একজন নারী বাড়ি ফিরছেন। অফিস শেষে বাড়ি ফেরার এই সময়টা অনেক বেশি স্বস্তির হয়। সন্ধ্যায় যেমন পাখিরা নীড়ে ফেরে, তেমনি কর্মজীবী মানুষেরাও ফেরে। হয়তো মাথায় থাকে বাড়ি ফিরে প্রিয়জনদের নিয়ে কিছুক্ষণ সময় কাটানোর ইচ্ছা। হয়তোবা থাকে বাসার বাজারের হিসাব, কিছু কিনে নিয়ে যাওয়া উচিত কিনা – সেই ভাবনাও মাথায় ঘোরে। এত কিছু মাথার ভেতরে থাকার পর মাথার বাইরেটা বাঁচানোর ভাবনা কি ততটা প্রবল থাকে?
এই শহরের ফুটপাতগুলো যেমন, তাতে হেঁটে বাড়ি ফেরাও এক সংগ্রামের নাম। ফুটপাতে গাড়ি উঠে যাওয়াও তো এ দেশে দুর্লভ ঘটনা নয়। তবে ওই নারী অন্যান্য পথচারীদের মতো গা বাঁচিয়েই চলছিলেন। হয়তো আশপাশের গাড়ির হর্নের দিকেই তাঁর নজর ছিল বেশি। বিপদ ওদিক থেকে আসতে পারে বলেই বোধ হয়েছিল হয়তো। কিন্তু হুট করে তাঁর মাথায় উড়ে এসে পড়ল যমদূতরূপী ইট মতান্তরে সিমেন্টের তৈরি ব্লক!
নিমেষে ওই নারী লুটিয়ে পড়লেন রাস্তায়। সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ করা ভিডিও চিত্রে অন্তত সেটাই দেখা গেছে। তিনি আর উঠলেনই না। আরও কিছু উড়ে এসে মাথায় পড়ার ভয় মনে নিয়েই তাঁকে ঘিরে ধরেছিলেন বাকি পথচারীরা। শেষে হাসপাতালেও নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা দীপু সানা আর চোখ খোলেননি। বাড়ি ফেরার যাত্রাই হয়ে গেছে তাঁর অগ্যস্ত যাত্রা। আধুনিক বিজ্ঞানকে ভরসা মানলে, হয়তো তিনি জানতেও পারেননি কেন তিনি প্রাণটা হারালেন!
দীপু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করেছিলেন। চাকরি করছিলেন বাংলাদেশ ব্যাংকে। এ দেশের সমাজ বাস্তবতা ধরলে তিনি বেশ ‘নিরাপদ’ ছিলেন। তাঁর পেশার সুস্পষ্ট সুরক্ষা ছিল। ব্যক্তিজীবনে স্বামী-সন্তান নিয়ে গঠিত সংসারে স্থিরতাও ছিল। অন্তত তাঁর মৃত্যুর পর সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে পাওয়া পোস্টগুলো দেখে সেটিই মনে হয়। নিশ্চিতভাবেই মৃত্যুর কারণ হিসেবে তাঁরা অন্য কোনো কিছুকেই ভয় পেতেন। অথচ এখন সংবাদমাধ্যমের সামনে প্রিয়তমা স্ত্রীর মৃত্যুর কারণ বর্ণনায় স্বামী তরুণ বিশ্বাসকে বলতে হচ্ছে ইট বা সিমেন্টের ব্লকের নাম। সেটা এতটাই অনাকাঙ্ক্ষিত যে, নিশ্চিত করেই বলা যায়, কথাগুলো বলার সময় তরুণ বিশ্বাস সেই কারণকে বিশ্বাস করতে পারছেন না!
আমরা বলতেই পারি যে, মৃত্যু একটি অনাকাঙ্ক্ষিত ও অনিশ্চিত বিষয়ই। সেটি যে কোনো সময়ই আসতে পারে এবং বলে-কয়ে অন্তত আসে না। এভাবেই পুরো বিষয়টা অদৃষ্টের হাতে ছেড়ে দেওয়াই যায়। কিন্তু ইট বা সিমেন্টের তৈরি ব্লক নিশ্চয়ই আকাশে ওড়ে না! কেউ না কেউ ছোড়ে বা ফেলে। অন্তত পাখি ঠোঁটে করে আকাশে উড়তে উড়তে পাতা ফেলার মতো করে ইট ফেলে না। ফেলে মানুষ বা মানুষ সম্বন্ধীয় কিছুই। যিনি ফেলেছেন, তিনি নিশ্চয়ই এতক্ষণে জেনে গেছেন, তাঁর ফেলা ইটে কার প্রাণ গেছে। না জানার কোনো কারণই নেই। দীপুর মরে যাওয়ার ভিডিও যে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ভাইরাল। এমন সহজলভ্য মৃত্যুর উদাহরণ কে না প্রত্যক্ষ করতে চায়!
অর্থাৎ, দীপুর মরণ এসেছে আরেক মানুষের হাত ধরেই। হয়তো তার অসাবধানতায়, উপেক্ষায়, বা নিতান্তই মজার ছলে। এই দেশেই তো চলন্ত ট্রেনে পাথর ছোঁড়া হয়। ডানাহীন সেই উড়ন্ত পাথরে কত মানুষ আহত হলো, নিহত হলো, রেলবিভাগ কত বিজ্ঞপ্তি দিল, অনুরোধ জানাল – তাও কি এই অকাজ একেবারে বন্ধ হলো? এভাবে শুধুই মজার ঠেলায় কত মানুষ যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং হচ্ছে, তার কি ইয়ত্তা আছে?
তাই অন্যের প্রাণের এরূপ অযথা সংহারে এই দেশের মানুষ হিসেবে আমরাই দায়ী। দীপু সানার হত্যাকারী এক অর্থে আমরাই। আমাদের কারণেই একটি তিন বছরের শিশুকে বাকিটা জীবন মায়ের স্মৃতি হাতড়ে বেড়াতে হবে। পুরনো অ্যালবামের ছবি ঘেঁটে মায়ের মুখটা স্মরণে গাঁথতে হবে। কল্পনাবিলাসী মনে শুধুই আঁকতে হবে মায়ের কল্পিত স্মৃতি!
এই ধারণাটুকুই আসলে রাজধানী ঢাকায় অকালে মরে যাওয়া মা-ছেলে বা দীপু সানার মৃত্যুকে স্বাভাবিক করে ফেলে। আমরা হয়তো ধরেই নিয়েছি যে, এভাবেই রাজধানীতে কিছু মানুষ মরে যাবে। এসব আগুনের উৎস সম্পর্কে কখনোই হয়তো আর জানা হবে না আমাদের। আমরা হয়তো জানবই না, দীপু সানার মাথাকে দুমড়ে দেওয়া ইট বা সিমেন্টের ব্লকটি কীভাবে ডানা পেয়েছিল! ধুলোর স্তুপে হাজার ফাইলের ভিড়ে হারিয়ে যাবে কিছু অপঘাতে মৃত্যুর ফাইল।
তাই প্রাথমিকভাবে মায়ের নাম শারমিন বলে জানা গেলেও মরে যাওয়া শিশু ছেলেটির নাম জানতে আমাদের গলদঘর্ম হতে হবে। এই দেশের প্রচলিত ব্যবস্থায় ছেলেটি যে অজ্ঞাতকুলশীল! ওর নাম জানা-না জানা ঐচ্ছিক বিষয় অনেকটাই। শেষ পর্যন্ত এই মৃত্যুগুলো হয়ে থাকে কেবলই কোলাটেরাল ড্যামেজ! হয়তো কারও কিচ্ছুই এসে যায় না এসবে।
শরিয়তপুরে সম্প্রতি এক ক্ষেতে গম খাওয়ার কারণে বিষ দিয়ে ১২টি পাখি মেরে ফেলা হয়েছে। এটা নিয়েও আলোচনা হবে হয়তো খানিকটা। কিন্তু হারিয়ে যাবেন দীপু, শারমিনরা। কারণ মানুষ তো এখনো বিরল হয়ে ওঠেনি। তার জীবনের আর দাম কত? আসুন, আমরা বরং পরের ঘটনার জন্য অপেক্ষা করি।
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন