ফ্যাসিস্টরা যেভাবে ক্ষমতায় আসে

আপডেট : ২৪ নভেম্বর ২০২৪, ০৬:২৭ পিএম

রাজনৈতিক আদর্শ হিসেবে ফ্যাসিবাদ অত্যন্ত জটিল। একই সঙ্গে এটি নিয়ত পরিবর্তনশীলও। ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে প্রাথমিকভাবে প্রধান পুঁজি থাকে সামাজিক ক্ষোভ। অর্থাৎ, কোনো দেশ বা সমাজের মানুষ যখন নানা বিষয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে, এক ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষোভ ও উত্তেজনা দানা বাঁধতে থাকে, ঠিক সেই অস্থির সময়টাকে পুঁজি করে ফ্যাসিস্টরা। একে ভিত হিসেবে ব্যবহার করে ধীরে ধীরে এগোনো শুরু করে ফ্যাসিবাদ।

মানবসভ্যতার শুরুটা হয়েছিল মানুষের গোষ্ঠীবদ্ধতার মধ্য দিয়ে। গোষ্ঠী গঠন হওয়ার পরই আসে তার নেতৃত্ব দেওয়ার প্রসঙ্গ। এই প্রক্রিয়াতেই ধীরে রাজ্য বা সাম্রাজ্যের গোড়াপত্তন হয়। রাজা বা সম্রাটের শাসনকাল শুরু হয়। অতিসরলীকরণ মনে হলেও বংশানুক্রমিক শাসনের ইতিহাস এ রকমই। এরপর ধীরে ধীরে আসে গণতন্ত্রের ধারণা। আর এই ধারণাতেই স্বৈরাচার বা একনায়কের তত্ত্বের উদ্ভব, যদিও এমন শাসন তত্ত্ব সৃষ্টির আগেও ছিল। সেই একনায়কতন্ত্রেরই একটি চরম রূপ হলো ফ্যাসিবাদ।

১৯২০ থেকে ১৯৩০‑এর দশকে ইউরোপে এর প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে উদ্ভব ও বিস্তার ঘটে। এবং তার প্রতিভূই মূলত হিটলার ও মুসোলিনি। মুসোলিনি এ ক্ষেত্রে ছিলেন অগ্রগামী সৈনিক। হিটলার তাঁর কাছ থেকে অনেক শিক্ষাই নিয়েছিলেন এবং নিজের স্বার্থে সেসব কাজেও লাগিয়েছিলেন। বিশেষ করে প্রোপাগান্ডা ও সহিংসতার বহুমুখী ব্যবহারের বিষয়টি মুসোলিনির কাছ থেকেই হিটলার আত্তীকরণ করেছিলেন বলে ধারণা করেন অনেক বিশ্লেষক। জার্মানি ও ইতালির পর ফ্যাসিবাদী আদর্শের ভিত্তিতে ইউরোপজুড়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন গঠিত হয়েছিল।

ফ্যাসিবাদের সংজ্ঞা আসলে অনেক। যেহেতু আগেই বলা হয়েছে যে, এই রাজনৈতিক আদর্শটি নিয়ত পরিবর্তনশীল এবং স্থান‑কাল‑পাত্রভেদে এর হরেক বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়, তাই ফ্যাসিবাদকে একদম নিখুঁতভাবে সংজ্ঞায়িত করা এবং এর মান সংজ্ঞা নির্ধারণ করা খুবই কঠিন। কিছু বিশেষজ্ঞ ফ্যাসিবাদ বলতে একগুচ্ছ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, একটি রাজনৈতিক দর্শন বা একটি গণআন্দোলনকে বুঝিয়ে থাকেন। আবার অনেকে বলেন ফ্যাসিবাদ এমন একটি রাজনৈতিক আন্দোলন, যেটি উগ্র জাতীয়তাবাদ, সামরিকবাদ এবং ব্যক্তিকে বাদ দিয়ে রাষ্ট্রের সর্বাধিক ক্ষমতায়নকে গুরুত্ব দিয়ে থাকে। তবে বেশির ভাগ সংজ্ঞাতেই ফ্যাসিবাদকে একনায়কতন্ত্রেরই আরেক রূপ হিসেবে মেনে নেওয়া হয়েছে। এটিও মেনে নেওয়া হয়েছে যে, ফ্যাসিবাদে উগ্র জাতীয়তাবাদের চর্চা আবশ্যিক এবং যেকোনো মূল্যেই একে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হয়ে থাকে।

প্রতীকী ছবিবিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ফ্যাসিবাদীরা প্রথমে একটি প্রতিষ্ঠিত ও প্রচলিত সরকার ব্যবস্থায় গণতন্ত্রকে অবলম্বন করেই ঢোকে। বাহ্যিকভাবে হলেও গণতন্ত্রের ধারক‑বাহকের পরিচয়েই তারা সরকার কাঠামোয় আশ্রয় খোঁজে। এরপর ধীরে ধীরে সেই কাঠামোর মধ্যে থেকেই ফ্যাসিবাদী দল বা ব্যক্তিরা ক্ষমতা সুসংহত করে, কুক্ষিগত করে। এবং সর্বশেষ ধাপে গিয়ে ফ্যাসিবাদী একনায়কতন্ত্রের গোড়াপত্তন হয়।

ইতালির বেনিতো মুসোলিনির শাসন ও জার্মানিতে এডলফ হিটলারের শাসনকে ফ্যাসিবাদের উত্তম দৃষ্টান্ত বলে মেনে নেওয়া হয়। এই দুই ফ্যাসিস্ট শাসকও এভাবেই ক্ষমতায় আরোহণ করেছিলেন। তাই ফ্যাসিস্টরা কীভাবে ক্ষমতায় আসে, সেটি বর্ণনার ক্ষেত্রে এই দুই শাসক ও তাদের দলের কর্মকাণ্ড উদাহরণ হিসেবে এসেই যায়। ফ্যাসিবাদ বিষয়ক গবেষক রবার্ট প্যাক্সটন এই প্রক্রিয়াতেই ফ্যাসিস্টদের রাষ্ট্র বা সরকার ক্ষমতা দখলের একটি ধারাবাহিক কাঠামো চিহ্নিত করেছেন। এই কাঠামোটির তিনি নাম দিয়েছেন, ‘ফাইভ স্টেজেস অব ফ্যাসিজম’। প্যাক্সটন মনে করেন, এই ৫ ধাপেই ফ্যাসিস্টরা ক্ষমতায় বসে। মুসোলিনি ও হিটলারও এভাবেই ক্ষমতায় আরোহণ করেছিলেন।

১ম ধাপ: মোহভঙ্গের আশ্রয়ে প্রকাশ্যে আবির্ভাব

ইতালি ও জার্মানিতে মুসোলিনি ও হিটলারের আবির্ভাব ঘটেছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পরপর। মূলত প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণে পাওয়া দুর্দশাহেতুই এই আবির্ভাবের অন্যতম কারণ। ওই সময় ইতালি ও জার্মানিতে যেসব প্রথাগত রাজনীতিবিদ সক্রিয় ছিলেন, তাদের কর্মকাণ্ডে দুই দেশের মানুষ খুশি ছিল না। দেশের নেতারা যেভাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জাতিকে নতিস্বীকার করিয়েছিল, সেটিই ছিল সাধারণ জনতার অসন্তুষ্টির মূল কারণ। ফলে জনগণের মনে ক্ষোভ দানা বাঁধছিল প্রবলভাবে।

ভার্সেই চুক্তিতে জার্মানির জন্য বরাদ্দ ছিল অত্যন্ত কঠোর ও অপমানজনক বিধি–এই বিষয়টিকে বড় করে তুলেছিলেন এডলফ হিটলার। মূলত এটিকেই নিজের পক্ষের প্রচারণার প্রধান অস্ত্র হিসেবে হাজির করেছিলেন হিটলার। ওই চুক্তিতে জার্মানিকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ সংঘটনের দায় নিতে বাধ্য করা হয়েছিল। জার্মানিকে ছেড়ে দিতে হয়েছিল ইউরোপ ও অন্যান্য অঞ্চলে দখলে থাকা উপনিবেশের মোট ভূমির প্রায় ১৩ শতাংশ। সেই সঙ্গে নিয়মিত সামরিক বাহিনী ও নৌবাহিনীর আকার ছোট করে আনতে হয়েছিল জার্মানিকে এবং প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বিজয়ী পক্ষকে দিতে হয়েছিল আর্থিক ক্ষতিপূরণ। জার্মান জাতিকে লজ্জিত, অপমানিত ও ক্ষুব্ধ বোধ করানোর জন্য এসব শর্ত যথেষ্ট ছিল। আর সেই সুযোগটাই নিয়েছিলেন হিটলার। তাছাড়া প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানিতে অর্থনৈতিক সংকট চরম আকার ধারণ করেছিল, ফলে সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতাও বেড়ে যায়। এই ভার্সেই চুক্তিকে পুরোপুরি অমান্য ও অগ্রাহ্য করার এবং দেশকে আবারও গর্বিত করে তোলার স্বপ্ন দেখিয়েই হিটলার তাঁর অনুসারীর সংখ্যা বাড়িয়ে ফেলেছিলেন এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে আলোড়নও ফেলতে পেরেছিলেন।

অন্যদিকে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর যে ধরনের চরম অর্থনৈতিক সংকট দেখা দিয়েছিল, তাতে তৎকালীন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় আর সাধারণ মানুষ আস্থা পাচ্ছিল না। জার্মানিতে দেখা দিয়েছিল চরম মূল্যস্ফীতি। নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম দ্রুত হারে বেড়ে আকাশে গিয়ে ঠেকেছিল। জার্মানির মুদ্রার মান নামতে নামতে চলে গিয়েছিল তলানিতে। এ‑সংক্রান্ত অনেক বিখ্যাত ছবিও পাওয়া যায় এখনকার অন্তর্জালেও।

জার্মানির পাশাপাশি ইতালিতেও অর্থনীতির অবস্থা খারাপ হয়ে গিয়েছিল। প্রায় দুই বছর ধরে সে দেশে গণহারে ধর্মঘট চলে, বিভিন্ন কলকারখানা স্থবির হয়ে পড়ে। ফলে বেকার মানুষের সংখ্যা বৃদ্ধি পায় আশঙ্কাজনক হারে। আর সেই প্রভাব স্বাভাবিকভাবেই পড়েছিল ইতালির সামাজিক ও রাজনৈতিক জীবনে।

প্রতীকী ছবিএভাবেই প্রচলিত ব্যবস্থার প্রতি জনতার মোহভঙ্গ বা আস্থাহীনতার সুযোগ নিয়ে ফ্যাসিবাদের ভিত শক্ত করার কাজটি শুরু হয়ে। এই সুযোগ ঠিকমতো কাজে লাগানোর ওপরই নির্ভর করে পরবর্তী ধাপের কর্মকাণ্ড।

২য় ধাপ: রাজনৈতিক দল হিসেবে বৈধতা প্রতিষ্ঠা

সাধারণ জনতার মোহভঙ্গ বা আস্থাহীনতাকে কাজে লাগিয়ে জনগণের মনোকাঠামোতে শক্ত আসন তৈরি করে ফ্যাসিবাদ। এই জনঅসন্তুষ্টিই মূলত ফ্যাসিবাদের রাজনৈতিক ক্ষমতার উৎস। কোনো কারণে জনগণের ক্ষোভ নেতিয়ে গেলেই ফ্যাসিবাদের রাজনৈতিক শক্তির উৎসে টান পড়ে। মুসোলিনি ও হিটলার নিজেদের রাজনৈতিক দল সৃষ্টি করেছিলেন তৎকালীন প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক কাঠামোকে ব্যালট বাক্সের মাধ্যমে প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে ফেলতে। এর বাইরে ওইসব ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক দলগুলোর অন্যতম অস্ত্র ছিল সহিংসতা।

১৯১৯ সালে মুসোলিনি ইতালির ফ্যাসিস্ট পার্টি গঠন করেছিলেন। এটির বৈশিষ্ট্য ছিল প্রধানত সমাজতন্ত্রের বিরোধিতা ও উগ্র জাতীয়তাবাদের প্রতি শর্তহীন সমর্থন। ইংরেজিতে ‘ব্ল্যাকশার্টস’ নামে এই দলের একটি সশস্ত্র মিলিশিয়া গোষ্ঠীও ছিল। এ গোষ্ঠীর সদস্যরা প্রায়ই ইতালির শহর‑গ্রামের রাস্তাঘাটে সমাজতন্ত্রীদের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘাতে জড়াত।

অন্যদিকে নাৎসি পার্টি ১৯২০ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর জার্মানিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। হিটলার ও তাঁর এই নাৎসি দল প্রধানত বিশ্বযুদ্ধের পরের নতজানু জার্মানিকে পুনরুজ্জীবিত করার আখ্যানকে হাজির করেছিল। আগের ধাপে এই বিষয়টি নিয়ে কিছুটা আলোচনাও হয়েছে। দেশটির সাধারণ জনতাকে নাৎসি পার্টির সদস্যরা বোঝাতে চেয়েছিলেন যে, জার্মানির ভেতরকার অস্থিরতাই প্রথম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের অন্যতম কারণ। তা না হলে হয়তো জিতেও যেতে পারত জার্মানি! এই অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা বলতে হিটলার ও তাঁর দল বুঝিয়েছিল দেশটির গণতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা, সমাজতন্ত্রী আন্দোলনকারীদের এবং অতি অবশ্যই ইহুদিদের। এভাবে কিছু অভিযুক্ত পক্ষ তৈরি করে, তাদের ওপর দুর্দশা সৃষ্টির সব দায় চাপিয়ে, বিশ্বযুদ্ধে জয়ী হওয়ার কার্যকারণের এবং জাতিগত শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের একটি মিথ তৈরি করা হয়। এতে নানা সমস্যা, অপমান ও ক্ষোভে জর্জরিত জনতাও আকৃষ্ট হয়েছিল। সেই আকর্ষণ এতটাই তীব্র ছিল যে, ১৯২৮ সালের পার্লামেন্টারি নির্বাচনে মোটে ৩ শতাংশ ভোট পাওয়া নাৎসিরা ১৯৩৩ সালের নির্বাচনে পেয়ে যায় ৪৪ শতাংশ ভোট। এভাবে জনতার রায় ব্যাগে ভরার সাথে সাথে নাৎসি দল বলপ্রয়োগের উপায়ও বের করেছিল নিজস্ব আধাসামরিক বাহিনী গঠনের মধ্য দিয়ে। ইংরেজিতে এর নাম ছিল ‘ব্রাউনশার্টস’। এই সশস্ত্র গোষ্ঠীটি ইতালির মতো করেই রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের ওপর বলপ্রয়োগে এবং তাদের নির্মূলে সিদ্ধহস্ত ছিল।

অর্থাৎ, ফ্যাসিবাদীরা দুটি সমান্তরাল প্রক্রিয়ায় নিজেদের রাজনৈতিক দলকে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। প্রথমে জনতার ক্ষোভকেই কেবল পুঁজি করে জনভিত্তি তৈরি করে নেয়। এরপর একদিকে প্রতিষ্ঠিত গণতান্ত্রিক কাঠামোর ভেতরে ঢুকে পড়ে ভোটের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা চলে এবং সেই সাথেই অন্যদিকে স্রেফ বলপ্রয়োগের বন্য নীতিতে হাত পাকতে থাকে। এভাবেই ফ্যাসিস্টরা রাজনৈতিক দল হিসেবে নিজেদের বৈধতা প্রতিষ্ঠা করে।

৩য় ধাপ: ডানপন্থীদের সঙ্গে মিশে শক্তিমত্তা অর্জন

দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যকার ইউরোপে প্রকৃতপক্ষে দুটি রাজনৈতিক গোষ্ঠী ক্রিয়াশীল ছিল। একটি হলো রক্ষণশীল আদর্শ এবং আরেকটি ছিল সমাজতান্ত্রিক আদর্শ। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে সেই সময় সমাজতান্ত্রিক আদর্শ নতুন দিশা দেখাচ্ছিল বিশ্বকে এবং একই সঙ্গে এক অজানা শঙ্কাও ছড়িয়ে দিয়েছিল। ফলে রক্ষণশীল রাজনীতি সমাজতান্ত্রিক জুজুতে ভীত হয়ে পড়েছিল। আবার পুঁজিবাদীরাও আতঙ্কে ভুগছিল। ঠিক এমন পরিস্থিতিতেই তৃতীয় বিকল্প হিসেবে উঠে আসে ফ্যাসিস্টরা।

অর্থাৎ, আর্থ‑সামাজিক সংকটের সঙ্গে রাজনৈতিক বিকল্পের অভাব ও জুজুর ভয়ও ফ্যাসিস্টদের উত্থানে প্রবল ভূমিকা রাখে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর এই পরিস্থিতিই তৈরি হয়েছিল। রক্ষণশীলেরা সাধারণত ঐতিহ্যবাহী মূল্যবোধ, জাতীয়তাবাদ, প্রথাগত আইন ও শৃঙ্খলার নীতির ওপর ভরসা রাখে। এই একই বোধে আস্থা থাকে ফ্যাসিস্টদেরও। ফলে আদর্শগতভাবে খানিকটা মিল থাকায় এ দুই পক্ষ কাছাকাছি আসে এবং একতাবদ্ধ হয়, রাজনীতিতে অংশীদার হয়। রক্ষণশীলেরা যদিও বুঝতে পারে যে, ফ্যাসিস্টরা আসলে প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক বন্দোবস্তকেই একেবারে উপড়ে ফেলতে চায়, তবু মন্দের ভালো হিসেবে তাদের সাথে জোট বাঁধে। ভাবতে থাকে যে, ভোটের মাঠের সুবিধায় জোট হোক, পরে না‑হয় ঝোপ বুঝে কোপ মেরে ফ্যাসিস্টদের বসিয়ে দেওয়া যাবে!

প্রতীকী ছবিগত শতকের বিশ ও ত্রিশের দশকেও জার্মানি ও ইতালিতে একই অবস্থা হয়েছিল। উপরি হিসেবে ছিল সমাজতন্ত্র ছড়িয়ে পড়ার ভয়। ফলে ফ্যাসিস্টদের সাথে নিয়ে রাজনৈতিক বৈধতা দেওয়ার কঠিন কাজটিকে আরও সহজ করে দিয়েছিল রক্ষণশীল রাজনীতিকেরা। ইতালিতে ১৯২১ সালের নির্বাচনে মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট পার্টির সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়েছিল রক্ষণশীলেরা এবং ভোটের রাজনীতিতে সংখ্যাগরিষ্ঠতাও লাভ করেছিল। আবার জার্মানিতে নাৎসি পার্টির সঙ্গে জোট বেঁধেছিল দেশটির রক্ষণশীল রাজনৈতিক নেতারা। দুই দেশের রক্ষণশীল রাজনীতিকেরাই ভেবেছিলেন যে, ফ্যাসিস্টদের সঙ্গে তাদের এই জোট হবে ক্ষণস্থায়ী এবং ভোটের মাঠে কেবলই সুবিধা লাভের পথ হবে। সেই সাথে সমাজতন্ত্রীদের ঠেকিয়ে রাখার কাজটিও সমাধা হবে। কিন্তু আদতে ফ্যাসিস্টদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেনি রক্ষণশীলেরা। ১৯৩২ সালের নির্বাচনে ভোটে সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভের পর থেকেই জার্মানিতে নাৎসি পার্টির প্রভাব ক্রমশ বাড়তে থাকে এবং একসময় হিটলার দেশটির চ্যান্সেলর হয়ে যান। কোনো কোনো বিশ্লেষক মনে করেন, হিটলার চ্যান্সেলর হওয়ার পরও নাৎসি পার্টিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে বলে মনে করেছিলেন তৎকালীন রক্ষণশীল রাজনীতিকেরা। উল্টো হিটলারের ক্যারিশমাকে কাজে লাগিয়ে ফায়দা লোটার চেষ্টা করেছিলেন। তবে নিজেদের অতিচালাক ভাবার সেই হিসাব শেষে ভুল প্রমাণিত হয়েছিল চরমভাবে। ফ্যাসিস্টদের নিয়ন্ত্রণ করার বদলে উল্টো নিজেদেরই দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া অবস্থায় আবিষ্কার করেছিলেন রক্ষণশীলেরা! আর এভাবেই সরকারি ক্ষমতা কাঠামোয় উত্থান ঘটে ফ্যাসিবাদীদের।

৪র্থ ধাপ: প্রতিষ্ঠানের উপর প্রভাব খাটাতে ক্ষমতার ব্যবহার

ক্ষমতায় বসার পর ফ্যাসিবাদীরা নিজেদের রাজনৈতিক কর্তৃত্বকে সুসংহত করার কাজ শুরু করে দেয়। অর্থাৎ, যা অর্জিত হয়েছে সেটিকে রক্ষা করার একচেটিয়া বন্দোবস্তকে পাকাপোক্ত করার কাজ আরম্ভ হয়।

ইতালিতে মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট পার্টি ১৯২১ সালের সাধারণ নির্বাচনে জিতেছিল রাজনৈতিক জোটের অংশ হয়ে। পরের বছর ইতালির রাজা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মুসোলিনিকে নিয়োগ দেন। এই নিয়োগ যে খুব স্বতঃপ্রণোদিত ছিল, বিষয়টি তা নয়। নিয়োগের আগে ফ্যাসিস্টরা এক বিশাল সমাবেশ করেছিল, নাম দিয়েছিল ‘মার্চ অন রোম’। এই সমাবেশের মূল উদ্দেশ্য ছিল শক্তি প্রদর্শন বা ফ্যাসিস্টদের গায়ের জোর দেখানো। সেই উদ্দেশ্য সফল হয়েছিল বলেই মুসোলিনি প্রধানমন্ত্রী বনে গিয়েছিলেন। ফ্যাসিস্ট পার্টির শক্তি বেড়ে গিয়েছিল বলেই অনেকে আশঙ্কা করেছিল যে, মুসোলিনিকে ক্ষমতা না দিলে দেশে গৃহযুদ্ধ বেধে যেতে পারে! অর্থাৎ, একটি ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেই ক্ষমতা সুসংহত করার পথ খোঁজে ফ্যাসিস্টরা। যদিও ইতালিতে ফ্যাসিবাদীরা নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব পুরোপুরি কুক্ষিগত করেনি। বরং ক্যাথলিক চার্চের মতো ঐতিহ্যবাহী কিছু প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট মাত্রায় স্বাধীনতা দিয়ে রেখেছিল।

নাৎসিরা অন্যদিকে আরও এক ধাপ এগিয়ে ছিল। তারা জার্মানিতে সরকার ও সমাজের ওপর পরিপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছিল। ১৯৩৩ সালে চ্যান্সেলর রূপে ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ পেয়েই হিটলার তৎকালীন সরকার থেকে অ‑নাৎসিদের বের করে দেন। ইহুদিদের নাগরিকত্ব বাতিল করতে তিনি আইন পাসও করেছিলেন এবং জার্মানির বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নাৎসিবাদে অবিশ্বাসী সব অধ্যাপকদের বিতাড়িত করেছিলেন। নাৎসি পার্টিকে আরও অবিসংবাদিত ও একমাত্র বিকল্প হিসেবে গড়ে তুলতে হিটলার বিরোধী সব রাজনৈতিক দলকেও নিষিদ্ধ করেছিলেন এবং নিজেই যেন যখন খুশি ডিক্রিবলে আইন প্রণয়ন করতে পারেন, সেই ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। এভাবে হিটলারের অধীনে জার্মানি একদলীয় শাসনের দেশে পরিণত হয়েছিল। ১৯৩৩ সালের নভেম্বরে আয়োজিত নির্বাচনে তুমুল কারচুপি ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে হিটলারের দল ৯০ শতাংশ ভোটে জয়লাভ করেছিল। আর ১৯৩৮ সালের পর তো নির্বাচন ব্যবস্থা তুলে দেওয়ারই ব্যবস্থা করেছিলেন হিটলার!

অর্থাৎ, ফ্যাসিস্টরা ক্ষমতায় আরোহণের পরপরই নিয়মিত নিজেদের শক্তির প্রদর্শনীর আয়োজন করতে থাকে। সরকারের অংশ হয়ে তারা অবাধে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালনের সুযোগ পায় এবং যেকোনো উগ্রবাদী ভাবনার প্রসারে সেই সুযোগকে কাজে লাগায়। এই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সমান্তরালে চলতে থাকে বলপ্রয়োগের উদাহরণ সৃষ্টি। সংঘাত, সহিংসতা করে অথবা সংঘাত, সহিংসতার ঝুঁকি তৈরি করে এক ধরনের ভয়ের ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করা হয়। এই পরিবেশে ভিন্নমতের যে কেউ কোণঠাসা হয়ে পড়ে। ফ্যাসিস্ট কাঠামোর বিরোধিতাকারী যে কেউ তখন নিশ্চিহ্ন হওয়ার ভয় পায়। এই বোধ তৈরি করতে নানা উপায় ব্যবহার করা হয়। আর এভাবেই ভয় দেখিয়ে, হুমকি দিয়ে নিজেদের দাবি আদায় করে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিকভাবে আরও শক্তি অর্জন করে ফ্যাসিবাদীরা। এক পর্যায়ে, জোর করে নিজেদের একমেবাদ্বিতীয়ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে ফ্যাসিবাদীরা।

প্রতীকী ছবি৫ম ধাপ: আমূল সংস্কার প্রক্রিয়া সম্পাদন

সমাজ ও সরকারের ওপর প্রায়‑পূর্ণ বা একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ আরোপের পর ফ্যাসিস্ট নেতারা নিজেদের শক্তি বা ক্ষমতা প্রয়োগের জন্য একের পর এক মরিয়া চেষ্টা চালাতে থাকে। এর জন্য আমূল সংস্কারের পথে হাঁটতে থাকে তারা। এর অন্যতম উদ্দেশ্য থাকে অবশ্যই পুরো রাষ্ট্রের খোলনলচে পাল্টে সেটিকে ফ্যাসিবাদের আদর্শের বা ইচ্ছার সাথে সম্মতি উৎপাদনের যন্ত্রে পরিণত করা।

এই ধাপে মুসোলিনির ইতালি যেমন আফ্রিকাজুড়ে সহিংস ঔপনিবেশিক অভিযান চালিয়েছিল। লিবিয়াতে ইতালির সেনারা স্থানীয়দের বিরুদ্ধে রাসায়নিক অস্ত্র ব্যবহার করেছিল নির্বিচারে। মূলত উপনিবেশিক শাসনের বিরোধীরা যে সংগ্রামের সূচনা করেছিল, সেটিকে চূড়ান্তভাবে দমন করতেই এমন নিষ্ঠুর নিপীড়নের আশ্রয় নিয়েছিল মুসোলিনির সেনারা। অনেককে আটক রাখা হয়েছিল কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে। ১৯৩৫ সালে ইতালি আগ্রাসন চালিয়েছিল তখনকার আবিসিনিয়া বা আজকের ইথিওপিয়ায়। সেখানে চূড়ান্ত বর্ণবাদী আচরণের পাশাপাশি চালানো হয়েছিল হত্যা‑ধর্ষণের মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। তবে এ ধরনের নৃতাত্ত্বিক আক্রমণ কিন্তু দেশের ভেতরে চালায়নি মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট দল। এই শাসকের সরকার শ্বেতাঙ্গ ও খ্রিষ্টান ধর্মাবলম্বীদের আর্যদের উত্তরাধিকারী বলে ঘোষণা করেছিল এবং কৃষ্ণাঙ্গ ও ইহুদিদের সঙ্গে তাদের বিয়ে নিষিদ্ধ করেছিল।

আগের ধাপের মতোই হিটলারের নাৎসি পার্টি ফ্যাসিবাদের এই ধাপেও ইতালির চেয়ে কয়েকগুণ এগিয়ে ছিল। বিশ্বে ফ্যাসিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে এ ক্ষেত্রে হিটলার ও তাঁর দল অনন্য। হিটলার বাইরের দেশগুলোতে আক্রমণ করার পাশাপাশি নিজের দেশেও কোপ মেরেছিলেন। বিরোধী সব রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করেছিলেন তিনি, ধ্বংস করে দিয়েছিলেন। লাখ লাখ মানুষকে হত্যার আদেশ দিয়েছিলেন। ইউরোপজুড়ে চালিয়েছিলেন আগ্রাসন। মুসোলিনির সঙ্গে হাতে হাত মিলিয়ে শুরু করেছিলেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধও।

অর্থাৎ, এই পঞ্চম ধাপে এসেই ফ্যাসিবাদ তার চূড়ান্ত বিধ্বংসী রূপ ধারণ করে। আগের চারটি ধাপে ক্রমে শক্তি অর্জনের পর সেই পুঞ্জীভূত শক্তির চরম প্রয়োগ দেখতে হয় এই ধাপে। এভাবেই ফ্যাসিবাদ দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বৈশ্বিক সীমানায় হাজির হয়। আর তার ফল ভোগ করতে হয় সবাইকেই। যে কারণে হিটলার ও মুসোলিনির নামে এখনও ভয়ে কেঁপে ওঠে যেকোনো সুবোধসম্পন্ন বিশ্বনাগরিকের মন।

আশা করা যায়, ওপরের ধাপগুলোর সাথে বৈশ্বিক ও জাতীয় পর্যায়ের অনেক শাসনকালেরই মিল খুঁজে পাওয়া যাবে। মনে রাখতে হবে, এসব মিল পাওয়া গেলেই কিন্তু বুঝে নিতে হবে যে, সংকট আসন্ন!

লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন

[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ক্ষমতাচ্যুত হয়ে প্রায় দুই বছর ভারতে অবস্থানের পর দেশে ফিরে তাঁর আত্মসমর্পণের...
চীনের সাম্প্রতিক বাংলাদেশ–সম্পৃক্ততা নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, পরিবর্তনশীল আঞ্চলিক ভূরাজনীতি এবং কৌশলগত ভারসাম্যের প্রয়োজনীয়তাকে সামনে এনেছে। দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির সীমা ছাড়িয়ে এক গুরুত্বপূর্ণ সফর ছিল...
প্রতিশ্রুতি আছে, পরিকল্পনা নেই— বাস্তবায়ন তো দূরের কথা! জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দলই তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ঘোষণা করেছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান,...
দলটির ইতিহাসে প্রথমবারের মতো আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একজন অমুসলিম প্রার্থীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক কৌতূহলের...
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি ধাপে ধাপে সারা দেশে সম্প্রসারণের নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। স্বচ্ছ উপকারভোগী নির্বাচন, নির্ভুল তথ্যভান্ডার, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার ও আন্তঃমন্ত্রণালয়...
ডলারের বাজারে আবারও চাপ বেড়েছে। সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি ডলারের দাম বেড়েছে ৫০ পয়সা। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, জুন শেষে সরকারের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধসহ বিভিন্ন আমদানি ব্যয় মেটানোয় ডলারের দাম কিছুটা...
রাজধানীর মিরপুরের পল্লবীর সিটি ক্লাব এলাকায় বিশ্বকাপ ফুটবল খেলা দেখার সময় আতশবাজি বিস্ফোরণে চার যুবক দগ্ধ হয়েছেন। তারা হলেন মো. সাকিব, রিফাত, সজীব ও তাহসিন। তাদের মধ্যে তিনজন প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে...
অস্বাভাবিক ভাড়া ও অব্যবস্থাপনার কারণে ভরা মৌসুমেও পর্যটকশূন্য কিশোরগঞ্জের হাওর। ফলে, বিপাকে নৌকার মাঝি, হোটেল মালিকসহ হাজারো মানুষ। পর্যটকদের অভিযোগ, ট্রলার ভাড়া ও খাবারের বাড়তি দাম, অপরিচ্ছন্ন...
লোডিং...

এলাকার খবর