২০০৭ ও ২০২৪ থেকে কী শিক্ষা পেল গণমাধ্যম?

২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারি।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট।

প্রায় ১৭ বছরেরও বেশি সময়ের ব্যবধান। তবে এই দুই সালের মধ্যে একটি দারুণ মিল আছে। এই দুটি বছরেই বাংলাদেশ উত্তাল হয়ে উঠেছিল প্রবলভাবে, ভেঙে পড়েছিল চলমান সরকার ও প্রশাসন। ২০০৭ সালে হয়েছিল অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিতে বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক দলের আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে। সেসময় বদল হয়েছিল, তবে মৃদু চালে। কিন্তু ২০২৪ সালে কোটা নিয়ে আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্টি হওয়া, উত্তাল হাওয়া আন্দোলন পুরো সরকারকেই আছড়ে ফেলে দিয়েছে। ১৭ বছর আগে দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি হয়েছিল এবং সেনাসমর্থিত একটি সরকার ক্ষমতা নিয়েছিল। এবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে থাকা শেখ হাসিনাকে প্রবল আন্দোলনের তোড়ে শুধু পদত্যাগই করতে হয়নি, সেই সঙ্গে দেশ ছেড়ে পালাতেও হয়েছে। সেই দিক থেকে আন্দোলনের প্রাবল্যের বিবেচনায় ২০২৪ অনন্যই বলতে হবে।

মিলের পাশাপাশি অমিলও আছে। ২০০৭ সালের ঘটনা গণমাধ্যমকেও নাড়া দিয়েছিল, কিন্তু ২০২৪-এর মতো নয়। সেবার অন্তত বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর দেখা যায়নি। বা চলমান আন্দোলনে সাংবাদিক হতাহতের বিষয়টিও এবারের তুলনায় ২০০৭ সালে ছিল নগণ্য। কিন্তু এবার তা প্রবল রূপ নিয়েছে। সত্য লুকানোর বা আন্দোলনের খবর না দেওয়ার অভিযোগ এবার এন্তার উঠেছে। বোধ করি, ডিজিটাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রসারের কারণেই এসব অভিযোগের এবার ঢেউ উঠেছে। আপনার কাছে যখন বিভিন্ন উৎস থেকে খবর পাওয়া সহজলভ্য হয়ে যায়, তখন চাইলেও ঝুম বর্ষার দিনে রৌদ্রদগ্ধ পৃথিবীর কথা দর্শক বা পাঠককে ‌‘খাওয়ানো’ যায় না।

এই প্রসঙ্গে আরও গভীরে ঢোকার আগে চলুন এ দেশের সংবাদমাধ্যম শিল্পের পরিস্থিতিটা একটু বোঝা যাক। এক কথায়, এ দেশের সংবাদমাধ্যম শিল্প অত্যন্ত রুগ্ন। প্রায় ১৫ বছরের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকেই বিশেষণটি দেওয়া। এর জন্য বিশেষজ্ঞ মতের আসলে প্রয়োজন নেই খুব একটা। কারণ, এতদিন ধরে এই শিল্পের অংশ হয়ে থাকা অবস্থায় এটুকু অন্তত জানা গেছে, সাংবাদিকতা পেশাটি অত্যন্ত অনিশ্চিত। আর্থিক নিরাপত্তা খুব একটা নেই, এমনকি এ খাতের দেশের শীর্ষ কিছু প্রতিষ্ঠানেও এই অনিশ্চয়তা প্রবল। করপোরেট লুকে সাংবাদিকতাকে কিছুটা আকর্ষণীয় চেহারা দেওয়ার চেষ্টা অনেক প্রতিষ্ঠান করেছে বটে, তবে ভেতরটা ফাঁপাই। আর্থিক নিরাপত্তা না থাকার দরুণ দেশের সাংবাদিকদের একটি অংশ অসৎ পথেও পা বাড়ায় হরদম এবং সেই কারণেই অনেকে সাংবাদিককে ‘সাংঘাতিক’ নামে ডেকে থাকেন হরেদরে। এটি ঠিক যে, এই পেশার সিংহভাগ মানুষই নিজের ভালো লাগা থেকেই এটিকে বেছে নিয়েছেন এবং তারা সৎও। কিন্তু এক গামলা দুধে যেমন এক ফোঁটা গোচনাই সব গুণাগুণ নষ্ট করে দিতে পারে, তেমনি ২০ শতাংশ অসৎ ব্যক্তির কারণে বাকি ৮০ শতাংশেরই নাম খারাপ হয়। আমাদের দেশেও সেটিই হয়েছে।

এর বাইরে আরেকটি বড় অভিযোগ সাংবাদিকদের কিছু অংশের বিরুদ্ধে আছে, সেটি হলো পক্ষপাতদুষ্ট হওয়া। ২০০৭ সালের শুরুর দিকে এই বিষয়টি ততটা মাথাচাড়া দেয়নি। অন্যান্য সাধারণ খবরের মতোই জরুরি অবস্থা জারির খবর মানুষ পেয়েছে। অন্তত তথ্যটুকু পেয়েছে। তবে যত দিন গেছে, তা ফিকে হয়েছে। নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ফিরে আসার পর আমরা বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমের ক্ষেত্রেও যাচাইবিহীন সংবাদ প্রকাশের খবর শুনেছি। এক্ষেত্রে বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সংস্থার চাপ দেওয়ার খবরও পাওয়া গেছে। আর গত কয়েক বছরে তা যে আরও প্রবল হয়েছিল, সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না। ফলে অনেক খবরই চেপে যায় কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান, বা এমনভাবে ঘুরিয়ে প্রকাশ করে, যাতে মূল তথ্যই আর পাওয়া হয় না। প্রচলিত শাসন ব্যবস্থার প্রশস্তিমূলক বাক্যের স্তম্ভও গড়ে তোলা হয় নানা চাপে পড়ে।

এতে করে একজন দর্শক বা পাঠক স্বাভাবিকভাবেই প্রতারিত বোধ করেন। যে নাগরিক প্রতিদিনকার জীবনে নানা আর্থসামাজিক ও রাষ্ট্রপ্রদত্ত সংকটে পর্যুদস্ত থাকেন, তিনি যখন যেকোনো গণমাধ্যমে ‘সুখে শান্তিতে কাটছে ছোট্ট এই জীবন’ ঘরানার সংবাদ পড়েন বা শোনেন বা দেখেন, তখন তার মনে এক ধরনের অব্যক্ত ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। কারণ, রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে গণমাধ্যমে বিদ্যমান পরিস্থিতি সম্পর্কে নিজের মতটা অন্তত জানাতে চান একজন পাঠক-দর্শক। ১০০‑তে ১০০ না পেলেও নিজের প্রবল বাস্তবতার ৬০ বা ৭০ শতাংশ প্রতিচ্ছবির প্রতিনিধিত্ব চান। কিন্তু সেটাও না পেলে তৈরি হয় আস্থার সংকট। এবং এ দেশের সংবামাধ্যমগুলো সেই প্রবল আস্থার সংকটে প্রায় ১ দশক ধরেই আছে। এর প্রাবল্য বেড়েছে মূলত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ডিজিটাল মাধ্যমের প্রসারের কারণেই। কারণ মানুষ বিকল্প হিসেবে মূলত সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমকে বেছে নেওয়ার চেষ্টা করছে, যদিও এতে ছড়িয়ে পড়া কনটেন্টের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন আছে হাজার। কিন্তু এই বিকল্পের পথে সাধারণ মানুষের হাঁটার অন্যতম দায় কি সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর নয়? অবশ্যই সেই দায় আছে।

২০০৭ সালের পরও আমরা সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে যে ধরনের অভিযোগ পেয়েছিলাম, তা এবারও আছে। কারণগুলো কিছুটা একই। বিনিয়োগের উৎসভিত্তিক স্বার্থ, সরকারি-বেসরকারি চাপ, ব্যবসায়িক বিষয়, মতাদর্শ ইত্যাদি নানা কারণে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম ভিন্ন ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে, যার মাধ্যমে অনেক খবরই হারিয়ে যায়। এসব যে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতেও হয় না, তা কিন্তু নয়। তবে এ দেশে তার প্রকাশভঙ্গি বেশ স্থূল। ফলে আপামর মানুষের আস্থাও নড়ে যায় প্রবলভাবে।

এর বাইরে আছে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের ভিন্ন ভিন্ন অ্যাজেন্ডা ও স্বার্থ। যে আজকে বিদ্রোহের ডাক দেয়, সেও সময় ফুরোলে পরে বাতাবি লেবুর বাম্পার ফলনের খবর শোনায়। এই রূপান্তর কখনো সূক্ষ্ম, আবার কখনো স্থূল হয়। কিন্তু হয়। অন্তত এ দেশে এমন উদাহরণ ভুরি ভুরি। কেবলই সঠিক ও নিখাদ সংবাদ উপহার দেয়, এমন সংবাদমাধ্যম খুঁজতে গেলে এ দেশে ঠগ বাছতে গাঁ উজাড় হয়ে যাবে। তবুও হয়তো হাত দু’খানি শূন্যই থাকবে!

এটি ঠিক যে, এবারে যেভাবে সংবাদমাধ্যমগুলোকে আন্দোলনের লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়েছে, তা কেবল উপযুক্ত সংবাদ থেকে প্রতারিত হওয়ার ক্ষোভ থেকে হয়নি। সেই ক্ষোভ তো আমাদের জনগণ ফেসবুক-ইউটিউবে গালি দিয়েই প্রশমন করে ফেলেন অনেকখানি। এবার যা হয়েছে, তা নিখাদ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড এবং তা অপরাধীরাই করেছেন। এর উদ্দেশ্য ছিল অনেকখানি আক্রান্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিলুপ্তি চেয়ে। সেই চাওয়া যতটা না সংবাদকেন্দ্রিক, তার চেয়ে বেশি ছিল মতাদর্শিক। ভাঙচুর না করেও এই একই কাজ ২০০৭ সালেও হয়েছিল। ওই সময় অনেকগুলো সংবাদ প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে গিয়েছিল পূর্বতন সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট হওয়ার কারণে। সেখানেও ছিল বাতাবি লেবুর গন্ধ। এবারও হয়তো কিছু বন্ধ হবে, আবার কিছু বন্ধ দ্বার খুলবেও। সেই সাথে কি নতুন রঙে, গন্ধে বাতাবি লেবুও ফিরবে? ফিরতেই পারে!

এই ফেরাটা তখনই বন্ধ হবে, যখন এ দেশের সংবাদমাধ্যমগুলো সংবাদ পরিবেশনায় সেন্সর আরোপের মতো কাজটি করবে না। এডিটোরিয়াল পলিসি ভিন্ন ভিন্ন হতেই পারে, তার প্রতিফলনও থাকবে। সাংবাদিকতার নীতিমালাও তাই বলে। কিন্তু তাই বলে দিনের আলো বা রাতের আঁধারে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার খবরও যখন মেরে ফেলা হয় নির্দ্বিধায়, তখন সংকট তৈরি হয় নিশ্চিত। অবশ্য এই ‘সংবাদ হত্যা’ ঠেকানোর মহৌষধ কেবল যে সাংবাদিকদেরই মহান দায়িত্ব, তা নিশ্চয়ই নয়। এই সঠিক দায়িত্ব পালনের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টির দায় রাষ্ট্র, সরকার, জনগণ থেকে শুরু করে সবার। কারণ এই সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো যতক্ষণ পর্যন্ত নিজেদের পছন্দকে সাংবাদিক বা সংবামাধ্যমের ওপর চাপিয়ে দেওয়া থেকে বিরত না হবে, ততক্ষণ এই সংকটের কোনো সমাধান হবে না। ফলে ভুগবে আবার সেই রাষ্ট্র, সরকার, জনগণ থেকে শুরু করে সবাই-ই।

সুতরাং, কথা সেই পুরোনোই। আপনি যেমন, আশপাশে আপনি তেমন ব্যক্তি বা বস্তুই পাবেন। তাই সামগ্রিক ইতিবাচক পরিবর্তন না এলে দেশের কোনো একটি উপাদান হুট করেই ভোজবাজির মতো বদলে যাবে না। তবে প্রত্যক্ষ পক্ষ হিসেবে সাংবাদিকদের ও সংবাদমাধ্যমগুলোকেই এটি আগে অনুধাবন করতে হবে। পাশাপাশি অন্যরা যত দ্রুত এটি বুঝতে পারবেন, ততই মঙ্গল। নইলে কেবল হা-হুতাশই হবে সার। সাত মণ তেলও পুড়বে না, রাধাও নাচবে না!

লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন

[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]