ধর্ষণ: অভিযোগনামায় শিক্ষক–শিক্ষার্থী যখন এক হয়ে যায়

বইমেলা চলছে রাজধানীর বাংলা একাডেমি চত্বরে। জেলাপর্যায়েও বইমেলার আয়োজন হয়েছে। ফেব্রুয়ারি মাস এটা। ভালোবাসার মাস, শোকের মাস, প্রেমের মাস। এই মাসে এ নিয়েই ব্যস্ত থাকার কথা তরুণদের। কিন্তু দেশের পুরোনো দুটি বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণ শিক্ষার্থীরা ব্যস্ত আন্দোলনে। ধর্ষণ—এই একটি শব্দ ও বাস্তবতা তাঁদের পথে নেমে বিক্ষোভ জানাতে, আন্দোলন করতে বাধ্য করছে।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়—দেশের দুই পুরোনো ও ঐতিহ্যবাহী উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। দীর্ঘ পথচলায় বহু বহু কীর্তির গল্প আছে এ দুই প্রতিষ্ঠানের। কিন্তু সেসবকেই যেন ‘ধর্ষণ’ করছে সাম্প্রতিক ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টা কাণ্ড।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমেছেন। স্বামীকে আটকে রেখে স্ত্রীকে ধর্ষণের ঘটনায় তাঁরা ফুঁসে উঠেছেন। বিশ্ববিদ্যালয়টির নিপীড়নবিরোধী সেল, প্রশাসন, নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা সব দপ্তর ও কাঠামো প্রশ্নের মুখে। এদিকে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও আন্দোলনে নেমেছেন। কারণ একই—ধর্ষণচেষ্টা। তাঁরাও সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামোকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন।

জাহাঙ্গীরনগরে অভিযুক্তের তালিকায় যেখানে শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সেখানে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে শিক্ষক। তদন্ত চলছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের তদন্ত কমিটি তদন্ত করছে। তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা হিসেবে শিক্ষার্থীদের নানা মেয়াদে বহিষ্কার এবং শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তদন্তের প্রতিবেদন এলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হবে।

কিন্তু এ কী ভীষণ বেদনার নয় যে, উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থী—উভয়েই গা ঘেঁষাঘেঁষি করে জায়গা করে নিয়েছে ধর্ষণের মতো এক গুরুতর অভিযোগের তালিকায়? হ্যাঁ, বেদনারই। কিন্তু আমরা কি বেদনাহত? উত্তরটা সম্ভবত নেতিবাচক হবে। কারণ, শিক্ষক–শিক্ষার্থীদের গড় নৈতিকতার মান নিয়ে সাধারণ্যে আর কোনো উচ্চাশা তো দূর, আশাই নেই। বরং বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অধঃপতন চটুল আড্ডার টপিক হয়ে উঠছে। কিন্তু এটা মনে করার কারণ নেই যে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে তারা বিরোধী পক্ষ হিসেবে বিবেচনা করে। বরং, বিভিন্ন আড্ডা বা চলতি পথের তির্যক মন্তব্য তাদের হতাশারই প্রতীক। কে না জানে, দীর্ঘদিনের অপ্রাপ্তির বোধ মানুষকে নিজেকে নিয়েই তামাশা করায় বাধ্য করে।

পুরোনো চারটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস তাদের এই দেশ ও দশের বিশ্ববিদ্যালয় শুধু নয়, নিজেদের প্রতিষ্ঠান হিসেবে একটা পরিচিতি দিয়েছিল। সে পরিচয় কিন্তু এমনি–এমনি দাঁড়ায়নি। দেশের ক্রান্তিকাল, সাধারণ মানুষের প্রয়োজন বিবেচনায় সব সময় যৌক্তিক অবস্থান নেওয়ার চেষ্টা, শিক্ষক–শিক্ষার্থী নির্বিশেষে তারুণ্যদীপ্ত ভূমিকা পালন এবং অতি অবশ্যই উচ্চ নৈতিকতার বোধ এই বিশেষ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠানগুলোকে আসীন করেছিল। করেছিল বলতে হচ্ছে, কারণ সেই আসন টলে গেছে অনেক দিন হলো।

স্বামীকে আটকে রেখে স্ত্রীকে ধর্ষণের ঘটনার প্রতিবাদে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নেমেছেন। ছবি: সংগৃহীতউচ্চশিক্ষায় বা গবেষণায় অর্জন হোক, কিংবা সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর হিসেবে নিজেদের দায়মোচনের বিষয়ই হোক—এই প্রতিষ্ঠানগুলো আর আগের মতো ভূমিকা পালন করছে না। আগে যে হুজ্জতকারী বা সন্ত্রাস বা অপকর্ম ছিল না—এমন নয়। কিন্তু একই সঙ্গে সংখ্যাগরিষ্ঠ শিক্ষার্থীদের প্রতিরোধও ছিল ব্যাপক ও প্রভাববিস্তারকারী। ফলে গুটিকয়ের অপকর্মের দায় বৃহত্তর শিক্ষক–শিক্ষার্থী সমাজ, বা প্রতিষ্ঠানকে সেভাবে নিতে হতো না। কিন্তু এখন এই সময়ে সবই যেন নির্লীপ্ত। আর এই নির্লিপ্তীর পথ ধরেই ক্ষমতার ভাগীদার গোষ্ঠীগুলো তাদের প্রভাব–বৃত্তের পরিধি বাড়াতে থাকে। সেই পরিধিতে ঢুকে পড়ে কেউ যায় ঝলসে, কেউ নিহত, কেউ ধর্ষিত।

ধর্ষণ মানে তো পীড়ন, মানে তো এক ভয়াবহ বলপ্রয়োগ। সে অর্থে, গা বাঁচিয়ে চলা তথাকথিত সাধারণ শিক্ষার্থীদের নির্লীপ্তি তাদেরই ধর্ষিত (পীড়িত অর্থে) হওয়ার বাস্তবতার নির্মাতা। পীড়নকারীর শক্তি ও সাহসের জোগানদাতা মূলত এই বিপুল শিক্ষার্থী সাধারণের প্রতিবাদ ও প্রতিরোধহীনতা।

তারা বলছে—নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে অনেক দিন ধরেই তারা এই বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তারা অভিযোগ করেছে। কোনো মীমাংসা হয়নি। তারা কেঁদেছে, কেউ ফিরেও দেখেনি। তারা আকুতি করেছে, কেউ শুনেও দেখেনি। অথচ আজ তারা ঠিকই শুধু নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে শুধু নয়, গোটা দেশকে শোনাতে পারছে। আজ ঠিকই তারা জোর ঝাঁকুনি দিতে পারছে। আজ ঠিকই অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর রাজনৈতিক আশ্রয়, তারই কর্মী ও নেতার বিরুদ্ধে মাঠে নেমেছে, নিজেদের উর্দি সামলাতে।

এই উর্দি সামলানোর বিষয়টিও কিন্তু দারুণ। প্রতিবারই এমন অভিযোগ উঠলে রাজনৈতিক দলগুলো, তাদের ভ্রাতৃপ্রতীম সংগঠনগুলো সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সাময়িক বা স্থায়ী বহিষ্কারের মধ্য দিয়ে হাত মুছে নেয়। ক্ষমতার ছাতাটি সরিয়ে নেয়। অথচ, ক্ষমতার সেই ছাতার নিচে দাঁড়িয়েই কিন্তু অপরাধটি সংঘটন হয়েছিল। একই আচরণ করে উচ্চশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসনও। নিঃসন্দেহে এটি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। কিন্তু এই শাস্তি এমন ফৌজদারী অপরাধের ক্ষেত্রে ‘হালকা বকে’ দেওয়া ছাড়া আর কিছু নয়।

দিনের পর দিন এই হালকা বকে দেওয়ার সংস্কৃতি দেখেছে সাধারণ শিক্ষার্থীরা। ফলে রাষ্ট্রের বিচারহীনতার সংস্কৃতি যে প্রতিষ্ঠানের কড়ি–বর্গায়ও ঢুকে বসে আছে, সে বিষয়ে তারা নিঃসন্দেহ হয়েছে, যা তাদের প্রতিবাদের শক্তি ও সাহস কেড়ে নিয়েছে। আর এই হৃতশক্তির পথ ধরেই বিরাট রাক্ষসে পরিণত হয়েছে ক্ষমতার মধুপায়ীরা। এই বাস্তবতায় যারা প্রতিষ্ঠান ও প্রতিষ্ঠানের বৃহত্তর শিক্ষক–শিক্ষার্থী সমাজের রক্ষাকর্তা হতে পারত, সেই প্রশাসনও বরং বাড়তি ছাতা মেলে নিয়েছে ও নিচ্ছে তেলা মাথায় তেল দেওয়া নীতি। ফলে প্রশাসনের দায়িত্বপ্রাপ্তরা সাধারণ পরিচয়ে শিক্ষক হলেও, তাঁরা অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষমতাধর রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠন বা তাদের তথাকথিত ‘হাইকমান্ডের’ আজ্ঞাবহ দাশে পরিণত হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে তাঁরা নিজেরাও নৈতিক মান ও শক্তি হারিয়ে বসে আছেন। ফলে তাঁদের পক্ষে কোনো ভূমিকা নেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে। এটা অনেকটা সুঁই ও ঝাঁজরের কাহিনির মতো হয়ে পড়েছে।

ছাত্রীকে ‘ধর্ষণ চেষ্টার’ অভিযোগে এক শিক্ষককে স্থায়ীভাবে বরখাস্তের দাবিতে আন্দোলন। ছবি: সংগৃহীতএর ফল হচ্ছে—জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনায় অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদের পর র‍্যাব কর্মকর্তা জানালেন, এটি এখনকার শুধু নয়, প্রতিষ্ঠানটিতে চলা দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। এটি একটি ঘটনামাত্র নয়, বহুদিনের ঘটনা। আর এই বহু বহু দিন, আসলে বহু তরুণী বা নারীর কষ্টের, অপমানের আখ্যান, যেখানে শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষক থেকে শুরু করে প্রীতিভাজন সহশিক্ষার্থী সব এক ভূমিকায়। সে ভূমিকার নাম—নিপীড়ক।

জাহাঙ্গীরনগরের শিক্ষার্থীরা সুস্পষ্টভাবে তাই দাবি তুলেছেন, এ ঘটনায় কোনো এক বা একাধিক শিক্ষার্থী বা অভিযুক্ত শুধু নয়, গোটা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, তার নিরাপত্তা কাঠামো এবং এসবের দায়িত্বে থাকা সবার বিচার করতে হবে। যেকোনো সুস্থ মস্তিষ্কের মানুষের পক্ষে এই দাবিকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। কিন্তু হায়, সুস্থ কে?

লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন