১৬ ডিসেম্বর: পাকিস্তানের পরবর্তী নিয়াজি কে হবেন

প্রতি বছর ১৬ ডিসেম্বর তোপধ্বনির শব্দ আমার ভেতরে এক অদ্ভুত অনুভূতির জন্ম দেয়। মনে হয়, কোনো নবজাতকের প্রথম কান্না, যে জানান দিচ্ছে দীর্ঘ ৯ মাসের সংগ্রামের পর আমি এসে গেছি। এই কান্নার মধ্যে এক সুখের সন্ধান থাকে, যাকে শুধুই অনুভব করা যায়, বোঝানো যায় না। বোঝানোর সেই শক্তিও আমার নেই। বিজয়ের ৫২ বছরে এ নিয়ে অনেক লেখালিখি হয়েছে। আমি একটু ভিন্ন আঙ্গিকে বিষয়টা দেখার চেষ্টা করব। এই চেষ্টার কৃতিত্ব বা দায় সবটুকুই আমার বন্ধু পাকিস্তানের একজন সুপরিচিত সাংবাদিক হামিদ মিরের। তিনি বাংলাদেশেরও একজন বন্ধু হিসেবে পরিচিত। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে সমর্থনের জন্য তাঁর বাবা ওয়ারিশ মির বর্তমান সরকারের কাছ থেকে ফ্রেন্ডস অব লিবারেশন ওয়ার সম্মাননা (মরন্নোত্তর) পেয়েছিলেন, যা গ্রহণের জন্য ঢাকায় এসেছিলেন হামিদ মির।

হামিদ মিরের সাথে আমার পরিচয় প্রায় দুই দশক। প্রথমে টেলিফোনে। পরে ঢাকায় সামনা-সামনি। তিনিই সে দেশের প্রথম সাংবাদিক, যিনি ইসলামাবাদ প্রেসক্লাবের সামনে সমমনাদের নিয়ে ব্যানার হাতে দাঁড়িয়ে দাবি করেছিলেন, পাকিস্তান যেন বাঙালিদের কাছে, বাংলাদেশের কাছে ১৯৭১-এর বর্বরতার জন্য ক্ষমা চায়। এ জন্য তাঁর গায়ে দেশদ্রোহীর তকমা লাগাতে পিছপা হয়নি মূলধারার গরিষ্ঠ পাকিস্তানিরা, যারা কিনা শিশুকাল থেকে শিখে এসেছেন বাঙালিদের কারণে পাকিস্তান ভেঙে দু–টুকরো হয়েছে। তিনি গায়ে মাখেননি। নিজের মতে অটল থেকেছেন। তিন দিন আগে এ বিষয়ে তিনি একটি ভিডিও তাঁর নিজস্ব ইউটিউব চ্যানেলে পোস্ট করেছেন। বিস্তারিত তথ্য–প্রমাণ দিয়ে তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক শাসক ও রাজনীতিকেরা পাকিস্তান ভাঙার নিলনকশা করেছিলেন। যা হয়তো এখনো শেষ হয়নি।

পাকিস্তানি সাংবাদিক হামিদ মির। ছবি: উইকিমিডিয়া কমন্সহামিদ মির বলছেন, নিজেদের যাবতীয় অপকর্ম ঢাকতে পাকিস্তানের শাসকেরা (পড়ুন মহাশক্তিমান সশস্ত্রবাহিনী) কীভাবে দেশ ভাঙার দায় পুরোপুরি ভারতের ওপর ঠেলে দিয়ে নিজেদের পিঠ বাঁচিয়েছেন। এমনকি সে দেশের সংবাদমাধ্যমও এ নিয়ে বিশেষ কিছু বলেনি। এর জন্য দায়ীদের কাঠগড়ায় তোলেনি। কিন্তু পরিহাস হলো—ইতিহাস তো কাউকে ছেড়ে কথা বলে না। হামিদ মির একটি কথাও নিজের থেকে বলেননি। শাসনব্যবস্থার সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত এবং পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনীতির ওপরের সারির নেতাদের বয়ানের লিখিত রূপ, যা বিভিন্ন বই ও পত্রপত্রিকায় ছাপা হয়েছে, সেখান থেকে উদাহরণ তুলে এনেছেন। তাঁর বক্তব্য—পাকিস্তান ভাঙার মূল পরিকল্পক জেনারেল (পরে ফিল্ড মার্শাল) আইয়ুব খান। ১৯৬২ সালেই তিনি এই পরিকল্পনা করেছিলেন তাঁর সমমনাদের নিয়ে। কারণ জে. আইয়ুব বাঙালিদের গণতন্ত্র, স্বায়ত্তশাসন, নির্বাচন, জনগণের অধিকার—এসব দাবি-দাওয়া নিয়ে ত্যক্ত-বিরক্ত হয়ে উঠেছিলেন। তাঁর ধারণা ছিল, বাঙালি অধ্যুষিত পূর্ব পাকিস্তানকে ছেঁটে ফেলতে পারলে তিনি নিরীহ, গোবেচারা পশ্চিম পাকিস্তানিদের নিয়ে বেশ সুখে-শান্তিতে থাকতে পারবেন।

নবাব মনসুর আলি খান পতৌদির নাম আমরা সবাই মোটামুটি জানি। তিনি ভারতীয় ক্রিকেট দলের সবচেয়ে কম বয়সী অধিনায়ক। একচোখ নষ্ট হওয়ার পরও দুর্দান্ত খেলতেন। অভিনেত্রী শর্মিলা ঠাকুরের (আয়েশা খানম) স্বামী। বর্তমান প্রজন্মের জনপ্রিয় তারকা সাইফ আলি খান ও সোহা আলি খানের বাবা। কারিনা কাপুরের শ্বশুর। কিন্তু তাঁর আসল পরিচয় তিনি দিল্লির পাশে পতৌদির নবাব।

মনসুর আলি খানের দাদা নবাব ইফতেখার আলি খান পতৌদির ভাই ছিলেন শের আলি খান পতৌদি। নবাব পরিবারের সদস্য হয়েও তিনি যুক্ত হয়েছিলেন ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার আর্মিতে। ভারত ভাগের পর মেজর জেনারেল শের আলি খান পতৌদি হলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রথম চিফ অব জেনারেল স্টাফ (সিজিএস)। শের আলি খান সাহেব অবসর নেওয়ার পর একটি বই লিখেছিলেন। নাম—‘দ্য স্টোরি– সোলজারিং অ্যান্ড পলিটিকস ইন ইন্ডিয়া অ্যান্ড পাকিস্তান’। এই বইয়ে তিনি লিখছেন, ১৯৫৮ সালে সামরিক শাসন জারির অনেক আগে থেকেই সেনাবাহিনীকে আস্থায় নিয়ে দেশের ক্ষমতা দখলের বিষয়ে মনস্থির করেছিলেন জেনারেল আইয়ুব খান। মে. জেনারেল পতৌদি তাঁকে বলেছিলেন, ‘এটা করবেন না।’ আইয়ুবের জবাব ছিল, ‘আমাকে রাজনীতি সামলাতে দাও। তোমরা সবাই এর বাইরে থাক।’ এরপরে আরও যা বলেছিলেন, তা প্রায় সব দেশের সামরিক শাসকেরাই বলে থাকেন। অপদার্থ ও দুর্নীতিবাজ ব্লাডি পলিটিশিয়ান ও সিভিলিয়ানদের সবক শেখাবেন তিনি।

মে. জেনারেল পতৌদি আইয়ুবকে অনেক বোঝানোর চেষ্টা করলেন। তিনি বইয়ে লিখছেন, ‘আমি সবসময় জোর দিয়েছিলাম ইউনিফর্ম পরে রাজনীতির ময়দানে খেলতে নামা খুবই বিপজ্জনক। এটা সেনাবাহিনীকে ধ্বংস করে দেবে। কিন্তু আমার কোনো কথাই তিনি (আইয়ুব) শুনলেন না।’ এখানেই শেষ নয়।

পাকিস্তানের সাবেক আইনমন্ত্রী বিচারপতি (অব.) মোহাম্মদ ইব্রাহিমের লেখা দিনলিপির সংকলন ‘ডাইরিজ অব জাস্টিস মোহাম্মদ ইব্রাহিম: ১৯৬০–১৯৬৬’ (বামে) এবং তাঁর স্থলাভিষিক্ত বিচারপতি মুনিরের লেখা ‘ফ্রম জিন্নাহ টু জিয়া: ফেইলিওর অব ল অব নেসেসিটি’ (ডানে) বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: লেখকচার বছর সেনাশাসক থাকার পর জেনারেল আইয়ুবের খায়েশ হলো তিনি নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট হবেন। ব্রিটিশদের সূত্রে পাওয়া পার্লামেন্টারি ডেমোক্রেসি বা সংসদীয় গণতন্ত্রের পরিবর্তে প্রেসিডেন্সিয়াল ফর্ম অব ডেমোক্রেসি বা প্রেসিডেন্ট-কেন্দ্রিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রবর্তনের কথা ভাবলেন। ভাবা মানেই কাজ। ডাক পড়ল আইনমন্ত্রী বিচারপতি (অব.) মোহাম্মদ ইব্রাহিমের। তিনি একজন বাঙালি। আইয়ুব তাঁর কাছে মনের ইচ্ছার কথা জানাতেই বিচারপতি ইব্রাহিম তা পত্রপাঠ খারিজ করে দিলেন। বললেন, ‘প্রেসিডেন্ট কেন্দ্রিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রবর্তন করবেন না। এটা পাকিস্তানকে ভেঙে দেবে।’

হেলমেট ছাড়াই আলোচনায় নেমে আইনমন্ত্রীর অভাবিত বাউন্সার একেবারে থুতনিতে গিয়ে লাগে পাকিস্তানের সর্বময় কর্তা জেনারেল আইয়ুবের। তবে তাঁকে বরখাস্ত করতে হয়নি। প্রেসিডেন্টের মনোভাব বুঝতে পেরে পদত্যাগ করেন বিচারপতি ইব্রাহিম। এরপর নতুন আইনমন্ত্রী হিসেবে তাঁর জায়গায় আইয়ুব বেছে নেন পাঞ্জাবের মানুষ বিচারপতি মুনিরকে। বিচারপতি মুনিরের আবার ট্র্যাক রেকর্ড ভালো ছিল। তিনি সামরিক শাসক আইয়ুবের সবকিছুরই আইনি মান্যতা দিয়েছিলেন। তিনিই জে. আইয়ুবের বেসিক ডেমোক্রসির ফরমুলা মেনে নতুন সংবিধান রচনায় হাত দিলেন। মারহাবা পেলেন বসের কাছ থেকে। ঘনিষ্ঠ হলেন। বিচারপতি মুনিরের মতো মানুষেরা অপকর্মে সিদ্ধহস্ত হলেও লেখাপড়াটা জানতেন। তাই পরে একটি বই লিখেছিলেন। নাম— ‘ফ্রম জিন্নাহ টু জিয়া: ফেইলিওর অব ল অব নেসেসিটি’।

মুনির লিখেছেন, ‘আইয়ুব তাঁকে বলতেন, এই বাঙালিরা সমসময় অভিযোগ করে, বঞ্চনার কথা বলে ঘ্যানঘ্যান করে। দেখ তো এদের সাথে সম্পর্ক কীভাবে শেষ করা যায়। প্রভু আজ্ঞা মেনে বিষয়টি নিয়ে আলোচনার জন্য মুনির দেখা করলেন বাঙালি মন্ত্রী রমিজউদ্দিনের সাথে। কুমিল্লার দাউদকান্দির মানুষ রমিজউদ্দিন পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় যোগাযোগমন্ত্রী ছিলেন। সেই সাক্ষাতের বিবরণ বিচারপতি মুনির এভাবে বইয়ে লিখেছেন, ‘One day I was talking to Mr. Ramizuddin who had been a minister in Bengal or East Pakistan. I broached the matter to him. His reply was prompt and straight. He asked me whether I was suggesting secession. I said, yes or something like it as confederation or more autonomy. He said, ‘look here we are the majority province, and it is for the minority province to secede because we are Pakistan.’ (একদিন আমি জনাব রমিজউদ্দীনের সাথে কথা বলছিলাম, যিনি বাংলা বা পূর্ব পাকিস্তান থেকে মন্ত্রী ছিলেন। আমি তাঁর কাছে বিষয়টি তুলে ধরলাম। তাঁর উত্তর ছিল দ্রুত ও সোজাসাপটা। তিনি আমাকে জিজ্ঞেস করেছিলেন যে আমি আলাদা হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছি কিনা। আমি বললাম, হ্যাঁ বা কনফেডারেশন বা আরও স্বায়ত্তশাসনের মতো কিছু। তিনি বলেন, ‘দেখুন এখানে আমাদের প্রদেশ সংখ্যাগরিষ্ঠ, এবং এটা সংখ্যালঘু প্রদেশের ব্যাপার, তারা ঠিক করুক বিচ্ছিন্ন হবে কিনা। কারণ আমরা পাকিস্তান।)

বিষয়টি এখানেই শেষ হয়। হামিদ মির লিখছেন, এই বই প্রমাণ করে পাকিস্তান সরকারের দুই প্রধান– একজন প্রেসিডেন্ট ও সেনাপ্রধান জেনারেল আয়ুব খান ও অন্যজন আইনমন্ত্রী বিচারপতি মুনির, তাঁরা চেয়েছিলেন পাকিস্তান ভেঙে দু টুকরো হোক। এ জন্য বাঙালিদের কাছে প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল।

পাকিস্তান নিয়ে ব্রিটিশ সাংবাদিক হারবার্ট ফেল্ডম্যান একটা বই লিখেছেন। নাম ‘দ্য এন্ড অ্যান্ড বিগিনিং পাকিস্তান ১৯৬৯–১৯৭১’। বইয়ে আইয়ুব খানের একটা সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়েছে। সাক্ষাৎকারটি ছাপা হয়েছিল ১৯৭২ সালের ১ এপ্রিল লন্ডনের টেলিগ্রাফ পত্রিকায়। সেখানে আয়ুব পরিষ্কার বলেছেন, ‘I had plan to offer independence to east Pakistan, but that certain things came in the way and I could not do it.’ (পূর্ব পাকিস্তানকে স্বাধীনতা দেওয়ার পরিকল্পনা আমার ছিল। কিন্তু কিছু জিনিস এমনভাবে আসছিল যে, আমি তা করতে পারিনি।)

জে. আইয়ুব এই কাজের জন্য খান আব্দুল ওয়ালি খানের মতো বিশিষ্ট রাজনীতিককেও ধরে ছিলেন। ওয়ালি খান ছিলেন ‘সীমান্ত গান্ধী’ বলে পরিচিত খান আব্দুল গফফার খানের ছেলে। যাকে আইয়ুবের সরকার পাকিস্তানের সাথে বেইমানি করার অভিযোগে একাধিকবার গ্রেপ্তার করে। বাঙালিদের আলাদা করার জন্য সেই ওয়ালি খানের দ্বারস্থ হন এই সেনাশাসক। সেটা ১৯৬৮ সাল। আইয়ুব তখন বেশ ভয়ে ছিলেন, কখন কী হয়ে যায়। কারণ, তিনি যাদের আলাদা করতে চাইছেন, তাদের ওখানে আন্দোলন তখন তুঙ্গে। তার আঁচ কিছুটা হলেও পশ্চিমে গিয়ে লাগছে। ফলে তাঁর বিচলিত হওয়ার যথেষ্ট কারণ ছিল। এর মধ্যে ১০ বছর মসনদে কেটে গেছে, ফলে বিপদ আসন্ন এটা বোঝার মতো হাঁটুতে বুদ্ধি ছিল আইয়ুবের।

ওয়ালি খানকে বললেন জে. আইয়ুব, ‘আমার বিরুদ্ধে এত কিছু বলো না। তাহলে আবার সামরিক শাসন চলে আসবে। ওয়ালি খান মনে রেখ, পূর্ব পাকিস্তান থেকে যত দিন আলাদা হতে না পারব, ততদিন আমি কিছুই করতে পারব না। আমার একটা স্থিতিশীল পাকিস্তান জরুরি।’ ওয়ালি খান তাঁকে কোনো ধরনের সাহায্য করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। বলেন, ‘আজ পূর্ব পাকিস্তান নিয়ে বলছেন, কাল উত্তর–পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ নিয়ে বলবেন না, এর কোনো গ্যারান্টি আছে।’ ফলে সেখানে ব্যর্থ তিনি।

আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান ও জুলফিকার আলী ভুট্টোর এডিসি হিসেবে কাজ করা আরশাদ শামি খানের লেখা ‘থ্রি প্রেসিডেন্টস অ্যান্ড এইড: লাইফ, পাওয়ার অ্যান্ড পলিটিকস’ বইয়ের প্রচ্ছদ। ছবি: লেখকএত কথা বলার অর্থ হলো আইয়ুবের এই দুর্বুদ্ধি থেকে কোনো শিক্ষাই নেননি পাকিস্তানের জেনারেলরা। আইয়ুবের পরে জেনারেল ইয়াহিয়া এসে ৭০-এর নির্বাচন দিলেন। সবাই বাহ বাহ করে উঠল। কিন্তু আরশাদ শামি খান তাঁর ‘থ্রি প্রেসিডেন্টস অ্যান্ড এইড: লাইফ, পাওয়ার অ্যান্ড পলিটিকস’ বইয়ে এর গোপন তথ্য ফাঁস করে দিয়েছেন। পাকিস্তান বিমানবাহিনীর এই কর্মকর্তা আইয়ুব, ইয়াহিয়া ও জুলফিকার আলি ভুট্টোর এডিসি ছিলেন। কাছ থেকে অনেক কিছু দেখেছেন। ইয়াহিয়া তাঁকে বলেন, ‘মুজিব তো অনেক আসন পেয়ে যাবে। দেখ, অন্য কী করা যায়।’ ১৯৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগকে ঠেকাতে পাকিস্তানের সামরিক সরকার দুই কোটি রুপি বরাদ্দ করে। আর এই অর্থ তুলে দেওয়া হয় ঢাকায় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগের প্রধানের  হাতে। সামরিক গোয়েন্দা বিভাগ ইয়াহিয়াকে এই তথ্য দেয় যে, আওয়ামী লীগ ১৬২টি আসনে মধ্যে ৬০ শতাংশও পাবে না। আর পশ্চিম পাকিস্তানে জুলফিকার আলি ভুট্টোর দল ১৩৮-এর মধ্যে ৪০ শতাংশ আসন পাবে কিনা সন্দেহ। অর্থাৎ, যতই লোক দেখানো অবাধ ও সুষ্ঠু ভোট হোক না কেন কেউই ন্যাশনাল অ্যাসেমব্লিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাচ্ছে না। অতএব ইয়াহিয়ার মেরে মজা। রাজনীতিকদের নিয়ে আর কোনো সমস্যা নেই।

কিন্তু বিধি এভাবে বাম হবে কে জানত! ১৬২ আসনের মধ্যে আওয়ামী লীগ একাই ১৬০টি পেয়ে সব কেঁচেগন্ডুষ করে দেবে, ইয়াহিয়া বা তাঁর সাগরেদরা বুঝতেই পারেননি। এই নির্বুদ্ধিতার ফলে শুধু তাঁর দেশ দু টুকরো হয়নি, ৯৩ হাজার সৈন্যকে যুদ্ধবন্দি হিসেবে আটক হতে হয়েছে।

তারপরও কি আইয়ুব-ইয়াহিয়ার উত্তরসূরিরা কোনো শিক্ষা নিয়েছেন। বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের কাজকর্ম দেখে তেমনটা মনে হয় না। বিপর্যস্ত অর্থনীতি, বেহাল আইন শৃঙ্খলা ব্যবস্থার মধ্যে রাজনীতি নিয়ে খেলা করে চলেছেন তিনি। অনেকটা জেনারেল ইয়াহিয়ার মতোই কাজ করছেন জে. আসিম মুনির। আসলে ১৬ ডিসেম্বর, ১৯৭১ পাকিস্তানি সামরিক বাহিনীকে কোনো শিক্ষাই দিতে পারেনি। একরাশ মিথ্যা বলা আর দেশের মানুষের ওপর হামলে পড়া অব্যাহত রাখা ছাড়া। ফলে পরের আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজী কে হবেন, তা তারা এখনই ঠিক করে রাখতে পারে।

লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল মিডিয়া, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন