আসুন, একটু কাঁদি

আপডেট : ১৪ অক্টোবর ২০২৪, ১০:৪১ পিএম

ক্রন্দন, রোদন, কান্না, কাঁদা, অশ্রুবর্ষণ।

যখন যেটায় সুবিধা, লেখায় সেটাই কাজে লাগে। সরাসরি না বলে মাঝে মাঝে চোখের জল দিয়েও কাজ সারি আমরা। অথবা বলি চোখ ভিজে উঠল। বিজ্ঞান মানলে চোখ ভিজে ওঠাকে ঠিক কান্না বলার উপায় নেই। তা যে নামেই ডাকা হোক, প্রশ্ন হলো, আমরা কাঁদি কেন?

মানুষের চোখ থেকে তিনটি ভিন্ন কারণে পানি বের হয়। প্রথমটির কথা আপনি-আমি হয়তো জানিও না, আর জানলেও টের পাই না। চোখকে ভেজা রাখতে, দৃষ্টি পরিষ্কার রাখতে, ময়লা দূরে রাখতে আর অক্সিজেন সরবরাহ করতে এর প্রয়োজন হয়। প্রতিবার চোখ পিটপিট করে আমরা এই পানি চোখের প্রতি প্রান্তে ছড়িয়ে দিই।

দ্বিতীয় ধরনটা অবশ্য পরিচিত। চোখে কিছু পড়লে, পেঁয়াজ কাঁটতে গেলে চোখকে রক্ষা করতে ছুটে আসে এই পানি।
কিন্তু কান্না, ক্রন্দন বা চোখের জল বলতে আমরা যা বুঝি সেটা প্রকৃতপক্ষে তৃতীয় ধরনের–আবেগীয়। যুক্তি দিয়ে যখন আবেগকে আটকে রাখা যায় না, শারীরিক বা মানসিক ব্যথায় যখন নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে জল ফেলি, সেটাকেই আমরা আসলে কান্না বলি।

সংজ্ঞাতেই বলে দেওয়া হলো, আমরা কেন কাঁদি। আমরা ব্যথা পেলে কাঁদি, দুঃখ পেলে কাঁদি, হতাশায় কাঁদি, এ দুইয়ের মিশেলে কাঁদি, ক্ষোভে কাঁদি, কাঁদি রাগে, নিজের অক্ষমতায়। প্রিয়জন হারানোর দুঃখে চোখের জল ফেলি, কাউকে প্রিয় করতে না পারার ব্যর্থতাতেও। এর বাইরে আরও কত কারণেই তো কান্না করি।

মনে আছে, ছোটবেলায় বাড়িতে কোনো এক আয়োজন ছিল। খুব কাজ করি এমন ভাব দেখাতে কেটে রাখা পেঁয়াজ আলাদা করার গুরু দায়িত্ব নিয়েছিলাম। কিন্তু খাওয়ার সময় দেখি এত এত পেঁয়াজ ঘাটায় হাতে এমন বিধঘুটে গন্ধ লেগে আছে যে হাত মুখের কাছে নেওয়া যাচ্ছে না। সে গন্ধে নাকি দারুণ সব রান্না চোখের সামনে পেয়েও খেতে না পারার দুঃখে, তা মনে নেই–কিন্তু বেশ কেঁদেছিলাম সেবার।

দৌড়ঝাঁপ দিয়ে হাত-পা ছিলে ফেলার ব্যথায় না কাঁদলেও অমন কিছু করার শাস্তিস্বরূপ মারধরে কেঁদেছি। নিজেদের পোষা প্রথম মুরগির বাচ্চা চুরি হওয়ার দুঃখে কান্না করেছি। পারিবারিক সিদ্ধান্তে কেঁদেছি, নিজের সিদ্ধান্ত জোর করে মেনে নেওয়ার জন্যও চোখের পানির ব্যবহার করিনি, তা নয়। ভার্সিটির বেলায় পছন্দের বিভাগে ভর্তি হতে না পেরে কান্নার মতো হাস্যকর কাজও করেছি। নিজের অভিজ্ঞতা না থাকলেও তীব্র আনন্দে কাঁদতে দেখেছি। স্বজন হারানোর তীব্র ব্যথা হালকা করতেও চোখের গ্ল্যান্ড ব্যবহার করেছি। গত কয়েকদিন তীব্র অসহায়ত্বে ঠিক কান্না না করলেও চোখ ভিজে উঠেছে।

কিন্তু সবই তো নিজের কথা বললাম। অন্যরা কেন কাঁদেন?
সবার কথা বলতে পারি না। শুধু এক মায়ের কথা জানি, যিনি ‘চাকরি না পেলে নাই, ছেলেটা মরল কেন’ ভেবে কাঁদছেন। ঘরের ছাদে খেলতে থাকা ছয় বছরের মেয়ের শরীরে লাগা বুলেটের কথা তুলে হাহাকার করছেন এক বাবা। ঘরের যে জানালায় দাঁড়ানোর দায়ে চার বছরের ছেলেটা অন্য ভুবনে চলে গেল, সে জানালাটা দেখিয়ে কাঁদছেন আরেক বাবা।
গুলিবিদ্ধ এক কিশোরকে হাসপাতালে নিতে রিকশায় তুলে নিজের ছেলের দেহ চিনতে পারা বাবাও কাঁদছেন। অন্যদের পানি খাওয়াতে গিয়ে বুলেটবিদ্ধ জমজ ভাইয়ের কথা বলতে গিয়ে গলায় দলা পাকিয়ে আসছে কারও। বন্ধুর পায়ে গুলি লেগেছে বলে বেরিয়ে আর না ফেরা ছেলেটার জন্য কাঁদছে তার পুরো পরিবার। তলপেটে গুলি লাগা দাদির জন্য খুব বেশি কাঁদার মনে হয় ফুরসৎ মেলেনি, ওই বুলেট যে এর আগে নাতির শরীর ভেদ করে এসেছিল।

মৃত্যুর পর যেন মনে রাখে সবাই–এমন জীবন গড়তে চাওয়া ছেলেটা ১৮ পেরোনোর আগেই সবাইকে কাঁদিয়ে চলে গেল। ফুটবল কিনে না দেওয়ার অপ্রাপ্তিতে বাবাকে আজীবন আটকে রেখে গেল ১২ বছরের এক কিশোর। ছেলের জন্য পাত্রী দেখে এসে ছেলের শেষ গোসলের কথা শোনার মুহূর্ত জানাতে গিয়েও কাঁদছিলেন এক বাবা।

কাঁদছেন আরও অনেকেই, কেউ স্বজন হারিয়ে, কেউবা স্বজন হারানোর ভয়ে। হাসপাতালে প্রতি মুহূর্তে ভয়ঙ্কর কোনো খবরের শঙ্কায়ও চোখ ভিজছে অনেকের। কোনোদিন গায়ে হাত না তোলা ছেলের গায়ে বুলেটের দাগের কথা বলে কাঁদছেন এক মা। সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার হতাশায়ও চোখ মুছেছেন কেউ।

এক একটা কান্না একেক রকম। কারণে পার্থক্য আছে, প্রকাশে তফাত আছে, কিন্তু গুরুত্বে?
ইনহেরিটেন্স বইয়ে ক্রিস্টোফার পাওলিনি বলেছেন, ‘ক্ষুদ্রতম শালিকের চিন্তাও একসময় গুরুত্বে রাজার দুশ্চিন্তার সমান হয়ে যায়।’ সমাজের নানা স্তরের মানুষ আমরা, নানা কারণে কাঁদি। তা আপনার কাছে যৌক্তিক মনে না হতে পারে, আরেকজনের কাছে হয়তো হাস্যকর লাগতে পারে, সে কান্নার পেছনের আবেগকে উপেক্ষাও করতে পারেন, কিন্তু অসম্মান করার অধিকার হয়তো কারওরই নেই।

লেখক: সহকারী ক্রীড়া সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন

[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]

বাঙালি নারীর অসীম সাহসিকতা, দেশপ্রেম, আদর্শ আর বিপ্লবের কথা যখন লেখা হয় সবার আগে আসে প্রীতিলতার নাম। শিল্পী, শিক্ষিকা, দার্শনিক, এবং নারীর আত্মমর্যাদার প্রতীক প্রীতিলকার জীবন গল্প আমাদের শেখায়,...
‘বাড়ির কাছে আরশী নগর, আমি একদিনও না দেখিলাম তারে’–এই পঙ্‌ক্তিটি যখন ফরিদা পারভীনের কণ্ঠে ধ্বনিত হতো, তখন সেটা শুধু সুর নয়, ছিল আত্মার এক নিঃশব্দ আকুলতা। লালনের সহজিয়া দর্শনকে হৃদয়ে ধারণ করে যিনি...
নেপালসহ দেশে দেশে সরকার পতন ও এরপরের ‘খিচুড়ি’ হয়ে যাওয়া পরিস্থিতিতে সেসব অভ্যন্তরীণ সমস্যাগুলো না হয় ‘ডাল’ আর ‘চাল’-এর ভূমিকা নিয়েছে। আগুন হিসেবে কাজ করেছে জেন জি-র ক্ষোভ। কিন্তু খিচুড়ি রান্নার...
‘বিপ্লব, নাকি করপোরেট শক্তির খেল’–প্রশ্নটা আজ দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির সামনে এক বিরাট ধাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। চার বছরের মধ্যে ভারতের তিন প্রতিবেশী দেশ–শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ এবং নেপাল–গণআন্দোলনের জেরে...
বিশ্বকাপের তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হওয়ার আগে ফ্রান্স কোচ দিদিয়ের দেশম স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, এই ম্যাচ খেলতে তাদের তেমন কোনো আগ্রহ নেই। তবে জাতীয় দলের দায়িত্বের...
গত বছরের ২৭ মে তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনকে গ্রেপ্তার করে সেনাবাহিনী। আরও গ্রেপ্তার হয় তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী মোল্লা মাসুদ, শ্যুটার আরাফাত ও শরীফ। ২৪ এর ৫ আগস্টের পর একের পর এক হত্যাকাণ্ডে...
আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে দেশের প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে খেলার মাঠ এবং পর্যায়ক্রমে সারা দেশে আন্তর্জাতিক মানের ১০টি স্পোর্টস ভিলেজ নির্মাণ করা হবে বলে জানিয়েছেন যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী...
সংবাদ সম্মেলনে মেজর ফারহান মাহমুদ মোক্তাদা জানান, চক্রটি সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের নাম-ছবি ব্যবহার করে অবৈধ সুবিধা আদায়ের অপচেষ্টা চালাচ্ছিল। গ্রেপ্তারকৃতের কাছ থেকে ১টি মাইক্রোবাস, ৭টি মোবাইল...
লোডিং...
পঠিতনির্বাচিত

এলাকার খবর