যুদ্ধের চেয়ে যখন বেশি বেদনাদায়ক যুদ্ধবিরতি 

গাজায় অস্থায়ী যুদ্ধবিরতির প্রথম দিনে আমরা অনেকেই বের হতে সাহস পাইনি।  এটি কার্যকর হবে কি না তা ভেবে আমরা খুব ভয়ে ছিলাম। দ্বিতীয় দিনে আমরা সাহস সঞ্চয় করে বেরিয়ে পড়লাম। দিনের আলোতে গত সাত সপ্তাহ ধরে গাজায় ইসরায়েলের অবিরাম বোমাবর্ষণের ফলে সৃষ্ট ধ্বংসযজ্ঞ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। আমরা আমাদের আশপাশের রাস্তাঘাটও চিনতে পারছিলাম না।

এমন সব জায়গা আছে যেখানে একটি ভবনও নেই। কিছুই রেহাই দেওয়া হয়নি: বাড়ি, আবাসিক টাওয়ার, দোকান, বেকারি, ক্যাফে, স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, লাইব্রেরি, শিশুদের কেন্দ্র, মসজিদ, গীর্জা সব কিছুই ধ্বংস করা হয়েছে। 
প্রথম আমরা ধ্বংস দেখেছি। এরপর থেকেই মনের ব্যথা শুরু হয়েছে। 

আতঙ্ক, শঙ্কা এবং বোমা থেকে বাঁচার জন্য ছুটে চলার মধ্যে আমাদের অনেকেই প্রিয়জনদের হারিয়ে ফেলেছি।  অনেকে তাঁদের মৃতদেহ দাফন করতে পারেননি। অনেকে ঠিকভাবে শোকটুকুও পালন করতে পারেনি।

গাজার মেডিকেল শিক্ষার্থী সাবরি ফারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্টে লিখেছেন, এটি বোঝানোর জন্য বিপর্যয় শব্দটি অপর্যাপ্ত। এটি ফিলিস্তিনি জনগণের বিরুদ্ধে একটি সম্মিলিত হত্যাযজ্ঞ।

আমি যুদ্ধের প্রথম সপ্তাহেই গাজা ছেড়ে আসি। আমি ভাগ্যবান যে ছাড়তে পেরেছিলাম। ওইদিনই ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গাজা ছাড়তে চাওয়া মানুষদের বহরে হামলা চালিয়ে ৭০ জন কে হত্যা করে। 

ইসরায়েল যে রাস্তাটিকে উত্তর থেকে দক্ষিণে লোকদের সরিয়ে নেওয়ার জন্য নিরাপদ রুট হিসেবে আখ্যায়িত করেছে তা নিরাপদ ছাড়া অন্য কিছু ছিল। গত সাত সপ্তাহ ধরে, যারা দক্ষিণের দিকে গেছে তারা ওই রাস্তার সর্বত্র বেসামরিক লোকদের মৃতদেহ পড়ে থাকার বেদনাদায়ক দৃশ্য দেখেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এসব ভয়াবহ ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। 

যখন যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয় তখন আরো ফিলিস্তিনিরা উত্তর থেকে সরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। তাঁদের আশা ছিল যে এটি করা নিরাপদ হবে। কিন্তু দক্ষিণে যাওয়ার সময় তাঁরা ইসরায়েলি চেকপয়েন্টের মুখোমুখি হয়। সেখানে তাঁদের  থামিয়ে তল্লাশি করা হয় এবং তাদের জিনিসপত্র বাজেয়াপ্ত করা হয়। আমার পরিবারের নারী সদস্য ও বন্ধুরা জানিয়েছেন যে, ইসরায়েলি সেনরা তাদের সোনা নিয়ে গেছে। পরিচয়পত্র ছাড়া আর কিছু তারা নিয়ে যেতে পারেননি।  

যারা সঙ্গে করে কিছু নিয়ে যেতে পেরেছেন তাঁরা ভাগ্যবান। ইসরায়েলি সৈন্যরাও পরিকল্পিতভাবে উদ্বাস্তুদের অপহরণ করছে। আমার অনেক বন্ধুদের ভাইবোনসহ অনেকে নির্ধারিত নিরাপদ রুট দিয়ে সরে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল। এরপর থেকে তারা নিখোঁজ রয়েছে।

ইসরায়েলিরা ফিলিস্তিনি কবি মোসাব আবু তোহাকেও গ্রেপ্তার করেছে। তাঁর মুক্তির জন্য ব্যাপক আন্তর্জাতিক প্রচারণার পরেই তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছিল। ঠিক কতজন অপহৃত হয়েছে তার প্রকৃত সংখ্যা আমরা এখনো জানি না।

গাজার উত্তর থেকে দক্ষিণে পায়ে হেঁটে যেতে সময় লাগে আট ঘণ্টা। এটি এমন একটি জায়গা যেখানে যাওয়া অনেক ফিলিস্তিনির জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে যাচ্ছে। এর কারণ তাঁরা খুব বৃদ্ধ, খুব অল্পবয়সী, খুব ক্লান্ত, খুব ক্ষুধার্ত এবং পানিশূন্য, আহত বা অক্ষম। 

যুদ্ধবিরতি মধ্যে উত্তর থেকে দক্ষিণে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।এ দিকে গেলেও যে কেউ অপহরণের শিকার হতে পারে বা মারাও যেতে পারে। ইসরায়েলি সেনাবাহিনী আমাদের ওপর লিফলেট ফেলে এই দিকে ভ্রমণ না করতে সতর্ক করেছিল। যুদ্ধবিরতির সময়েও দক্ষিণ দিকে যেতে গিয়ে ইসরায়েলি বাহিনীর হাতে দুজন নিহত হয়েছেন।   

আমার মতো  হাজার হাজার ফিলিস্তিনির গাজা শহরের নিজ বাড়িতে ফিরে আসা নিষিদ্ধ। আমার বাড়িটি এখনও আছে কি না তা দেখতে পারছি না বলে আমার খারাপ লাগছে।  অনেকের পরিবার ও বন্ধুবান্ধব রাস্তায় গুলিবিদ্ধ হয়েছে বা ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে আছে। তারা তাঁদের লাশ উদ্ধার করতে পারছে না এবং তাদের যথাযথ দাফন করতে পারছে না। 

ইসরায়েল আমাদের সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে: আমরা কোথায় যাই, আমরা কী করি, আমরা কতটা খাই বা পান করি, আমরা আহত বা ধ্বংসস্তূপের নীচে কয়েকদিন আটকে থাকা লোকদের বাঁচাতে পারব কি না । ইসরায়েল যে মানবিক সাহায্যের ট্রাক গাজায় প্রবেশ করতে দিচ্ছে তা মানবিক বিপর্যয় কমাতে পারবে না। আমরা সবে বেঁচে আছি। বোমায় না মারা গেলে আমাদের ক্ষুধা, তৃষ্ণা, ওষুধের অভাব ও ঠান্ডায় মৃত্যু হবে। 

এই যুদ্ধবিরতি আগের ৫০ দিনের চেয়ে বেশি বেদনাদায়ক । এই প্রথম গাজার জনগণ তাদের শহীদ শিশু, জবাই করা পরিবার, ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘরবাড়ি এবং ছিন্নভিন্ন জীবন দেখতে পেরেছে। কল্পনা করুন আপনি ছয় দিনের যুদ্ধবিরতিতে বেঁচে ছিলেন সাত দিনের দিন মৃত্যু হবে তার প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য।

আফাফ আল-নাজ্জার, গাজার ফিলিস্তিনি সাংবাদিক