ক্রীড়াঙ্গনে উন্নতির জন্য অনেকগুলো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে। এরমধ্যে আছে রেমিট্যান্স, ব্র্যান্ডিং ও এনডোরসমেন্ট, অবকাঠামো, ক্রীড়া উন্নয়ন, ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি। আসলে এগুলো কেন গুরুত্বপূর্ণ তা দেখে নেওয়া যাক।
স্পোর্টস রেমিট্যান্স
বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনে দক্ষ জনবল তৈরির সুযোগ রয়েছে। এই তালিকায় থাকবে খেলোয়াড়, কোচ, আম্পায়ার, রেফারি, জাজ, প্রশাসনিক কর্মকর্তা, ব্যবস্থাপক, ধারাভাষ্যকার ইত্যাদি। অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, আমেরিকাসহ উন্নত দেশগুলোর পাশাপাশি ভারত, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তানও এই সুযোগ নিচ্ছে। তারা দক্ষ ক্রীড়া জনবল বিদেশে পাঠিয়ে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা বা রেমিট্যান্স আয় করছে। অথচ আমরা রেমিট্যান্স শব্দটি দেখি একটু ছোট পরিসরে। এর যে পরিসর আরও বাড়ানো সম্ভব তা আমরা বিবেচনাতেই নিই না। বিভিন্ন খাত থেকেই বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব। এক্ষেত্রে ক্রীড়াঙ্গনের সম্ভাবনা বিপুল। এর সামান্যই আমরা আয় করতে সক্ষম হচ্ছি আমাদের ক্রীড়াবিদ, আম্পায়ার ও রেফারিদের মাধ্যমে। এখানে ভাষা একটি সমস্যা। সেটা দূর করা কঠিন কোনো বিষয় নয়।
ব্র্যান্ডিং ও এনডোরসমেন্ট
খেলাধুলা সারা বিশ্বে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, মূল্যবান, আকর্ষণীয় ও গ্ল্যামারাস পণ্য। এর সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে বিপণন বা মার্কেটিং। অর্থাৎ এটা একটা ব্যবসা। দাতব্য কিছু নয়। আমরা তা কখনো বোঝার চেষ্টা করি না। ফলে হেলায় হারাচ্ছি যাবতীয় সম্ভাবনা। স্বাধীনতার ৫৩ বছর পেরিয়ে এসে এভাবে সম্ভবনা নষ্টের অবকাশ নেই। কারণ এই পণ্যের সফল বিপণন দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখবে। অবদান রাখবে জিডিপিতে। ক্রীড়া অর্থনীতি হবে বেগবান। তৈরি হবে কর্মসংস্থান।
একটি দেশকে বিশ্বজুড়ে খুব সহজে পরিচিত করাতে পারে খেলাধুলা। এজন্য চাই সঠিক ব্র্যান্ডিং। জাতীয়ভাবে ও প্রতিটি খেলাকে আলাদাভাবে। এমনকি তারকাদের নিয়েও। সঠিক ও সফল ব্র্যান্ডিংয়ে বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে দরকষাকষি সহজ হবে। তারকা খেলোয়াড়রাও পাবেন যথাযথ এনডোর্সমেন্ট।
প্রসঙ্গত, একটা সময় ছিল যখন নবাব বা জমিদাররা খেলাধুলার পৃষ্ঠপোষকতা করতেন। পরে সমাজের বিত্তবানরা তাঁদের জায়গা নেন। সেই জায়গায় এখন এসেছে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। আমরা যাদের করপোরেট বলছি। পৃষ্ঠপোষণার ধারা বদল হলেও আমাদের কর্মকর্তাদের মানসিকতা ও অ্যাপ্রোচের পরিবর্তন হয়নি। ফলে আমার থেকে গেছি সেই তিমিরে। আলোর পথে ফেরা সম্ভব কেবল পেশাদার ব্যবস্থাপনায়।
মনে রাখা জরুরি, পৃথিবীতে কোনো কিছুই ওয়ান ওয়ে নয়, টু ওয়ে ট্র্যাফিক; যে টাকা দেবে সে পাই-পয়সা হিসাব বুঝে নিতে চাইবে। করপোরেট পৃষ্ঠপোষণার এই বিষয়গুলো অনুধাবন করা আবশ্যক।
ক্রীড়া উন্নয়ন
এরজন্য প্রয়োজন সামগ্রিক ও সমন্বিত উদ্যোগ। যাকে বলে চাই একেবারে হোলিস্টিক অ্যাপ্রোচ। নাহলে সফলতা অধরাই থেকে যাবে। ক্রীড়া উন্নয়নের পূর্বশর্ত সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ, মানসম্মত অবকাঠামো, দূরদর্শী সংগঠক, পেশাদার ব্যবস্থাপনা, সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকার মনোভাব, সময়োপযোগী গবেষণা ও ট্রেন্ড অ্যানালাইসিস, বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনা, প্রযুক্তির সম্পৃক্ততা, উপযুক্ত আর্কাইভিং, কমিউনিটি এনগেজমেন্ট, পাঠক্রমে খেলাসংক্রান্ত বিষয়ের অন্তর্ভূক্তি, সমসাময়িক প্রজন্মের ওপর আস্থা আর কোয়ালিটেটিভ ও নির্মোহ সাংবাদিকতা।
বলার অপেক্ষা রাখে না, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই আমরা পিছিয়ে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আমাদের উপস্থিতিই নেই। এই যেমন গবেষণা ও ট্রেন্ড অ্যানালাইসিস। এটা শুনলে অনেকে ভিমরি খেতে পারেন। কারণ এর কি প্রয়োজন! অথচ এসব ছাড়া বর্তমানে এক পা-ও এগোনো সম্ভব নয়। সময়ে সময়ে বিশ্বজুড়ে সামগ্রিকভাবে অথবা দেশ ভেদে খেলার ট্রেন্ড বদলায়। আমাদের রাডারে তা ধরা পড়ে না। অবশ্য আমাদের রাডারই তো নেই। সফল হতে গেলে জানতে হবে, চোখ-কান খোলা রাখতে হবে। নচেৎ পিছিয়েই থাকতে হবে।
ক্রীড়া উন্নয়নে সরকারের পক্ষে সবসময় সবকিছু করে ফেলা সম্ভব না। এখানেই চাই বেসরকারি উদ্যোগ। তারা এখানে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারে। সরকারি নজরদারী ও জবাবদিহি সাপেক্ষে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বেসরকারিভাবে একাডেমি গড়ে উঠতে পারে। কিন্তু সেগুলো কি হবে, কেমন হবে ইত্যাদির জন্য সরকার প্রদত্ত নীতিমালা ও তাদের যথাযথ অধিভূক্তি থাকতে হবে। নাহলে গজিয়ে যাবে ব্যাঙের ছাতার মতো।
সমসাময়িক প্রজন্মরাই আধুনিক। যে যত পরে জন্মায় সে তত বেশি এগিয়ে থাকে। এবার তো প্রমাণ হয়ে গেল আমাদের জেন জি-দের কারিশমায়। এদেরকে সম্পৃক্ত করতে পারলে অনেক সমস্যার সমাধান হতে পারে। এরা মানসিকতায় অনেক এগিয়ে। এরা যথার্থই ভুবনগ্রামের বাসিন্দা। বিশ্ব এদের হাতের মুঠোয়। তাই এদেরকে অগ্রাধিকার দিয়ে পরিকল্পনা সাজালে সফল হওয়ার সম্ভবনা উত্তরোত্তর বাড়বে।
উন্নয়নমুখী স্কিম
ক্রীড়ানীতি ২০২৩-এর খসড়াতেও খেলাধুলাকে বিনোদন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। খেলোধুলা কোনো বিনোদন নয়। ক্রীড়া আসলে সংস্কৃতি ও রুচির পরিচায়ক। অপেশাদারিত্বের দিন শেষ। এখন শুধু অংশগ্রহণ নয়, বরং সফল হওয়াটাই মুখ্য। তাই সেকেলে মানসিকতা পরিহার করে পেশাদার অবকাঠামো বাস্তবায়নের মাধ্যমে খেলাধুলাকে এগিয়ে নিতে হবে। এখানে লক্ষ্যমাত্রা স্থির করার প্রয়োজনীয়তা আছে। কোন কোন খেলায় আমরা সাফ পর্যায়ে, কোনগুলোতে এশিয় পর্যায়ে এবং কোনগুলোতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সফল হতে চাই–সেটা নির্ধারণ করে বিভিন্ন স্কিম বা কর্মসূচির মাধ্যমে প্রতিভা অন্বেষণ থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নীত করার ব্যবস্থা করতে পারলে সাফল্য অধরা থাকবে না। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ অলিম্পিক অ্যাসোসিয়েশন (বিওএ)কে আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি একই মুখ ক্লাব, ফেডারেশন ও যে কোনো কমিটিতে থাকার প্রথা বিলুপ্ত হওয়াটা একান্ত আবশ্যক। অবকাঠামো উন্নয়নের দায়িত্ব অন্য কারো হাতে ন্যস্ত করে বিওএকে শক্তিশালী করতে পারলে ক্রীড়া পরিষদ ও ক্রীড়া পরিদপ্তরের কোনো প্রয়োজন পড়বে না বলেই বিশেষজ্ঞদের অভিমত।
ক্লাব ও লিগ
একটা সময় ছিল প্রতিটি জেলা শহরে নিয়মিত লিগ হত। সেই সংখ্যা কয়েক শ; অসংখ্য শিল্ড আর কাপের খেলাও হত। যত দিন গেছে সেসব বিলুপ্ত হয়েছে। খেলাকে ঢাকাকেন্দ্রিক করে ফেলা, ফেডারেশন ও বোর্ডের গাফিলতি এই অবক্ষয়ের মূল কারণ। এক্ষেত্রেও এটা পূর্ণাঙ্গ রিপোর্ট তৈরি করা, কারণ অনুসন্ধান করা ও দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা জরুরি। না হলে, এই ট্র্যাডিশন সমানে চলতে থাকবে। পাইওনিয়ার ফুটবল ও নির্মাণ স্কুল ক্রিকেটের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দুটি টুর্নামেন্ট বন্ধ করে দেওয়ার দায়ও উভয় প্রতিষ্ঠানকে নিতে হবে।
প্রতিটি খেলার জন্য চাই উপযুক্ত পরিবেশ ও ব্যবস্থা। কিন্তু আমাদের এখানে সেটা উপেক্ষিতও থাকে। প্রপার ম্যাট ছাড়া সম্ভব নয় এমন খেলাকে স্রেফ কংক্রিটের মেঝেতে বছরের পর বছর ধরে চালিয়ে যাচ্ছে ফেডারেশনগুলো। ফলে থাকছে না সাফল্যের সম্ভাবনা। বিদেশের গিয়ে লজ্জায় ফেলছে দেশকে। এর দায় খেলোয়াড়দের নয়, বরং কর্মকর্তাদেরই। অন্যদিকে কিছু অনামী ও দুর্বল দলকে এনে টুর্নামেন্ট আয়োজন করে নিজেরা চ্যাম্পিয়ন হয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলছেন তাঁরাই। এই প্রক্রিয়া চিরতরে বন্ধ করতে হবে।
অবকাঠামো নির্মাণ
দেশজুড়ে যত অবকাঠামো তা নির্মাণ করে থাকে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ। অবকাঠামো একটা হয় বটে, মূলত হয় মধু বন্টন। ফলে যেখানে প্রয়োজন নেই সেখানে কিছু একটা দাঁড় করানো হয়। সেটাও কি হয় তা নিয়ে বিভিন্ন সময় পত্রিকায় খবর হয়েছে। সারা দেশের সুইমিংপুলসহ নানা অবকাঠামো নির্মাণ, বেহাল দশা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে নানা সময়ে রিপোর্ট হয়েছে। অথচ তাতে সংশ্লিষ্টদের কিছুই এসে যায়নি। কোনো জরিপ এবং গবেষণা ছাড়া অবকাঠামো নির্মাণ বন্ধের পাশাপাশি ক্রীড়া পরিষদের কাছ থেকে এই দায়িত্ব সরিয়ে যথাযথ কোনো প্রতিষ্ঠানকে ন্যস্ত করতে হবে। আর বিগত ৩৩ বছরে জনগণের করের অর্থ নষ্ট করার জন দায়ীদের যথোপযুক্ত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
ঢাকায় প্রথম স্টেডিয়াম হয় ১৯৫৫ সালে। এর জীবনকাল শেষ হয়েছে অনেক আগেই। এই স্টেডিয়াম ভেঙে নতুন করে করার কথা অনেকবারই বিশেষজ্ঞরা বলেছেন। কিন্তু কোনো সরকারের আমলেই ক্রীড়া মন্ত্রণালয় ও জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ বিষয়টি আমলে নেয়নি। বরং প্রতিটি বড় আসরের (দেশিয় বা আন্তর্জাতিক) আগে অপরিকল্পিতভাবে সংস্কার হয়েছে। ২০১৭ সালে রেনোভশেনের জন্য ৮০ কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দ করা হলেও সময় মতো কাজ শেষ হয়নি। বরং সময় বেড়েছে, ব্যয়ও বেড়েছে। সর্বশেষ দাঁড়িয়েছে ১৫৫ কোটি টাকা। এই সংস্কার কাজেরও তদন্ত করে দোষীদের শাস্তি নিশ্চিত করা জরুরি। উপরন্তু ক্রীড়া পরিষদের দুটি ভবন, ঢাকা স্টেডিয়াম, হকি স্টেডিয়ামসহ পুরো এলাকাটাকে একটা স্পোর্টস কমপ্লেক্স হিসেবে গড়ে তোলা যায় কিনা সেটা বিবেচনায় নিতে পারে বর্তমান সরকার।
(চলবে)
লেখক: সাংবাদিক
[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]


বিশ্বমানের ক্রীড়াঙ্গন তৈরির এখনই সময়
