একুশের বইমেলার কলেবর ইদানীং প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে বললে ভুল হবে। গত ১০-১৫ বছর ধরেই ধীরে ধীরে এই মেলার এলাকা বেড়েছে। ধুলোর পাশাপাশি অংশ নেওয়া প্রকাশনা সংস্থা ও বইয়ের সংখ্যা কয়েক গুণ হয়েছে। সেই সঙ্গে গত কয়েক বছরে বইমেলার চরিত্রও কি খানিকটা বদলে গেছে? মেলার বদলে এ ক্ষেত্রে মেলায় আসা মানুষের উল্লেখ করলে আসলে যথাযথ হয়। এ দেশের মানুষের বই পড়ার অভ্যাস বা বইয়ের প্রতি আগ্রহের বিষয়টি নিয়ে বেশ কয়েক বছর ধরেই ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হচ্ছে।
এসবের কিছু প্রামাণ্য দৃশ্য এবারের বইমেলায় গিয়েও দেখা গেছে। অন্তত এই অধমের চোখে আটকেছে। বইমেলার গেট দিয়ে ঢোকার পরপরই মানুষের ইতস্তত ভিড় লক্ষ্য করা যায় বেশ। বই দেখতে, পড়তে বা কিনতে এক স্টল থেকে আরেক স্টলে যাওয়ার হিসাবে বইপ্রেমীদের ভ্রাম্যমাণতা বা ইতস্তত ঘোরাঘুরি স্বাভাবিক। তবে সেটি যদি বই বিষয়ক ধারণা বা দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হতে শুরু করে, তাহলে বলতেই হয়—‘সমস্যা’ আছে।
যদি বইমেলায় একদিনের ঘোরাঘুরিকে মাথায় নিয়ে একটি মূল্যায়ন করতে বসি এবং সেই সাথে অন্যবারের টুকরো টুকরো স্মৃতিকে জোড়া লাগাই, তবে মেনে নিতেই হবে যে, বড় ধরনের একটি পরিবর্তন হয়ে গেছে। যেমন: এবারের বইমেলায় দর্শনার্থীদের দেখে মনে হচ্ছে, এদের বেশির ভাগই এসেছেন মেলায় একটা ‘কোয়ালিটি টাইম’ কাটাতে এবং তা কেবলমাত্র বইকেন্দ্রিক নয়। বইয়ের তুলনায় সেখানে হাত বেশি খোঁজে মোবাইল ফোন। আর সুযোগ পেলেই উঠে যায় ক্লিক ক্লিক ছবি। সেটা আয়োজকেরাও কিছুটা বুঝেছেন। সেটা অনুভব করা যায় গেট দিয়ে ঢোকার মুখেই শুধু ছবি তোলার জন্য করপোরেট সংস্থার সৌজন্যে বসানো সুন্দর চারকোনা ফ্রেম দেখার পর। ওই অস্থায়ী স্থাপনাগুলো বানানোই হয়েছে কেবল ছবি তোলার সুবিধার কথা ভেবে। সাধারণত বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের প্রচারের স্বার্থেই এসব ক্ষেত্রে বিনিয়োগ করে থাকে। সেক্ষেত্রে নিশ্চয়ই জেনে-বুঝেই এমন স্থাপনা বসানো হয়েছে। নিশ্চয়ই তাঁরা খোঁজখবর নিয়ে দেখেছেন যে, বইয়ের মেলায় বইয়ের তুলনায় ছবির বাজার ভালো! সুতরাং সেই ক্ষেত্রে বিনিয়োগ তো করতেই চাইবেন যে কেউ। এটা স্বাভাবিকও।
অর্থাৎ, বইয়ের মেলায় মোবাইল ফোনের ক্যামেরা এখন গুরুত্বের শীর্ষেই আছে। সাদা চোখে যতটুকু দেখা গেল, তাতে তার পরিমাণ মোটের তুলনায় ৬০ শতাংশের অনেক বেশি বলেই মনে হলো। সেলফি তোলার গুরুত্ব আছে সমহারে। এ বিষয়ে দৈবচয়নের ভিত্তিতে বিভিন্ন প্রকাশনীর স্টলে থাকা কয়েকজন বিক্রেতার সঙ্গেও কথা হলো। স্রেফ বই কিনতে গিয়েই আলাপ। তাতে একজন বিক্রেতা জানালেন, তিনি মৌসুমি বই-বিক্রেতা নন। প্রকাশনীর কাজে আছেন দীর্ঘদিন। তাঁর ভাষায়, ‘ভাই, বইয়ের ফ্ল্যাপ উল্টিয়ে ভেতরের লেখা পড়ে খুব কম মানুষ। সবার হাতে এখন ক্যামেরা-সমৃদ্ধ মোবাইল ফোন। মূল উদ্দেশ্য স্টলের সামনে দাঁড়ায়ে সেলফি তোলা। সেলফি তুলতে বই লাগে, কেনা বা পড়া লাগে না। সেলফি তুলতে তুলতে বই ছিঁড়ে ফেলার মতো ঘটনাও দেখছি। এই হইল অবস্থা!’
সব মিলিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট যে, মোবাইল ফোন বা তাতে থাকা ক্যামেরা এখন বইমেলার অন্যতম অনুষঙ্গ। এতে বিপণন থেকে প্রচার—সবই যুক্ত। বইমেলাতেই দেখা গেল, দুজন অত্যন্ত বিখ্যাত লেখক (যাঁদের নামের জোরেই বই বিক্রি হয়) পাশাপাশি দাঁড়িয়ে কথা বলছেন, আর তার ভিডিওচিত্র ধারণ হচ্ছে। ওই কাজটির জন্য তাঁরা বইয়ে অটোগ্রাফপ্রত্যাশী পাঠকদের অপেক্ষমাণ রেখেছেন। অর্থাৎ, লেখকেরাও এই লেন্সের বাইরে নন এখন আর। যদিও তাঁরা বই কিনতে প্রতিনিয়ত পাঠকদের উৎসাহ দিতে থাকেন, তবুও তাঁরা ইউটিউব ও ফেসবুকে ভিডিও প্রচারের আগ্রাসী অ্যালগরিদমকে এড়াতে পারেন না। তাই কাগজে স্বাক্ষর দিয়ে বই কেনাকে আরও উৎসাহিত করাকে প্রয়োজনে অপেক্ষমাণ রেখে হলেও ক্যামেরার সামনে মুখ দেখাতেই হয় লেখকদের। কারণ, বই বিক্রির সাথে সাথে সোশ্যাল মিডিয়ায় পাওয়া লাইক-কমেন্ট-শেয়ারও তাঁদের কাছে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়; হয়তো এখনকার প্রেক্ষাপটে গুরুত্ব আরও বেশিই।
করোনা মহামারির সময় থেকেই পুরো বিশ্বে ইন্টারনেট ও ক্যামেরার বা নির্দিষ্ট করে বললে ভিডিও কনটেন্টের চাহিদা ব্যাপক হারে বেড়েছে। এ–সংক্রান্ত হিসাব-নিকাশ বা বৃদ্ধির হার একটু খোঁজ করলেই পাওয়া যাবে। সেসব হিসাব দিয়ে এই লেখাকে আর দীর্ঘ না করা যাক। মোদ্দা কথা হলো, পুরো বিশ্বের মানুষ প্রযুক্তির ওপর অত্যধিক নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। এই দেশে তার ব্যাপকতা হয়তো আরেকটু বেশিই। আমরা আমাদের জীবনাচরণের সঙ্গে মোবাইল ফোন ও ইন্টারনেটকে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে ফেলেছি। তাতে যেমন কাজের কাজ হচ্ছে, তেমনি অকাজও হচ্ছে। হয়তো আমাদের এই প্রবণতা কিছুটা আসক্তির পর্যায়েই চলে গেছে। তাই পাশের মানুষটির হাত ধরার বদলে এখন পাশের মানুষটির সঙ্গে সেলফি তুলেই তা ফেসবুক-ইনস্টাগ্রামে আপলোড করতে আমরা বেশি ব্যস্ত। কোডিং করা ওই দুনিয়াটাই এখন সত্যি হয়ে গেছে আমাদের কাছে। আর সত্যিটা হারিয়ে যেতে বসেছে!
এর পাশাপাশি আমাদের কাছে জাতীয় দিবসগুলো কি অনেকটাই স্রেফ উপলক্ষ হয়ে যায়নি এখন? ক’জন আর শিকড়ের কথা মনে রাখে? এই ধরুন, একুশে ফেব্রুয়ারির বিষয়টিই। আমরা এই দিনটি এলেই আবেগে থরো থরো হয়ে উঠি, গলার স্বরও বদলে যায় অনেকের। কিন্তু ক’জন বাংলা ভাষাটার প্রসারে আসলে কাজ করি? ক’জন এই বিশ্বায়নের যুগে বাংলার প্রকৃত চর্চা করতে চাই? শুধু আবেগমথিত কণ্ঠে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো…’ গাইলেই একুশে ফেব্রুয়ারি সঠিক ও ব্যাকরণগতভাবে পালন করা হয়ে যায়? নাকি ভাষার প্রতি ভালোবাসাটাও লাগে?
তাই সবার আগে বরং চলুন রেস্টুরেন্টে গিয়ে শুরুতে খাওয়া যাক। বইমেলায় গিয়ে আগে বইয়ের দিকেই মনোযোগটা দেওয়া যাক। যেটি ছবি তোলার জায়গা, শুধু সেখানেই না হয় মোবাইল ফোন-গিম্বল বা সেলফিস্টিক বের করলাম। এই অভ্যাসটুকু আত্মস্থ হলে পরে না হয় দেশ ও জাতির উদ্ধারে নামা যাবে। তা না হলে পুরো বিষয়টিই হয়ে থাকবে মেকি, কেবলই শো-কেসে সাজানো ডল পুতুলের মতো। ওতে বাইরের লোকে আপনার ঘরের সৌন্দর্য উপভোগ করলেও একান্তে আপনি ঠিকই বুঝবেন যে, সার্বিক চিত্রটি কতটা প্রাণহীন!
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনপেন্ট টেলিভিশন