সম্প্রতি অংশীজনদের সাথে এক বৈঠকে ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন সংশোধনের খসড়া নিয়ে আলোচনায় হয়েছে। বিশেষত, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান দমনে সংঘটিত অপরাধের বিচার আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনের অধীনে করার জন্য এই প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও আন্তর্জাতিক মানের করতেই এই খসড়া। এই প্রস্তাবিত সংশোধনীতে কিছু প্রশংসনীয় প্রস্তাবের পাশাপাশি উদ্বেগও রয়েছে।
তবে ভালো খবর হলো, অন্তর্বর্তী সরকারের আমন্ত্রণে জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার দপ্তরের একটি তথ্য-অনুসন্ধান দল ইতিমধ্যে স্বাধীনভাবে তদন্ত শুরু করেছে। গত ১ জুলাই থেকে ১৫ আগস্ট পর্যন্ত ঘটে যাওয়া ছাত্র আন্দোলনকেন্দ্রিক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো এই তদন্তের আওতাভুক্ত।
সংবাদপত্রের প্রতিবেদন অনুসারে, জাতিসংঘের এই প্রতিনিধি দল ১৫টি ধরনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা তদন্ত করবে, যার মধ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড অন্তর্ভুক্ত। আশা করা হচ্ছে, তদন্ত প্রতিবেদন আগামী নভেম্বরের শেষ সপ্তাহের মধ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে জমা দেওয়া হবে।
জাতিসংঘের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, তথ্য-অনুসন্ধান দলটির কাজ হলো–ঘটনার প্রকৃত তথ্য উদ্ঘাটন, দায় নির্ধারণ, মূল কারণ বিশ্লেষণ এবং অতীত মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা মোকাবিলা ও ভবিষ্যতে সেগুলোর পুনরাবৃত্তি রোধে কার্যকর সুপারিশ করা।
এদিকে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য কমিটির সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, জুলাই থেকে শুরু হওয়া ছাত্র-জনতার আন্দোলনে এখন পর্যন্ত ১,৫৮৩ জনকে শহীদ ঘোষণা করা হয়েছে এবং ২২ হাজারের বেশি মানুষ আহত হয়েছে। এই তথ্য ৬ অক্টোবর প্রধান উপদেষ্টা তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি পোস্টে শেয়ার করেন।
আইন সংশোধন নিয়ে আয়োজিত সভায় বক্তব্য রাখতে গিয়ে আইন উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল সরকারের অবস্থান পরিষ্কার করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা আর কোনো ক্ষত বা বিভাজন চাই না। এই বিচারগুলোর মাধ্যমে আমরা সমাজে পুনর্মিলনের প্রক্রিয়া শুরু করতে চাই। সবাইকে একমত হতে হবে যে, বিচারটি সুষ্ঠু হয়েছে এবং দোষীদের ক্ষেত্রে যে শাস্তি দেওয়া হয়েছে, তা ন্যায়সঙ্গত।’
কিন্তু, গোটা প্রক্রিয়াকে আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার পথে বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থায় মৃত্যুদণ্ডের বিধান একটি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে, যখন সারা বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলো মৃত্যুদণ্ড সম্পূর্ণরূপে বিলুপ্ত করার আহ্বান জানাচ্ছে। দুঃখজনকভাবে, প্রস্তাবিত সংশোধনীতে মৃত্যুদণ্ড বিলুপ্তির নীতিটি গ্রহণ করা হয়নি।
১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনে দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার ক্ষমতা ট্রাইব্যুনালের রয়েছে। তবে জাতিসংঘ মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করে বলে এ ক্ষেত্রে তাদের কোনো সমর্থন পাওয়ার সুযোগ নেই।
মৃত্যুদণ্ড অপরিবর্তনীয়; বিচারিক ভুলের ক্ষেত্রে সংশোধনের কোনো সুযোগ থাকে না এবং এটি যে অপরাধ দমনে কার্যকর তাও প্রমাণিত হয়নি। তবে সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো–এটি প্রায়ই রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা অন্যান্য বিরোধ দমনের জন্য অপব্যবহার হয়ে থাকে।
বিচার বিভাগের ওপর একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো–ন্যায়বিচারের ব্যর্থতা রোধ করা এবং কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন ভুলভাবে দোষী সাব্যস্ত বা শাস্তি না পায়, তা নিশ্চিত করা। বলা হয়ে থাকে, ‘একজন নিরপরাধ ব্যক্তিকে সাজা দেওয়ার চেয়ে শত অপরাধীকেও ছেড়ে দেওয়া ভালো।’
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের শেষে ১১২টি দেশ সম্পূর্ণভাবে মৃত্যুদণ্ড বিলুপ্ত করেছে এবং ১৪৪টি দেশ আইন বা বাস্তবে মৃত্যুদণ্ডের প্রথা পরিত্যাগ করেছে।
আইনে প্রস্তাবিত আরেকটি পরিবর্তন উদ্বেগের কারণ হয়েছে। মানবতাবিরোধী অপরাধ বা গণহত্যায় দোষী সাব্যস্ত হলে কোনো রাজনৈতিক দলকে সর্বোচ্চ ১০ বছরের জন্য নিষিদ্ধ করার বিধান যোগ করার কথা বলা হয়েছে। তবে এই বিধান বাস্তবায়ন করলে এটি ন্যায়বিচার এবং মৌলিক অধিকারের লঙ্ঘনের মাঝে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যহীনতার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, কোনো রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্র বা সনদে হত্যা, সহিংসতা, বৈষম্য বা মানবতাবিরোধী অপরাধের সমর্থন নেই। তাই স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন ওঠে, একটি রাজনৈতিক দল বা প্রতিষ্ঠানকে কি সত্যিই অপরাধী হিসেবে দায়ী করা যায়? বাস্তবে সাধারণত দলের ব্যক্তিবিশেষ বা নেতাদের বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ আনা হয়, পুরো দলকে নয়।
রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের ক্ষেত্রে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার বিদ্যমান আইনগুলোকে বিবেচনায় আনা যেতে পারে। বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, কোনো নাগরিক এমন কোনো সমিতি বা দলের সদস্য হতে বা গঠন করতে পারবে না, যা ধর্মীয়, সামাজিক বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করার উদ্দেশ্যে তৈরি হয়েছে; ধর্ম, বর্ণ, গোত্র, লিঙ্গ, জন্মস্থান বা ভাষার ভিত্তিতে নাগরিকদের মধ্যে বৈষম্য তৈরি করে; রাষ্ট্র, নাগরিক বা অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বা জঙ্গি কার্যক্রম সংগঠিত করে; অথবা যার গঠন ও উদ্দেশ্য সংবিধানের সাথে অসামঞ্জস্যপূর্ণ।
২০০৯ সালের সন্ত্রাসবিরোধী আইন-এর ১৮(১) ধারা অনুযায়ী, যৌক্তিক কারণে সরকার গেজেটে একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে কাউকে তালিকাভুক্ত বা কোনো সংস্থাকে সন্ত্রাসী কার্যকলাপের সাথে যুক্ত থাকার অভিযোগে নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে পারে এবং সেই সংস্থাকে তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করতে পারে।
সুতরাং, কর্তৃপক্ষ বা সরকারের দায়িত্ব হলো প্রমাণ করা যে, নিষিদ্ধ করার লক্ষ্যে প্রস্তাবিত সংস্থা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত। কিন্তু এটি কি তত সহজ? ১০ বছরের জন্য একটি রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা কি দলটির জন্য প্রকারান্তরে মৃত্যুদণ্ডের সমান নয়? মৃত্যুদণ্ড বিলুপ্তির পক্ষে যে যুক্তি দেওয়া হয়, তা কি রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার বিরুদ্ধেও প্রযোজ্য নয়?
অন্যদিকে, বিচার প্রক্রিয়ায় বিদেশি আইনজীবীদের নিয়োগ এবং বিচার কার্যক্রম ইন্টারনেট বা অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে ধারণ ও সম্প্রচারের ব্যবস্থা একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। পাশাপাশি, বিদেশি সরকার, বেসরকারি সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের প্রকাশ্য শুনানি, বিচার এবং অন্যান্য কার্যক্রমে উপস্থিত থাকার সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত জবাবদিহির প্রতি বর্তমান সরকারের অঙ্গীকারকে প্রতিফলিত করে।
বাংলাদেশ যখন শাসনব্যবস্থার সব ক্ষেত্রে ব্যাপক সংস্কারের পথে এগোচ্ছে, তখন ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনকে সমর্থন ও ইন্ধনের জন্য দায়ীদের বিচারে আন্তর্জাতিক মানের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। কঠোর বিচারিক প্রক্রিয়া ও যথোপযুক্ত শাস্তির মাধ্যমেই দেশ থেকে স্বৈরতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদের শিকড় সম্পূর্ণভাবে উপড়ে ফেলার আশা করা সম্ভব।
জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে ১৯৬৬ সালে গৃহীত ইন্টারন্যাশনাল কভেন্যান্ট অন সিভিল অ্যান্ড পলিটিকাল রাইটস-এর স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশ নিশ্চয় সেই চুক্তিতে অন্তর্ভুক্ত শর্তাবলী অনুসরণ করে আইন ও নীতিমালা প্রণয়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
(নিবন্ধটি ইংরেজি থেকে অনূদিত।)
লেখক: সহযোগী সম্পাদক, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন।
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]