দেশে-বিদেশে এত ওলট‑পালট শেষে স্থিতিশীলতা ফিরল কী?

দেশ তো বটেই, গেল বছর বলা যায় গোটা দুনিয়াতেই একটা ওলট‑পালট হয়েছে। এমনিতে নির্বাচনের বছর হিসেবে ২০২৪ সালের দিকে সবার নজর ছিল। বিশ্বের ৬০টির বেশি দেশে হওয়া নির্বাচনে অনেক দেশেই ক্ষমতার বদল হবে একটা ধারণাও ছিল। কিন্তু নির্বাচন, পুনর্নিবাচন, ঝুলন্ত পার্লামেন্ট, দীর্ঘদিনের ক্ষমতাধর কর্তৃত্ববাদী একাধিক সরকারের জনরোষে পতন, নানা দেশ ঘিরে বৈশ্বিক পরাশক্তিদের ভাগ‑বাটোয়ারা, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে নয়া ব্যবস্থা–সব মিলিয়ে ২০২৪ যেন এখনো শেষই হচ্ছে না।

বিগত বছরে আগেই বলা হয়েছে, ৬০টির বেশি দেশে নির্বাচন হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ যেমন ছিল, তেমনি বিশ্বের জনবহুল গণতন্ত্রিক দেশ ভারত এবং গোটা বিশ্বের মুরুব্বি আমেরিকার নির্বাচনও ছিল। এর সাথে যুক্ত হয়েছে ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশের নির্বাচন। আর যুদ্ধ তো ছিলই, যা এখনো আছে, এখনো মরছে মানুষ।

বছর পেরিয়ে ২৪‑এর প্রলম্বন যেন টিকে আছে ২৫‑এও। সেটা কীভাবে? গত বছরে হওয়া নির্বাচনগুলোর দিকে তাকালে দেখা যাবে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ক্ষমতাসীনদের ফের ক্ষমতায় আসাটা অনেক কঠিন হয়ে পড়েছিল। যারা তারপরও আসতে পেরেছিল, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তাদের আসতে হয়েছিল নানা কারিকুরি করে। আবার এই ফিরে আসাদের কাউকে কাউকে ক্ষমতা থেকে টেনে নামিয়েছে জনতা।

আরও পড়ুন:

বিশ্বজুড়ে শুধু ২০২৪ নয়, আরও আগে থেকেই এক ধরনের অস্থিতিশীলতা বিরাজ করছে। এর মূলে যেমন আছে দুটি যুদ্ধ, তেমনি আছে এর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাবে দেশে দেশে বিদ্যমান অর্থনৈতিক সংকট। রয়েছে মুদ্রা রাজনীতি। কিন্তু এই যে দেশে দেশে ক্ষমতার এত ওলট‑পালট, তাতে এই দশার কি কোনো বদল হলো বা অদূরভবিষ্যতে বদলের কোনো ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে?

নিরঙ্কুশ জয় পেয়েছে স্টারমারের দল লেবার পার্টি। ছবি: রয়টার্স

উত্তর এখন পর্যন্ত, না। সাধারণ মানুষ তার অর্থনৈতিক দৈন্য নিয়ে আগে যেমন হতাশ ছিল, এখনো হতাশ। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এই হতাশার মাত্রা বরং বেশি।

বিগত বছরের নির্বাচনগুলোর একটি অভিন্ন বৈশিষ্ট্য রয়েছে। আর তা হলো–অধিকাংশ হেভিওয়েট নির্বাচনেই ক্ষমতাসীনদের পক্ষে ক্ষমতা ধরে রাখাটা কঠিন হয়ে পড়েছিল। শুরুতেই এ ক্ষেত্রে বলতে হয় আমেরিকার কথা। দেশটির নির্বাচনে শত চেষ্টাতেও শেষ পর্যন্ত ডেমোক্র্যাটদের বিজয় অধরা থেকে গেছে। মসনদে এসেছেন ঘটন‑অঘটনপটিয়সী ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর এই মসনদে ফেরায় তিনি সাথে পেয়েছেন প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট–উভয় কক্ষেই নিজ দলের সংখ্যাগরিষ্ঠতা। ফলে ঘটন ও অঘটন–দুইই এবার জমে যেতে পারে।

যেনতেন প্রকারে একটা নির্বাচন করে ক্ষমতায় ফের আওয়ামী লীগ এলেও এবার আর শেষ রক্ষা হলো না। ছবি: রয়টার্স

বদল এসেছে যুক্তরাজ্যেও। সেখানে আবার কনজারভেটিভদের হটিয়ে গদিতে এসেছে লিবারেলরা। অবসান হয়েছে ১৪ বছরের একটানা কনজারভেটিভ শাসন। কিন্তু নতুন আসা লিবারেলদের গদিও বড় নড়বড়ে। নতুন বছরে নতুন প্রধানমন্ত্রী স্টারমারও বেশ টলমল।

আরও পড়ুন:

বাংলাদেশ পরিস্থিতি তো নতুন করে কিছু বলবার নেই। যেনতেন প্রকারে একটা নির্বাচন করে ক্ষমতায় ফের আওয়ামী লীগ এলেও এবার আর শেষ রক্ষা হলো না। জনরোষে গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তার পতন হয়। ক্ষমতায় আসে অন্তর্বর্তী সরকার, যা পোশাকে অরাজনৈতিক। তবে রক্ষণশীল ও ধর্মবাদী দলগুলোর প্রতি এর পক্ষপাত নিয়ে জনপরিসরে সমালোচনা দিন দিন প্রকট হচ্ছে।

ভারতে নরেন্দ্র মোদি ফের গদিতে বসতে পারলেও এ জন্য তাঁকে জোট শরিকদের তুষ্ট করতে হয়েছে। সংগৃহীত ছবি

পাশের দেশ ভারতে নরেন্দ্র মোদি ফের গদিতে বসতে পারলেও এ জন্য তাঁকে জোট শরিকদের তুষ্ট করতে হয়েছে। বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় তাঁকে পুরো মেয়াদেই কিছুটা নড়বড়ে দশায় থাকতে হবে। এ ক্ষেত্রে অবশ্য বাংলাদেশ পরিস্থিতি তাঁর জন্য সহায় হয়েছে। একে কাজে লাগিয়ে বিজেপি ও নরেন্দ্র মোদি নিজের পায়ের তলার মাটি ফের শক্ত করার সুযোগ কাজে লাগাচ্ছেন। পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যগুলোর বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির জয় মোদির হাতকে শক্ত করছে।

আরও পড়ুন:

দক্ষিণ কোরিয়ায় বেশ একটা হল্লা হয়ে গেল। একবার সামরিক শাসন জারি, তার প্রতিক্রিয়ায় খোদ প্রেসিডেন্টকেই বাতিলের খাতায় ঠেলে দেওয়া পার্লামেন্ট–সব মিলিয়ে দেশটির রাজনীতির ময়দান এখনো বেশ উত্তপ্ত। সহসা তা ঠান্ডা হওয়ারও তেমন কোনো চিহ্ন নেই।

সামরিক আইন ঘোষণা করেন দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রেসিডেন্ট ইউন সুক ইওল। ছবি: সিএনএন

আলোচনায় নিশ্চিতভাবেই আসবে সিরিয়া। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর শেষ পর্যন্ত আসাদ সরকারের পতন হয়েছে সেখানে। দেশটির একনায়ক বাশার আল‑আসাদ দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। বলা যায় ২০১১ সালে শুরু হওয়া এই দীর্ঘ লড়াইয়ে সেখানে শেষতক আমেরিকা‑ইসরায়েল‑তুরস্ক এই ত্রয়ীই বিজয়ী হয়েছে। পিছু হটেছে বৈশ্বিক পরাশক্তির মর্যাদা পুনরুদ্ধারে রত রাশিয়া এবং নয়া পরাশক্তি হতে চাওয়া চীন ও মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক শক্তি ইরান। এর মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ব্লকই যে আরও অনেক দিন ছড়ি ঘোরাবে, তা এক রকম নিশ্চিত হলো।

বিদ্রোহীদের আক্রমণের মুখে সিরিয়ার স্বৈরশাসক বাশার আল–আসাদ দামেস্ক থেকে পালিয়ে মস্কোয় আশ্রয় নিয়েছেন। ছবি: এক্স থেকে নেওয়া

আফ্রিকার দেশ বতসোয়ানায়ও এসেছে বদল। সেখানে ৬০ বছরের শাসনের অবসান হয়েছে দেশটির ডেমোক্রেটিক পার্টির।

একইভাবে গত বছরের নির্বাচনে বিরোধী দলগুলো জয় পেয়েছে দক্ষিণ আফ্রিকা, ঘানা, পানামা, পর্তুগাল ও উরুগুয়েতে। ফ্রান্সে ইমানুয়েল মাখোঁকে সরে যেতে হয়েছে আগাম নির্বাচন দিয়ে। জাপানও আছে এ তালিকায়।

মোটাদাগে ক্ষমতার সমীকরণে প্রথাসিদ্ধ রাজনৈতিক দলগুলো এক রকম প্রান্তবাসী হতে হচ্ছে। ক্ষমতাসীন যে দলগুলো ফের ক্ষমতায় ফিরতে পেরেছে, তারা কেউ স্বস্তিতে নেই। তাদের বিরোধী মত ও দল শক্তির খেলায় ক্রমেই এগিয়ে যাচ্ছে।

আরও পড়ুন:

অর্থাৎ, নির্বাচন সুষ্ঠু হোক, কিংবা জালিয়াতিপূর্ণ হোক–ক্ষমতায় বদল হোক বা না হোক–ভোটার ও নাগরিকেরা ক্ষমতাধরদের নিয়ে ঠিক সন্তুষ্ট নয়। বিরাট হল্লা করে বদল এনেও দেখা যাচ্ছে, দীর্ঘশ্বাস থামছে না। হতাশা কমছে না। ফের গুজগুজ, চাপা ক্ষোভ, এমনকি কোথাও কোথাও অসন্তোষ দানা বাঁধছে। যেন, ক্ষমতায় কেউ থাকুক, সেটাই চাইছে না সাধারণ মানুষ।

এমন হওয়ার কারণ কী? পরিসংখ্যানভিত্তিক ওয়েবসাইট স্ট্যাটিস্টা এক প্রতিবেদনে জানাচ্ছে, মুখ্য কারণ অর্থনীতি। কোনো নির্দিষ্ট অঞ্চল নয়, গোটা বিশ্বই এক প্রলম্বিত অর্থনৈতিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। স্ট্যাটিস্টা এ নিয়ে ৩৪টি দেশের নাগরিকদের ওপর একটি জরিপ চালিয়েছে। সেখানে দেখা গেছে, জরিপে অংশগ্রহণকারীদের ৬৪ শতাংশই মনে করে তার দেশের অর্থনীতির অবস্থা বেশ নাজুক। আর নির্বাচন হয়েছে এমন দেশগুলোতে এই নৈরাশ্যের হার আরও বেশি। ফ্রান্স, জাপান, দক্ষিণ আফ্রিকা, দক্ষিণ কোরিয়া ও যুক্তরাজ্যের মতো যেসব দেশে নির্বাচন হয়েছে সম্প্রতি, সেখানকার মানুষদের ৭০ শতাংশের বেশি নিজ দেশের অর্থনীতি নিয়ে হতাশ। আমেরিকার ক্ষেত্রেও নানাভাবে সমালোচিত ডোনাল্ড ট্রাম্পের ফিরে আসার পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে অর্থনৈতিক সংকট এবং তা নিয়ে শাসকগোষ্ঠীর ওপর মানুষের হতাশা ও ক্ষোভ।

সারা দুনিয়ায় মুদ্রাস্ফীতির লাগাম পরানো কঠিন হয়ে পড়েছে। নিত্যপণ্যের দাম ক্রমেই সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। আগের দুই দশকের মহামন্দা, কোভিড‑১৯ মহামারি, দুটি বড় ও চলমান যুদ্ধ, দেশে দেশে সরকারগুলোর গরিবশোষণ ও ধনীতোষণ নীতি এবং সেই সূত্রে আয় বৈষম্যের ক্রমবৃদ্ধি ইত্যাদি মিলিয়ে এই ধারা এক প্রায় সমাধান অযোগ্য দশার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যার শেষ প্রান্তে সাধারণ মানুষের জন্য আছে এক গভীর খাদ।

নিত্যপণ্যের দাম ক্রমেই সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। ছবি: রয়টার্স

সেই খাদের দিকে যেতে বাধ্য হওয়া মানুষ আবার তার সামনে আশারও তেমন কিছু দেখছে না। কারণ, তার কথাই কেউ শুনছে না। একটা ভীষণ মেরুকরণের দুনিয়ায় সে নিজেকে আবিষ্কার করছে। চোখের সামনে সে দেখছে, গণতন্ত্র নামক বস্তুটি তামাদি হয়ে গেছে। যে তাকে ফেরানোর গল্প ফেঁদে আসছে, সেও একই রকম তস্কর। ফলে এই এক অর্থনীতি ও গণতন্ত্রের প্রশ্নেই বিভাজন বাড়ছে সমাজে। বাড়ছে মেরুকরণ। ৩১টি দেশের নাগরিকদের ওপর জরিপ চালিয়ে স্ট্যাটিস্টা জানাচ্ছে, গণতন্ত্র নিয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের ৫৪ শতাংশই হতাশা প্রকাশ করেছে। তাদের একটা সাধারণ বোধ হচ্ছে–তারা আর ব্যক্তি মানুষ হিসেবে রাজনীতিক ও নীতিপ্রণেতাদের কাছে গ্রাহ্য হচ্ছে না। বরং তাদের আর দশটা জড় উপকরণের মতো করেই দেখা হচ্ছে।

গণতন্ত্র ও অর্থনীতির এই দৈন্যের ফাঁক গলে বিশ্বমঞ্চে বেশ পোক্ত অবস্থান নিয়েছে ডানপন্থা, যা ক্রমেই অতি ডানের দিকে ধাবমান। ভারত তো বটেই, জাপান, দক্ষিণ আফ্রিকা, ইন্দোনেশিয়া, আর্জেন্টিনা, দু‑একটি ব্যতিক্রম বাদে ইউরোপ ও আমেরিকায়, আফ্রিকায় ডানপন্থাই আসছে সামনে, ক্ষমতায়। দেশে দেশে জাতীয়তাবাদী জিগির বেশ উচ্চকিত এখন। ফলে ক্ষমতায় যদি নাও থাকে, ডানপন্থী দলগুলো পায়ের নিচে এতটাই শক্ত ভিত পেয়েছে যে, ক্ষমতা ও শাসনের অনেক কিছুই আর তাকে এড়িয়ে করা যাচ্ছে না।

অস্ট্রিয়া, রোমানিয়া, পর্তুগাল, ফ্রান্স, জার্মানি, যুক্তরাজ্যসহ (অতি ডান) বহু দেশে ডানপন্থার দিকে ঝোঁক বাড়ছে। অর্থাৎ, আবারও সারা বিশ্বে জনতুষ্টিবাদী রাজনীতি হালে পানি পাচ্ছে। অবশ্য এটা মনে করার কারণ নেই যে, জনতুষ্টিবাদের সিঁড়ি বেয়ে শুধু ডানপন্থাই মোক্ষ পাচ্ছে। না, তালিকায় বামপন্থাও আছে। এ ক্ষেত্রে শ্রীলঙ্কা, মেক্সিকোর কথা বলতেই হবে।

অবশ্য জনতুষ্টিবাদের এই নববিজয়রথের বিষয়টি বুঝতে এত দেশের তথ্যের দিকে না তাকালেও চলে। শুধু যুক্তরাষ্ট্র, বা ওয়াশিংটনের দিকে তাকালেই হয়। সেখানে আবারও ট্রাম্প ফিরেছেন। অর্থাৎ, উগ্র জাতীয়তাবাদী জনতুষ্টিবাদের বিজয় হয়েছে।

প্রশ্ন হলো কেন? এই কয় বছর আগেই না ট্রাম্পকে বিরক্ত হয়ে ত্যাগ করেছিল আমেরিকানরা? তাহলে? কারণ, মানুষ আসলে একটা নিদান খুঁজছে। ২০১৬ সালে তারা ভেবেছিল ট্রাম্প প্রথাসিদ্ধ রাজনীতিকদের থেকে আলাদা। সুতরাং হয়তো তিনি এই নিদান দিতে পারবেন। ভুল ভাঙতে দেরি হলো না। চার বছর কোনোভাবে দাঁতমুখ খিঁচে সহ্য করে প্রথায় ফিরল মানুষ বাইডেনকে নির্বাচিত করে। কী পেল? একাধিক যুদ্ধ, মৃত্যু, প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ, মেরুর লড়াইয়ে নিজেদের কষ্টার্জিত সম্পদের অপব্যয়, ধনীতোষণ, আন্দোলনে লাঠিপেটা ইত্যাদি। ফলে ফের আবার তার সামনে রাখা বিকল্পের দিকে গেল মানুষ। যদিও সে জানে, প্রতারিত হওয়াই তার নিয়তি।

আর এই যে জনতুষ্টিবাদ এবং সেই সূত্রে মধ্যপন্থার পরাজয়, এর মধ্য দিয়ে দেশে দেশে বাড়ছে মেরুকরণ। মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় ফারাক তৈরি হচ্ছে। পিউ রিসার্চ সেন্টারের এক গবেষণায় দেখা গেছে, সাধারণ মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক আদর্শ বিচারে মেরুকরণ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে।

নবনির্বাচিত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্স

একটু চোখ বোলানো যাক। পিউ রিসার্চ সেন্টারের তথ্যমতে, আমেরিকায় পরিবর্তনের পক্ষে (উদার) মত দিয়েছে জরিপে অংশ নেওয়া ৯১ শতাংশ ব্যক্তি। আর প্রথাগত পথে (রক্ষণশীল) চলতে ইচ্ছুকদের হার ২৮ শতাংশ। ফলে উদার নাকি রক্ষণশীল পন্থার প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রে দুই মেরুর দূরত্ব ৬৩ শতাংশ পয়েন্ট। একই প্রশ্নে এই ব্যবধান অস্ট্রেলিয়ায় ৩৮, ইসরায়েলে ৩৫, পোল্যান্ডে ৩২, হাঙ্গেরিতে ৩২, নেদারল্যান্ডসে ৩০, কানাডায় ৩০, স্পেন ৩০, গ্রিস ২৯, যুক্তরাজ্যে ২৫, সুইডেন ২৫, জার্মানি ২৪, ইতালিতে ২৩, ফ্রান্সে ২৩ ও বেলজিয়ামে ৮ শতাংশ পয়েন্ট। অর্থাৎ, সর্বোচ্চ মেরুকরণ আমেরিকায়। ইউরোপের দেশগুলোর মধ্যে শুধু বেলজিয়ামেই এ ব্যবধান দুই অঙ্কের নিচে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তানসহ দক্ষিণ এশিয়া বা এশিয়ার দেশগুলোর দশা সম্পর্কে জানার কোনো উপায় নেই। তবে, নিত্যকার ঘটনাপ্রবাহ সাক্ষ্য দিচ্ছে, এসব অঞ্চলে বাম ও ডান ধারার মধ্যকার বা উদার ও রক্ষণশীল ধারার মধ্যে এই অঞ্চলে মতাদর্শিক ব্যবধান দিন দিন বাড়ছে। ফলে সবচেয়ে বিপাকে রয়েছে মধ্যপন্থা, যা মানুষকে স্বস্তিহারা করে ফেলছে।

এই অস্বস্তিই আসলে সেই ঘর, যেখানে আগে থেকেই বাস করে হতাশা নামক বস্তুটি। এই হতাশা অর্থনৈতিক শোষণ, মতপ্রকাশে বাধা, নিজ নিজ আচারে বাধা, ট্যাগিং সংস্কৃতি, গণতান্ত্রিক কাঠামোয় নিজেকে খুঁজে না পাওয়া থেকে উদ্ভূত। ফলে ঘরটিতে প্রবেশের পর অস্বস্তি ও হতাশার শুভদৃষ্টি বিনিময় আর শুভ থাকছে না শাসকদের জন্য। জন্ম হচ্ছে ক্ষোভের। সেই ক্ষোভকে প্রশমিত করে নিজের দিকে আনতে বিশ্বের অধিকাংশ দেশের শাসক ও রাজনীতিকেরা নেমেছেন উগ্র জাতীয়তাবাদী জনতুষ্টিবাদের আবাদে। এর ফলও অবশ্য তাকেই ভোগ করতে হচ্ছে। শুধু জনতাকে একবার এ মুখ থেকে, ও মুখে যেতে হচ্ছে। অর্থনৈতিক সংকটের ভুক্তভোগী হলেও এর কোনো নিদান যেহেতু সে জানে না, সেহেতু কথিত উচ্চকণ্ঠ নিদানদাতাদের ওপরই তাকে আস্থা রাখতে হচ্ছে। এই আস্থার প্রতিদান কেউ তাকে দিতে পারছে না। কারণ, গালভরা কথা বলা যত সহজ, করা ততই কঠিন। ফলে শাসকমাত্রই বিরোধ ও অসন্তোষের মুখে পড়ছে, যা এক নিরন্তর অস্থিতিশীলতার পাঁকে আটকে ফেলেছে দেশে দেশে একটু স্বস্তি খোঁজা মানুষদের। এটা এক চক্রের নির্মাণ করছে। এই চক্রে আজকের বিজয়ীই পরিণত হচ্ছে কালকের বিজিততে। অবশ্য জনতার জন্য আজ ও কাল–দুইই সমান। তার কোনো বিজয়ের দিন যেন আর নেই।

লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন

[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]