পাকিস্তানের ভোটাররা অন্তত নিজের ভোটটা দিতে পেরেছে—এই ভাবনায় অনেকেই পুলকিত বোধ করছেন। করতেই পারেন। পাকিস্তানে এমনিতেই ভোট দেওয়ার প্রবণতা কম। ১৯৭১-এর পর থেকে ধরলে ৫০ শতাংশের বেশি হলেই ধরা হয়, মানুষ ব্যাপক আগ্রহ নিয়ে বিপুল সংখ্যায় ভোট কেন্দ্রে গেছে। এবারের চিত্রটা অবশ্য ভিন্ন। সকালে ভোটার কম থাকলেও পরে বেড়েছে। ফলে স্থানীয় সময় বিকেল ৫টায় ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও কোথাও কোথাও সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত ভোট নিতে হয়েছে।
এতে পুলকের চেয়ে সন্দেহের জায়গা তৈরি হয়েছে বেশি। কারণ ভোটকেন্দ্রের ভেতরে ভোটারদের লাইন যত লম্বা হয়েছে, কেন্দ্রের ভেতরে ভোট নেওয়ার গতি ততই কমেছে। ফলে সময় শেষ হওয়ার পরও দু ঘণ্টা ধরে ভোট নেওয়া হয়েছে বলে আত্মতৃপ্তির সুযোগ কম। সবচেয়ে বড় কথা এখন পর্যন্ত কেউ জানে না ঠিক কত শতাংশ ভোট পড়েছে। পাকিস্তানে ১৩ কোটি ভোটারের মধ্যে ভোটদাতার সংখ্যা খুব বেশি হলেও ৬০ শতাংশের আশপাশেই হবে। সেটা যদি হয়ে থাকে, তাহলে ২৬২টি আসনে ৮ কোটির মতো ভোট পড়েছে।
পাকিস্তানের সাংবাদিক, একাডেমিক, রাজনৈতিক কর্মী হুসেন হাক্কানি বিষয়টি বেশ পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন। ভারতের বিশিষ্ট সাংবাদিক বরখা দত্তের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এই নির্বাচনকে ‘রিগড ইলেকশন’ (কারচুপির নির্বাচন) না বলে ‘ফিক্সড ইলেকশন’ (পূর্ব নির্ধারিত নির্বাচন) বলে বর্ণনা করেছেন। এর ব্যাখ্যায় তিনি বলেছেন, ‘কারচুপির নির্বাচন হলো একজনের ভোট যদি অন্য কেউ দিয়ে দেয়। আর ফিক্সড ইলেকশন মানে এমন একটা পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে একটি দলের জন্য বিষয়টি কঠিন হয়ে পড়ে। আর অন্য দলের জন্য কাজটি সহজ হয়ে যায়।’
হুসেন হাক্কানি ২০০৮-১১ পর্যন্ত আমেরিকায় পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। তিনি ‘পাকিস্তান: বিটুইন মস্ক অ্যান্ড মিলিটারি’, ‘রিমাজিনিং পাকিস্তান: ট্রান্সফরমিং এ ডিসফাংশানাল নিউক্লিয়ার স্টেট’সহ একাধিক বইয়ের লেখক। তাঁর কথা একেবারে ফেলনা নয়। ওই সাক্ষাৎকারে তিনি আরও বলেছেন, ‘পিটিআইকে (ইমরান খানের দল) সব ক্ষেত্রে বাধা দেওয়া হয়েছে। প্রচারে দাঁড়াতেই দেওয়া হয়নি।’ তাঁর আশঙ্কা, এমনকি ফল গণনার সময়ও হস্তক্ষেপ হতে পারে। হুসেন হাক্কানির আশঙ্কা কতটা সত্য, সেটা গণনার প্রক্রিয়া ও ফলাফলই বলে দিচ্ছে।
এত কিছুর পরও ইমরানের দলকে নির্বাচনের প্রতিযোগিতা থেকে দূরে সরাতে না পেরে সরকার ভোটের দিন সারা দিন সারা দেশে মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেট সুবিধা বন্ধ করে দেয়। অজুহাত ছিল আইন–শৃঙ্খলার বাহিনীর চাহিদা। আসলে মাঠে নামতে না পেরে পিটিআই প্রার্থীদের জন্য ভোটারদের কাছে নিজেদের পরিচিত করার একমাত্র সুযোগ ছিল সামাজিক মাধ্যম বা সোশ্যাল মিডিয়া। সেখানেই আসলে ভয়টা। আজ অর্থাৎ ভোটের পর দিন (৯ ডিসেম্বর) পাকিস্তানের জাতির পিতা কায়েদে আজম জিন্না প্রতিষ্ঠিত ইংরেজি দৈনিক ডনের সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছে, ‘যোগাযোগ পরিষেবা স্থগিতের কারণে ভোট-প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হয়েছে এবং নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে।’
সম্পাদকীয়তে আরও লেখা হয়েছে, ‘ইসিপির জন্য দরকার ছিল, প্রার্থীদের বিনা বাধায় প্রচার চালাতে দেওয়া; একটি স্বচ্ছ ও অবিতর্কিত প্রতিযোগিতার জন্য মাঠ প্রস্তুত করা; দেশের প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ যাতে স্বাধীনভাবে তাদের অধিকার প্রয়োগ করতে পারে তাতে সহায়তা করা; স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ভোট গণনার ব্যবস্থা করা এবং এর ফলকে সশ্রদ্ধ চিত্তে ও অবনত মস্তকে মেনে নেওয়া।’ ডনের মন্তব্য, ‘আসলে ভবিষ্যতে ইতিহাস সাক্ষ্য দেবে, এর প্রায় সব ক্ষেত্রেই ব্যর্থ হয়েছে নির্বাচন কমিশন।’ সুতরাং তত্ত্বাবধায়ক বা অন্তর্বর্তী নিরপেক্ষ সরকার হলেই নির্বাচন সুষ্ঠু হবে পাকিস্তানের নির্বাচন এর সাক্ষ্য দেয় না। পাকিস্তানের উদাহরণ টানা এ কারণে যে, বিশ্বে এই দেশটিতেই একমাত্র তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা টিকে আছে, যাকে নিয়ে যথেচ্ছাচার করছে, সে দেশের মহাপ্রতাপশালী সেনাবাহিনী।
নির্বাচনী খেলার এত কিছু পূর্ব-নির্ধারিত হওয়া সত্ত্বেও প্রাথমিক ফল আসার সময়ই সবার তাক লেগে গিয়েছিল। কারণ শত প্রতিবন্ধকতাও দমাতে পারছিল না ইমরানের দলের স্বতন্ত্র প্রার্থীদের। তাঁরা অনেক আসনে এগিয়েছিলেন। দলটির দাবি, তারাই সরকার গঠন করতে চলেছে। এর প্রতিক্রিয়ায় ‘আন্ডার দ্য গান: পলিটিক্যাল পার্টিস অ্যান্ড ভায়োলেন্স ইন পাকিস্তান’ বইয়ের লেখক নিলুফার সিদ্দিকী পিটিআই-সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীদের পক্ষে এই জোয়ারকে ‘সম্ভাব্য ভূমিকম্পের’ লক্ষণ বলে বর্ণনা করেন। তিনি নিউইয়র্কের ইউনিভার্সিটি অ্যাট আলবেনির রাষ্ট্রবিজ্ঞানের সহকারী অধ্যাপক। আল–জাজিরাকে তিনি বলেন, পিটিআই-সমর্থিত এই স্বতন্ত্রদের এত ভোট পাওয়া, এটা পিটিআই-এর পক্ষে, না ক্ষমতাসীন দলগুলোর বিরুদ্ধে, না সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে একটি প্রতীকী পদক্ষেপ—তা তাঁর কাছে এখনো পরিষ্কার না।
আসলেই বোধহয়, একেই বলে ফাঁসে আটকানো। দেশের মানুষের সাথে চালাকি যে সব সময় খাটে না–১৯৭১-এ তারা তা বোঝেনি; এখনো বুঝবে এমনটা আশা করা বোকামি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রথম দিন থেকে এখন পর্যন্ত প্রতিটি ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীর হস্তক্ষেপ পুরো বিষয়টিকে বিতর্কিত করে তুলেছে। যে কারণে ডনের সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছে, ‘(নির্বাচনের) এর পবিত্রতা হরণে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও গোটা রাষ্ট্রযন্ত্র সমানভাবে দায়ী। তাদের কর্মকাণ্ড রাজনৈতিক মেরুকরণকে আরও খারাপ করেছে। কখন থামতে হবে, তা তারা জানে না। এ জন্য পুরো প্রক্রিয়াটি শুরু হওয়ার আগেই বিতর্কে পরিণত হয়েছিল। এটি ইতিমধ্যেই স্পষ্ট বলে মনে হচ্ছে যে, এই নির্বাচন দেশের রাজনৈতিক সংকট কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করবে না। সংকট ও অস্থিতিশীলতা, সম্ভবত জাতিকে জর্জরিত করতে থাকবে। পাশাপাশি ভয়ের কৌশল ব্যবহারের মাধ্যমে ভিন্নমতকে নিয়ন্ত্রণে রাখা হবে। এটা খুবই লজ্জাজনক যে, এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ অতি অবহেলায় হারিয়ে গেছে।’
জিন্না প্রতিষ্ঠিত পত্রিকাটি তাদের সম্পাদকীয় নিবন্ধে একবারও সেনাবাহিনীর নাম মুখে আনেনি। তিনি বেঁচে থাকলে কী বলতেন, কে জানে। তবে জেনারেল আসিম মুনির বা তাঁর উত্তরসূরিদের এক দিন জনগণের কাঠগড়ায় দাঁড়াতেই হবে। সে দিন বোধহয় বেশি দূরে নয়।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন