পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই লাভরভের একটা কথা বেশ মনে ধরেছে। তিনি বলছেন, ‘আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে কোনো আদর্শ আছে বলে আমি বিশ্বাস করি না।’ লাভরভ প্রায় ২০ বছর রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বে আছেন। এর আগে ওই মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেছেন দীর্ঘ দিন। ফলে তাঁর কথাটা একেবারে ফেলনা নয়।
হঠাৎ করে এই প্রসঙ্গ আসার কারণ বাংলাদেশের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। প্রথম থেকেই এই নির্বাচনে দেশের অন্যতম বড় দল বিএনপি শর্তসাপেক্ষে অংশ নেওয়ার কথা বলায় বিষয়টি জটিল হয়ে ওঠে। তাদের প্রধান শর্ত পূরণ না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত দলটি নির্বাচনে অংশ নেয়নি। সমমনা দলগুলোও বিএনপিকে অনুসরণ করে। দেশের মধ্যেকার এই রাজনৈতিক মতপার্থক্য নিজেরা মেটাতে না পারায় স্বাভাবিকভাবে বাইরের দেশগুলো এ নিয়ে নিজেদের মতো মন্তব্য করতে থাকে। এর কোনোটা সরকারি দল আওয়ামী লীগের পক্ষে যায়। আবার একটা বড় অংশ তাদের পক্ষে গেছে বলে বিএনপি ধরে নিয়েছিল। ফলে নির্বাচনজুড়ে দেশের মানুষের চেয়ে, যাদের কিনা কথায় কথায় দেশের মালিক বলা হয়, তাদের বাদ দিয়ে বিশেষ কিছু দেশের ঊর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তির বক্তব্য অতিরিক্ত গুরুত্ব পেতে থাকে। যা কিনা পঞ্চাশোর্ধ্ব একটি দেশের প্রাজ্ঞ রাজনীতিকদের কাছে মানুষ একেবারেই আশা করেনি।
এখানে লক্ষ্যণীয়—এই বিবাদে বিদেশি অংশীজনদের মধ্যে কেন্দ্রীয় চরিত্রে ছিল আমেরিকা। দেশটি প্রথম থেকে শেষ পর্যন্ত বলে এসেছে—নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক হতে হবে। কিন্তু অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন মানে প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে শেখ হাসিনার পদত্যাগের মাধ্যমে নির্দলীয়, নিরপেক্ষ সরকার প্রতিষ্ঠা এবং বিএনপি ও এর সমমনা দলগুলোর নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অর্থই হলো নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক—এটা যাঁরা ধরে নিয়েছিলেন ভুলটা তাঁদের সেখানেই হয়ে গেছে। আসলে তাঁরা দেশ হিসেবে আমেরিকার সরকারি বক্তব্যের একটা নিজস্ব ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছেন। আর সেই ব্যাখ্যায় ঘি ঢেলেছে আমেরিকার ভিসা নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা ও ‘ঘটনার ওপর নজর রাখছি’ ধরনের কথাবার্তা।
কিন্তু একটু খতিয়ে দেখলে সবাই বুঝবেন অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ নির্বাচন মানে নিরপেক্ষ নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন নয়। আর নির্বাচন বর্জনের ব্যাপারে বিএনপির নিজস্ব সিদ্ধান্ত মানে নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হয়নি—এটা কিন্তু নয়। কারণ, আমেরিকার পক্ষে এ ধরনের সুনির্দিষ্ট কথা বলা কঠিন। আমাদের এখানে যে তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল, তা অধিকাংশ গণতান্ত্রিক দেশে নেই। সেসব দেশে নির্বাচনের পদ্ধতি ও অনুষ্ঠান নিয়ে নানা প্রশ্ন আছে, সেখানেও ক্ষমতাসীন শাসকদলের নেতৃত্বে ভোট হয়ে থাকে। এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতির একমাত্র অনুকারক পাকিস্তান। সেখানকার সমস্যাটা দেখুন। গত আগস্টে ক্ষমতা নেওয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কথা ছিল নভেম্বরের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠানের। তা পেছাতে পেছাতে ৮ ফেব্রুয়ারিতে গেছে। এখন ইরানের সাথে পাকিস্তানের যে সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, তাতে নির্বাচন নিয়ে আশঙ্কার পাশাপাশি অনির্বাচিত সরকারের মেয়াদ বেড়ে চলেছে। এসব কারণে যেসব দেশে গণতন্ত্র স্থায়ী রূপ নিয়েছে, তাদের পক্ষে এ ধরনের ব্যবস্থার পক্ষে জোর সওয়াল করা খুবই কঠিন। আর আমেরিকা! যে দেশে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট (ডোনাল্ড ট্রাম্প) নিজে প্রার্থী হিসেবে হেরে গিয়ে ভোট নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তাঁকে জোর করে হারিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন—সেখানে কি তাহলে নতুন কোনো ব্যবস্থার দরকার পড়বে? এটা এই শিক্ষা দেয়, নিজস্ব কোনো ব্যবস্থা যদি গড়ে তুলতে হয়, তাহলে তা নিজেদেরই করতে হবে। বাইরে থেকে কেউ এসে করে দেবে না। এর জন্য যে আন্দোলন–সংগ্রামের প্রয়োজন, তা করার দায়িত্বই রাজনৈতিক দলগুলোরই।
কেউ কেউ হাতেপায়ে ডান্ডাবেড়ি পরে স্বজনের জানাজায় অংশ নিচ্ছেন। এর দায় কে নেবে? এমনটা যে হতে পারে, তা বোঝার জন্য কোনো বড় পণ্ডিত হওয়ার দরকার পড়ে না। আন্দোলন-সংগ্রামে এমনটা হতেই পারে—তাপ-নিয়ন্ত্রিত বসার ঘরে আরামকেদারায় গা এলিয়ে এ কথা বলার অধিকার বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব রাখেন না। অবশ্য তাঁরা হয়তো এখনো এই অপেক্ষায় আছেন, ‘দেখ একতরফা ভোট করে এই সরকার কতদিন টিকতে পারে?’
নির্বাচন নিয়ে বিএনপির অনুমান ঠিক হলে, এর ১০ দিনের মাথায় ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত পিটার হাস নতুন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদের সাথে দেখা করতেন না। এই সাক্ষাতের পর পিটার হাস কী বলেছেন? বলেছেন, নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা, ব্যবসার সম্প্রসারণ, রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান ও জলবায়ু পরিবর্তনে সহযোগিতার মাধ্যমে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে চায় আমেরিকা। তিনটি শব্দ একটু খেয়াল করুন—নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা ও ব্যবসা সম্প্রসারণ।
নির্বাচনের পরপরই অবশ্য আমেরিকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ম্যাথু মিলার এক বিবৃতিতে বলেছিলেন, ‘অন্যান্য পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে আমেরিকা একমত যে, এই নির্বাচন অবাধ বা সুষ্ঠু হয়নি এবং সব দল এতে অংশ না নেওয়ায় আমরা হতাশ।’ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোতে অনুষ্ঠিত নির্বাচন নিয়ে পশ্চিমা বিশ্ব এমন আকছার মন্তব্য করেই থাকে। কারণ তারা যেটাকে মানদণ্ড মনে করে, সেখানে পৌঁছাতে এসব দেশের এখনো বহুদিন লাগবে, যেমনটা কথকদের লেগেছে।
আমেরিকার নিরাপত্তা বা প্রতিরক্ষাসংক্রান্ত স্বার্থের বিরুদ্ধে যায়—এমন কোনো কাজ বাংলাদেশ করেওনি, করবেও না। বর্তমান প্রেক্ষাপটে এই দুই বিষয়ে আমেরিকার স্বার্থহানি করা বিশ্বের যেকোনো দেশের জন্য কল্পনার বাইরে। ভূরাজনৈতিক অবস্থানের দিক থেকে বাংলাদেশ কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকলেও তার কোনো অপব্যবহার এ দেশের সরকার করবে না। সময় পাল্টে গেছে, বিশ্বের চিত্র বদলেছে, প্রমাণ হয়েছে বৈরিতা দিয়ে ভালো কিছু অর্জন সম্ভব না।
তৃতীয় অবস্থানে থাকা ব্যবসা–বাণিজ্যের একটু খোঁজ নেওয়া যাক। বাংলাদেশে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় বিদেশি বিনিয়োগকারী দেশের নাম আমেরিকা। এই বিনিয়োগের পরিমাণ ৪১০ কোটি ডলার। আর ১৩৪ কোটি ডলার বিনিয়োগ নিয়ে চীন আছে পঞ্চম স্থানে। আর এই তালিকায় প্রতিবেশী ভারত আছে দশম স্থানে। অন্যদিকে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ঋণদাতা দেশ হলো জাপান। তাহলে বিদেশি বিনিয়োগকারী বা ঋণদাতা—কোনো হিসাবেই এক নম্বর স্থানে নেই চীন। তাহলে বাংলাদেশ চীনের খপ্পরে চলে যাচ্ছে, সেখান থেকে উদ্ধারের জন্য আমেরিকার এই অতি সক্রিয়তা—এ কথার যৌক্তিকতা কী খুঁজে পাওয়া যায়?
দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশের জ্বালানি খাতের ৬০ শতাংশের ওপর বিনিয়োগ মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর। সেখানে শেভরন, এক্সসেলারেট এনার্জির মতো প্রতিষ্ঠান কাজ করছে। এ বছরই সমুদ্রে ২৬টি কূপে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের জন্য টেন্ডার আহ্বান করবে বাংলাদেশ। অংশ নিলে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর এই দায়িত্ব পাওয়ার সুযোগ অনেক বেশি। আর এই মুহূর্তে বাংলাদেশে কাজ করছে—এমন মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আছে ভিসা, মাস্টারকার্ড, মেটলাইফ, মেটা (ফেসবুক), উবার, এক্সন মোবিল, স্ট্যান্ডার্ড চাটার্ড ব্যাংক, বোয়িং, জেনারেল ইলেকট্রনিক্স। আর নামের দরকার আছে?
আর বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশ হতে চলেছে। মানি আর না মানি, ক্রয়ক্ষমতাসম্পন্ন মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠী বেড়ে চলেছে। এ এক বিরাট বাজার। একে হাতছাড়া করবে কোন বোকা? যাঁরা তাদের কাছে এই বোকামিটা প্রত্যাশা করেছিলেন, তাঁদের বুদ্ধি নিয়ে এখন প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক না!
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন