প্রীতি উরাংরা বেঁচে থাকুক

প্রীতি, ফুল ও শোভা তিন ক্ষমতাহীন শিশু। তারা তিনজনই ডেইলি স্টার পত্রিকা থেকে সদ্য চাকরিচ্যুত নির্বাহী সম্পাদক আশফাকুল হকের বাড়িতে কাজ করত। কাজে আসার সময় তাদের বয়স ছিল যথাক্রমে ১১, ৭ ও ৮ বছর।
 
প্রীতি উরাং মারা গেছে। তাই এ লেখায় তার সত্যিকার নামটি ব্যবহার করা হয়েছে। অন্য দুজন বেঁচে আছে কঠিন ক্ষত নিয়ে, তাই তাদের জন্য দুটি ছদ্মনাম দেওয়া হলো। অবশ্য চতুর্থ একজন শিশুর কথা আমরা পরে জেনেছি। প্রীতিও বাঁচার চেষ্টা করেছিল। 

তেরো বছর আগে বাংলাদেশের একজন চা শ্রমিকের ঘরে জন্মেছিল প্রীতি। বলে রাখা ভালো প্রীতির মৃত্যুর পর করা মামলাটিতে তাকে পনেরো বছর বয়সের বলা হয়েছে। পরে আমরা সরেজমিনে প্রীতিদের বাড়িতে গিয়ে নিশ্চিত হয়েছি ওর বয়স বাড়ানো হয়েছে মামলার সময়ে। অবশ্যই আসামিপক্ষকে আনুকূল্য দেওয়ার জন্য। স্কুলের কাগজপত্রও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। শুধু প্রীতি নয়, ফুল এবং শোভার বাড়িতেও গিয়েছি।

পেটে খিদে নিয়েও উড়ে উড়ে বড় হচ্ছিল প্রীতি। সে ছিল এক বুদ্ধিদ্বীপ্ত শিশু। মা-বাবা মিরতিংগা চা বাগানের অস্থায়ী শ্রমিক। পাহাড়ের ওপরে একটা মাত্র মাটির ঘর তাদের। তার মায়ের রোগাটে, ক্ষীণদেহ তাদের চরম অভাবের খবর দেয়।

একদিন এক বড় কাগজের বড় কর্তা সৈয়দ আশফাকুল হকের ঘরে কাজ করতে এল প্রীতি। এগারো বছর বয়সে ছোট্ট মেয়েটি উপার্জন করার দায়িত্ব নিল। তার মাসিক আয় ছিল ৬২৫ টাকা। মেয়ের জন্য ভাতের সংস্থান করতে হয় না—অন্তত এটুকু সুবিধা পেয়েছিলেন প্রীতির মা-বাবা। শিশুশ্রমিক হিসেবে কাজে এল প্রীতি। আশফাকুল হক ও তানিয়া খন্দকারের ঘরে সে সন্তান হিসেবেও জন্ম নিতে পারত। তেমন হলে প্রীতিও অস্ট্রেলিয়ায় পড়তে যেতে পারত। সে জন্ম নিতে পারত আমার ঘরে বা আপনার ঘরে। সে শাজনীন তাসনিম রহমানের মতো লতিফুর রহমানের ঘরেও জন্ম নিতে পারত। নিষ্ঠুর হত্যার শিকার শাজনীনের স্মৃতি এখনো আমাদের মনকে ভারী করে দেয়। যা হোক, আরও নানা রকম জন্ম হতে পারত প্রীতির বা আমাদের যে কারও। কোথায় জন্ম নেব, আমাদের কাউকে তা পছন্দ করার সুযোগ দেয়নি প্রকৃতি।

কোনো শিশু যদি শ্রমিক হয়, যদি সে মেয়ে হয়, যদি সে একবার বা বারবার ধর্ষিত হয়—কী হয় তাতে! সেটা কেবল একটা ঘটনা হয়। সে শিশু, কেউ তার ওপরে বলপ্রয়োগ করতে পারে। সে নারী, সে ধর্ষিত হতে পারে। সে চা শ্রমিকের ঘরে জন্ম নিয়েছে, শ্রমিক তো সে হবেই। কোনো অজানা কারণে যদি সে বিসিএস অফিসার হয়, তাকে নিয়ে পত্রিকায় খবর বেরোয়। তবে যদি সে আসলে শ্রমিক হয়, তো সে মরে গেলে অথবা তাকে মেরে ফেলা হলে তার মা কাঁদবেন, এই তো হওয়ার কথা। কাঁদছেন প্রীতির মা নমিতা উরাং। পাশের বাড়ির এক শিশুকে জড়িয়ে ‘মা মা’ বলে কাঁদছিলেন আমাদের সামনেই।

চাপা পড়া এই ঘটনা কয়েকদিনের জন্য আলোচনায় এসেছে। তাই বলে অপরাধের তদন্ত হবে—এমন বলা যায় না। এগুলোকে টাকা-পয়সা দিয়ে মিটিয়ে ফেলার চেষ্টা করা হয়েছে ‘ফুল’ এর বেলায়। যদিও ফুলকে টাকা দেওয়া হয়েছে প্রীতি মারা যাবার পর। সামাজিক চাপ না থাকলে টাকাও দিতে হয় না সচরাচর। আর দেওয়া হলে, হতে পারে লাখ দুয়েক টাকা, যেমন দেওয়া হয়েছে ফুলের মা-বাবাকে। অবশ্য সেই টাকা এখনো পায়নি পরিবারটি। দালালে গিলে খেয়েছে বলে আমাদের জানিয়েছেন ফুলের মা-বাবা। 

প্রীতি উরাং মৌলভীবাজারের একটি চা-বাগানের শিশু। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের ওঁরাওরা নামের শেষে সাধারণত ওঁরাও পদবি ব্যবহার করলেও চা-বাগানের ওঁরাওরা পদবিতে লেখে উরাং। নমিতা উরাং এখনো প্রাচীন হৃদয় নিয়ে আছেন। মেয়ের মৃত্যুর ক্ষতিপূরণ হিসেবে তিনি টাকা নিতে রাজি হননি।

ফুল নামে শিশুটির অঙ্গ হয়তো বেঁকেচুরে গেছে। হয়তো ডাক্তাররা কোনোমতে জোড়া দিয়েছেন। নিত্য কর্ম করার সময়ে ব্যথা লাগে তার। সে ভয়ে কাতরে ওঠে ওইসব প্রসঙ্গ এলে। তার চিকিৎসা হয়তো এ দেশে সম্ভব নয়। অথচ তার মা চিকিৎসা করাতে চান নাসিরনগরে। ঢাকার নামে তাদের ভয়। তার বাবার মনে হয়, এবার ঢাকা গেলে মেয়ে যদি আর না ফেরে। এই অবিশ্বাসের কারণ ঢাকাবাসীই তো ঘটিয়েছে। দেশে আবার প্রজেক্টভিত্তিক উন্নয়ন হয়। তাই, যেকোনো মানবিক ইস্যুকেও এখন লোকেরা প্রজেক্ট ভাবে। তার ওপরে আছে আশপাশের অল্প টাকায় বিক্রি হওয়া প্রতিবেশী। এতকিছু ডিঙিয়ে ফুল কি আর ফুটতে পারবে?

আর শিশু ‘শোভা’ তো নির্বাক শোভা। সে যখন সৈয়দ আশফাকের ওই বাড়িতে কাজে যায়। সে ছিল একা। নয় বছরে দুবার বাড়ি গিয়েছে সে। প্রথম দফাতেই হয়তো সে সহ্য করে নিতে বাধ্য হয়েছিল নিপীড়নগুলো। তার তো বাড়ি যাওয়ার উপায় ছিল না। নয় বছর ওই ভয়ঙ্কর ঘরে থাকতে থাকতে তার মনোবিকলন হয়েছে কিনা, জানা দরকার। তার মামা ফুলসাই যখন বলছিলেন, এ পর্যন্ত শোভার পরিবার দুই লাখ টাকা পেয়েছে। শোভা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল মামার দিকে। শোভার পরিবার এই টাকা আসলে পেয়েছে তো, শোভার নীরব সহনশীলতার মূল্য হিসেবে?

ফুল, প্রীতি আর শোভা অনেক মূল্য দিয়েছে। এবারে শোভা তার চেনা চা পাতার গন্ধের কাছে ফিরে গিয়েছে। সে হয়তো কোনো ওঁরাও যুবকের ঘরণী হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। এখন সে মুক্ত। তবে ওই পরিবারের ঘটনাবলি প্রকাশ করলে কেউ যদি সন্ধ্যের আঁধারে তাকে টিলা থেকে ফেলে দেয় বা তার ছোটো বোনটাকে নিয়ে যায়! এসব হয়তো আমার আশঙ্কা। তবে অবাস্তব আশঙ্কা নয়। গরিব বাচ্চা নির্যাতিত হলে কী–বা আসে যায়। এসব তো তাদের বিগত জন্মের পাপ। অথবা নিষ্ঠুর সমাজের বহুদিন ধরে ধামাচাপা দেওয়া আর বৈষম্য তৈরির পাপের ফল। কার পাপ জানি না। তবে মানবাধিকারের ইনডিকেটর, শ্রমিকের অধিকার, মজুরি—এসব জানে না এই শিশুরা এবং তাদের মা-বাবা।

এখন আসি ভদ্রপাড়ার আলাপে। ভদ্রলোকেরা চিরকাল অন্যকে ঠকিয়েছে। আর ঘোষণা করেছে তারা নিজেরাই সেরা। তো নাগরিক দাবির মুখে দুই মাস পরে ডেইলি স্টার কর্তৃপক্ষ সৈয়দ আশফাকুল হককে অব্যাহতি দিয়েছে। তবে অব্যাহতি দেওয়ার কারণ উল্লেখ করেনি অব্যাহতিপত্রে। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে তারা এখনো তাকে অপরাধী ঘোষণা করেনি। নিপীড়িত এই শিশুদের বিপক্ষে রয়েছে অনেক ক্ষমতাধর ব্যক্তি। তারা পরস্পরবিরোধী দুটি পক্ষ। মানুষের জীবন এবং সম্মানকে মর্যাদা না দিয়ে অর্থ এবং প্রতিপত্তিকে গুরুত্বপূর্ণ করা হয়েছে সমাজে। এর ফল হলো, অল্পকিছু আশফাকুলের আস্ফালন। আর অধিকাংশের ক্ষমতাহীন, প্রাণহীন, অনিশ্চিত জীবন অথবা মৃত্যু।

প্রীতি সৈয়দ আশফাকের বাসা থেকে লাফিয়ে পড়ে মারা গেছে। প্রীতির এই মৃত্যু হত্যা নাকি প্ররোচনাজনিত আত্মহত্যা—এ প্রশ্নের উত্তর অমীমাংসিত। মামলায় ঘটনাটিকে ‘অবহেলাজনিত মৃত্যু’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ডেইলি স্টার বহু অনুসন্ধানী প্রতিবেদন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে দেশজুড়ে। প্রীতি কেন লাফিয়ে পড়ল—এটাও সন্ধান করতে পারত তারা। ফুল বেঁচে আছে। শোভা আছে। চা-শ্রমিকদের আরও একটি শিশুর কথা একটি টেলিভিশন প্রচার করেছে, সেও সৈয়দ আশফাকের বাসায় কাজ করত, ওই মেয়েটির বাড়িতে আমাদের যাওয়ার সুযোগ হয়নি।

প্রীতির স্কুল শিক্ষকরা জানিয়েছেন, মামলায় ওকে পনেরো বছর বয়স্ক বলা হলেও ওর বয়স তেরো বছর। ওর শিক্ষকরা বলেছেন প্রাকস্কুল ছাড়ার সর্বোচ্চ বয়স সাত বছর। ২০১৮ সালে সাত বছরে স্কুল ছাড়লে মৃত্যুকালে প্রীতির বয়স হয় তেরো বছর হয়। প্রীতির স্কুলের নথি এবং যেদিন সে মারা যায়, সৈয়দ আশফাকের বাড়ির সেদিনের সিসিটিভি ফুটেজ দুটোই গায়েব হয়ে গেছে।

খোলা জানালা ধরে প্রীতি ঝুলেছিল অন্তত বারো মিনিট। বাঁচার জন্য চিৎকার করেছিল। প্রতিবেশী দরিদ্র লোকেরা তাকে বাঁচাতে বারবার ২/৭, নম্বর শাহজাহান রোডের নিরাপত্তারক্ষীদের গেট খুলতে বলেছিল। বারো মিনিট সময় পেয়েও তার জন্য নিচে একটা চাদর না ধরার জন্য কে দায়ী, আমি জানি না। দায়ী কি কেবল নাগরিক নির্লিপ্ততা?

প্রীতি মারা যাওয়ার আগে ফুল নামে যে শিশুটি সৈয়দ আশফাকুল হকের বাসা থেকে লাফিয়ে পড়ে বেঁচে গেছে, সেটি গত বছর আগস্ট মাসের কথা। আমরা কয়েকজন গিয়েছিলাম এই শিশুদের বাড়িগুলোতে, আসলে কী ঘটেছিল জানতে। ব্রাক্ষণবাড়িয়ায় আমাদের দলে ছিলেন লেখক-গবেষক প্রিসিলা রাজ, সাংবাদিক-সমাজকর্মী মুরাদ মৃধা, আমি এবং আরও কয়েকজন। এই ফুলটির জীবন আর কখনো ফুটে উঠবে কিনা জানি না।

আমাদেরকে ফুল বলেছে সে মরে যেতে চেয়েছিল। চেনাশোনা সাত বছরের শিশুদের কথা স্মরণ করলাম। মৃত্যু সম্পর্কে তাদের পরিষ্কার ধারণা আছে বলে মনে হচ্ছে না। তবুও যে বাসা থেকে পড়ে প্রীতি মারা গেছে, সেই বাসার একই খোলা বারান্দা থেকে ফুল লাফ দিয়ে মরে যেতে চেয়েছিল।

ব্রাক্ষণবাড়িয়ার এক গ্রাম থেকে সৈয়দ আশফাকুল হকের বাড়িতে ঘরের কাজ করতে এসেছিল শিশুটি। একান্ত কথাবার্তার সময় ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে আঁতকে উঠছিল শিশুটি। কেঁদে লুটিয়ে পড়ছিল সে। তাকে প্রশ্ন করার অপরাধে তার কাছে আমি ক্ষমাপ্রার্থী। সে বলেছে, দুই পায়ের মাঝে ব্যথা পেয়েছে লাফিয়ে পড়ার পরে নয়, আগে। একদিন না চারদিনই সে নিপীড়নের শিকার হয়েছে। শেষের দিন ভয়ঙ্কর ব্যথা পেয়ে মরে যাবার জন্য সে লাফিয়ে পড়েছিল আটতলার জানালা দিয়ে।

সাত বছরের শিশুটি নারী পুরুষের ইচ্ছাকৃত বা জবরদস্তিমূলক শারীরিক সম্পর্ক বোঝে না। তার কাছ থেকে পাওয়া ছোট ছোট প্রশ্নের উত্তর জোড়া দিতে হয়েছে। আলাপের প্রত্যক্ষ শ্রোতা ছিলেন আমাদের সঙ্গী প্রিসিলা রাজ এবং সেখানকার একজন নারী ওয়ার্ড মেম্বার। মেডিকেল রিপোর্টে বলা হয়েছে প্রস্রাবের রাস্তা থেকে পায়ুপথ পর্যন্ত ৩-৩-৩ সেন্টিমিটার দীর্ঘ-চওড়া-গভীর ক্ষত হয়েছে। শিশুর মা-বাবা হাসপাতালে পৌঁছে দেখতে পান, তার জননাঙ্গের অপারেশন চলছে। নারীদেহের এই গভীর এবং সংরক্ষিত জায়গাটি বাইরের আঘাতে এমন ক্ষতবিক্ষত হতে পারে না বলে আমার ধারণা। কয়েকজন চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলেছি। বাচ্চার বাবা-মা বুঝে বা না বুঝে দুই লাখ টাকা পাবেন ভেবে মামলা তুলে নিয়েছেন। একেকবার একেক রকম কথা বলছেন তাঁরা। কিন্তু আমি ভুলতে পারছি না, অবুঝ শিশু বলেছে, আঘাত সে পেয়েছে লাফ দেওয়ার আগেই। বাইরের প্রভাবমুক্ত মেডিকেল পরীক্ষার দাবি জানিয়েছিলাম সেখান থেকে ফিরে আমার ফেসবুকের পাতায় একটি লেখায়। পরে ১১৭ নাগরিকের বিবৃতিতেও এ দাবি জানানো হয়েছে।

প্রীতির মতো আরেকটি ওরাও মেয়ে, যার ছদ্মনাম দিয়েছি শোভা। সেই শোভা আট বছর বয়স থেকে সতেরো বছর বয়স পর্যন্ত সৈয়দ আশফাকুল হকের বাড়িতে কাজ করেছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে মৌলভীবাজার পর্যন্ত ঘুরে আসার পর গিয়েছিলাম মোহম্মদপুরের ওই বহুতল ভবনটিতে। শুনলাম আশফাকুল হকের স্ত্রী তানিয়া খন্দকার শোভার বিষয়ে একজন প্রতিবেশীর কাছে বলেছেন, সে মাঝে মাঝে মিথ্যে গল্প বলে। শোভার মাথায় একটু গোলমাল আছে। জানি না, অন্য অনেক ছড়ানো মিথ্যের মতো এই কথাও মিথ্যে কিনা। আমরা চারজন গিয়েছিলাম শোভার বাড়ি। সেখানে ছিলেন ফ্লোরা বাবলি তালাং, যিনি কুবরাজ আন্তপুঞ্জি উন্নয়ন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক, প্রিসিলা রাজ, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. আবুল হাসান এবং আমি।

প্রীতি উরাং। ছবি: সংগৃহীতশোভার কাছে গিয়ে দেখলাম সবকিছু ঠিক আছে। তার কাছ থেকে আশফাকুল হকের গৃহের একটি শান্ত বিবরণ পাওয়া গেল। তবে আমাদের জানামতে, শোভা দুটো প্রশ্নের উত্তরে সত্য তথ্য দেয়নি। এক, প্রীতি এবং সে দুজনেই ফোনে নিজেদের বাড়ির লোকের সঙ্গে কথা বলত। দুই, প্রীতি এবং ফুল দুটো আলাদা জানালা দিয়ে লাফিয়ে পড়েছে। ক্রস চেক থেকে এই দুটো মিথ্যে আমাদের কাছে প্রমাণিত হয়েছে। প্রীতির সঙ্গে এক বছর পরিবারের যোগাযোগ ছিল না, যা প্রীতির মা-বাবা বারবার গণমাধ্যমে বলেছেন। আমাকেও প্রীতির বাবা তাই বলেছেন। আর আশফাকুল হকের শাহজাহান রোডের বাসার আশপাশের সব লোক বলেছে, দুজন এক জানালা দিয়েই পড়েছে। শোভা এক বিপর্যস্ত মুহূর্তে বলেছে, প্রীতিকে সে বাড়ি চলে যেতে বলেছিল। কারণ, এত মারধর সহ্য করে প্রীতি থাকতে পারবে না, যা শোভা সহ্য করেছে। আমাদের মনে হয়েছে, শোভাকে শুধু মারধর নয়, অন্যকিছুও সহ্য করতে হয়েছে। মনে হবার অসংখ্য কারণ রয়েছে। কয়েকটা বলি।

এক. একটা স্বাভাবিক গৃহে দুবার দুজন গৃহ সহকারী লাফিয়ে পড়তে পারে না।

দুই. শারীরিক সম্পর্কের মিথ্যে বয়ান দেওয়ার জন্য যথেষ্ট বয়স হয়নি ফুলের। সে জবরদস্তিমূলক শারীরিক সম্পর্কের বয়ান দিয়েছে। তার জননাঙ্গে দীর্ঘ, প্রশস্ত এবং গভীর ক্ষত রয়েছে। ফুলের মা বলেছে, তাকে বিয়ে দেওয়া সম্ভব হবে না। ফুল বলেছে, সে চারদিন ওই বাড়িতে ছিল, চারদিন তার সঙ্গে এমন ঘটনা ঘটেছে। চতুর্থ দিনের ভয়াবহতায় সে মরে যাওয়ার জন্য লাফ দিয়েছিল।

তিন. ফুল নামে শিশুটি লাফ দেওয়ার দিন ওই বাড়িতে ছিল শোভা। তবে সে দাবি করেছে গার্ড ইন্টারকমে ফোন করার আগে সে কিছুই জানত না। সম্ভবত সে আসলে নানা কিছু জানে, তবে বলতে পারছে না।

চার. সাত বছরের শিশু যেখানে চারদিনের চারদিনই আক্রান্ত হলো, সেখানে এগারো এবং আট বছর বয়স থেকে দীর্ঘদিন অবস্থানকারী শিশু দুজনেরও একই রকমভাবে আক্রান্ত হওয়া স্বাভাবিক।

পাঁচ. এই ঘটনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে চারটি স্পটে কমপক্ষে দুই শ লোকের সঙ্গে কথা বলেছি। সবার মধ্যেই একটা সাধারণ বিষয় ছিল, সেটা হলো, ‘ভয়’। ভয় এবং অন্যায্য অর্থ এসব জায়গায় ছড়িয়ে ছিল বলে আমাদের মনে দৃঢ় ধারণা জন্মেছে।

ছয়. অন্যায় না করে এত ভয় কেন ছড়ানো হলো, সেটা একটা প্রশ্ন।

সাত. ফুলের পরিবারকে দুই লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে মামলা তুলে নেওয়ার জন্য। আরও অনেক টাকা সৈয়দ আশফাকুল হকের নিয়োজিত দালালরা নিয়ে গেছে বলে অভিযোগ পেয়েছি। টাকা দেওয়া হয়েছে প্রীতি মারা যাওয়ার পর। এই অর্থ প্রদানের মধ্যে প্রীতির মৃত্যুরহস্য চাপা দেওয়ার অভিপ্রায় আছে বলে আমাদের ধারণা।

আট. প্রীতি বারো থেকে তেরো মিনিট গ্রিল ধরে ঝুলেছিল। সে বাঁচার আকুতি করেছিল। ভবনের চারপাশে হাজার মানুষ বিক্ষোভ করছিল। তারা নিচে চাদর পেতে বাচ্চাটিকে বাঁচাতে চেয়েছিল। আশফাকুল হকের পরিবার এবং ভবনের গার্ডরা প্রীতিকে বাঁচানোর উদ্যোগ নেয়নি। এলাকাবাসীকেও ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। প্রীতির মৃত্যু কি আশফাকুল হকদের বড় কোনো অপরাধ ঢাকবার সুযোগ করে দিয়েছে?

নয়. এই ঘরে কেন শিশুদেরকেই শ্রমিক হিসেবে আনা হতো বারবার?

লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়