেওয়ার মতো নয়। ইসরায়েল যুদ্ধের মধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যে পশ্চিমা শক্তির বিরুদ্ধে থাকা ইরানকেও দুর্বল করে দেওয়া গেছে, কাতার তো আগে থেকেই একঘরে। চীন দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে আছে। মধ্যপ্রাচ্যে তাদের বিআরআই এগিয়ে নিচ্ছে বটে; তবে ফিলিস্তিনের ব্যাপারে তারা তেমন সরব নয়। কোনো যুদ্ধে সরাসরি কোনো পক্ষ নেওয়াটা চীনের  ইতিহাসও ঠিক সমর্থন করে না। পশ্চিমের দেশ কিংবা সৌদি আরবের মতো পশ্চিমের পক্ষের শক্তির জন্য এখনই সুযোগ মধ্যপ্রাচ্য প্রশ্নে নিজেদের ‘সমন্বয়ক’ হিসেবে পরিচয় দেওয়ার। আওয়াজটা এমন–মধ্যপ্রাচ্যে ঝামেলা? আমাদের কাছে আসো! এতদিন ফিলিস্তিন আর ইসরায়েল দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন যেমন আলোচনার টেবিলে ইসরায়েলকে ‘তির’ জুগিয়েছে, ইউরোপের দেশগুলোর সমর্থন ফিলিস্তিনকে সেখানে ‘ঢাল’ দিতে পারে। শেষ পর্যন্ত তাদের এই চাপ যদি ইসরায়েলকে আলোচনার টেবিলে বসতে রাজি করাতে পারে, দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের কোনো রাস্তা তৈরি হয়–তা যত বছর পরই হোক, এই সময়ের সমন্বয়ক হিসেবে যুক্তরাজ্য-ফ্রান্স-সৌদি আরব নিজেদের অবস্থান এমনভাবে নিশ্চিত করছে, যাতে সেটার লাভের গুড়টা যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল একা খেতে না পারে।

তিন, ইউরোপিয়ান জাত্যাভিমান। ইউক্রেন যুদ্ধের ট্র্যাজেক্টরি বলছে, এ যুদ্ধে বিনিয়োগের কিছু ফল তুলে নিয়ে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। এরই মধ্যে ইউক্রেনের খনিজের ৫০ শতাংশের চুক্তি করে ফেলেছে তারা। ন্যাটোর অংশ হিসেবে ফ্রান্স, যুক্তরাজ্যের মতো দেশ যাদের বিরুদ্ধে আমেরিকার সঙ্গে মিলে লড়েছে, সেই রাশিয়াও দনবাসের নিয়ন্ত্রণ আর ন্যাটো প্রশ্নে ইউক্রেনের ‘না’-র নিশ্চয়তা পেলেই কেবল যুদ্ধে বিরতি দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত তা-ই যদি হয়, তাহলে ইউরোপের দেশগুলো কী পেল? উল্টোদিকে ট্রাম্পের দিক থেকে আজ ন্যাটো ছেড়ে দেওয়া, কাল ন্যাটোতে অন্যদের নানা চাপে রাখার ঘোষণা তো আসছেই! চীন-যুক্তরাষ্ট্র ভাগে বিভক্ত হতে চলা বিশ্বে কোনো নির্দিষ্ট প্রাণীর তৃতীয় সন্তান বলে নিজেদের পরিচয় দিতে না চাওয়া ইউরোপীয় জোট সৌদি আরবকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে ব্যবসা বাড়াতে চায়, যেখানে ফিলিস্তিনে যুদ্ধ থামা কিংবা এই যুদ্ধের কারণে ক্রমেই বাড়তে থাকা সন্ত্রাসীগোষ্ঠীর উত্থান থামা তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতিটি হিসাবেই দেখুন তো, ফিলিস্তিনের লাভ-ক্ষতি কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে? তাদের এই সমীকরণে কোথাও থাকার কথাই-বা ছিল কী? তাদের মৃত্যু, তাদের কষ্ট–সেসব মানুষের আবেগে টোকা দিতে পারে, কিন্তু বিশ্বের মোড়লদের লাভ-ক্ষতির তাস পিটাপিটিতে সেটা শুধুই ইস্কাপনের টেক্কা। যখন যার হাতে থাকবে, তার লাভ। বাকিদের লাভের হিসেবের মধ্যে ফিলিস্তিনের জন্য এতটুকুই বরাদ্দ যে, তাদের বাঁচার অধিকারটুকু যদি কোনোভাবে নিশ্চিত হয় আর কী! এর আগ পর্যন্ত এদিকে ফিলিস্তিনে মানুষ মরবে, মুসলিম বিশ্ব তাকে দেখবে মুসলিমদের ওপর নিপীড়ন হিসেবে, বাকি বিশ্বের প্রগতিশীলদের চোখে তারা পড়বে মানবাধিকারের লঙ্ঘনে… ওদিকে পর্দার আড়ালে চলবে কূটনীতির জটিল মারপ্যাঁচ। লাশ বারেবারেই হয়ে ওঠে কূটনীতির কারেন্সি!

লেখক: সাংবাদিক

আগামীকাল পড়ুন তৃতীয় পর্ব: ফিলিস্তিনের পাশে দাঁড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্যে আসলে কী করতে চাইছে সৌদি আরব?

[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]

​সম্প্রতি ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে আটক এবং পরবর্তী ঘোষণা অনুযায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দেশ পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের বিষয়টি আন্তর্জাতিক রাজনীতির ইতিহাসে এক নজিরবিহীন ও...
আরেকটি সাধারণ আশঙ্কা হলো–এআই দিয়ে তৈরি লেখা, ছবি ও কণ্ঠস্বর জনমত ও নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারকারী অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। এই উদ্বেগগুলো যৌক্তিক। তবুও এসব উদ্বেগ আদতে আরও অস্বস্তিকর ও মৌলিক...
একদিক থেকে দেখলে একে যুদ্ধ বলা যায় কি না, তা-ই প্রশ্নসাপেক্ষ। আক্রমণ যেখানে বলতে গেলে একপাক্ষিক, সে তো যুদ্ধের চেয়ে বরং নিপীড়িতের ওপর নিপীড়কের আগ্রাসনের সংজ্ঞায় পড়ে। ২০২৩ সালের অক্টোবরে হামাসের...
গাজা যুদ্ধের দুই বছর হতে চলল। জাতিসংঘে সাধারণ পরিষদের অধিবেশন সামনে রেখে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, কানাডার মতো জি৭ জোটভুক্ত তিন দেশ ও অস্ট্রেলিয়া ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতির বিষয়ে ঘোষণা দিয়ে রেখেছে। এই ঘোষণা...
বিশ্বকাপ ফুটবল মানেই টানটান উত্তেজনা, শেষ মুহূর্তের নাটক, আর কোটি ভক্তের স্বপ্নপূরণ। কিন্তু এর উল্টো পিঠটাও বড্ড নিষ্ঠুর। সেমিফাইনালের মহারণ শেষে আজ রাত ৩টায় আমেরিকার মায়ামিতে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী...
বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়ার আগে ফ্রান্স কোচ দিদিয়ের দেশম স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এই ম্যাচ খেলতে তাদের তেমন কোনো আগ্রহ নেই। তবে জাতীয় দলের দায়িত্বের...
গত বছরের ২৭ মে তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনকে গ্রেপ্তার করে সেনাবাহিনী। আরও গ্রেপ্তার হয় তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী মোল্লা মাসুদ, শ্যুটার আরাফাত ও শরীফ। ২৪ এর ৫ আগস্টের পর একের পর এক হত্যাকাণ্ডে...
আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে খেলার মাঠ এবং পর্যায়ক্রমে সারা দেশে আন্তর্জাতিক মানের ১০টি স্পোর্টস ভিলেজ নির্মাণ করা হবে বলে জানিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী...
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর