গাজা পরিস্থিতি নিয়ে ৫ প্রশ্ন

ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকায় গত ৭ অক্টোবর ইসরায়েলি বাহিনীর নৃশংস হামলা দেখে আমি শুধু হতবাকই ছিলাম না, পরবর্তী দিনগুলোতে কী ঘটবে, তা নিয়েও ভীষণ উদ্বিগ্ন ছিলাম। তবে কিছু বিষয় যে ঘটবে, তা আগে থেকেই জানতাম। যেমন- রাজনীতির মঞ্চে যাঁরা ভাঁড়ের ভূমিকায় ছিলেন তাঁরা পিছু হটবে এবং তাঁদের ভেতর থেকে সাধারণ মানবতাবোধও গায়েব হয়ে যাবে। শুধু তাই নয়, তারা সামগ্রিক বিষয়টাকে এমন অবহেলার সঙ্গে মোকাবিলা করবে যে গাজা পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদে খাদের কিনারে গিয়ে পড়বে। ফলে ইসরায়েল–ফিলিস্তিনের সাধারণ মানুষ আরও বেশি বিরক্ত হয়ে পরস্পরের মুখোমুখি হবে এবং অবধারিতভাবে এই অঞ্চলের ভবিষ্যৎ হবে আরও সহিংসতাপূর্ণ।

গাজায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার এক মাস পর এই বিষয়গুলো আরও পরিষ্কার হয়ে গেছে। আমার অনুমানগুলো বেশিরভাগই ফলে গেছে দেখে আমি এখন আরও বেশি হতাশ হয়ে পড়েছি।

যাইহোক, চলমান এই যুদ্ধ আর কতদিন চলবে, ইসরায়েল আসলে কী অর্জন করতে চায়, আর কত মানুষ মারা যাবে এই যুদ্ধে, ইসরায়েল–আমেরিকার সম্পর্কে কি ফাটল ধরবে ইত্যাদিসহ আরও নানা প্রশ্ন এখন মানুষের মনে। আমি এখানে গুরুতর পাঁচটি প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করতে চাই।

প্রথমত: ইসরায়েল কি পরিকল্পিতভাবে গাজাকে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় পরিণত করছে?
গাজায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই উত্তর গাজার বসতবাড়িগুলো গুড়িয়ে দিচ্ছে ইসরায়েরি বাহিনী এবং গত ৭ অক্টোবরের পর থেকে গাজার উত্তরাঞ্চলের বাসিন্দাদের দক্ষিণের দিকে সরে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে ইসরায়েল। ইসরায়েল এক প্রকার বাধ্যই করছে ফিলিস্তিনিদের দক্ষিণের দিকে সরে যেতে। এর মধ্য দিয়ে ইসরায়েলের উদ্দেশ্য পরিষ্কারভাবে ফুঁটে উঠেছে। তারা চায়, উত্তর গাজার সব বাসিন্দা দক্ষিণে গিয়ে জড়ো হোক এবং দক্ষিণ গাজা ঘনবসতিপূর্ণ হয়ে উঠুক।

দ্বিতীয়ত: ইসরায়েলি বাহিনীর স্থল আক্রমণ কি আরও নৃশংস হবে?
গত মাসে ইসরায়েল–হামাস যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইসরায়েলি নেতারা বিভিন্ন জায়গায় যেসব বক্তব্য দিচ্ছেন, তা রীতিমতো ভয় জাগানিয়া। ইসরায়েলের এক মন্ত্রী বলেছেন, গাজায় পারমাণবিক বোমা ফেলে সবকিছু ধ্বংস করা হবে। একইভাবে আমেরিকান নেতাদের বক্তব্যও ভীতিকর। তারা বলছেন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বার্লিন ও টোকিওর অবস্থা যেমন হয়েছিল, গাজার অবস্থা তেমন করা হবে। হামাসের প্রত্যেক যোদ্ধাকে হত্যা করা হবে, ইত্যাদি। এমনকি কোনো নিয়মকানুনের তোয়াক্কা না করেই তারা সৈন্য পাঠানোরও হুমকি দিচ্ছে।

ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে হামাস যোদ্ধারা। ছবি: রয়টার্সএসব বক্তব্য থেকে অনুমান করা যেতে পারে যে, গাজায় ইসরায়েলি সৈন্যরা আরও নৃশংস হবে। তবে বিশ্লেষকেরা মনে করেন, নেতাদের সব বক্তব্যকেই অকাট্য হিসেবে ধরে নেওয়ার কারণ নেই। বেশিরভাগ সময়ই তাঁরা রাজনৈতিক মেঠো বক্তব্য দিয়ে থাকেন।

তৃতীয়ত: হামাসের উত্থান কেমন হবে?
হামাস একটি ‘ধারণা’। একটি ‘আদর্শ’। হামাস সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন বলেছেন, হামাস একটি বিকৃত ধারণার নাম। এ ধারণাকে পরাজিত করতে হবে। 

তবে এমন বক্তব্য বিভ্রান্তিকর। কারণ হামাসের কিছু আদর্শ আছে বটে, তবে তা সুস্পষ্ট নয়। আমাদের মনে রাখতে হবে, হামাস একটি আন্দোলনের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছিল। হামাসের পেছনে যদি কোনো ধারণা থেকে থাকে, সেটি হচ্ছে- ফিলিস্তিনের সাধারণ মানুষের মুক্তির আশাকে বাঁচিয়ে রাখা।

হামাস সদস্যদের সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে আলাপের মাধ্যমে আমি জানতে পেরেছি, অন্যান্য দলের সঙ্গে তাদের সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। তারা ব্যক্তিগত স্বার্থের চেয়ে সামগ্রিক স্বার্থকে প্রাধান্য দেয়। অন্যদিকে ফাতাহ সদস্যদের মধ্যে ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা বেশি।

হামাস একটি বড় সংগঠন এবং তাদের গঠনতন্ত্র বেশ জটিল। তাদের অনেক শাখা রয়েছে। যেমন সামরিক, কূটনৈতিক, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক, নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ এবং যোগাযোগ শাখা। হামাস এখন ইসরায়েলের সঙ্গে অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে লড়ছে। এভাবে যুদ্ধ যদি চলতেই থাকে, তবে অসংখ্য হামাস যোদ্ধা প্রাণ হারাবে, গাজার ঊর্ধ্বতন প্রশাসকেরা বরখাস্ত হবেন এবং শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিকভাবে সমস্যাটির সমাধান হওয়ার আর কোনো সম্ভাবনা থাকবে না।

হামাস তাহলে কী করবে? যুদ্ধ শেষে নিজেদের পরিবর্তন করে ফেলবে? নাকি তাদের কৌশল পরিবর্তন করে ফেলবে? দিন যত যাচ্ছে, এসব প্রশ্ন ততই সামনে চলে আসছে।

চতুর্থত: ফাতাহ কীভাবে যুক্ত হবে এই যুদ্ধে?
ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরভিত্তিক সংগঠন ফাতাহ এখন নানা ভাগে বিভক্ত। সংগঠনটির বিভক্তি ছড়িয়ে পড়েছে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত। এমন পরিস্থিতিতে অনেকেই ভাবছেন, ফাতাহর কিছু অংশ কি এই যুদ্ধে অংশ নেবে? হামাস নিয়ন্ত্রিত গাজায় কি ফাতাহর পুনরুত্থান হবে? এখনই এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া কঠিন। কারণ ফাতাহর তরুণ যোদ্ধাদের হামাসের সঙ্গে যোগ দেওয়ার যেমন সম্ভাবনা রয়েছে, তেমনি ব্যক্তিগত রেষারেষির কারণে প্রবীণ যোদ্ধাদের বিরাগভাজনও হওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে।

উত্তর গাজার বাসিন্দাদের দক্ষিণ গাজায় সরে যেতে বলছে ইসরায়েল। ছবি: রয়টার্সপঞ্চমত: ইসরায়েলে সিদ্ধান্ত নেবে কে?
১৯৮২ সালের পর থেকে এবং সম্ভবত ১৯৭৩ সালের যুদ্ধের পর ইসরায়েল এখন গাজায় সবচেয়ে বড় ও ব্যাপক সামরিক অভিযান চালাচ্ছে। এর পেছনে আসলে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে কে? প্রশ্নটি এ কারণেই উঠছে যে, ইসরায়েলের শীর্ষ রাজনৈতিক নেতৃত্ব এখন নানা ভাগে বিভক্ত। ক্ষমতার একটি অংশে রয়েছে সামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনীর নেতারা। অন্য একটি অংশে রয়েছে জাতীয়তাবাদী ও ধর্মভিত্তিক নেতারা। ফলে, গাজায় অভিযান চালানোর ব্যাপারে ইসরায়েলের সিদ্ধান্তটি সমন্বিতভাবে আসছে কি না, সেই প্রশ্ন থেকেই যায়।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এসব প্রশ্নের উত্তর নিশ্চয় পাওয়া যাবে। ততদিন পর্যন্ত ঘটনার ওপর নিবিড়ভাবে চোখ রাখতে হবে। কোথায় কী ঘটে, তা পর্যবেক্ষণ করতে হবে গভীরভাবে। কারণ ঘটনাগুলোর ভেতর থেকেই পাওয়া যাবে উত্তরগুলো।

নাথান জে ব্রাউন, জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল অ্যাফেয়ার্সের অধ্যাপক।

কার্নেগি মিডল ইস্ট সেন্টার থেকে অনুবাদ করেছেন মারুফ ইসলাম।