চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের শুরুর দিকে রাজধানীর মোহাম্মদপুরের জেনেভা ক্যাম্প সংলগ্ন একটি ভবনের নয় তলা থেকে পড়ে মারা যায় শিশু গৃহকর্মী প্রীতি উরাং। মৃত্যুটি দুর্ঘটনা, নাকি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড, সে নিয়ে সরব গণমাধ্যম, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইতিমধ্যে অবশ্য কিছুটা নীরব হয়ে এসেছে অন্যান্য আরও হাজারও ঘটনা-দুর্ঘটনা-পরিকল্পিত অপরাধের চাপে। তবুও কেন, কীভাবে, কী কারণে এই ঘটনাটি ঘটেছে, এ নিয়ে কিছু প্রশ্ন সঙ্গত কারণেই অনেকের মনে এখনও ঘুরপাক খাচ্ছে।
ইতিমধ্যে আমরা জেনেছি, প্রীতি উরাং এর বাড়ি মৌলভীবাজার জেলা সদর থেকে ১২ কিলোমিটার দূরে কমলগঞ্জ উপজেলার মিরতিংগা চা বাগানের ভেতর এক ছোট টিলার উপর। প্রীতির বাবা লোকেশ উরাং এবং মা নমিতা উরাং অস্থায়ী চা শ্রমিক। চা শ্রমিক, তার মধ্যে অস্থায়ী। চা শ্রমিকদের অর্থনৈতিক দুর্দশার চিত্র মানে বেতনাদি ও কর্মপদ্ধতি যারা জানেন, তাদের কাছে অস্থায়ী চা শ্রমিকদের কষ্টের কথা সহজেই অনুমেয়। এটাও অনুমেয় যে, প্রীতি উরাং এর শৈশব আর্থিক স্বচ্ছলতায় না কাটলেও কেটেছে সবুজে-শ্যামলে, প্রকৃতির নিবিড় ছোঁয়ায়। এমন একটি প্রাকৃতিক আবহ থেকে একটি শিশুকে যখন ইট-কাঠ-পাথরের এ নগরের এক কোণে একটি বহুতল ভবনের বাণিজ্যিক একটি ফ্ল্যাটবাড়িতে এনে রাখা হয়, তাও আবার গৃহকর্মের মতন গুরুভার বহনের জন্য, তখন সে শিশুর মানসিক অবস্থা কী হয়, সেটি নিশ্চয়ই আমাদের সকল অনুমানের বাইরের একটি বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।
দ্য ডেইলি স্টারের নির্বাহী সম্পাদক সৈয়দ আশফাকুল হক ও তার স্ত্রী তানিয়া খন্দকার ছিলেন হতভাগ্য ও নিহত প্রীতি উরাং এর গৃহকর্তা-গৃহকর্ত্রী। এ কথা খুবই প্রাসঙ্গিক যে, এই দম্পতির বাসার অরক্ষিত জানালা থেকে প্রায় মাস ছয়েক আগে, ২০২৩ সালের ৫ আগস্ট ফেরদৌসী নামক আরেকজন গৃহকর্মীও পড়ে গিয়েছিল। যার বয়স ছিল মাত্র সাত বা আট বছর। গুরুতর আহত হলেও ফেরদৌসী বেঁচে আছে এখনও। কিন্তু তার জীবন আর আগের মতন স্বাভাবিক নেই। ছয় মাস আগের এ ঘটনাটিকে দুর্ঘটনা আখ্যা দিয়ে ক্ষতির তুলনায় নামমাত্র চিকিৎসাব্যয় ও ক্ষতিপূরণ দিয়ে এ দম্পতি ফেরদৌসীর গরীব পরিবারের সঙ্গে আপসরফা করে ফেলেন এবং মামলা থেকে অব্যাহতিও পান। চরম দারিদ্র্যের কাছে ন্যায়বিচার পরাজিত হলো কিনা, এ পরিস্থিতিতে সে জিজ্ঞাসা থেকে বের হয়ে আসা সহজ নয় আসলে।
বাসা, মেস, ডরমিটরিতে গৃহকর্মে নিয়োজিত কর্মীদের কাজের শর্ত ও নিরাপত্তা, আইএলও নির্ধারিত শোভন কর্মপরিবেশ, মজুরি ও কল্যাণ নিশ্চিত করা, নিয়োগকারী ও গৃহকর্মীদের মধ্যে সুসম্পর্ক সমুন্নত রাখা এবং কোন অসন্তোষ সৃষ্টি হলে তা নিরসনে দিকনির্দেশনা প্রদান করার নিমিত্তে ২০১৫ সালের ২১ ডিসেম্বর সরকার 'গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতি' অনুমোদন করেন। এটি কোন আইন বা বিধি নয়, তবে সাধারণভাবে প্রযোজ্য। ২০১৬ সালের ৪ জানুয়ারি একটি সরকারি গেজেটে এই নীতি প্রকাশ করা হয়। এই নীতি অনুযায়ী গৃহকর্মী নিয়োগের ক্ষেত্রে বয়সসীমা শ্রম আইন, ২০০৬ এর বিধান প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ ১৪ বছরের কম বয়সী কোন গৃহকর্মী রাখা যাবে না। নিহত প্রীতি উরাং-এর বয়স বলা হচ্ছে ১৫। আমরা যদি এ তথ্যকে সঠিক বলেও ধরে নিই, তাহলেও দুই বছর আগে তার গৃহকর্মে নিয়োগকালে বয়স ছিল ১৩ বছর, যা স্পষ্টতই উপরের এ নীতিমালার পরিপন্থী। আর ছয় মাস আগে আহত ফেরদৌসীর বয়স ছিল সাত বা আট বছর, যা রীতিমতো সমস্ত নীতিমালাকে বুড়ো আঙুল দেখানোর শামিল।
আশফাকুল হকের মতন সমাজের এই স্তরের মানুষ কেন বারবার প্রচলিত নীতিমালার বাইরে গিয়ে বয়সসীমার নিচের গৃহকর্মী নিয়োজিত করছেন, কেনই বা তার শিশু গৃহকর্মীরা বারবার একই পদ্ধতিতে আহত, নিহত হচ্ছেন এগুলো আইনের গুরুত্বপূর্ণ জিজ্ঞাসা।
প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে জানা গেছে, ঘটনাস্থলে পাওয়া নিহত প্রীতি উরাং-এর দেহে পরিধেয় কাপড় ছিল এলোমেলো। পত্রপত্রিকা থেকেই আমরা জানতে পারি যে, প্রীতির মরদেহের সুরতহাল রিপোর্ট তৈরি করেন মোহাম্মদপুর থানার এসআই সাদিয়া, যিনি রিপোর্টে প্রীতির শরীরে নতুন ও পুরোনো কিছু দাগের কথা উল্লেখ করেছেন। কর্মকালের দুই বছরে পিতামাতার সঙ্গে তাকে দেখা করতে দেওয়া হয়নি। মাসে দু'একবার শুধু ফোনে কথা বলার সুযোগ দেওয়া হত। মামলা যে নেওয়া হয়েছে সেটিও ৩০৪ ধারায় না নিয়ে ৩০৪ক ধারায় 'অবহেলার ফলে সংঘটিত মৃত্যু' হিসেবে নেওয়া হয়েছে। এই সব কিছুই সচেতন ও সংবেদনশীল জনমনে তৈরি করেছে নানান প্রশ্ন ও সন্দেহের।
ঘটনার দশ দিন পর গত ১৬ ফেব্রুয়ারিতে দ্য ডেইলি স্টারের পক্ষ থেকে এর সম্পাদক ও প্রকাশক একটি বিবৃতি দিয়েছেন, যাতে তিনি বলেছেন, মামলা ও মামলার তদন্ত তার নিজস্ব গতিতেই চলবে, এতে কোন পক্ষ থেকে কোন প্রকার প্রভাব বিস্তার করার কোন সম্ভাবনা নেই। যদিও সৈয়দ আশফাকুল হকের বাসার পূর্বের গৃহকর্মী আহত হওয়ার মামলায় এবং অন্যান্য প্রভাবশালী মহলগুলোর পূর্বাপর আরও নানান ঘটনায় আমরা ভিন্ন চিত্র দেখে অভ্যস্ত ও আশাহত। তবুও এইবার প্রীতি উরাং মরে গিয়ে হলেও ন্যায়বিচার পাক, প্রকৃত সত্য উদঘাটিত হোক, শিশুদের জন্য একটি উপযোগী সমাজব্যবস্থার ভাবনা তৈরি ও বাস্তবায়ন হোক, এই প্রত্যাশাই নিহত প্রীতির পরিবার-পরিজনসহ সাধারণ জনগণের, আমাদের সকলের।
লেখক: আইনজীবী,বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট


কেন বারবার সাংবাদিকের বাড়ির বারান্দা থেকে পড়ে যায় শিশু গৃহকর্মী
ফেব্রুয়ারিতে ২৯১ টি নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে : এমএসএফ
