আজ থেকে ২৪ বছর আগে টেস্ট খেলার অনুমতি পেয়েছিল বাংলাদেশ। খেলেছিল প্রথম টেস্ট ম্যাচ। এরপর এতগুলো বছর চলে গেল। কিন্তু তবুও ফিরে ফিরে আসে সেই ‘অসহায় আত্মসমর্পণ’। কীভাবে? চলুন, এ নিয়েই কথা বলা যাক।
টেস্ট স্ট্যাটাস পাওয়ার পরের বেশ কয়েক বছর বাংলাদেশের অবস্থা ছিল প্রায় একই। ‘অসহায় আত্মসমর্পণ’। যে দলের সঙ্গেই তখন টেস্ট খেলতে নামত বাংলাদেশের পুরুষ ক্রিকেট দল, মাঝে মাঝে আশার প্রদীপ জ্বালাতে পারলেও, দ্রুতই সেই প্রদীপের ঘি–সলতে ফুরিয়ে গিয়ে মঞ্চস্থ হতো ‘অসহায় আত্মসমর্পণ’। আর এই সমর্পণ সবচেয়ে বেশি হতো ব্যাটসম্যানদের। বোলাররা ছিলেন খেটে যাওয়াদের দলে। তাদের যেহেতু আউট হয়ে সাজঘরে ফেরার কোনো উপায় ছিল না, ফলে যতটুকুই সামর্থ্য, তাই নিয়েই তারা অন্তত যুদ্ধক্ষেত্রে লড়াই চালিয়ে যেতেন। হ্যাঁ, হারতেন হয়তো অসংখ্যবার। কিন্তু টিকে থাকার চেষ্টাটাও ছিল।
আর এই টিকে থাকার চেষ্টাতেই ভয়ানক কমতি ছিল বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের। ঐতিহাসিকভাবেই, অন্তত টেস্টে তো এটি সত্য বটেই। আমাদের ব্যাটসম্যানরা বারংবার প্রতিপক্ষের কাছে অসহায় আত্মসমর্পণের উদাহরণ তৈরি করেছেন এবং এখনও করছেন। বিষয়টি ব্যাটসম্যান বা বোলার—কারও পক্ষে–বিপক্ষে যাওয়ার ব্যাপার নয়। বাংলাদেশের পুরুষ ক্রিকেট দলের পরিসংখ্যান দেখলেই এটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। অনেক ক্ষেত্রেই বোলারদের অবদান ব্যর্থ করে দিয়েছেন আমাদের ব্যাটসম্যানরা। এমন উদাহরণ ঢের আছে। এই যেমন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক টেস্ট ম্যাচটিকেও উদাহরণ হিসেবে টানা যায়। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে প্রথম টেস্টের প্রথম ইনিংসে বোলাররা সেভাবে দাঁত বসাতে পারেননি। কিন্তু ওয়েস্ট ইন্ডিজের দ্বিতীয় ইনিংসে অভাবিত নৈপুণ্য দেখিয়েছেন। ফলে বেশ কম রানে প্রতিপক্ষকে অলআউট করে জেতার জন্য যে লক্ষ্য নির্ধারিত করা হয়েছিল, হাতে থাকা সময়ের হিসাবে সেটি অর্জনযোগ্যই ছিল। কিন্তু আমাদের ব্যাটসম্যানদের, বিশেষ করে টপ অর্ডারের বডি ল্যাঙ্গুয়েজ দেখে মনেই হলো না যে, শুরু থেকে কখনো তারা জেতার জন্য বা টেকার জন্য খেলতে চেয়েছেন।
চলতি বছরে এখনও পর্যন্ত ৯টি টেস্ট ম্যাচ খেলেছে বাংলাদেশ। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে টেস্ট সিরিজটি বাদ দিলে বাকি সব ম্যাচেই সেই অসহায় আত্মসমর্পণ করার গল্প। হ্যাঁ, ঠিক আগের মতোই মাঝে মাঝে মনে হয়েছে, এই বুঝি ন্যূনতম প্রতিরোধের দিকে যাওয়া হচ্ছে। কিন্তু কিছুক্ষণের সেই ভ্রম কাটতে বেশি দেরি হয়নি। তাই পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দারুণ খেলে ২–০’তে সিরিজ জিতলেও এর পর থেকেই শুরু হয় টানা ধবলধোলাই হওয়ার পালা। ভারতে গিয়ে হোয়াইটওয়াশ হয়েছে বাংলাদেশ, দক্ষিণ আফ্রিকাকে দেশে ডেকে এনেও একই হাল। এর আগে গত মার্চ মাসে শ্রীলঙ্কাকে দেশে ডেকে এনেও ধবলধোলাই হতে হয়েছে।
হেরে যাওয়া এই সবগুলো ম্যাচে একটি বিষয় দিনের আলোর মতো পরিষ্কার, সেটি হলো ধারাবাহিক ব্যাটিং ব্যর্থতা। শ্রীলঙ্কার সঙ্গে দুই টেস্টের চার ইনিংসের তিনটিতেই ২০০–এর কম রানে অলআউট হয়েছে বাংলাদেশ। ভারতের বিপক্ষে দুই টেস্টের চার ইনিংসের দুটিতে ২০০–এর নিচে এবং দুটিতে ২৫০–এর নিচে অলআউট হয়েছে আমাদের দল। দক্ষিণ আফ্রিকার বিরুদ্ধে চার ইনিংসের তিনটিতেই আবার দেড়শ রানের নিচে অলআউট হয়ে গেছে বাংলাদেশ। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে প্রথম টেস্টেও এক ইনিংসে ২৬৯ করার পর দ্বিতীয় ইনিংসে সব ব্যাটসম্যান মিলে তোলা গেছে মাত্র ১৩২ রান।
অর্থাৎ, আমাদের ব্যাটসম্যানরা এ বছর টেস্টে প্রায় ৫০ শতাংশের বেশি সময়েই অসহায় আত্মসমর্পণ করেছেন। সবাই মিলে ২০০ রানও করতে না পারলে তাকে এছাড়া আর কীইবা বলা যায়! আর যদি আমরা বিশেষভাবে টপ অর্ডারের দিকে তাকাই, তবে হতাশায় চোখ বুজে ফেলা ছাড়া আর গতি নেই। এটি ঠিক যে, প্রতিপক্ষ শক্তিশালী ছিল। কিন্তু এই মানের ক্রিকেট খেলার উপযোগী বলেই নিশ্চয়ই তাদের বাছাই করা হয়েছে। সেখানে ন্যূনতম টেম্পারমেন্ট ও ইনটেন্ট দেখাতে না পারলে আর খেলা কেন? অথচ এ বছরে খেলা ৯ টেস্টের হিসাবে বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি রান কোনো নিখাদ ব্যাটসম্যান করেননি। করেছেন অলরাউন্ডার হিসেবে পরিচিত মেহেদী হাসান মিরাজ। ১৬ ইনিংস খেলে মোট ৫৩৬ রান করেছেন তিনি, গড় ৩৮। মমিনুল হক, লিটন দাস, মুশফিকুর রহিম বা নাজমুল হোসেন শান্ত—আমাদের সব স্পেশালিস্ট ব্যাটসম্যানরাই এক্ষেত্রে মিরাজের পেছনে।
যদি টেস্টে আমাদের ব্যাটসম্যানদের ব্যাটিংয়ের হাইলাইটস দেখতে বসে কেউ, তবে একটি লক্ষণ অন্তত বুঝে যাওয়া যায় সহজেই। সেটি হলো, বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরা টিকে থাকার চেষ্টাটা করেন খুবই কম। নন্দিত সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদের ভাষায় বলতে গেলে, তাঁদের বড্ড তাড়াহুড়া! ধৈর্য্য শব্দটিই যেন তাঁদের কাছে অচেনা। অবশ্য জাতিগতভাবেও আমাদের ধৈর্য্য কিছুটা কমই। টেস্টে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ব্যাটিং দেখলে মনে হয়, টেস্ট নয়, যেন টি–টোয়েন্টি চলছে। এমনিতে টেস্টের সেই চিরাচরিত মন্থর গতির ব্যাটিংয়ের চল এখন সারা বিশ্বেই খুব একটা নেই। স্ট্রোক প্লে’র প্রদর্শনী চলে হরহামেশা। তবে যারা এটি করে, তারা সেই প্রচলিত টেস্ট ব্যাটিংটা শেখার পরই বলের সাথে পাল্লা দিয়ে রান তোলার চেষ্টাটা করেন। আর আমরা ধাপে ধাপে না উঠে, উঠতে চাই লাফে লাফে। দুই বা তিন ধাপের সিঁড়ি এক লাফে পার হতে গিয়ে তাই প্রায়ই পা পিছলে যায় এবং অল্প সময়ে ভিড় বাড়ে সাজঘরে।
কেউ কেউ হয়তো বলতে চাইবেন, আমাদের ব্যাটসম্যানদের ক্রিকেটীয় মেধা কম! কিন্তু সর্বোচ্চ মানের ক্রিকেট খেলতে গেলে মেধার চেয়েও বেশি প্রয়োজন হয় মেহনত। এ কারণেই আমরা প্রবাদপ্রতীম শচীন টেন্ডুলকর বা কুমার সাঙ্গাকারা বা স্টিভ ওয়াহদের পরিশ্রমের নানা মিথ শুনি। এমনকি হালের জো রুট বা ইয়াশাসভি জয়সোয়াল বা কেন উইলিয়ামসনদের ব্যাটিংয়েও পরিশ্রম ও ধৈর্য্যের যুগলবন্দী দেখতে পাই। এর ঠিক বিপরীতে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের কার্যক্রমে দৃষ্টিকটুভাবে চোখে পড়ে দুঃসাহসের হঠকারী প্রকাশ। ওতে টিকে থাকার চেষ্টা থাকে খুবই কম। কেবলই ভেঙে পড়ার ছবি। তাতে দিন দিন বাংলাদেশের টেস্ট ব্যাটিংয়ের বিতিকিচ্ছিরি রূপ পরিগ্রহ ছাড়া আর কিছু হচ্ছে না।
তবু আশায় বুক বাঁধতে হয়। দেশের ক্রিকেটমোদীরাও করেই যাচ্ছেন তা ধারাবাহিকভাবে। আপাতত টেস্টে আমাদের আশার ফুল একজনই, তিনি হলেন মেহেদী হাসান মিরাজ। এই বছরে টেস্টে সবচেয়ে বেশি রান করার পাশাপাশি সবচেয়ে বেশি ৩০টি উইকেটও তিনিই নিয়েছেন। অবস্থাদৃষ্টে মনে হতেই পারে যে, মিরাজ ছাড়া আমাদের জাতীয় পুরুষ ক্রিকেট দলের আর কেউই বোধহয় টেস্টে ‘কালা পারা না’!
এটি ঠিক যে, বাংলাদেশের ক্রিকেটে এখন একটি ট্রানজিশন পিরিয়ড চলছে। তামিম–সাকিব–মুশফিক–রিয়াদদের মতো অভিজ্ঞদের কেউ কেউ ধীরে ধীরে বিদায় নিচ্ছেন, কেউ আবার ফিকে হয়ে এসেছেন। মনে রাখতে হবে, এঁরাই একসময় শক্ত হাতে হালটা ধরে ছিলেন। এখন আসলে নতুন তরুণদেরই দায়িত্বশীল হতে হবে। তাতে তাঁরা যে ধারাবাহিক হতে পারছেন না, সেটি স্পষ্ট। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডেরও দায় অনেক। ঘরোয়া ক্রিকেটকে বেহাল রেখে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আর কতই’বা এগোবে দেশ?
বর্তমানে বাংলাদেশের জাতীয় পুরুষ ক্রিকেট দল আছে ‘৯৯৯’ অবস্থায়। টেস্ট, ওয়ানডে ও টি–টোয়েন্টি—সব ফরম্যাটের আইসিসি র্যাঙ্কিংয়েই বাংলাদেশ এখন ৯ নম্বরে। এ দেশে স্থানীয়ভাবে জরুরি পরিষেবা নেওয়ার ফোন নম্বরও ৯৯৯। সাধারণত দুর্ঘটনাজাতীয় কিছু ঘটলে এ দেশের সাধারণ নাগরিকেরা এই নম্বরে ফোন করেই সহায়তা চান, দুর্যোগ কাটিয়ে ওঠেন। ক্রিকেটে বাংলাদেশেরও এখন তেমন সহায়তাই বেশি প্রয়োজন। টেস্টে একটু বেশিই প্রয়োজন, এই যা। অসহায় আত্মসমর্পণের এই পরিস্থিতি থেকে বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা কত দ্রুত বের হতে পারেন, তাই এখন দেখার।
লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]