নয়া বিশ্ব: বিশ্ব কী বড় কোনো যুদ্ধের দিকে যাবে?

যুদ্ধ নিয়ে একটা গুঞ্জন বেশ কিছুদিন ধরেই চলছে। কিন্তু যুদ্ধ তো বাস্তব। তাহলে আর কোন যুদ্ধ? গুঞ্জনে আশ্রয় নেওয়া যুদ্ধটি আরও প্রলয়ঙ্করী, আরও বিনাশী। কেন এমন শঙ্কার বীজ ছড়াচ্ছে চারদিকে? কেন ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে সতর্ক করে ওভাল অফিসের বৈঠকে বসে বলছেন–আপনি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে জুয়া খেলছেন।

এ প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে যুদ্ধের আর্থিক মূল্য নিয়ে একটু ধারণা নেওয়া যাক। আটলান্টিক কাউন্সিলের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজা যুদ্ধে শুধু গাজার অবকাঠামো ধ্বংসের কারণে আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ১ হাজার ৮৫০ কোটি ডলারের। এটা বিশ্বব্যাংক, জাতিসংঘ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের হিসাব। এই হিসাব ২০২৪ সালের ২২ অক্টোবর দেওয়া হয়েছিল। যুদ্ধবিরতির পর সার্বিক পরিস্থিতি দেখার পর এই হিসাব আরও অনেকখানি বাড়বে।

যুদ্ধবিধ্বস্ত গাজা। ছবি: রয়টার্স এদিকে একই যুদ্ধ নিয়ে ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যমের বরাত দিয়ে তুরস্কের সংবাদ সংস্থা আনাদলু জানিয়েছে, গাজা যুদ্ধে ইসরায়েলকে ৪ হাজার ২০০ কোটি ডলারের আর্থিক মূল্য চোকাতে হয়েছে। আর মানুষের জীবনের হিসাব নিলে এ পরিমাণ কোথায় গিয়ে ঠেকবে, তা সহজেই অনুমেয়।

তাকানো যাক ইউক্রেন যুদ্ধের দিকে। ওয়াশিংটন পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, শুধু যুদ্ধেই ইউক্রেনের ব্যয় হয়েছে ৩২ হাজার কোটি ডলার। রুশ পক্ষের হিসাবটি যুক্ত করলে এ অঙ্ক কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা আর না ভাবলেও চলবে। আর এর সাথে যখন ইরান, চীন, উত্তর কোরিয়া, গোটা ইউরোপকে জুড়ে দেওয়া হবে, তখন এটি লাখ কোটি ডলারের সীমা পেরিয়ে যাবে নিশ্চিতভাবেই।

এবার তাহলে সহজেই বোঝা যাচ্ছে যে, এই যে বৃহত্তর যুদ্ধের শঙ্কা, তার ব্যাপকতা আসলে কত? ঠিক কী পরিমাণ মানুষের প্রাণ নানাভাবে জড়িয়ে যাবে এর সাথে। আর এর অর্থমূল্যই‑বা কত হবে?

তেমন যুদ্ধের কি কোনো শঙ্কা আছে? পরাশক্তির লড়াই যখন চলে, তখন যুদ্ধের শঙ্কা না থেকে পারে না। এ ক্ষেত্রে মূল লড়াইটি নিশ্চিতভাবেই চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে। এই লড়াই যুদ্ধের ময়দান পর্যন্ত যাবে কি যাবে না, তা বলে দেবে অনেকগুলো বিষয়।

স্নায়ুযুদ্ধকালের মতো করে গোটা বিশ্বে মানচিত্র নিয়ে টানাটানি না লাগলেও দেশে দেশে নিজ স্বার্থ রক্ষায় শাসক অদল‑বদল অনেকটা পোশাক বদলের মতোই হয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র নিজ মসনদ টেকাতে চীনের সঙ্গে দ্বৈরথে রাশিয়া ও ভারতকে কাছে টানার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে বলেই মনে হয়। আর সেক্ষেত্রে পরীক্ষিত ‘পশ্চিমা মিত্র’দের ত্যাগ করার প্রয়োজন পড়লে তাও তারা করবে।

ইউক্রেন যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সর্বাত্মকভাবে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে চীনের সঙ্গে তার একটি ছায়াযুদ্ধ হয়েছে–এটা বলতেই হবে। তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প এই যুদ্ধের মীমাংসা খুঁজতে গিয়ে যেভাবে ইউক্রেন ও বাকি ইউরোপকে বাদ রাখলেন এবং এখন পর্যন্ত চাপ জারি রেখেছেন, তাতে নতুন সমীকরণ হাজির না হওয়াটা অস্বাভাবিক। ইউরোপের দেশগুলো সেই সমীকরণ তৈরির পথে হাঁটছেও।

যুক্তরাষ্ট্র ইউক্রেনকে আর কোনো সহায়তা তহবিল ছাড় না করার ঘোষণার পর গত ৩ মার্চ লন্ডনে সম্মেলন ডেকেছিলেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। ওয়াশিংটন ফেরত স্টারমারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে পোল্যান্ড, সুইডেন, তুরস্ক, নরওয়ে, চেক প্রজাতন্ত্র, ডেনমার্ক, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, রোমানিয়া, ফিনল্যান্ড, ইতালি, স্পেন ও কানাডাসহ ১৮টি দেশের নেতা উপস্থিত হয়েছিলেন। সেখানে উপস্থিত ছিলেন জেলেনস্কিও।

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। ছবি: রয়টার্সবৈঠক শেষে কিয়ার স্টারমার ইউক্রেনকে দুই বিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তা দেওয়ার ঘোষণাও দিয়েছেন। একই রকম কিছু ঘোষণা সামনেও আসতে পারে। কারণ, এই যুদ্ধে পিছু হটাটা ইউরোপের জন্য আত্মঘাতি হয়ে উঠতে পারে বলে মনে করছেন অঞ্চলটির নেতারা। এ কারণেই ঘনঘন জরুরি সম্মেলনে বসছেন তাঁরা।

এই ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যে শক্তিধর দেশ হিসেবে ব্রিটেন, জার্মানি ও ফ্রান্সের পাশাপাশি তাকানো দরকার পোল্যান্ডের দিকেও। কেন? কারণ, সাবেক বাইডেন প্রশাসনের সময় এই পোল্যান্ডকেই ‘পশ্চিমা বিশ্বের’ পরবর্তী অগ্রসেনা হিসেবে গড়ার কাজটি করা হচ্ছিল বেশ জোরেশোরে।

কেন পোল্যান্ডকে বেছে নেওয়া? এ ক্ষেত্রে মানচিত্রে তার সুবিধাজনক অবস্থান একটি বড় কারণ। আর দ্বিতীয় কারণ অবশ্যই তার অর্থনীতি। পোল্যান্ড ও রাশিয়ার মধ্যে রয়েছে বেলারুশ, যা কিনা আবার পরীক্ষিত রুশ মিত্র। পোল্যান্ডের আরেক পাশে আছে জার্মানি, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডিফ্যাক্টো নেতা। ইউক্রেন যুদ্ধের মাঝামাঝি পর্যায়ে জার্মানি ও ফ্রান্স রাশিয়ার সাথে দ্রুত একটা মিটমাট চাইলে পোল্যান্ড ও ব্রিটেনের সাথে তাদের দূরত্ব বেড়েছিল। কিন্তু এই দূরত্ব ঘুচিয়ে দিয়েছেন ট্রাম্প, রিয়াদের আলোচনায় ইউরোপের কোনো প্রতিনিধিকে না রেখে। ফলে এবার পোল্যান্ডের মতো করেই বাকি ইউরোপ বলতে প্রস্তুত যে, আরেকটি যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে ইউরোপ, যা থেকে কেউ রেহাই পাবে না। উল্লেখ্য, পোল্যান্ডের তরফ থেকে এই ভাষ্য এসেছিল গত বছরের মার্চে।

অন্য ইউরোপীয় দেশগুলোর মতো বয়স্ক জনসংখ্যা নিয়ে পোল্যান্ড একটি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। কিন্তু ইউক্রেন যুদ্ধই সেই সংকটের সমাধান এনে দিয়েছে। এই যুদ্ধে প্রতিবেশী ইউক্রেনের ১ কোটি ১৫ লাখ লোক দেশটিতে আশ্রয় নিয়েছে। এই এক‑দেড় কোটি লোকের আবার আছে যুদ্ধের টাটকা স্মৃতি। পাশাপাশি পোল্যান্ড ২০২২ সালেই পাঁচ বছরের মধ্যে তাদের সেনা সংখ্যা ৩ লাখে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে রেখেছে। সে অনুযায়ী কাজও করছে দেশটি। শেষ পর্যন্ত এই প্রতিশ্রুতি রাখতে পারলে পোল্যান্ডেই থাকবে ইউরোপের সবচেয়ে বড় ও শক্তিশালী সামরিক বাহিনী। সাথে ইউক্রেন ও ব্রিটেনের সঙ্গে সামরিক চুক্তি এবং ২০২২ সালেই মার্কিন সেনা সদর স্থাপনে সম্মত হওয়ার বিষয়টি যোগ করলে পোল্যান্ডের পরিচয় আর বাফার না থেকে, ক্রমেই শীর্ষ তূন হিসেবে চিহ্নিত হবে।

ফলে ‘পশ্চিমা বিশ্ব’ বা ‘পশ্চিমা সভ্যতা’ ধারণা থেকে ইউরোপকে ছেঁটে ফেলে ‘আমেরিকান সভ্যতার’ আলাপটি একটি বৃহত্তর যুদ্ধের শঙ্কাকে বাড়িয়ে দিচ্ছে। যদিও ট্রাম্প খোলাখুলি চলতি যুদ্ধগুলো থামানোর কথা বলছেন। কিন্তু এই সমাধানের পথে হাঁটতে যে পন্থা নিচ্ছেন, তা বারুদের গোলায় আগুন দিতে পারে। গাজায় যুদ্ধবিরতি চলাকালে তিনি ফিলিস্তিনিদের জায়গা দেওয়ার প্রস্তাব তুলেছেন সৌদি আরবের কাছে। ইউক্রেনের সমাধান খুঁজতে তিনি এককভাবে শুধু রাশিয়ার সাথে কথা বলছেন। ছুড়ে ফেলছেন ন্যাটোসহ অন্যসব বিষয়কে।

বলা দরকার, মার্কিন প্রকল্প ডারপার কথাও। এটি মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্প, যার পূর্ণ রূপ–ডিফেন্স অ্যাডভান্সমেন্ট রিসার্চ প্রজেক্ট এজেন্সি। যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যমুখী যাবতীয় ধারণা এখন এই প্রকল্পের দিকে তাকিয়ে। বলে রাখা ভালো, এমনই একটি প্রকল্প ছিল আরপানেট (অ্যাডভান্সড রিসার্চ প্রজেক্ট এজেন্সি নেটওয়ার্ক), যার ফল হচ্ছে আজকের ইন্টারনেট। তফাৎ হচ্ছে ডারপা কাজ করছে মূলত মহাশূন্য নিয়ে। মহাকাশে মানুষের স্থিতি, বিস্তৃতি তো বটেই বড় বড় সার্ভার স্থাপনের বিষয়গুলোই এর গবেষণার কেন্দ্রে রয়েছে।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের তরফ থেকে ন্যাটো জোট ও মিত্রদের স্বার্থকে এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা থেকে ওয়াশিংটনকে সরিয়ে নেওয়া ইত্যাদি বিদ্যমান বিশ্বব্যবস্থার অবলোপনের ইঙ্গিতবাহী। তাঁর কথা বারবার করে আসছে কারণ, এই সংস্থাগুলোই মার্কিন শক্তিমত্তার প্রতীক। বাকি নেতৃবৃন্দ তো আগে থেকেই এই কাঠামো বদলাতে উদ্‌গ্রীব। 

প্রশ্ন হলো–ডোনাল্ড ট্রাম্প কি তবে নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মারছেন? তিনি নিজে থেকে কি খর্বশক্তির হতে চাইছেন? উত্তর হচ্ছে–না। কারণ, ট্রাম্প তো বটেই যুক্তরাষ্ট্র বুঝে গেছে যে, চীনা বলয় এমনভাবে বেড়েছে এবং সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিগুলো এমনভাবে একাট্টা হচ্ছে যে, শুধু ইউরোপকে সাথে নিয়ে এ লড়াইয়ে টিকে থাকা যাবে না। তাই যুক্তরাষ্ট্র অবশেষে ইউরোপকে বোঝা হিসেবে চিহ্নিত করে তাকে ঝেড়ে ফেলতে চাইছে। নয়া বিশ্বব্যবস্থার যে পদধ্বনি শোনা যাচ্ছে, তাতে তারা নিজের অংশটি বুঝে নিতে চাইছে। এখানে কোনো নিয়ম বা বিধি বা সম্পর্কের বালাই নেই।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ছবি: রয়টার্সদ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর এবং আরও স্পষ্টভাবে স্নায়ুযুদ্ধোত্তর বিশ্বে ‘পশ্চিমা বিশ্ব’ চিহ্নিত সীমান্তগুলো নিয়ে একটা ঐকমত্যে পৌঁছায়। ইউরোপের কাছে নির্ধারিত সীমানাগুলো এবং সেই সীমানার ধারক দেশগুলোর সার্বভৌমত্ব খুবই সংবেদনশীল একটি বিষয়। ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর প্রথম মেয়াদে মেক্সিকো সীমান্তে ‘বিগ বিউটিফুল ওয়াল’ তৈরির প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছিলেন। এটি নিয়ে প্রতিবেশিরা অস্বস্তিতে ভুগলেও ইউরোপ আশ্বস্ত হয়েছিল যে, পুরোনো ঐকমত্যের বাইরে তাহলে ট্রাম্প যাবেন না। কিন্তু মনে রাখা দরকার, ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ইউরোপে কোনো যুদ্ধ ছিল না। দ্বিতীয় মেয়াদে আছে। আর এই যুদ্ধের বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে ট্রাম্প এই সীমানা‑রেখাকেই হাস্যকর ও বলপ্রয়োগে দখলযোগ্য বলে বার্তা দিচ্ছেন। ফলে ইউরোপ এবার শিরে সংক্রান্তি অনুভব না করে কী করবে! করছেও তাই।

রাশিয়াকে প্রতিহত করতে তারা একাট্টা হতে চাইছে। আর রাশিয়া? সে তো প্রস্তুত হয়ে বসেই আছে। আগেই বলা হয়েছে যে, রাশিয়া যুদ্ধকালীন সিলেবাস চালু করেছে সেই ২০২২ সালেই, যা কিন্ডারকার্টেন থেকে শুরু করে সব পর্যায়ে অনুসৃত হচ্ছে। ফলে এটি যে শুধু ইউক্রেন যুদ্ধকে লক্ষ্য করে নয়, তা তো স্পষ্টই। ৭‑৮ বছরের শিশু থেকে ৩৫‑৪০ বছরের তরুণ‑যুবাদের মনস্তত্ত্বে সামরিকীকরণ ঘটিয়ে তার ফল তারা আঞ্চলিক যুদ্ধের মধ্যেই ঘরে তুলবে–এমনটা নিশ্চয় ভাবছে না। তবে কি রাশিয়া যুদ্ধ করবেই? না, উত্তরটি এতটা সরল নয়। রাশিয়ার এই অবস্থান, প্রস্তুত হয়ে থাকার জন্য। ঠিক যেমন পোল্যান্ডকে প্রস্তুত করা হয়েছে। ঠিক যেমন ইউরোপ একজোট হতে চাইছে, সে রকম।

তবে কি যুদ্ধ হবেই? এর উত্তর বোকার মতো করে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ দিয়ে দেওয়াটা ভুল হবে। কারণ, বৈশ্বিক অর্থনীতি, সেই অর্থনীতির ভবিষ্যৎ জ্বালানি, প্রযুক্তি মুঘলদের আকাঙ্ক্ষা, তাদের চাহিদা ইত্যাদি আসলে যুদ্ধের প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি ঠিক করে দেবে। এ ক্ষেত্রে চীনের এআইআইবি, এনডিবি, সিআরএফ ইত্যাদির কেন্দ্র হিসেবে চিহ্নিত ব্রিকস যেমন, তেমনি সোভিয়েত প্রভাববলয় পুনরুদ্ধারের রুশ উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং মার্কিন মেরু রক্ষার লড়াই‑ই মূল ভূমিকা রাখবে।

শান্তি তবে ছলনাই!
পুরো বিশ্ব নতুন করে কোনো যুদ্ধে ঢুকবে, নাকি শান্তি স্থাপন হবে, স্থিতিশীলতা আসবে কিনা, তা মুলত নির্ভর করছে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই অন্তিম পর্যায়ের ভাগ‑বাটোয়ারার ওপর।

খেয়াল করলেই দেখবেন যে, যুক্তরাষ্ট্রে যেমন ইলন মাস্ক এখন বাস্তব, চীনেও তেমনি প্রত্যাবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছেন জ্যাক মা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা উন্নয়ন নিয়ে যে ইঁদুর দৌড় শুরু হয়েছে, তার সাথে জড়িয়ে আছে উচ্চ সক্ষমতার সার্ভার, বিপুল শক্তি, যার প্রাপ্যতার ওপরই নির্ভর করছে আসলে কে আগে রাজত্ব করবে এ দুনিয়ায়। এখানেই চলে আসছে মহাকাশ প্রযুক্তির বিষয়। গত কয়েক বছর ধরে বিশ্বের শক্তিধর সবগুলো দেশ মহাকাশ প্রযুক্তির উন্নয়নে উঠেপড়ে লেগেছে। কারণ, এই ধুলার পৃথিবী আর এই চাহিদা পূরণে সক্ষম নয়। তাই মহাকাশে নিজেদের উপস্থিতির ওপর জোর দিচ্ছে সবাই।

ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদেই আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ উপস্থিতি রাশিয়ার সমতুল্য করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেন। বলে রাখা ভালো যে, ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশনে এখনো যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার যৌথায়ন আছে এবং সেটা ১৯৫৭ সাল থেকেই। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র রুশদের ওপর কিছুটা নির্ভরশীলও। এই নির্ভরতার বদলে একচেটিয়া হতে চাইছে এখন ওয়াশিংটন। তবে এ ক্ষেত্রে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে তারা চিহ্নিত করেছে চীনকে। কিছু দিন আগে চাঁদে অবতরণ নিয়ে দেশগুলোর মধ্যে হওয়া প্রতিযোগিতাটি স্মর্তব্য।

পরীক্ষিত ‘পশ্চিমা মিত্র’দের ত্যাগ করার প্রয়োজন পড়লে তাও তারা করবে। এটা কূটনীতির মধ্য দিয়ে হতে পারে, হতে পারে খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ ও আঞ্চলিক অস্থিরতার মধ্য দিয়েও। কোনটি হয়, তা মূলত ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভ্লাদিমির পুতিন, শি জিনপিং, নরেন্দ্র মোদি, রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানদের মতো নেতাদের পদক্ষেপগুলোই বলে দেবে।

এখানে বলা দরকার, মার্কিন প্রকল্প ডারপার কথাও। এটি মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি প্রকল্প, যার পূর্ণ রূপ–ডিফেন্স অ্যাডভান্সমেন্ট রিসার্চ প্রজেক্ট এজেন্সি। যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যমুখী যাবতীয় ধারণা এখন এই প্রকল্পের দিকে তাকিয়ে। বলে রাখা ভালো, এমনই একটি প্রকল্প ছিল আরপানেট (অ্যাডভান্সড রিসার্চ প্রজেক্ট এজেন্সি নেটওয়ার্ক), যার ফল হচ্ছে আজকের ইন্টারনেট। তফাৎ হচ্ছে ডারপা কাজ করছে মূলত মহাশূন্য নিয়ে। মহাকাশে মানুষের স্থিতি, বিস্তৃতি তো বটেই বড় বড় সার্ভার স্থাপনের বিষয়গুলোই এর গবেষণার কেন্দ্রে রয়েছে। বুঝতে কষ্ট হয় না যে, ট্রাম্পের গাইড ইলন মাস্ক কেন হয়ে উঠছেন, কিংবা ট্রাম্প ক্ষমতায় বসবার পর প্রযুক্তি মুঘলেরা কেন তাঁর কাছে হত্যে দিয়ে পড়েছেন। বা তিনি কেন এই মুঘলদের সঙ্গই বেশি উপভোগ করছেন। একই কথা খাটে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের ক্ষেত্রেও।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং। ছবি: রয়টার্সফলে আমাদের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে বসে এই সমীকরণ বোঝাটা কিছুটা ঝক্কিরই বলতে হবে। এই ভবিষ্যৎ পৃথিবীর চালচলন ও তাতে নানা দেশের ভাগবাটোয়ারাই আসলে বলে দেবে, ভূ‑রাজনীতিতে আসলে কী হবে। ভূ-রাজনৈতিক নানা খেলায়, শক্তিসাম্য প্রতিষ্ঠায় জাতীয়তাবাদ যে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হবে, তা বর্তমান প্রবণতা বলে দিচ্ছে। তবে এই খেলায় ধর্ম কতটা ব্যবহৃত হবে, তা এখনই বলা যাচ্ছে না। কিন্তু একদিকে তুরস্ক এবং অন্যদিকে ইউরোপ যদি নিজ নিজ ‘সভ্যতা ভাষ্য’ নিয়ে পৃথক বলয়ে ঢুকে পড়ে, তবে ধর্মের সংঘাতও ঢুকে পড়তে পারে। তবে এখন পর্যন্ত এ দুই পক্ষ বেশ গা‑ঘেঁষাঘেঁষি করেই আছে।

পৃথিবীতে শান্তি থাকবে কি থাকবে না–সেই তর্কটি তাই এই ভাগবাটোয়ারার ওপরই নির্ভরশীল। তবে এটা নিশ্চিত যে, স্নায়ুযুদ্ধকালের মতো করে গোটা বিশ্বে মানচিত্র নিয়ে টানাটানি না লাগলেও দেশে দেশে নিজ স্বার্থ রক্ষায় শাসক অদল‑বদল অনেকটা পোশাক বদলের মতোই হয়ে যাবে। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র নিজ মসনদ টেকাতে চীনের সঙ্গে দ্বৈরথে রাশিয়া ও ভারতকে কাছে টানার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে বলেই মনে হয়। আর সেক্ষেত্রে পরীক্ষিত ‘পশ্চিমা মিত্র’দের ত্যাগ করার প্রয়োজন পড়লে তাও তারা করবে। এটা কূটনীতির মধ্য দিয়ে হতে পারে, হতে পারে খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ ও আঞ্চলিক অস্থিরতার মধ্য দিয়েও। কোনটি হয়, তা মূলত ডোনাল্ড ট্রাম্প, ভ্লাদিমির পুতিন, শি জিনপিং, নরেন্দ্র মোদি, রিসেপ তাইয়েপ এরদোগানদের মতো নেতাদের পদক্ষেপগুলোই বলে দেবে। 

লেখক: উপবার্তা সম্পাদক, ডিজিটাল বিভাগ, ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশন

[এই মতামত লেখকের নিজস্ব। এর সঙ্গে ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনের প্রাতিষ্ঠানিক সম্পাদকীয় নীতিমালার কোনো সম্পর্ক নেই।]

আগের পর্বগুলো পড়ুন

পর্ব ১: নয়া বিশ্ব: ডোনাল্ড ট্রাম্প আসলে পৃথিবীটা কেমন চান
পর্ব ২: নয়া বিশ্ব: শি, পুতিন, মোদি বনাম নিঃসঙ্গ ইউরোপ
পর্ব ৩: নয়া বিশ্ব: ট্রাম্প চলেছেন পূর্বসূরীদের পথেই
পর্ব ৪: নয়া বিশ্ব: ‘দ্য ডেথ অব দ্য ওয়েস্ট’